kalerkantho


আসল পাইওনিয়ার কিন্তু আমার মা

মঞ্জুলিকা চাকমা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রথম নারী ব্যবসায়-উদ্যোক্তা। হস্তশিল্পের এই কিংবদন্তি কারিগরের জীবন ও পথচলার গল্প শুনেছেন রুদ্র আরিফ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



আসল পাইওনিয়ার কিন্তু আমার মা

ছোটবেলার কথা মনে পড়ে?

আমার জন্ম ১৯৪৪ সালের ২৬ অক্টোবর, রাঙামাটি। বাবা কালী রতন খীসা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। আমরা থাকতাম সরকারি কোয়ার্টারে। সেটির নাম ছিল ‘বাজার ফান্ড কোয়ার্টার’। ঘুম থেকে উঠে বাসা থেকে বের হলেই বাজারটি দেখতে পেতাম। ১৯৫০ সাল থেকে এ স্মৃতি মনে আছে। এখন যে ছেলে-মেয়েরা ব্যবসা করছে, বিশেষ করে মেয়েরা, আমাদের সময়ে কোনো চাকমা মেয়েকে কখনোই বাজারে আসতে দেখিনি। তবে তঞ্চঙ্গ্যা মেয়েরা বাজারে আসত হলুদের গুঁড়া, সবজি ইত্যাদি বিক্রি করতে। তার মানে ওরা চাকমাদের আগে থেকেই ব্যবসায় জড়িত ছিল। তাদের পরনের মালাগুলো ছিল গ্লাস বিডসে তৈরি। এ জিনিসটি আমাকে খুব আকৃষ্ট করত। অন্য পাহাড়িরা আবার মালা বানাত ন্যাচারাল বিডস এবং গাছের নানা ধরনের বিডস দিয়ে। এখন কত রকমের মালা হয় না? খুব সূক্ষ্ম, ছোট বিডস দিয়ে মালা বানাত ওরা। তঞ্চঙ্গ্যাদের কোনো মালা ছিঁড়ে গেলে, আমরা দৌড়ে গিয়ে গ্লাস বিডসগুলো কুড়িয়ে নিতাম। পরবর্তী সময়ে আমি যখন ব্যবসা শুরু করি, চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট থেকে গ্লাস বিডস কিনে এনে, তঞ্চঙ্গ্যা মেয়েদের দিয়ে সে রকম মালা বানিয়ে নিয়েছি। এটি আমি ১৯৬০ দশকের কথা বলছি। ওরা কিন্তু দিনের বেলা মালা বানায় না। রাতে চেরাগের আলোয় বানায়। ওদের কেরোসিন তেলের টাকা অগ্রিম দিতে হতো আমাকে।

 

আপনার হাতেখড়ি কখন?

রাঙামাটিতে একটাই অফিসার্স ক্লাব ছিল। আর আমাদের বাসার সামনে ছিল টেনিস কোর্ট। এ নিয়েই ছিল তখনকার রাঙামাটি শহর। অর্ধেক বাজার আর অর্ধেক শহর। কাপ্তাই বাঁধের কারণে ১৯৫৯ সালে পুরো এলাকাটি পানিতে তলিয়ে যায়। পরের বছর আমরা একটু উঁচু অঞ্চলে চলে আসি। এখন যেখানে শহর হয়েছে, এসব অঞ্চল তখন ছিল বনজঙ্গল। শহরে তখন মুষ্টিমেয় অফিসার থাকতেন। ১৯৫০ দশকে আমার মা পঞ্চলতা খীসা কাপড় বুনতেন। মা কিন্তু বিক্রির জন্য বুনতেন না। তিনি ছিলেন অল পাকিস্তান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। তিনি বাংলা বলতে পারতেন না। যখন ডিসির বাংলোতে যেতেন, আমি তাঁর সঙ্গে যেতাম। মায়ের দোভাষী হিসেবে কাজ করতাম সেই ছোট্ট বয়সেই। পাকিস্তান আমলে উর্দুভাষী ডিসি ছিলেন, তাই উর্দুও বলতে পারি। ফাইভ-সিক্সে পড়ার সময় মায়ের সঙ্গে আমিও কাপড় বোনার কাজে হাত লাগিয়েছি। তিনিই আমার প্রথম প্রশিক্ষক, বিশেষ করে তাঁকে আমি নকশার কাজ করে দিতাম। তিনি বলতেন, ‘লেখাপড়া করো, আর যাই করো—এ কাজটি করতেই হবে।’

 

পরিবারে কারা ছিলেন?

