kalerkantho


দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পুরো কাঠামো আমারই তৈরি

এ দেশের ফসল গবেষণার প্রধান প্রতিষ্ঠান ‘বারি’ তাঁর হাতে তৈরি। প্রাণী ও মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটও তাঁর করা। বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার জনক, কাজী পেয়ারার উদ্ভাবক, ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট ড. এম বদরুদ্দোজার মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

১৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পুরো কাঠামো আমারই তৈরি

কর্মজীবনের শুরু কিভাবে হয়েছিল?

১৯৪৮ সালে শেরেবাংলানগরের ‘ইষ্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ থেকে পাস করলাম। এরপর ‘ইস্ট পাকিস্তান অ্যাগ্রিকালচারাল সার্ভিস কমিশন’-এর মাধ্যমে সরকারি কর্মকমিশনে নির্বাচিত হয়ে ‘নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি’তে ‘রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট (গবেষণা সহকারী) হিসেবে কর্মজীবন শুরু হলো। ‘প্লান্ট প্যাথলজি (উদ্ভিদের রোগবিজ্ঞান) বিভাগে কাজ করতাম। ফসলের রোগবালাই ও সেগুলো নিরাময়ের ওপর গবেষণা করতে হতো। একটানা গবেষণা করে ১৯৫৪ সালে ‘ফুল ব্রাইট স্কলারশিপ’ নিয়ে  যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম।

 

উন্নত এই দেশে কী বিষয়ে গবেষণা করেছেন? সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা কেমন দেখেছেন?

‘ক্রপ সায়েন্স’ বা ‘ফসল বিজ্ঞান’-এ ‘প্লান্ট ডিজিজ (উদ্ভিদের রোগ)’ ও ‘প্লান্ট ব্রিডিং (উদ্ভিদের জন্ম)’—এ দুই বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ ও অগ্রসর শিক্ষা লাভ করেছি। যুক্তরাষ্ট্রে খেয়াল করে দেখেছি, তাদের লেখাপড়ার পদ্ধতি পুরোপুরি আলাদা। ছাত্র-ছাত্রীদের অনেক স্বাধীনতা থাকে। প্রয়োজন মনে করলে সুপারভাইজার বা তত্ত্বাবধায়ককে জানিয়ে, তাঁর সম্মতিতে তিনি তাঁর পিএইচডির প্রগ্রাম পর্যন্ত পরিবর্তন বা বদল করতে পারেন। ভালো ছাত্র পেলে তত্ত্বাবধায়করা সাধারণত রাজি হন। এখানে তত স্বাধীনতা নেই। আরো দেখেছি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য—এই তিনটি মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সেই দেশ অনেক অগ্রসর। পরবর্তী জীবনে যে কৃষি খাতে অবদান রাখতে পেরেছি, সে ক্ষেত্রে এ দেশের অভিজ্ঞতা আমার ওপর কোনোভাবে প্রভাব ফেলেনি বটে; কিন্তু গবেষণা খাতে, এ দেশের বিজ্ঞানীদের আলাদা অবস্থান তৈরি করার ক্ষেত্রে, সেসব অভিজ্ঞতা তো নিশ্চয়ই আমার ওপর প্রভাব ফেলেছে। আমার পিএইচডির বিষয়বস্তু ছিল রোগাক্রান্ত আখ। কঠিন রোগে আখ লাল হয়ে যায়। এই রোগের বিকল্প হিসেবে আখের কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছি। এ নিয়েই তিন বছর পর পিএইচডি শেষে ১৯৫৭ সালে দেশে চলে এলাম।

 

ফিরে এসে আগের পদে যোগ দিলেন?

উদ্ভিদের রোগবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি ফেরত আমাকে নিয়োগদানের মতো উচ্চতর পদ নেই বলে সে বিভাগে যোগদানের সুযোগ রইল না। কিছুদিন টুকটাক কাজ করলাম, বসেও থাকতে হলো। পরে আবার ইস্ট পাকিস্তান অ্যাগ্রিকালচারাল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় বসতে হলো। ১৯৬২ সালে নির্বাচিত হয়ে নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতেই আরো উচ্চতর বিজ্ঞানীর পদ ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট ইকোনমিক বোটানিস্ট (সহকারী অর্থনৈতিক উদ্ভিদবিদ)’ পদে যোগ দিলাম। এই পদে কাজ করতে গিয়েই মূলত অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ফসলের গবেষণার দিকে আমার ঝোঁক তৈরি হলো। ফলে ভুট্টা চাষের দিকে নজর দিলাম। অনেক আগে থেকেই ভেবেছি—এই বাংলাদেশ চিরকাল ধানচাষের ওপর নির্ভরশীল। এ দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। তখনকার দিনে তো আজকের মতো চালের দাম বাড়তি ছিল না, মানুষও কম ছিল; কিন্তু তার পরও আমার মনে হয়েছে, এ দেশে তো আরো অনেক ফসল ফলে। সেগুলোও খাদ্যশস্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যায় ধানের আবাদ কমে গেলে তো মানুষ খাবারের সংকটে পড়বে। পরবর্তী সময়ে এগুলোই সত্য হয়েছে। কৃষিজমি কমে গেছে বলে ধানের আবাদও দিন দিন কমছে। সেই সময়ই আমার মনে হয়েছে, ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠীর চালের ওপর এত নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। ফলে ফসল গবেষক হিসেবে আমি ভুট্টা গবেষণায় নজর দিলাম। কিন্তু তখন আজকের চেয়েও আরো অনেক কম লোক ভুট্টা গ্রহণ করেছিলেন। সাঁওতালরা শুধু সীমিত আকারে এই ফসলের চাষাবাদ করত। বিজ্ঞানীমহলেও এই ফসলের গবেষণায় নিরুৎসাহ দেখেছি। ধান গবেষণা বাদ দিয়ে ভুট্টা গবেষণা, একে জনপ্রিয়করণের প্রচেষ্টা সবার কাছে একটু অন্য রকম মনে হলো। তার পরও আমি লেগে ছিলাম। গবেষণার একপর্যায়ে বিদেশ থেকে উন্নত প্রযুক্তির মেশিন কিনে নিয়ে এলাম। ভুট্টার বিবিধ ব্যবহার বাড়ানোর জন্য মেশিনে খই বানানো শুরু করলাম। এভাবেই আমার হাতে আজকের জনপ্রিয় ‘পপকর্ন’-এর শুরু হয়েছে। খই বানিয়ে বিজ্ঞানী মহলে বিতরণ করেছি, যাতে তাঁদের মাধ্যমে এই ফসলের চাষাবাদ আরো ছড়িয়ে যায়, সবাই খেতে আগ্রহ দেখান। কেউ কেউ ভালোই আগ্রহ দেখালেন। কিন্তু ভুট্টাচাষে কৃষকদের আগ্রহ দেখিনি।

