kalerkantho

পার্কে খুন

তাহমিনা সানি

২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পার্কে খুন

অঙ্কন : মানব

শনিবার সকালটায় এমন শনি লাগবে বুঝতে পারেনি সোহাগ। অমন শীত শীত সকালেও জগিং করতে বের হয়েছিল সে। তখন কি আর ভেবেছিল, কপালে শেষ পর্যন্ত এই আছে!

বেজার মুখ করে থানার দেয়ালে ঝোলানো আইনবিষয়ক প্রচারণা বিজ্ঞপ্তিগুলো পড়তে লাগল। কিছুক্ষণ যেতেই আরো অস্থির হয়ে উঠল। এভাবে আর কতক্ষণ! ইন্সপেক্টর সেই কখন তাকে বসিয়ে রেখে বেরিয়ে গেছেন, এখনো আসার নাম নেই। ভিকটিমের ওখানেই গেছেন হয়তো। মনে মনে বড্ড রাগ হয় ওর। পুলিশ ওর মোবাইলটাও আটকে রেখেছে। বাসায় একটা ফোনও দিতে পারছে না। কত রিকোয়েস্ট করেছে। লাভ হয়নি।

এদিকে বাড়িতে বউ টেনশন করছে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, এখনো বাসায় ফিরিনি। ওদের কি কোনো বউ-বাচ্চা নাই নাকি—মনে মনে ওর রাগ হয় ভীষণ।

আরো আধা ঘণ্টার মতো পার হলো বোধ হয়। থানার গেটে জিপের ঘরর ঘ্যাশশ শব্দ শোনা গেল। এর পরপরই ইন্সপেক্টরের আগমন। চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি। সোহাগকে দেখে যেন চোখমুখ আরো উল্টে ফেললেন। মনে মনে ঢোক গেলে সোহাগ। লক্ষণ সুবিধার না!

ধীরেসুস্থে নিজের চেয়ারে এসে বসলেন ইন্সপেক্টর। হাতে কিছু টুকিটাকি জিনিস ছিল, নোটপ্যাডসহ কী কী যেন! সেগুলো টেবিলে রাখলেন। তারপর টিস্যু বক্স থেকে একটা টিস্যু বের করে ক্যাপটা খুলে টাক মাথায় একবার বুলিয়ে নিলেন। টিস্যুটা দলামোচা করে বাস্কেটে ফেললেন। পুরোই যেন স্লো মোশন দেখছে সোহাগ!

সোহাগের মতো আস্ত একটা মানুষ যে তাঁর উল্টো পাশের চেয়ারে সেই তখন থেকে অপেক্ষা করে বসে আছে, তাতে ইন্সপেক্টরের কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হলো না। যেন সে মানুষ নয়, তেলাপোকা!

মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে সোহাগ বলল, ‘স্যার! কিছু কি হলো?’

ইন্সপেক্টর কিছু বললেন না। বেজার মুখে নোটপ্যাডটা খুললেন। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে কী যেন চেকও করতে লাগলেন।

ইতস্তত করে সোহাগ আবারও বলল—‘স্যার, আমি নির্দোষ! আমাকে ছেড়ে দিন। বাড়ি চলে যাই। বাসার সবাই টেনশন করছে।’

ইন্সপেক্টর নির্বিকার।

সোহাগ বোকার মতো মুখ করে বসে রইল।

ইন্সপেক্টর তার নোটবুকখানা বন্ধ করলেন। শীতল দৃষ্টিতে তাকালেন সোহাগের দিকে। ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন—‘লোকটা বেঁচে যেত। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও আতঙ্কে সে শেষপর্যায়ে হার্ট অ্যাটাক করেছে। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও বাঁচানো যায়নি। আর ওই ঘটনার আপনিই একমাত্র সাক্ষী।’

‘জি, স্যার। আমিই সাক্ষী। সবচেয়ে কাছ থেকে ভদ্রলোককে গুলি খেতে দেখেছি। এরপর আরো লোক এসে জড়ো হয়েছিল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পুলিশও এসেছিল। কিন্তু—ইন্সপেক্টর হাত তুলে ইশারা করে সোহাগকে থামিয়ে দিলেন—‘কী করে বুঝব?’

‘মানে!’

