kalerkantho


আমি বাংলায় কথা কই

ফ্রান্সে তাঁর জন্ম, ঘুরেছেন সারা পৃথিবী; তবে বগুড়ার সারিয়াকান্দিকে ধরেন তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। বাংলাও বলতে পারেন বাঙালির মতোই। ১৯৭২ সাল থেকে কয়েক দফায় বাংলাদেশে আছেন। হয়ে গেল ১৭ বছর। পেশায় চিকিৎসক এবং নেশায় আলোকচিত্রী পিয়া ক্লাকার সঙ্গে ভালোবাসা দিবসে দেখা করতে গিয়েছিলেন সালেহ শফিক

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০



আমি বাংলায় কথা কই

 

সারিয়াকান্দিতে কাজ করতে এলাম ১৯৭২ সালে। ব্রাদার্স টু ওল্ডম্যান নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তখন চিকিৎসক দরকার। আমি যোগাযোগ করলে তারা আমাকে নিয়ে এলো। ভার্সাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর অব সায়েন্স শেষ করেছি বেশি দিন হয়নি। সারিয়াকান্দিতে এসে দেখি, আমি কারো কথা বুঝতে পারছি না, কেউ আমাকে বুঝতে পারছে না। একজন দোভাষীকে দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে গিয়ে ভুল হয়ে যাচ্ছিল। রোগীদের সঠিক চিকিৎসাপত্র দিতে পারছিলাম না। আমি বেড়ানো শুরু করলাম অবসর সময়ে। কখনো চায়ের দোকানে গিয়ে বসি, কখনো মাছওয়ালার সঙ্গে, কখনো বা স্কুলে যাই বাচ্চাদের কথা শুনতে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা সকালে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গায়। আমি শব্দগুলো ধরতে পারিনি প্রথম প্রথম, তবে সুর তুলে ফেলি। একসময় দেখলাম, গানটা আমি গাইতে পারছি, বুঝতেও পারছি শব্দগুলো। বেড়ানোর সময় আমার সঙ্গে থাকত একটি নাইকন এফ ক্যামেরা। আমার যখন ১৬-১৭ বছর বয়স, মা-বাবা আমাকে একটা আগফা কিনে দিয়েছিল। তারপর আমার ছোট ভাই কিনেছিল একটি ফোকা ক্যামেরা। আমি ১৯৬৮ সালে কিনি একটি প্যানটাক্স। তারপর বাংলাদেশে আসার আগে কিনে নি

 

য়েছিলাম নাইকন।

 

ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম ছোট বেলায়ই। আমি দেখেছিলাম ডাক্তার হলে মানুষকে সাহায্য করা যায়। আমি চাইছিলাম এমন দেশে গিয়ে কাজ করতে, যেখানে সত্যি সত্যি মানুষের উপকার করা যাবে। আমি ট্রপিক্যাল ডিজিজ (ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, কুষ্ঠ ইত্যাদির প্রকোপ বেশি সেন্ট্রাল আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকায়।) নিয়ে পড়তে থাকি। অথচ আমার পূর্বপুরুষদের কেউ চিকিৎসক ছিলেন না। আমি বড় হয়েছি সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায়। পশ্চিম ফ্রান্সের জায়গাটিকে বলে ব্রিটানি। সেখানেই আমার জন্ম ১৯৪৭ সালে। আমার পূর্বপুরুষদের কেউ ছিলেন জেলে, কেউ বা লাইটহাউস কর্মী। একজন ছিলেন সেনাপতি। সেই পনেরো শতকে।

যা হোক, সারিয়াকান্দিতে আমি প্রথমবার এক বছর ছিলাম। আমার একজন ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিল, নাম সাহাদাত জামান টুকু। আমরা প্রতিদিন ভাত খেতাম আর মুরগি বা মাছের তরকারি। পরের বছর আমি চলে গিয়েছিলাম কম্বোডিয়ায়। কিছু দিন কাজ করেছি ভিয়েতনামে। নাইকনটা আমার সঙ্গেই থাকত। আমি দেখেছি বাংলাদেশে আমার আলোকচিত্রী বন্ধু যেমন নও

 

য়াজেশ আহমেদ, পাখি বিশারদ ইনাম আল হক প্রমুখ ক্যানন পছন্দ করেন। কিন্তু আমি নাইকন ছাড়তে পারিনি গত ৪০ বছরে। আমি ভিয়েতনামে ছিলাম যুদ্ধের মধ্যে। রোগীদের সেবা দিতে জঙ্গলে ছুটে গেছি। ক্যামেরাটা পানিতে পড়ে গেছে, কিন্তু ছবিগুলো নষ্ট হয়নি। আমি তাই নাইকনভক্ত।