 

সুইডেন গিয়েছিলেন কেন?       

সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটিতে পোস্ট ডক্টরাল থিসিস করেছি। রাই (ভুট্টাজাতীয় ফসল) ও হুইটের (গম) সংকরায়ণে যে গবেষকদল গবেষণা করেছেন, আমিও তাঁদের অন্যতম। সুইডিশরা এই ফসল না খেলেও তাদের দেশের গবেষণার ফলে উদ্ভাবিত এই ফসল বিশ্বের অন্যান্য দেশে, বিশেষত  মেক্সিকোতে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়েছে। তাদের প্রধান খাদ্য তো রাই। আমার পোস্ট ডক্টরাল থিসিস এই বিষয়ে। ফিরে এসে আবার আগের প্রতিষ্ঠানে পুরনো পদে যোগ দিলাম।

 

কেন আপনাকে পাকিস্তান অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক করা হলো?

আমার শিক্ষাগত অর্জন ও এখানে অবদান তো কম ছিল না। এখানে আমি তো কম করিনি। ভুট্টার মতো অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ফসলের আরো চাষাবাদ এবং খাদ্য হিসেবে সেটি প্রতিষ্ঠা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তারাও দেখল, আমার এমন ফসল গবেষণায় অবদান রয়েছে, যেটি পশ্চিম পাকিস্তানেও গুরুত্বপূর্ণ। তারা আমাকে নিয়ে গেল। তবে আমাকে সে দেশে তারা রাজনৈতিক কারণে নিয়ে যেতে বাধ্য হলো। আমরা চেয়েছিলাম, পাকিস্তানের এই অংশ এবং সে অংশেরও উচ্চতর পদগুলোতে পূর্ব বাংলার যোগ্য ব্যক্তিদের নেওয়া হোক। আমাকে সেই পদে আসীন করানোর মাধ্যমে অন্তত একটি প্রতিষ্ঠানের উচ্চতর পদে তো বাঙালিদের অবস্থান তৈরি হলো। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিলের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, ইনচার্জ ক্রপস হিসেবে যোগ দিলাম। রিসার্চ কাউন্সিলের আরেকজন নির্বাহী পরিচালক পশুসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। আমাদের এই গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আর দশটি সরকারি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের মতোই। এসব সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১৬ কি ১৭ জন গবেষক কাজ করেন। আমার অধীনে তখন অন্তত ২০ জন গবেষক ছিলেন।

 

‘আজরি’ কেন তৈরি করলেন?

১৯৬৮ সালে এরিড জোন রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আজরি) কোয়েটায় প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। শুরুর দিকে এখানে আমার সঙ্গে ছয়-সাতজন বিজ্ঞানী কাজ করতেন। শুকনো, খরা অঞ্চলে গম, ভুট্টা উত্পাদন নিয়ে আমরা গবেষণা করতাম। খরা অঞ্চল, কম পানি পায়—এমন স্থানীয় এলাকার উপযোগী ফসল উদ্ভাবন ও সেগুলো নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান এখনো গবেষণা করে।    

 

সেখানেও তো নব-উদ্ভাবনে বাঙালির মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

পশ্চিম পাকিস্তানে তখন খাবারের তেলের প্রচণ্ড অভাব ছিল। ভুট্টা থেকে তেল তৈরি করে সেই অভাব আমি মেটালাম। একে ‘কর্ন ওয়েল’ বলে। আমার হাত দিয়েই এই ফসলজাত তেল সে দেশে চালু হয়েছে। এটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা অবদান। শুধু পাকিস্তান নয়, পূর্ব বাংলার জন্যও তো এটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। কাজের ক্ষেত্র পশ্চিম পাকিস্তান হলেও সেটির অর্থ এই নয় যে আমি শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য আবিষ্কারটি করেছি। আমার পূর্ব বাংলার মানুষের জন্যও আবিষ্কারটি করেছি। ভুট্টা তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফসল হলেও শস্যকণা থেকে তেল আবিষ্কারের ফলে এই শস্যটির গুরুত্ব সে দেশে আরো বেড়ে গেল।

 

শস্যটি থেকে তেল তৈরির ভাবনা কিভাবে পেলেন? 