আমরা ছিলাম চার বোন, তিন ভাই। আমাদের প্রত্যেকের বয়সের ব্যবধান তিন বছর করে। আমি তৃতীয়; বোনদের মধ্যে অবশ্য সবার বড়। ছোটবেলা খুব একটা খারাপ কাটেনি। তবে মা খুব কড়া ছিলেন। অনেক পিটুনি খেয়েছি তাঁর!

 

স্কুলজীবন কেমন ছিল?

প্রাইমারিতে পড়েছি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। ওখান থেকে ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হয়েছি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। মেয়েদের পড়াশোনার জন্য তখন এটিই ছিল একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয়। তাই ভর্তি হওয়া খুব কঠিন ছিল। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মেয়েরা বলতে গেলে সুযোগই পেত না। গ্রামের যে ছেলেরা এসে পড়ত, তারা থাকত হোস্টেলে। নারী শিক্ষার তেমন প্রচলন ছিল না। একেক ক্লাসে চার-পাঁচজনের বেশি মেয়ে ছিল না। তবে আশ্চর্য ব্যাপার, আমাদের ক্লাসে মেয়ে ছিল ২১ জন, ছেলে ২০ জন। ছোটবেলা থেকেই আমি একটু দাপুটে ছিলাম। গার্লস গাইডিংয়ে নেতাগিরি করেছি! স্কুলের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার প্রত্যেকটি বিভাগেই নাম লিখিয়েছি—নাচ, কোরাস, গ্রুপ ড্যান্স ও নাটকে। একেবারেই গায়িকা ছিলাম না; তবু কোরাসের সময় অন্যদের সঙ্গে স্টেজে উঠে খুব চিল্লাতাম! খেলাধুলায় দৌড়, হাইজাম্প, লং জাম্পে সবার শেষেই থাকতাম! তবে সুঁই-সুতা, অঙ্ক রেস, চামচ মুখে নিয়ে দৌড়ানো—এগুলোতে আবার ফার্স্ট হতাম। ক্লাস সিক্স থেকেই অভিনয় করতাম। নিজে নির্দেশনা দিয়ে গোপাল ভাঁড়ের গল্প নিয়ে নাটক করাতাম। এগুলো স্কুলে আমিই শুরু করেছি। তখন তো এসবের কোনো শিক্ষক ছিলেন না। অন্যদিকে জগনানন্দ বড়ুয়া নামে এক সংগীত শিক্ষক ছিলেন শিল্পকলা একাডেমিতে। খুবই নামকড়া সংগীতজ্ঞ এবং শিল্প-সাহিত্যের নানা বিষয়ে জ্ঞানী। যখন নাইন-টেনে পড়ি, উনি দুটি কমিক লিখে দিয়েছিলেন, আমি সেগুলোর ক্যারিকেচার করেছি। আমার কোনো লজ্জা কিংবা অস্বস্তিবোধ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যেতে পারি। এ কারণে সেভেন থেকে টেন পর্যন্ত ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম। ক্লাস টেনে উঠে পুরো স্কুলেরই মেয়েদের ক্যাপ্টেন হয়ে গেলাম।

 

বিয়ে করলেন কখন?

সেভেনে ওঠার পর মা বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে-পড়ে লাগলেন। তখন এ বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। যেহেতু একদিকে বৃত্তি, অন্যদিকে পুওর ফান্ড থেকে সাহায্য পেতাম আমি; তাই আমার পড়াশোনার খরচ পরিবারকে দিতে হতো না। ফলে সে যাত্রায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম। তবে ক্লাস টেনে ওঠার পর আমাকে বিয়ে দেওয়া হয়। তখনকার দিনে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর কোনো মেয়ে পড়াশোনা করত না। আমিই প্রথম সেটি করেছি। যদিও শুরুতে দুই-এক দিন স্কুলে যাইনি, তারপর আবার ক্লাস করা শুরু করলাম। বিয়ের পর শুধু ম্যাট্রিকই নয়, ইন্টারমিডিয়েট, পিটি, বিএ—এ সবই পাস করেছি।

 

