kalerkantho


রহস্যজট

বাগানে খুন প্রিন্স আশরাফ

২৬ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বাগানে খুন প্রিন্স আশরাফ

অঙ্কন : মাসুম

কোনো কেসের সমাধান না করতে পারলেই সরকারি গোয়েন্দা রাশাদ রাহার প্রথমেই জ্যোতির্ময় দাদুর কথা মনে পড়ে। রহস্যের সুরাহা করতে না পেরে জ্যোতির্ময় দাদুর কাছে গেছে, কিন্তু কাজ হয়নি—এমনটি কখনো হয়নি।

আর এ ক্ষেত্রে যে জ্যোতির্ময় দাদু ছাড়া কোনো উপায় নেই, সে ভালোভাবেই বুঝতে পারছে। এক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেলের বাগানে খুনটা হয়েছে, সন্দেহভাজনরা হাতেনাতে ধরাও পড়েছে। তবে এদের মধ্যে প্রকৃত খুনি কে তা বের না করে স্বস্তি নেই।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জ্যোতির্ময় দাদু এখন ঢাকায় নেই। ডাক্তারের পরামর্শে হাওয়াবদলের মানসে তিনি নারিকেল জিঞ্জিরা বা সেন্ট মার্টিনসে গিয়ে বসে আছেন। সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের জন্য নিজের মোবাইল ফোনও অফ রেখেছেন। অবশ্য রাশাদ রাহা ভালো করেই জানে, মোবাইলে এই কেসের রহস্যের সুরাহা হবে না। তাকে সেন্ট মার্টিনসেই যেতে হবে।

সরকারি খরচে বিমানে কক্সবাজারে  এসে পরদিন সেন্ট মার্টিনসে গেল।

রাতটা থেকে গেল সরকারি এক রেস্ট হাউসে। জ্যোতির্ময় দাদু কেয়ারটেকারকে সঙ্গে নিয়ে সাগরের ধারে একটা কটেজে নিরিবিলি চমত্কার সময় কাটাচ্ছেন বলে খবর পেয়েছে সে। কেয়ারটেকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরদিন বেশ সকাল সকালই রাশাদ রাহা তাঁর সঙ্গে দেখা করল।

জ্যোতির্ময় দাদু রাশাদ রাহাকে দেখে একই সঙ্গে বিস্মিত এবং খুশিও হলেন। এমনিতে মানুষের সংস্পর্শ না চাইলেও রাশেদের প্রতি তাঁর বিশেষ পক্ষপাতিত্ব আছে। কটেজের সামনের টি টেবিলে বসে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, ‘এত দিন দুষ্কৃতকারীর পিছু ধাওয়া করে গোয়েন্দা আসে বলে জানতাম, এখন দেখছি সাধারণ বুড়োদের ধাওয়া করেও আসে! হা হা হা। ’

রাশাদ রাহা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল—‘নিরুপায় হয়ে এসেছি, দাদু। আপনি ছাড়া এই কেসের সমাধান কেউ দিতে পারবে বলে মনে হয় না। ’

‘ঘটনাটা ঘটেছে রিটায়ার্ড কর্নেল ওয়াহিদ মির্জার গাজীপুরের বাংলো বাড়িতে। রাতে বিশিষ্ট অতিথিদের ডিনারের দাওয়াত ছিল। সন্ধ্যার পর থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে ঢাকা থেকে একে একে অতিথিরা হাজির হন। বিপত্নীক কর্নেলের খাস খানসামা রইস সব দিক সামাল দিচ্ছিল। কুক, বেহারা—সব মিলিয়ে অতিথিদের খেদমতের লোকের অভাব ছিল না। অবশ্য অতিথির সংখ্যা বেশি নয়, মোটে চারজন।

অতিথিরা কর্নেলের খাস কামরায় আড্ডা দিচ্ছিলেন। খাস কামরা বললেও ওটা যেন অনেকটা সমরাস্ত্র প্রদর্শনীর ঘর। দেয়ালে তরবারি, ছোরা, ভোজালিসহ নানা ধরনের অস্ত্র লটকানো আছে। বনেদি বাগানবাড়ির চারপাশে উঁচু পাঁচিল। বাগানবাড়িতে ঢোকার একটাই লোহার দরজা। ওটার সামনে দাঁড়ানো ষণ্ডামার্কা দারোয়ান রমজানের চোখ এড়িয়ে কারো ভেতরে ঢোকার জো নেই।

কর্নেলের অতিথিদের মধ্যে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আসলাম হক, বেশ স্যুটেড-বুটেড হয়েই এসেছিলেন তিনি। কোমরে গোঁজা লাইসেন্স করা পিস্তল। এসেছিলেন খাজা নইমুদ্দীন। পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরেছেন। নানা ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁর। আর অপরাধবিজ্ঞানী প্রফেসর আলীম, অপরাধবিজ্ঞানের নানা বিষয়ে পারদর্শী। বাঁ হাতে নানা ধরনের ম্যাজিক দেখিয়ে রীতিমতো চমকে দিচ্ছিলেন সবাইকে। কর্নেল নিজেই তাঁর বিভিন্ন মিশন থেকে উপহার পাওয়া ধারালো অস্ত্রপাতির বয়ান দিচ্ছিলেন অতিথিদের কাছে। খাজা নইমুদ্দীনের বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল জিনিসগুলোর প্রতি। বিশেষ করে তরবারি, গুপ্তি, দড়ির ফাঁস—এগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিল ডানহাতি লোকটা।