ফসলবিজ্ঞানী হিসেবে আমি তো জানি যে ভুট্টার মধ্যে যথেষ্ট তেল আছে। যুক্তরাষ্ট্রে তেল খুব ব্যবহার করা হয়। তাহলে পাকিস্তানে কেন তেলটির উত্পাদন ও ব্যবহার সম্ভব হবে না? ফলে ভুট্টা নিয়ে আরো গবেষণার জন্য ‘মেইজ রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট)’ তৈরি করলাম। অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিলে ভুট্টা নিয়ে গবেষণা করা হলেও এই প্রতিষ্ঠান এ কারণেই প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে যে সেখানে কাজের সুযোগ-সুবিধা ও স্বাধীনতা অনেক বেশি। মেইজ রিসার্চ ইনস্টিটিউটে কাজের ক্ষেত্রে নমনীয়তা থাকায় পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যেই আমি ভুট্টা থেকে তেল তৈরি করতে পারলাম। সেখানে সরকারের আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্যও নেই। তবে বেসরকারি খাতে ইনস্টিটিউট করা তো কঠিন। সরকারি ও বেসরকারি খাতে ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পার্থক্য হলো এই—লাভ ছাড়া বেসরকারি খাতে কোনো ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয় না। ভারত ও পাকিস্তানে তো এই খাতগুলো বেসরকারি খাতে হতোই না। আমার কাজে তারা খুবই খুশি ছিল। পূর্ব বাংলার লোক হলেও তারা আমাকে যথেষ্ট সম্মান করত। তারা আমার নামের পর ‘ফাদার অব অ্যাগ্রিকালচার ইন পাকিস্তান’ বলতেই অভ্যস্ত ছিল। তারা আমাকে এতই গুরুত্ব দিত যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ফিরে আসার অপশন দেওয়ার পর সেই দেশের তৎকালীন কৃষিসচিব বলেছিলেন, ‘সবাইকে ফেরত যেতে দিতে পারি, কিন্তু ড. কাজী এম বদরুদ্দোজাকে যেতে দেব না। পাকিস্তানের কৃষি উন্নয়নের জন্য আপনার দরকার আছে।’ তখন বলতে হলো, ‘বাংলাদেশ আমার নিজের দেশ, সেখানকার কৃষির উন্নয়নে আমার কাজ করার দরকার আছে।’ ১৯৭২ সালে দেশে চলে এলাম।

 

দেশে ফিরে ভুট্টার তেল জনপ্রিয়করণের চেষ্টা করেছেন?

এখানে তো এটি প্রচলন করতেই পারিনি। অথচ স্বাধীনতার পর এখানেও তো তেলের অভাব ছিল। ভুট্টা থেকে তেল বানানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। সে জন্য যতটুকু ভুট্টা উত্পাদন প্রয়োজন, সেটি করা হলেও তেল তৈরির ব্যাপারে সরকারের তেমন আগ্রহ দেখিনি। তাদের আগ্রহ থাকলে এখানেও হয়তো ‘কর্ন ওয়েল’ চালু করা যেত। বাংলাদেশ ভুট্টার তেল তৈরি না করে ভুল করছে। তখন গমের দিকে নজর দিলাম। গম চাষও তখন সীমিত আকারে হতো। কৃষকরা গমচাষে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু গম ও ভুট্টাচাষকে জনপ্রিয় করতে ভুট্টার ছাতু ও পেশা গম মিলিয়ে নতুন ধরনের রুটি বানানো শুরু করলাম। এভাবে এ দেশে ভুট্টা ও গম চাষ ছড়িয়ে দিয়েছি। এটিও আমার অন্যতম অবদান। শুধু ধানের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বাংলাদেশকে আমি অন্যান্য কৃষিজ ফসলের ওপরও নির্ভরশীল করেছি।

 

সেই উদ্যোগের ফলাফল?              

আমাদের দেশের যে হাজার হাজার পোল্ট্রি ফার্ম আছে, সেই খামারগুলোর হাঁস-মুরগির খাদ্য কোথা থেকে আসছে? ভুট্টা খেয়েই তো প্রাণীগুলো বেঁচে আছে। পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রি তো এই খাবারের ওপর নির্ভর করেই এত ছড়িয়েছে। না হলে তো এই খাত এত বিকশিত হতে পারত না। ভুট্টার খইও তো এখন প্রচুর মানুষ খায়। পপ কর্ন, কর্ন স্যুপ প্রচুর বিক্রি হয়। দোকানে দোকানে, রাস্তার ধারে পপ কর্ন বিক্রি হয়। ভুট্টার দিকে আমার এত ঝোঁকের কারণ—এটি খুব ভালো ফসল। মানুষ, প্রাণী সবাই খেতে পারে। 

 

প্রথমে কোথায় যোগ দিলেন?