শিক্ষকতা দিয়ে আপনার ক্যারিয়ার শুরু।

সে সময়ে রাঙামাটিতে আরেকটি উচ্চ বিদ্যালয় ছিল—বয়েজ হাইস্কুল। সেটি ছিল বেসরকারি। শুধু ছেলেদের জন্য। ১৯৬১ সালে সেটিতে কো-এডুকেশন চালু করা হয়। সে বছরই ম্যাট্রিক পাস করেছি আমি। এক দিন বয়েজ হাইস্কুলের লোকজন আমার বাড়ি গিয়ে হাজির হলো, নিয়োগপত্র নিয়ে। যেহেতু স্কুলটিতে মেয়েদেরও পড়ানো হবে, তাই নারী শিক্ষক তো লাগবেই। আর আমি যেহেতু খুব ভালো ফল করে পাস করেছি, তাই কোনো রকম পরীক্ষা না নিয়েই আমাকে নিয়োগ দেওয়া হলো। একাডেমিক সার্টিফিকেটে আমার নাম মঞ্জুলিকা খীসা; কিন্তু চাকরিতে ঢুকলাম মঞ্জুলিকা চাকমা নামে। আসলে ম্যাট্রিক পাসের পরই সংসার শুরু করেছিলাম। সংসারে এসে, শ্বশুরবাড়িতে হয়তো একটু ভালো সাজতে গিয়েই ‘খীসা’র জায়গায় ‘চাকমা’ হয়ে গেছি! খীসা চাকমাদেরই একটি পদবি; আরো যেমন আছে দেওয়ান, কারবারী, তালুকদার ইত্যাদি। যদিও রাঙামাটিতে দাওয়াত দেওয়ার সময় এখনো আমার নাম ‘খীসা’ই লিখে।

 

ব্যবসা শুরু করলেন কখন?

স্কুলের পাশে আমার স্বামী একটি জায়গা কিনে ঘর তুলেছিলেন। সেখানেই সংসার শুরু হয় আমার। ফলে মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর, তাঁর কাছ থেকে যে কাজগুলো শিখেছিলাম, নিজেই সেগুলো করতে শুরু করলাম। ১৯৬২ সালের দিকে ‘মাঝির বস্তি মহিলা তন্তুবায় সমবায় সমিতি’ নামে একটি সমিতি গঠিত হয়। আমার মাকে করা হয় সেটির প্রেসিডেন্ট। মা যেহেতু লেখাপড়া জানতেন না, তাই সমিতিতে যেসব কাপড় বিক্রি করা হতো, সেগুলোর টাকা তিনি টিপসই দিয়ে নিতেন। পরে বাবা তাঁকে নাম লেখা শিখিয়েছিলেন। মাকে প্রেসিডেন্ট করার পর, তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক কাজে সাহায্য করতে আমাকে সেক্রেটারি বানানো হলো। এভাবে ব্যাবসায়িক লেনদেনের এক ধরনের অভিজ্ঞতা হলো আমার। এদিকে কাপ্তাই বাঁধের কারণে রাঙামাটি ডুবে যাওয়ায় মেয়েদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কিছু তাঁত দেওয়া হয়েছিল। সেগুলোর বেশির ভাগ তাঁতই ফেলে রাখা হয়েছিল। কেউ কেউ লাকড়ি হিসেবেও ব্যবহার করে ফেলেছে। ওখান থেকে একটি পুরনো তাঁত কিনে এনে ব্যবসা শুরু করলাম আমি। তারপর ড্রাম কিনলাম। এটি ১৯৬৫ সালের কথা। আমার স্বামী এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটির নাম রাখলেন ‘বেইন টেক্সটাইল’। আমার কাপড়ের বিশেষত্ব ছিল ডায়িং। এটি আমি বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) থেকে শিখেছিলাম। একবার আমাদের মাঝির বস্তি সমিতিতে কলকাতা থেকে এক বিশেষ ইনস্ট্রাক্টরকে নিয়ে আসা হয়েছিল; কিন্তু কোনো মেয়ে তাঁর কাছ কাজ শেখার আগ্রহ না দেখালেও, আমি শিখে নিলাম। ১৯৭৩-৭৪ সালে একবার চট্টগ্রামে আমার বোনের বাসায় এসে দেখলাম, এখানে লুঙ্গি, ধুতি—এসব তৈরি হচ্ছে। দেখে আমার খুব ভালো লাগল। ওখান থেকে দুজন তাঁতি ও সুতা নিয়ে এলাম। তার পর থেকে আমি চিকন সুতার কাজ শুরু করলাম। আমার লুঙ্গি ও গামছার সুনাম ছড়াতে থাকল। এর আগে আমরা মোটা সুতার কাজই শুধু করতাম।