অতিথিরা সবাই এসে পড়লেও কর্নেল উন্মুখ হয়ে ছিলেন একজন বিশেষ অতিথির জন্য। যাঁকে দেখলে আগত তাঁর তিন বন্ধু অবশ্যই চমকে উঠবেন, বিস্মিত হবেন। সেই অতিথি তখনো পৌঁছাননি। তাঁকে ডিনার পার্টিতে নিমন্ত্রণের পেছনে বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কর্নেলের। তাঁকে দেখে তাঁর তিন বন্ধুর মুখখানি কেমন হয় তা-ই দেখার ইচ্ছা তাঁর। কারণ এই তিনজন বহু বছর আগে এমন একটি অপরাধ করেছিল, যার একমাত্র সাক্ষী ছিলেন ওই বিশেষ বন্ধু। বন্ধুটি ঢাকা শহরে এসেছেন, তা তাঁর তিন বন্ধুর কেউ জানার কথা নয়। জানলে ওরা হয়তো এখানে আসতে রাজি হতো না। কর্নেল মজা দেখার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তখনই হঠাত্ করে ইলেকট্রিসিটি চলে গেল।

ওয়াহিদ মির্জা উপস্থিত তিন বন্ধুকে বললেন, ‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের নিজস্ব জেনারেটর আছে। জেনারেটরে তেল ভরা হলেই আলো জ্বলে উঠবে। ’

অন্ধকারের মধ্যে কে যেন একজন বলে উঠল, ‘এখানে বসে থাকার চেয়ে বাগানের দিকটায় ঘুরে আসি। বাগানবাড়িতে এসে ঘরে বসে থাকার কোনো মানেই হয় না। ’

দেখা গেল, ঘরে বসে থাকার ইচ্ছা কারোরই নেই। সবাই একে একে বাগানের দিকে রওনা হলো। ঘোর অন্ধকার হওয়ায় বাগানের কোনো কিছুই ঠিকমতো ঠাহর করা যায় না। তার মধ্যেই হঠাত্ করে একটা অদ্ভুত গোঁ গোঁ আওয়াজ হলো। তারপর সব কিছু নিস্তব্ধ।

আর তখনই জেনারেটর চালু হয়ে বাগানের দিককার আলো জ্বলে উঠল। হতভম্ব সবাই দৌড়ে এসে দেখতে পায়, বাগানে একটি লাশ পড়ে আছে। লাশের গলায় দড়ি টানটান হয়ে আছে, দড়ির গিঁটটা ডান দিকে। লাশের মুখে আলো পড়তেই কর্নেল আতঙ্কিত হয়ে দেখলেন, লাশটা আর কারোর নয়, তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু বিশেষ অতিথি মুহিবুল আলমের!

পুলিশও ডাকা হয়। কিন্তু তিনজনের কেউই অপরাধের কথা স্বীকার করেননি। পরে ডাক পড়ে রাশাদ রাহার।

দাদুর দিকে তাকিয়ে রাশাদ রাহা বলল, ‘অনুমান করা যায় কী ঘটেছে। তিন বন্ধুকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য কর্নেল মুহিবুল আলমকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু বন্ধুদের কেউ একজন তাঁর আসার খবরটা জেনে যায়। মুহিবুল আলম হয়তো ওই তিনজনের এখানে দাওয়াত পাওয়ার কথা জানতেন। তবে ভেবেছিলেন, এত দিনে সব ধামাচাপা পড়ে যাওয়ায় তার প্রতি কারো আক্রোশ নেই। দুর্ভাগ্যবশত মুহিবুল যখন এখানে এসে পৌঁছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ইলেকট্রিসি চলে যায়। দারোয়ানকে নিজের পরিচয় দিয়ে ভেতরে ঢোকেন তিনি। দারোয়ানের সঙ্গে মুহিবুলের কথোপকথন তিন বন্ধুর একজনের কানে যায়। আর সে দড়ির ফাঁস লাগিয়ে ভদ্রলোককে মেরে ফেলে। একজন প্রকৃত খুনি হলেও আপাতত সন্দেহভাজন তিনজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ’ তারপর একটু বিরতি টেনে বলল, ‘দাদু ঘটনাটা তো পুরোটা শুনলেন, এখন বলুন তো খুন করেছে কে?’

জ্যোতির্ময় দাদু মুচকি হাসলেন। তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছেন।

পাঠক, আপনি পারবেন খুনির পরিচয় বের করতে?


মন্তব্য