১৯৭২ সালে দেশে ফিরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিলের ‘ডিরেক্টর অব রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন’ হিসেবে যোগ দিলাম। এটি সরকারি পদ, বিজ্ঞানীরা সরকারি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গবেষণা করেন। তখন আমার অধীনে দুই শর বেশি বিজ্ঞানী গবেষণা করতেন। যোগদানের কিছুদিনের মধ্যে টের পেলাম, এভাবে সরকারের অধীনে থেকে কৃষি গবেষণা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। উচ্চতর পদে থাকলেও নিজের উন্নতি হওয়াই তো বড় কথা নয়, সরকারি চাকরি করে তো দেশের উন্নতি সম্ভব নয়। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, যেগুলো সরকারি খাতে করা সম্ভব নয়। সেই প্রয়োজনীয়তা এখানেও আমার মনে হলো।

 

সে জন্যই কি ‘বারি’ তৈরি করতে হলো?

‘বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বারি)’-কে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আমাকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। বেসরকারি খাতে ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে অনেক সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়, অনেক সংগ্রাম করতে হয়। বারির ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। আমি যখন একে ইনস্টিটিউশন হিসেবে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরির উদ্যোগ নিলাম, যেসব বিজ্ঞানী সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতেন, তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই সরকারি চাকরি ছেড়ে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে রাজি হলেন না। তাঁরা এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করলেন। তাঁরা ভাবলেন, সরকারি চাকরিতে অনেক ধরনের সুবিধা আছে, গাড়ি পাওয়া যায়, আবাসন আছে, চাকরি শেষে পেনশন পাওয়া যায়। কিন্তু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে তো এই সুুবিধাগুলো পাওয়া যাবে না। তাঁদের প্রতিরোধ ভেঙে এই প্রতিষ্ঠান তৈরি করা খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। আমার জীবনে বারি তৈরি করতেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে। কারণ এই উদ্যোগ নেওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানের ভেতর ও বাইরে থেকে প্রতিরোধের মুখে পড়েছিলাম। তবে কোনো কিছুতেই আমি দমিনি। এই ইনস্টিটিউট তৈরির ব্যাপারে আমি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলাম। আমি এমন একটি ইনস্টিটিউটের স্বপ্ন দেখেছি, যেখানে বিজ্ঞানীরা যা করতে চান, তা যেন ভালোভাবে করতে পারেন। তাঁরা তাঁদের কাজে যেন কোনো বাধা না পান। তাঁরা যেন বাংলাদেশের ফসল উত্পাদন বাড়াতে পারেন।

     

সরকারের কাছ থেকে কেমন সহযোগিতা পেয়েছেন? 

বিভিন্ন কারণে সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছি। দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো আমাকে ভালোভাবেই জানত। পাকিস্তানে কাজ করার সময় ইউএস এইড, বিশ্বব্যাংকের বড় কর্মকর্তারা আমার মধ্যে কত বেশি কর্মশক্তি রয়েছে, তা ভালোভাবেই জানতেন। ফলে উদ্যোগ নেওয়ার পর তাঁরাই সরকারের কাছে গিয়ে চাপ প্রয়োগ করলেন যে ড. বদরুদ্দোজাকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে দিতে হবে। তাঁকে তাঁর মতো করে কাজ করার সুবিধা দিতে হবে। সুবিধা বলতে এই—আমি যা করতে চাই, সেটি যেন নিজের ইচ্ছামতো করতে পারি এবং কোনো বাধা যেন না পাই। তাঁরাই আমার সেই ব্যবস্থাগুলো করে দিলেন। আর তাঁরা পাশে থাকায় প্রতিষ্ঠান তৈরি করার সময় আমার টাকা-পয়সারও কোনো অসুবিধা হয়নি। বারির জন্য সরকার আমাকে টাকা জোগাড় করে দেয়নি। আমিই টাকা জোগাড় করে সরকারের খাতে জমা দিয়ে জানিয়েছি—টাকা দিলাম। সে জন্য আমাকে দাতা নির্বাচন করতে হয়েছে। শুধু ইউএস এইড বা বিশ্বব্যাংক মানে একটি, দুটি দাতা নিয়ে আমি কাজ করতাম না। নির্ভরশীল হয়ে যাব বলে আমার অভ্যাসই ছিল, একসঙ্গে সাত-আটজন দাতা নিয়ে কাজ করতাম। বড়, ছোট নানা ধরনের অনেক দাতা সংস্থা আমার ছিল। জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বারি) বিল পাস হলো। এটি তৈরি করতে করতে ১৯৭৮ সাল হয়ে গেল। বিজ্ঞানীদের ঘরবাড়ি, কাজের জায়গা করতে গিয়ে সারা রাত কাজ করেও কাজ শেষ করতে পারতাম না। সকাল থেকে শুরু করে রাত ২টা-৩টা, কোনো কোনো দিন সারা রাতও আমি কাজ করেছি। প্রায় প্রতিদিনই এভাবে আমাকে কাজ করতে হতো। বারি আমার জীবনের অর্ধেক নিয়ে নিয়েছে।

 

গাজীপুরে গেলেন কেন?