 

৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন।

৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন তো স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ধরতে গেলে কোটি টাকার মতো হয়ে যাবে! তিনতলা বিল্ডিং করেছি, তাঁত করেছি, দোকান করেছি...। একেবারে শুরুতে কর্মী বলতে ছিলাম আমি আর আমার স্বামী। তারপর ১৯৬৮ সালের দিকে এক চাকমা মেয়েকে কাজে নিয়েছি। পুনর্বাসনকেন্দ্র থেকে তাঁত বোনা শিখে এসেছিল সে। সেই বুনত। আমি আর আমার স্বামী রং করতাম, তাঁতে টানা দিতাম। এরপর এক মারমা মেয়েকে নিয়ে এলাম। সে-ও তাঁত দিতে ও টানা দিতে জানত। এই মেয়েটি যোগ দেওয়ার পর অনেক মারমা মেয়ে কারিগর পেয়ে গেলাম। তারপর সেই দুজন বাঙালিকে নিয়ে এসেছিলাম, গামছা-লুঙ্গি বোনার জন্য। ১৯৮০-৯০ এই দুই দশকে আমার কারখানায় পুরোদমে কাজ চলেছে। তখন দুটি কারখানায় ৫০-৬০ জন কর্মী কাজ করত। এর মধ্যে শহরের কলেজগেটের দিকের কারখানাটিতে শুধু চাকমা মেয়েরাই কাজ করত। ২০০০ দশকে অন্যরাও এ ব্যবসা শুরু করল। এরা আসলে আমার কাছ থেকেই শিখেছে। তার আগে বলতে গেলে একচেটিয়া ব্যবসা ছিল আমার! ‘কারিকা’, ‘আড়ং’ ইত্যাদি শোরুমে আমার প্রডাক্ট বিক্রি করা হতো। তখন শ্রমমূল্য কম ছিল। এখন কোনো শ্রমিক এক দিন অন্য যেকোনো কাজ করলে ৫০০-৬০০ টাকা পায়। অথচ তাঁত বুনলে পায় ২০০-৩০০ টাকা। তাই এ কাজে তাদের আগ্রহ কম। আবার যে চাকমা মেয়েগুলো আমার সঙ্গে কাজ করত, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে, সন্তান হয়ে গেছে। তারা আবার নিজের মেয়েদের কাপড় বুনতে দেয় না। অন্যদিকে গত তিন বছর আমি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। বিদেশে, মেয়ের কাছে ছিলাম। এরই মধ্যে রাঙামাটিতে পাহাড়ধস হলো। সব মিলিয়ে এখন আমার কর্মিসংখ্যা কম; পাহাড়ি-বাঙালি মিলিয়ে ১০-১২ জন। একসময় ৬০-৭০ জনও ছিল। এখন চালু আছে দুটি কারখানা। তবে এমনিতে পাহাড়ি অনেক মেয়ে আছে, যারা নিজেদের ঘরে বসেই আমার জন্য কাপড় তৈরি করে দেয়। আমি তাদের সুতা ও নকশা দিয়ে দিই।

 

আপনার শোরুম কয়টি?

রাঙামাটিতে তিনটি ও কক্সবাজারে একটি শোরুম ছিল। কক্সবাজারেরটা আপাতত বন্ধ আছে। আমার অবর্তমানে ছেলে ব্যবসা দেখত। যেহেতু সে এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ ছিল না, ফলে একটু হিমশিম খেয়েছে। আমার তো সব কিছুর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। আমাদের কারখানাগুলো ছিল বেড়া দেওয়া। কর্মী মেয়েরা বলত, ‘মাসির কি বেড়ায় বেড়ায় চোখ আছে নাকি!’ আমাদের বাড়িটি তিনতলা। আমি থাকতাম দোতলায়। সেখান থেকেই চিৎকার করে ওদের দিকনির্দেশনা দিতাম। স্বামী যখন বেঁচে ছিলেন, তিনি বলতেন, ‘আমার হাতে রিমোট থাকলে তোমার গলাটা বন্ধ করে দিতাম!’ আমি একটু দজ্জাল গোছের কি না! আমার ডাকনামও দজ্জাল ধরনের—‘হত্যালি’। বজ্জাতের হাড্ডি আর কি! মা আমাকে এ নামে ডাকতেন। এখনো রাঙামাটির গ্রামাঞ্চলে ‘মঞ্জুলিকা’ বললে অনেকেই আমাকে চিনবে না; ‘হত্যালি’ বললে ঠিকই চিনে ফেলবে।

 

আপনার কাজ পাহাড়ি মানুষদের কতটুকু অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে?