‘মানে কী করে বুঝব যে আপনি নিহত ব্যক্তির শত্রু নন? হয়তো গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় পাননি বলে পথচারী সেজে ভিকটিমকে সাহায্য করার অভিনয় করেছিলেন?’

‘অসম্ভব!’

‘আমিও তা-ই বলছি। অসম্ভব কিছুই নয়।’

‘আরে আশ্চর্য! আমি তো শুরু থেকে বলেছি সব। এমনকি যে আসল খুনি, তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিবরণ দিয়েছি। আমার মাত্র তিন হাত দূরে ছিল সে। মাথায় মেহেদি দেওয়া লাল চুল। মধ্যবয়স্ক। পরনে ছিল বাদামি জ্যাকেট, কালো প্যান্ট আর সাদা কেডস।’

‘হুমম। দেখুন তো তিনি এই লোক কি না?’ বলতে বলতে ইন্সপেক্টর নোটপ্যাডে কাগজের ফাঁকে রাখা একটা ফটোগ্রাফ বের করলেন। সেখানে ভিকটিমসহ আরো চারজন লোক। তার মধ্যে একজনের চুল লাল।

‘ঠিক বুঝতে পারছি না। মুখটা ঠিক খেয়াল নেই। এত দ্রুত সব কিছু হয়ে গেল যে কী বলব। তবে আমার ঠিক মনে আছে, আমি আর ভিকটিম পাশাপাশিই দৌড়াচ্ছিলাম পার্কে। দীর্ঘক্ষণ ধরে ব্যায়াম করেছিলাম বলে দৌড়ে বেশি এনার্জি ছিল না। এক রকম জোরে হাঁটা যাকে বলে, সেভাবে আস্তে আস্তে দৌড়াচ্ছিলাম। আর ভিকটিমও সে ফাঁকে আমার সামনে আরো কিছু দূর এগিয়ে যায়। এরপর আমার পাশে দৌড়াতে দৌড়াতে আসে আরেক লোক। লালচুলো, যার কথা বলছিলাম আপনাকে। সেও আমাকে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ঠিক ভিকটিমের পিছে। মনে হয়, এক হাত দূরত্বও হবে না। সে সময় আমি কী দেখার জন্য যেন একটু অন্যদিকে তাকাই। আর তখনই শুনি গুলির শব্দ। আর লালচুলোও জোরে দৌড় দিয়ে বাঁয়ে কেটে পড়ে। আমি দৌড়ে গিয়ে আহত লোকটিকে ধরি। আশপাশে আরো অনেক লোক ছিল। তারাও ছুটে আসে। হাসপাতালে নিতে নিতে লোকটা মারা যায়। আরে আমিই তো সবার আগে পুলিশকে জানিয়েছি। যদি সত্যি খুনি হতাম, তাহলে কি পুলিশকে খবর দিতাম? আপনিই বলুন?’

‘সবই তো বুঝলাম। আরো বোঝা যাবে লালচুলোর সঙ্গে কথা বললে। আমি তাকে আসতে বলেছি। ভদ্রলোক ভিকটিমের বিজনেস পার্টনার। আপনার বয়ান শুনে ভিকটিমের পরিবার তার ছবি ফ্যামিলি অ্যালবাম থেকে বের করে দিল। তারা তো বলছে, এই লোকের সঙ্গে মৃত আহসান আলীর ব্যবসা নিয়ে ইদানীং বেশ ঝামেলা চলছিল। এমনকি তাদের পার্টনারশিপও ভেঙে যাওয়ার পথে ছিল। অবশ্য নিহতের পরিবার এটাও বলেছে, তাঁর ব্যবসায়িক কারণে আরো কিছু লোকের সঙ্গেও বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।’

‘স্যার, তাহলে তো সবই ক্লিয়ার। এবার তো আমাকে যেতে দিন!’