কারণ আমার তো বিশাল জমি দরকার। না হলে তো এই ইনস্টিটিউট করতে পারব না। সেখানে বোধ করি আমাদের সাড়ে ৩০০ একর জমি আছে। বারির জন্য জমি খুঁজে বেড়াতাম। জমি পাওয়ার পর সরকারের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করলাম। এরপর সেখানে বারি প্রতিষ্ঠিত করেছি। এখানে আমার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম ছিল—তাঁরা সরকারি চাকরিতে যে সুবিধাগুলো পাচ্ছিলেন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর তাঁরা যেন সেই সুবিধাগুলো পান, সে ব্যবস্থাগুলো আমাকে করতে হয়েছে। এটি তো সহজ ব্যাপায় নয়। আমি যখন তাঁদের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গেলাম, তখন তো তাঁদের পেনশন নেই। সরকারের সঙ্গে কথা বলে আমি তাঁদের পেনশনসহ আগের চাকরির সুবিধাগুলো প্রদান করলাম। বারিতে ধান ছাড়া অন্য সব ফসল, ফল, সবজিসহ সব কিছু নিয়ে গবেষণা হয়।

 

বারির প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক হিসেবে অবদান?

বারিকে আমি শুধু তৈরিই করিনি, একে আজকের অবস্থানে প্রতিষ্ঠাও করেছি। দীর্ঘ প্রায় আট বছর বারিতে ছিলাম। শুরু করার পর দেখেছি, আরো অনেক কৃষি গবেষকের প্রয়োজন। যাঁরা আছেন, তাঁদেরও দক্ষ করে তুলতে হবে। ফলে তাঁদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়েছে। সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে হয়েছে। নতুন ও হারানো জাতের শস্য, উদ্ভিদ, শাকসবজির উত্পাদনসহ সব ধরনের শস্যের গবেষণাই আমার হাতে বারিতে শুরু হয়েছে। শুধু গবেষণার নতুন ক্ষেত্রই নয়, বাংলাদেশের কৃষি গবেষকদেরও আমি তৈরি করেছি। আমার প্রতিষ্ঠিত গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁদের নতুন নতুন ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছি। সেসব প্রতিষ্ঠানে তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় পদগুলোও তৈরি করতে হয়েছে। আমাকে কৃষি গবেষণায় মানবসম্পদ তৈরি করতে হয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি খাতে যে জনশক্তি এখন দেখা যাচ্ছে, তার পুরোটাই আমার তৈরি। বারি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গবেষণা ইনস্টিটিউট। যেখানে শুধু একটি ফসল নয়, জমিতে উত্পাদিত সব ধরনের শস্য নিয়ে গবেষণা হয়। ধান বাদে সব ধরনের ফসল, ফল, শস্য নিয়ে এখানে গবেষণা হয়। ধান নিয়ে গবেষণা করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। শুরুর দিকে বারিতে আমার অধীনে দুই শর মতো বিজ্ঞানী ছিলেন। এখন সেখানে এক হাজারের বেশি বিজ্ঞানী কাজ করছেন। বারির শুরু থেকে একে পূর্ণাঙ্গ রূপদান—সবই আমি করেছি। আগে যখন ‘ডাইরেক্টরেট অব রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন’ ছিল, তখন এ দেশের ফসল, ফলসহ কৃষিজ শস্য গবেষণার কোনো উন্নতি হয়নি। এটি একটি রিসার্চ ইনস্টিটিউট হিসেবেই বছরের পর বছর কাজ করেছে। কিন্তু বারি হওয়ার পর এ ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ অনেক বেড়েছে। এ দেশের ফসলেরও অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো গবেষণাকেন্দ্র ছিল না বলে আমার সুবিধাই হয়েছে। খালি মাঠে গোল দেওয়ার মতো দাতাদের সাহায্য নিয়ে সব কিছু সহজে করতে পেরেছি। তারা  আমাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছে। এখন বাজারে অনেক শাকসবজি দেখা যায়, যেসব শাকসবিজ আমেরিকায় হয়, সেগুলো বারিতেও হয়। বাঙ্গির মতো যে ফলটি আমেরিকায় হয়, সেটি আমাদের এখানেও হচ্ছে। অনেক নতুন শাকসবজি, ফল, ফসল আগে এ দেশে হতো না। সেগুলো বারির গবেষকদের গবেষণায় এ দেশেই চাষাবাদ, বাজারজাত করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ফল ও শাকসবজির উন্নয়ন বারির অবদান। কাজী পেয়ারা তো এখানে হয়েছে। বারি না থাকলে হয়তো আমার উদ্ভাবিত ও আমার নামে প্রবর্তিত ‘কাজী পেয়ারা’ও হতো না। এ ছাড়া ভুট্টার কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছি।

 

বারির আঞ্চলিক কেন্দ্র কেন করতে হলো?

বাংলাদেশ ছোট দেশ তো, এমন কোনো ফসল নেই, যেটি শুধু একটি অঞ্চলেই হয়, পুরো দেশেই হয়। আর শস্য বা ফসল মানেই হলো, সেটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য নয়, সারা দেশে উত্পাদিত হয়। তবে যে অঞ্চলের যে ফসলগুলো গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোর গবেষণা, উন্নয়ন, সেই ফসলের হৃপিণ্ডের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য সেখানে আঞ্চলিক কেন্দ্র থাকা দরকার। যেমন রংপুরের আঞ্চলিক কেন্দ্রটি রাজশাহীসহ সেই পুরো অঞ্চলের ফসলগুলো নিয়ে গবেষণা করে। আমরা পুরো অঞ্চল চিহ্নিত করে সেখানে কেন্দ্রটি  স্থাপন করেছি। যাতে সেই এলাকার কৃষকরা গুরুত্ব পান, সেই এলাকার ফসলগুলো গুরুত্ব পায়। এগুলোকে আমরা আঞ্চলিক কৃষি গবেষণাকেন্দ্র বলি। রংপুর, বরিশালসহ বারির সাতটি আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোও আমার তৈরি। প্রতিটিই একেকটি বড় ইনস্টিটিউট। এই আঞ্চলিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বিদেশের যেকোনো গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সমান। এগুলোর মাধ্যমে আমি সারা দেশের ফসল, সবজি, ফলসহ অন্যান্য কৃষিজ ফসলের ওপর গবেষণা শুরু করেছি। বগুড়ায় আমাদের মশলা গবেষণাকেন্দ্র আছে। এখন যে সারা দেশের ফসলের ওপর গবেষণা হয়, নতুন নতুন ফসল—দেশের বাজারে যেসব ফসল আসে, তার পেছনে এই কেন্দ্রগুলোর অবদান আছে। সেগুলোতেও আমাকে মানবসম্পদ, মানে বিজ্ঞানী তৈরি করতে হয়েছে। এ কোনো সহজ কাজ ছিল না।