যে ধরনের কাজ হাতে হাতে ও ঘরে ঘরে বোনা হয়, সে কাজের ব্যবসা এখন অনেকেই করছে। তবে তাঁতের কাজ যেহেতু একটু খরুচে ব্যাপার, তাই এখনো সেভাবে অনেকে করে উঠতে পারছে না। এখন প্রচুর ক্রেতা তৈরি হয়েছে, এমনকি গ্রামের মেয়েরাও এসব বস্ত্র কিনছে। এখন প্রচুর মেয়ে ব্যবসাকর্মে জড়িত। ফসল, সবজি—এসব বিক্রি করে পোশাক কেনে তারা। ফলে মেয়েদের তৈরি করা কাপড় কেনার প্রচুর লোক আছে এখন। আরো আছে বিদেশি ক্রেতা। তবে পাহাড়ি মেয়েদের যদি প্রয়োজনীয় অর্থ সহযোগিতার ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে খুব উপকার হতো। ওদের তৈরি পোশাক বিক্রি হয় ঠিকই, কিন্তু একেকটা বুনতে যে পরিমাণ সময় লাগে, তারপর সেটি বিক্রি করার টাকার ওপর যেহেতু পরবর্তী কাজটিকে নির্ভর করতে হয়, তাতে নিয়মিত ব্যবসা চালানো কঠিনই।

অনেকে আমাকে এ কাজের পাইওনিয়ার বলে; আসল পাইওনিয়ার কিন্তু আমার মা। তিনি লেখাপড়া জানলে কত দূর যে এগোতে পারতেন, কে জানে! শুধু বাল্যশিক্ষা পড়েছিলেন। পুরো বাল্যশিক্ষা মুখস্থ বলতে পারতেন। খুব দাপট ছিল তাঁর; তবে কোনো অহংকার ছিল না। ১৯৬০ দশকে তাঁকে পাকিস্তান সরকার লাহোরে নিয়ে গিয়েছিল। ভীষণ অতিথিপরায়ণ ছিলেন তিনি। বছর দুয়েক আগে মারা গেছেন। তাঁকে পাইওনিয়ার বলার কারণ, তখনকার দিনে বিদেশ থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড সোয়েটার, কার্ডিগান—এসব আসত। একেকটি সোয়েটারে চার-পাঁচ তালি সুতা থাকত। আমার মা সুতাগুলো খুলে ফেলে সেগুলো দিয়ে শাল বুনতেন। সেখান থেকেই আমি শিক্ষা পেয়েছি। যেহেতু খুলে ফেলার পর সুতাগুলো কুঁচকে থাকত, তাই ফুটন্ত গরম পানিতে সেগুলো ধুয়ে, ডায়িং করে সোজা করে নিতাম আমি। তারপর শাল বুনে মিরপুরের বিহারি পল্লীতে পাঠাতাম। তখন কিন্তু বাংলাদেশের কোথাও শাল পাওয়া যেত না।

 

কতটুকু কষ্টকর ছিল আপনার যাত্রা?

