kalerkantho


যা দেখেছি তা-ই তো লিখব?

এই যে বাংলাদেশের এত ক্লিন চেহারা, সেটিও তো আমার বলার বিষয়। সেসব আমি তুলে ধরি। আমি জানি, এ কারণে আমার ওপর বিভিন্ন সরকারের অনেক অসন্তোষ জন্মেছে

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



যা দেখেছি তা-ই তো লিখব?

‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর গল্পের ভুবন, দেশভাগের ক্ষত আর নিজের জীবনের কথাও বললেন হাসান আজিজুল হক। সেসবই শুনলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’-এর পটভূমিকা?

একটি উদ্বাস্তু, ছিন্নমূল পরিবার। পশ্চিম বাংলা থেকে পূর্ব বাংলায় এসেছে। সেখানে তাদের অবস্থা মোটামুটি ভালোই ছিল। তবে এখানে তাদের রোজগারের কোনো পথ নেই। আধা গ্রাম, আধা শহর—এমন এক মফস্বলীয় এলাকায় এক নির্জন বাড়িতে তারা থাকে। দেশে থাকতে কোনো না কোনোভাবে তাদের জীবিকা নির্বাহ হতো। কিন্তু এখানে তো তারা ছিন্নমূল। করবে কী? কিচ্ছু করার নেই। বৃদ্ধ লোকটি ওখান থেকে যে অবস্থায় পরিবার নিয়ে এসেছেন, তাতে  উপার্জনের কোনো উপায়ই তাঁর কাছে ছিল না। বাধ্য হয়ে তাঁকে শেষ পর্যন্ত নিজের কন্যাকে ঘরোয়াভাবে দেহব্যবসায়ের কাজে লাগিয়ে দুটি অন্ন জোগাড় করে নিতে হয়। যে পরিবেশে তাঁকে বসবাস করতে হচ্ছিল, সেখানে বখাটে ছেলের তো কোনো অভাব নেই। যে লম্পট তিনটি এসেছে; মেয়েটির কথা তারা আগে আলোচনা করেছে—‘এট্টু এট্টু সর হইছে, এমন ডাবের মতো লাগে মেয়েডারে।’ এক টাকা, দুই টাকার বিনিময়ে তারা ওই বাড়িতে যায়, মেয়েটির কাছে আসে।   

 

তাহলে করবীগাছ?

করবীগাছ একটি প্রতীক মাত্র। এটি প্রেমের প্রতীক নয়, আমার সেই গল্পে এ গাছটি ভয়ংকর বিষফল তৈরি করে। করবীর তিনটি বিচি যদি কেউ চিবিয়ে খায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হবে। মেয়েকে এ কাজে বাধ্য করতে একজন বাবার কেমন লাগে? যারা খরিদ্দার তারা কোন পর্যায়ের লোক? তার মধ্যে একজন আবার ভাড়ার টাকা দিতে পারছে না। ভাড়া দুই টাকা। এ অবস্থায় তিনি নিজেকে কী করে সান্ত্বনা দেবেন? নিজেকে কী বলবেন তিনি? বাধ্য হয়ে তিনি নিজেকে ঠকান। গল্পেই তো আছে—‘ফেকু টাকা দুটি বের করে, দলা পাকায়, ভাবে, ভয় পায় শেষে বুড়োর দিকে ঝুঁকে পড়ে, সুহাস আর আমি দিচ্ছি। চেয়ারের ওপর লোকটা ভয়ানক চমকে ওঠে। পড়ে যাওয়ার মতো হয়। খটখট করে নড়ে পায়াগুলো, তোমরা দিচ্ছ, তুমি আর সুহাস? দাও। আর কত যে ধার নিতে হবে তোমাদের কাছে? কবে-ই বা শুধতে পারব এই সব টাকা? সুহাস উঠে দাঁড়ায়। চলে যাবে এখন? এত তাড়াতাড়ি। রুকু রাগ করবে—চা করতে দিলে না ওকে। ওর সঙ্গে দেখা না করে গেলে আর কোনো দিন কথা বলবে না।’ এরপর হারিকেন হাতে নিয়ে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি বেরিয়ে যান। আমার গল্পেই আছে—‘বুড়ো ফিরছে এখন...মাথা নামিয়ে কাঁধ ঝুলিয়ে ঘরে ফিরে এসে ফিসফিস করে, যাও তোমরা, কথা বলে এসো, উই পাশের ঘরে।’ যে দুজন টাকা দিয়েছে, তারা ভেতরে চলে গেছে। যে টাকা আনতে পারেনি, তাকে বলছেন, ‘ইনাম তুমি বসো, এককুনি যাবে কেন? এসো গল্প করি।’ শেষের দিকে আছে—হু হু কান্নার শব্দ। কারণ মা আপত্তি করছেন—তাঁর মেয়েকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বৃদ্ধ ভদ্রলোকের তো কোনো উপায় নেই। বিচ্ছিরি ভাষায় তিনি স্ত্রীকে গালগাল করছেন—‘চুপ চুপ মাগি, চুপ কর, কুত্তী...এবং সমস্ত চুপ করে যায়।’ এগুলো তো ভয়ংকর ব্যাপার, নিজের মুখে এখনো এসব আমি বলতে পারি না। তারপরে সেই যে লম্পটের কাছে টাকা নেই তাকে বসিয়ে রেখে তিনি নিজেই সারা রাত ধরে একটি কথাই বলছেন, কাঁপতে কাঁপতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলছেন, ‘এখানে যখন এলাম—আমি প্রথমে একটি করবীগাছ লাগাই।’ তিনি শুধু গাছটির কথা বলছেন। ওই যে করবীগাছ; যে গাছের ফলে বিষ হয় অর্থাৎ মানুষ মরতে বাধ্য। সেই বুড়ো মনে করছেন, তাঁর জীবনের কোনো অর্থ নেই। বিষ খেয়েই তাঁকে মরতে হবে। নিজের যুবতী কন্যাকে দুই টাকা, এক টাকার জন্য এ রকম করে ভাড়া খাটাতে হয়। সেই ভদ্রলোক শুধুই কাঁদেন, বলেন, ‘একদিন বিষ খেয়েই মরতে হবে। বিষগাছ লাগিয়েছি তো। বিষটিই খেতে হবে শেষ পর্যন্ত; তা ছাড়া কোনো উপায় নেই।’ ও দেশ থেকে এ দেশে এসে তো প্রথমে বিষের গাছই লাগায়।