 

একই সময়ে তো বিএআরসির চেয়ারম্যান ছিলেন?

বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএআরসি) চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার সময়ই বারি প্রতিষ্ঠা করেছি। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনেই বারি পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে যত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আছে, সবই এই এপেক্স বডির (উচ্চতম সংঘ) অধীনে পরিচালিত হয়। আমার সময় এর অধীনে আটটি, এখন বারি, ব্রিসহ এর অধীনে ১০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রশাসনিক কাজ নয়, এটি অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরো সমন্বয়ের জন্য কাজ করে। আগে এই কাউন্সিলও দুর্বল ছিল। সেখানে একজন নির্বাহী পরিচালক, নির্বাহী উপপরিচালক ও একজন মেম্বার ডিরেক্টর (সদস্য পরিচালক) ছিলেন। আমি সেখানে আটজন মেম্বার ডিরেক্টরের ব্যবস্থা করলাম। এগুলোও উচ্চতর পদ। এখনো তা-ই আছে। তাঁরা বিএআরসির অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়, কোথায় কী কাজ হচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের সহায়তার প্রয়োজন—সব কিছুর দেখভাল ও সহযোগিতার ব্যবস্থা করেন। এই পরিচালকরা পরিকল্পনা, পশুসম্পদ, ফসল ইত্যাদি আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে কাজ করেন। তাঁরা বিএআরসির মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশের কৃষিজ গবেষণা সমন্বয় করে থাকেন। ভারত, পাকিস্তানসহ আরো অনেক দেশেই তো এমন কাউন্সিল আছে। এই মেম্বার ডিরেক্টররা এত ক্ষমতাবান ও দক্ষ যে তাঁরা যেকোনো ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের মতো কাজ করতে পারেন। ফলে আমি এই প্রতিষ্ঠানকেও ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী করেছি, যাতে গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আরো সমন্বয় করা যায় এবং সেগুলো পরস্পরকে সহযোগিতার মাধ্যমে আরো ভালোভাবে পরিচালিত হতে পারে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিএআরসির আমি পুনর্বিন্যাস ঘটাই। বাংলাদেশের কৃষি গবেষণাকে আরো গতিময় করে তুলি।

 

এত প্রতিষ্ঠানে কেন কাজ করলেন?

আসলে সরকার আমাকে অনেক কাজে ব্যবহার করেছে। যদি তারা দেখে, এই ব্যক্তিকে দিয়ে কাজ হচ্ছে, তিনি ভালোভাবে ভূমিকা পালন করতে পারছেন, অবদান রাখছেন, তাহলে যে দলের সরকারই হোক না কেন, তারা তাঁকে যে সব সময় অপছন্দ করে তা নয়, পছন্দও করে। ফলে তারা আমাকে দিয়ে একই সঙ্গে তিনটি পদে কাজ করিয়েছে। কারণ তাদেরও তো কাজ এবং কাজের লোক দরকার। নেতৃত্ব পর্যায়ে দক্ষ লোকের বরাবরই অভাব আছে। তেমনভাবেই সরকার আমাকে মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান পদেও নিয়ে গেছে। তখনকার দিনে শ্রমিকনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁদের চাহিদা খুব বেশি ছিল। সেখানে যেসব কর্মী ছিলেন, তাঁদের অনেক দল-উপদল, অ্যাসোসিয়েশন ছিল, তাঁরা সরকারের বিপক্ষে বারবার আন্দোলন করতেন, তাঁদের দাবিদাওয়ার শেষ ছিল না। এই প্রতিষ্ঠানটি যখন ভেঙে পড়তে লাগল, তাঁদের নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার প্রথম পদক্ষেপ ছিল—তাঁদের কাছ থেকে উপঢৌকন হিসেবে দুধ, মাখন কিছুই নিইনি। ঘুষ নিলে তো তাঁরা আগ্রাসী হয়ে উঠবে। সেখানে নিয়মিত অফিস করেছি, কাজ শেষে বাড়ি ফিরে এসেছি। যখন কর্মীরা দেখেন, তাঁদের প্রধান বাজে কাজ করেন না, তখন তাঁরা আর খারাপ থাকেন না। ফলে এই বিরাট সমবায় সমিতিতে গিয়ে আমি অ্যাসোসিয়েশনগুলোর দাবিদাওয়া কমিয়ে ফেললাম। সেখানে কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করলাম। তাঁরা আমার কাছে এসে খুব বিনয়ের সঙ্গে কথা বলতেন। আর কোনো উগ্র আচরণ আমি পেলাম না। বছর তিনেক সেখানে ছিলাম। এভাবে সরকারের নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে করতে ১৯৮৪ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি। তবে তার পর থেকে এখনো কাজ করে চলেছি। এখনো বারিতে তাঁরা ডাকলে যাই। গত দুই মাসে তিন-চারবার গিয়েছি। সেখানে আমার নামে ‘কাজী বদরুদ্দোজা মিলনায়তন’ আছে। শনিবার  ‘এগ্রিকালচার রিসার্চ কাউন্সিল’-এ যাই। সেখানে আমাকে একটি রুম দেওয়া হয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী আমার কাছে এসে নানা বিষয়ে পরামর্শ নেন। পরিবারের সদস্যের মতো আমরা আলাপ করি।