দেখা গেল আমি স্কুলে ক্লাস করাচ্ছি, কোনো বিদেশি ক্রেতা এলেন, কেউ ছুটে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে যেত। আবার দেখা যেত, কেউ এসেছেন রাতের বেলা। সামরিক শাসনের সময়, বিশেষ করে এরশাদ যখন ক্ষমতায়, তখন বিকেল ৩টার পর চলাফেরায় নানা রকমের বিধি-নিষেধ জারি ছিল। তবে আর্মিরা আমাকে খুব সাহায্য করেছেন। তাঁরা নিজেরা আমার কাপড় এনে বাজারে বিক্রি করিয়ে দিতেন। হয়তো কাপড়ের কোনো অর্ডার এসেছে, ভোরেই পৌঁছে দিতে হবে—রাত হয়ে গেলেও তাঁরা আমার দরজায় নক করতেন। এ সময় আমার স্বামীও আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। আমার সঙ্গে কাপড় নিয়ে তিনিও যেতেন। আবার দেখা গেল, কোনো অতিথি বা ক্রেতা বা মন্ত্রী এসেছেন আমাদের কাজ দেখার জন্য। স্কুল থেকে ফিরে আমি হয়তো রং করার কাজ মাত্রই শেষ করেছি। তাঁদের জন্য আবার নতুন করে রং করতে হতো। আবার ধরুন, খেতে বসেছি, এমন সময় কেউ এসে বলল কারখানা ঘুরে দেখাতে। ফলে খাবার ফেলে আমাকে উঠে পড়তে হতো। তারপর কাপড় বিক্রি করতে যাওয়া, স্কুলে যাওয়া, প্রাইভেট টিউশনি করা, নিজে কাপড় বোনা—অনেক পরিশ্রমই করতে হয়েছে আমাকে।

 

বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন?

প্রতিবন্ধকতা সব সময়ই ছিল। পর্যাপ্ত মূলধন তো ছিল না। ঋণ নেওয়া, গয়না বন্ধক দেওয়া—এসব করতেই হতো। ব্যাংক তো অনেক পরে নিজেরাই যেচে এসে আমাকে ঋণ দিয়েছে; কিন্তু শুরুর দিকে যখন মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিতাম, অনেকে হয়তো দেওয়ার ব্যাপারে অস্বস্তিবোধ করত। আমি তাদের রাজি করানোর চেষ্টা করতাম। খুব বড় অঙ্কের হয়তো নয়, ৫০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতাম। ফিক্সড ডিপোটিজের ক্ষেত্রে ব্যাংক যে রকম ৮ শতাংশের মতো সুদ দেয়, আমি দিতাম

১১ শতাংশ করে। যদিও অনেকেই ভাবত, প্রচুর টাকাকড়ি কামাচ্ছি, আসলে ঋণের বোঝা আমাকে দীর্ঘদিন টানতে হয়েছে।

 

ব্যবসার পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, পেয়েছেন সম্মাননা।

১৯৬৫ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত রাঙামাটি সমবায় সমিতি লিমিটেডের পর্যায়ক্রমে সভাপতি ও সম্পাদক ছিলাম। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ছিলাম পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় মহিলা সংস্থার সম্পাদক। এ ছাড়া নানা সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রাফট কাউন্সিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রোটারি ক্লাব অব রাঙামাটির প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশনের রাঙামাটি ইউনিটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কেন্দ্রীয় মহিলা সম্পাদক, কেয়ার বাংলাদেশের চিটাগাং হিলট্রাক্ট ফ্যাসিলিটি টিমের উপদেষ্টা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা—ইউএনডিপির চিটাগাং হিলট্রাক্ট ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটির জেলা উন্নয়ন কমিটির সদস্য, রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক, চিটাগাং ওম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক, সমবায় ব্যাংকের পরিচালকসহ নানা দায়িত্ব পালন করেছি। এখন সার্ক অ্যাসোসিয়েশন অব হোমবেজড ওয়ার্কার্স (সাবা), বাংলাদেশের ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছি। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কারই তো পেয়েছি, তবে আমার সঙ্গে যারা কাজ করেছে, তারা অনেকেই এখন নিজেরা কারখানা দিয়েছে, নিজেদের মতো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এটিই আমার বড় প্রাপ্তি।

 

এখন জীবন কেমন চলে?

আমার দুই মেয়ে, এক ছেলে। ওরা পড়াশোনা শেষ করে নিজেদের মতো জীবন গুছিয়েছে। এই যে দীর্ঘ একটা জীবন কাটালাম, চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, সময় আর বেশি নেই! তবু এখনো কাজ করি। ছেলে বলে, ‘মা, জায়গাজমি যা আছে, বাড়ি তুলে ভাড়া দাও। এত কষ্ট করে উপার্জন করতে হবে না।’ কিন্তু আমার তো মনের খোরাক মেটাতে হবে! 

(ধানমণ্ডি, ঢাকা; ৫ নভেম্বর ২০১৮)



মন্তব্য