‘আরে এত অস্থির হচ্ছেন কেন? নিন। বাড়িতে একটা ফোনই দিয়ে দিন বরং।’ বলেই ইন্সপেক্টর টেলিফোন সেটটা সোহাগের দিকে এগিয়ে দিলেন।

সোহাগ কাঁপা কাঁপা হাতে সেটটায় বাড়ির নম্বর টিপল। ওর ওয়াইফই ধরল। তারপর ঝড়ের বেগে কী যে বকে গেল, নিজেই বলতে পারবে না। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে রেখে টের পেল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে এই শীতের মাঝেও।

এরই মধ্যে মৃত ব্যক্তির সেই ব্যবসায়িক পার্টনার থানায় হাজির। সোহাগ লোকটার দিকে তাকিয়ে ভয়ানক চমকে উঠল। লোকটার চুল কালো! একই রকম মাথাভর্তি চুল, কিন্তু কালো। ঠিক বুঝতে পারছে না, এই লোকই সেই লোক কি না। লোকটা আড় চোখে একবার সোহাগের দিকে দেখে নিয়ে সরাসরি ইন্সপেক্টরের সঙ্গে কাজের কথায় এলো—

‘আমি সোহেল আরেফিন। শুনুন, অনেকগুলো কাজ বাদ রেখে এখানে এসেছি। অল্প কথায় সারতে চাচ্ছি। এই পথচারী কী দেখেছে, কাকে দেখেছে—সেটি এত ইম্পর্টেন্ট কী করে হলো? আমি ওই সময় বাসায়ই ছিলাম। বেশ কিছুদিন হলো, আমার চুল কালো কলপ করা। তবে হ্যাঁ, একটা সময় ছিল, যখন আমার চুল লাল ছিল। কিন্তু এই একটা ইনফরমেশন নিশ্চিত করে, আমিই খুনি? ঢাকা শহরে লাল চুল আর কারো নেই। আমার অফিস কিংবা এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারবেন, কত দিন ধরে আমার চুল কালো। নিশ্চয়ই আমাকে কেউ ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। আর এই পথচারীকে টাকা খাইয়ে এ কাজ করা অসম্ভব কিছু না।’

‘চুপ করুন! আমি টাকা খাইনি! আপনিই খুন করেছেন। আমি ঠিক দেখেছি। খুনি লম্বা-চওড়া একেবারে আপনার মতোই ছিল। শুধু আপনার চুল কালো আর ওনার চুল ছিল লাল।’

লোকটা একরাশ বিরক্তি নিয়ে সোহাগের দিকে তাকিয়ে থাকল শুধু। কিছু বলল না। ইন্সপেক্টরের দিকে ফিরে বসল—‘বাজে কথা শোনার টাইম নেই। আপনি দ্রুত সমাধানে আসুন।’

‘বাজে কথা! আমার কথা বাজে কথা!’ প্রায় লাফিয়ে উঠল সোহাগ—‘আজকে সারাটা দিন আমার কেমন গেছে, সে আমিই জানি। পোস্ট অফিস থেকে টাকা উঠানোর কথা ছিল, দেশের বাড়িতে জরুরি ভিত্তিতে পাঠাতে হবে, তা হলো না। বাড়িতে বউটা কান্নাকাটি করে মরছে। সেই সকালে বেরিয়েছি, এখনো বাড়ি ফিরিনি। আপনি বলছেন বাজে কথা! ফাজলামিরও একটা সীমা থাকা দরকার!

‘খবরদার, আমাকে ফাজিল বলবেন না!’

‘অবশ্যই আপনি ফাজিল! লাল চুল কলপ করতে কতক্ষণ লাগে?’

মুহূর্তে ঘোলাটে হয়ে ওঠা পরিস্থিতি সামাল দিতে হুংকার ছাড়লেন ইন্সপেক্টর—‘থামুন আপনারা! কী শুরু করেছেন?’

ওরা দুজনই বিরস বদনে চুপ হয়ে গেল। ইন্সপেক্টর গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—‘দেখুন! আপনাদের দুজনের কেউই সন্দেহের বাইরে নন। আমি নিজেও একটু কনফিউজড। আমাকে একটু ভাবতে দিন।

ইন্সপেক্টর ভাবতে শুরু করলেন। পেটে গুলি খাওয়া লোকটার চেহারাটা স্পষ্ট ভেসে উঠল চোখের সামনে। কী যেন একটা মনে পড়ছে পড়ছে করেও পড়ছে না। তারপরই একসঙ্গে দুটি খটকা দানা বাঁধল মনে। ব্যস, রহস্যের সমাধান।

হাতকড়া নিয়ে আসার আদেশ দিলেন সেন্ট্রিকে। উপস্থিত দুজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল সভয়ে।

পাঠক, বলুন তো ইন্সপেক্টর কী করে জানলেন কে খুনি?


মন্তব্য