  

ইপসা প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প?

যখন বারি করছিলাম, সে সময় সরকার সিদ্ধান্ত নিল, শেরেবাংলানগরে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি ইনস্টিটিউটকে সরিয়ে সেখানে সচিবালয় পুনঃস্থাপন করা হবে। আমিও এই কলেজের ছাত্র ছিলাম, কৃষিবিজ্ঞানের লোক হিসেবে এর প্রতি মায়া আছে। সরকার সরিয়ে দিলে কোথায় একে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই জমি খুঁজতে শুরু করলাম। গাজীপুরের সালনায় জমি পেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, কলেজটি সেখানে নেব। কিন্তু কলেজের ছাত্ররা শেরেবাংলানগর থেকে কলেজটি না সরানোর জন্য উঠেপড়ে লাগল। তারা বলল, আমাদের নেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেবের যে ভিত্তিপ্রস্তরের মাধ্যমে এই কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই পাথর আমরা সরাতে দেব না। সরকারও তাদের দাবি মেনে নিল। ফলে সে জমিতে ‘ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন অ্যাগ্রিকালচার (ইপসা)’ স্থাপন করলাম। আমার পরিকল্পনা ছিল, কৃষি কলেজ থেকে বিএসসি পাস ছাত্র-ছাত্রীদের এখানে এমএসসি ডিগ্রি দেওয়া হবে। বারি, বিরিতে যাঁরা বিএসসি পাস করে গবেষক হিসেবে চাকরি করেন, তাঁরা এখানে মাস্টার্স করলে গবেষণার সঙ্গে তাঁদের শিক্ষার যোগসূত্র তৈরি হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ভালো গবেষকদের এখানে মাস্টার্স করতে নিয়ে আসতাম। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ডিগ্রিগুলো দেওয়া হতো, সেগুলো দেখেছি। প্রচলিত কোর্সের পাশাপাশি নতুন কিছু কোর্স চালু করেছিলাম। ইপসায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিও দেওয়া হতো। আমি বিস্তর পয়সা খরচ করেছিলাম বলে অবকাঠামোগত সব সুবিধাই ছিল। সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাসহ গবেষণাগারও তৈরি করে দিয়েছিলাম। পরে সরকার শুধু একে আরো একটু উন্নত করে নাম বদলে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ করল। সেই জমিতেই এটি আছে।

 

প্রাণিসম্পদ, মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট কেন করেছেন?

অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে কৃষি, মত্স্য, পশুসম্পদ—সব গবেষণাকেন্দ্রই তো আমার অধীনে ছিল। বারি প্রতিষ্ঠার পর থেকে লোকে বলতে শুরু করল, তিনি ফসলের লোক বলে শুধু ফসল নিয়েই কাজ করেন। আমি তো সেটি চাইনি। কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে তো আমাকে সবই দেখতে হয়েছে। তখন মনে করলাম, আমাদের প্রাণিসম্পদ নিয়ে তো কোনো গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নেই, একটি ইনস্টিটিউট করা প্রয়োজন। তখন দাতাদের বললাম, ফসল নিয়ে ইনস্টিটিউট তৈরি করলেও প্রাণিসম্পদ নিয়ে ইনস্টিটিউট করা আমার জন্য কঠিন নয়। কারণ ইনস্টিটিউট করতে কিভাবে কাজ করতে হয় আমি তা জানি। আপনারা সাহায্য করবেন? তাঁরা সবাই রাজি হলেন। আগেই ইনস্টিটিউট করতে ন্যূনতম কী প্রয়োজন, সব কাগজ তৈরি করে রেখেছিলাম। সেগুলো সরকারের পরিকল্পনা, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর কাছে পাঠালাম। কাউন্সিলপ্রধান হিসেবে সেটি করার ক্ষমতা রাখি। তখন যিনি প্রাণিসম্পদের পরিচালক ছিলেন তিনি বললেন, আমার তো ইনস্টিটিউট দরকার নেই। তখন বলতে হলো, ‘আপনি এটা কী বললেন? অবশ্যই প্রয়োজন আছে। দাতাদের কাছ থেকে আমি আর্থিক সাহায্য নিয়ে আসব। আপনাকে কাগজপত্রও তৈরি করে দেব; কিন্তু আপনি রাজি না হলে তো সেটি করতে পারব না।’ চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি রাজি হলেন। এরপর দাতা নির্বাচন করলাম। তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে প্রকল্পটি অনুমোদনের পর পরিচালকই সেটি বাস্তবায়ন করলেন। সরকারের কাছ থেকে সাভারে তাদের জন্য ৫০০ একর জায়গা বরাদ্দ এনে দিলাম। একইভাবে মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটটির প্রকল্পটি প্রস্তুত করে অর্থের জোগান দিয়ে সেটি তৈরি করার ব্যবস্থা করলাম। বিশ্বব্যাংক ও ইউনাইটেড নেশনস ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন (এফএও) অর্থের জোগান দিল। এই প্রতিষ্ঠানেরও প্রয়োজনীয় জমি ছিল না। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে ১০০ একর জমি তাঁদের জোগাড় করে দিয়েছি। আমার নীতিমালা, দিকনির্দেশনায় এই প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হয়েছে। এখনো এগুলো পরিদর্শনে যাই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে তৈরি করেছি, যাতে সরকারের অত নিয়ন্ত্রণ না থাকে, বিজ্ঞানীরা স্বাধীনভাবে দেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারেন। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান তৈরির দিকেই আমার নেশা বেশি।