১৯৭৪ সালে সোমালিয়া ঘুরে আমি কিন্তু পঁচাত্তরেই বাংলাদেশে চলে আসি। গুটিবসন্ত নিয়ে কাজ করেছি। গেছি অনেক জায়গায়। আশির দশকেরও অনেকটা সময় আমি বাংলাদেশে ছিলাম। মৌরিতানিয়া, সোমালিয়া আর আমেরিকায়ও গেছি; মাঝখানে কিন্তু বাংলাদেশেই ছিলাম বেশি। দেখুন আমি পাকিস্তানে ছিলাম, মিসরে ছিলাম, মধ্য আমেরিকায় ছিলাম; কিন্তু ভাষা কোনোটাই রপ্ত করতে পারিনি বা চাইনি। কারণ আমি বাংলাদেশেই ফিরতে চেয়েছি এবং বাংলা ভাষা বলতে চেয়েছি। একটা শব্দ আমার খুবই মজা লাগে। সেই শব্দটা সত্যি মজার—মিচকা শয়তান।

 

আলোকচিত্রী নওয়াজেশ আহমেদ মারা গেছেন। তাঁর সঙ্গে আমার শান্তি নিকেতন যাওয়ার কথা ছিল। আমরা কবিগুরুর স্মৃতিধন্য জায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে চেয়েছিলাম। কবিগুরুর গান আমি গভীর রাতে শুনি। যেমন শুনি লালনের গান। আমি কুষ্টিয়ায় লালন উৎসবে গেছি কম করেও ১০ বার। বাউল করিম শাহের সঙ্গে আমার দারুণ বন্ধুতা হয়েছিল। আমি সাঁইজির জন্মতিথিতেও গেছি, আবার দোল উৎসবেও গেছি কুষ্টিয়ায়। সুন্দরবনও আমার ভালো লাগে। শিল্পী কালিদাস কর্মকারের সঙ্গে গেছি সুন্দরবন। ছিলেন গাইড ট্যুরসের হাসান মনসুর। বাংলাদেশে আমার অনেক বন্ধু। বেশির ভাগই গ্রামের। ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের সব জায়গা আমার পছন্দ। একবার কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে নৌকায় করে চিলমারী হয়ে যমুনা সেতু পর্যন্ত গেছি। নদী আমার বেশি পছন্দ। চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেলের অয়ি যমুনা, লালন আর লালসালু চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে গেছি। অনেক ছবি তুলেছি। পরে আঁলিয়স ফ্রঁসেজ, ঢাকায় গ্যাংস অব তানভীর মোকাম্মেল নামে একটি প্রদর্শনী করেছি। বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলায়ও বেড়িয়েছি অনেক—নৌকায়, লঞ্চে, স্পিডবোটে। ২০০২ সালে আমি একটি ভালো প্রদর্শনী করেছিলাম। নাম ছিল, দ্য চেঞ্জিং ফেসেস অব সারিয়াকান্দি : ১৯৭২-২০০২। আমার প্রথম সারিয়াকান্দি আর ৩০ বছর পরের সারিয়াকান্দির পরিবর্তনগুলো আমি তুলে ধরেছিলাম। বাচ্চারা ভিড় করে এসে ছবিগুলো দেখেছে। বলেছিল, ও এখানে ফুলের বাগান ছিল... ফেরিঘাটটা এখন আর নেই কিংবা বাজার তো আগে ছোট ছিল। ১৯৭২ সালে ছোট ছিল, ২০০২ সালে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে এমন একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সবচেয়ে দুখের বিষয় কী? বলেছিল, বিয়ে হয়েছে বুড়ার সঙ্গে। আর সুখের বিষয়? বলেছিল, মেয়েরা পড়াশোনা করতে পারছে। ২০০৩ সালে সার্কাস নিয়ে আমি একটি প্রদর্শনী করেছিলাম। নাম ছিল, সার্ভাইভিং ড্রিমস : দ্য স্ট্রাগলিং সার্কাসেস অব বাংলাদেশ। ছবি তুলেছি অনেক জায়গায়। লায়ন সার্কাস, সোনার বাংলাসহ আরো কিছু দলের সঙ্গে মেলায় গেছি। জানতে পেরেছি, যে মেয়েরা এখানে কসরত দেখায়, ওদের কারোর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে, কারো বাড়ি ভাঙনে পড়েছে। এখানে ওরা রং মেখে দর্শককে আনন্দ দেয়, কিন্তু ওদের জীবনে কোনো রং নেই। বামন মানুষগুলোকে সমাজ সুন্দরভাবে নেয় না। তাই নানা রকম হাসি-কৌতুকে জীবন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা। এসব মানুষ, আরো যেসব মানুষের কথা বলা হলো না সেসব মানুষ, এই আমাদের বাংলার সব মানুষকে আমি ভালোবাসি। আমি ভালোবাসি শুঁটকি খেতে, বিশেষ করে লইট্টা শুঁটকি। ভালোবাসি বাংলাদেশে বারবার ফিরে আসতে।               

ছবি : পিয়া ক্লাকা ও সংগ্রহ



মন্তব্য