 

উচ্চ ফলনশীল গম চাষে কিভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন?

প্রফেসর পিটার বুললক পাকিস্তান, ভারত ও মেক্সিকোতে উচ্চ ফলনশীল গম আবিষ্কার এবং চাষাবাদ প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ জন্য তিনি নোবেলও পেয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় পাকিস্তানে হয়েছিল। তখন তিনি পাকিস্তান ও মেক্সিকোতে গবেষণা করতেন। আমেরিকান বিজ্ঞানী হয়েও মেক্সিকো তাঁর কাজের প্রধান ক্ষেত্র ছিল। আমরা বন্ধু হলাম। আমার সূত্রে তিনি বাংলাদেশে অসতেন। এ দেশে উচ্চ ফলনশীল গমের চাষাবাদ প্রচলন করলেন। তিনি এমন মানুষ ছিলেন, যিনি চাইলে সরকারপ্রধানও তাঁর কথা মান্য করতে বাধ্য।

 

বিদেশে আপনার অবদান?

ভিয়েতনামের সরকার তাদের কৃষি খাত নিয়ে গবেষণার জন্য একজন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনে ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন অব দ্য ইউনাইটেড নেশনসের (এফএও) সঙ্গে যোগাযোগ করল এবং তারা আমাকে নির্বাচন করল। ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠার দিকে তো আমার সব সময়ই আগ্রহ আছে। ফলে তাদের প্রধান কৃষি উপদেষ্টা হিসেবে আমি ‘কর্ন রিসার্চ ইনস্টিটিউশন’ ও জেনেটিকস রিসার্চ ইনস্টিটিউশন তৈরি করেছি। কর্ন রিসার্চ ইনস্টিটিউশন যব, ভুট্টা, গমজাতীয় উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করে। জেনেটিকস রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের কাজ ফসলের উন্নত জাত উদ্ভাবন।

 

দেশের খাদ্যব্যবস্থার পুরো কাঠামো কেন গড়ে দিয়েছেন?

আমাদের দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পুরো কাঠামো আমারই তৈরি। কারণ আমরা সব সময় খাদ্যসংকটে ভুগে থাকি। সে জন্যই কাঠামোটি আমাকে তৈরি করে দিতে হয়েছে। আমার সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। তবে এসব করতে গিয়ে আমার রক্ত পানি হয়ে গেছে। কোনো দিন এমনও গেছে, সারা দিনেও বাড়ি গিয়ে খাওয়ার সময় পাইনি। পিয়নকে অফিসেই আমার খাবার তৈরি করতে হয়েছে। কোনো রকম রান্না, খুব সামান্য খেয়ে কাজ করতে হয়েছে। অসংখ্য রাতে বাড়ি গিয়ে ঘুমাতেও যেতে পারিনি। মাত্র কয়েক ঘণ্টা অফিসে ঘুমিয়েছি। কোনো ফাইলই পরের দিনের জন্য ফেলে রাখিনি, দিনের কাজ দিনে শেষ করেছি। ৪০-৫০টি—টেবিলে যত ফাইলই আসুক, ফাইলগুলো শেষ না করে বাড়ি যেতাম না। এ দেশের ইতিহাসে এমন উদাহরণ আছে কি না আমার সন্দেহ আছে।

 

অনেক কাজ করেছেন। কোনো অপ্রাপ্তি?

পুরো বিজ্ঞানীসমাজ নিয়েই আমার বেদনা আছে। বিজ্ঞানীদের পদোন্নতির যে পদ্ধতি আছে, সেটি প্রশাসনিক পদোন্নতির কাঠামোতে হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি না। বিজ্ঞানীর পদোন্নতি তাঁর অবদানের ওপর নির্ভর করে হওয়া উচিত। বারি নিয়ে আরেকটি কথা বলার আছে, এখানে আগে শাকসবজির ওপর তেমন গবেষণা হতো না। এখন এই খাতে গবেষণাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, গবেষণা হচ্ছে—খুব ভালো। আমি খুশি। আগে বায়োটেকনোলজির ফিল্ড রিসার্চের ওপর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না, এখন বারিতে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে আছে। আগে যেমন মানবসম্পদের অভাবে নতুন নতুন ক্ষেত্রে তারা গবেষণা করতে পারত না, এখন সেসব নতুন নতুন ক্ষেত্রে গবেষণা করা হচ্ছে।

(৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, উত্তরা, ঢাকা)



মন্তব্য