 

এমন ঘটনাও তাহলে ঘটেছে?

এটি তো বাস্তব ঘটনা। যে দেখেছে সে দেখেছে, যে দেখেনি সে দেখেনি। বর্ধমান থেকে ১৯৬১ সালে আমরা খুলনার ফুলতলায় চলে এসেছি। তবে আমরা তো বিতাড়িত হয়ে আসিনি, সামর্থ্য ছিল, নিজেরাই চলে এসেছি। কিন্তু সবার তো এই সামর্থ্য ছিল না। ওখান থেকে চলে আসার পরই আমরা খুলনার ফুলতলার এই বাড়িটি বদলাবদলি করে পেয়েছিলাম। সেখানে থেকে আশপাশের জীবন দেখতাম; আমাদের মতো উদ্বাস্তু আরো পরিবার এসেছিল। আমরা তো মোটামুটি স্বাবলম্বী হিসেবেই এসেছি। আমি দৌলতপুর কলেজে শিক্ষকতা করি, আমার ভাই চাকরি করে। আমাদের চলে যায়। কিন্তু সব মানুষের তো সে দশা হয়নি। তাদের এই রকম পরিস্থিতি হয়েছিল। সেটি বোঝানোর জন্য অর্থাৎ কী বিষবৃক্ষই না আমরা রোপণ করেছি ১৯৪৭ সালে—এই গল্পটি তাই লেখা। ফুলতলায় প্রচুর উদ্বাস্তু থাকত। তারা এসে ওভাবে থাকত। উপার্জনের পথ নেই, জায়গাটিও বসবাসের অযোগ্য। চাষবাস, বাগান ছেড়ে চলে এসেছে। খাবে কী? কোনো রকম একটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। মেয়ে বড় হচ্ছে। কী করবে, কী করবেন সেই বৃদ্ধ? তাদের কারো কারো বাড়ির খবর পেতাম। কেউ কেউ বাড়িতে যে এ রকম ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হচ্ছেন, সে খবরও পেতাম। তখন আমার মনে অসম্ভব কষ্ট হতো। মানুষের এমন অসহায়ত্ব আমার মনে খুব আঘাত করল—এটি নিয়ে লিখতে হবে। সমাজের মধ্যে এমন ব্যাধি ঢুকেছে! দেশভাগ করে কিন্তু আমরা খুবই খুশি হয়েছি। আসলে কাকে ভাগ করেছে তারা? নিজের অংশকেই তো ভাগ করেছে। যাদের এ দেশ ছেড়ে ও দেশে যেতে হয়নি, তারা বলতে পারে যে দেশভাগ হওয়ার ফলে আমাদের তো কিছু আসে-যায় না, আমাদের তো দেশ ত্যাগ করতে হয়নি। এই বিষবৃক্ষটির কথা এখন তাই আমাদের মনে থাকে না। আমরা আলাদা রাষ্ট্র পেয়েছি; কাজেই আমাদের এখন মনে হয় যে ক্ষতিপূরণ অনেকটা হয়েছে। কিন্তু সে জন্যও তো আমাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, স্বাধীনতার জন্য লড়তে হয়েছে। যাদের সঙ্গে কোনো সময় না ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, আচরণে মিল আছে, তাদের সঙ্গে একত্রে থাকা যায়? তাহলে তো মুসলিম দেশগুলো সব একসঙ্গেই থাকতে পারত। কেন থাকতে পারে না? এমনকি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের সব সময় ভালোও নয়। সেটি দেখতেই পাচ্ছি আমরা—মধ্যপ্রাচ্য তো সব সময় অস্থির হয়ে আছে। তারা তো সব মুসলিম দেশ। কই ধর্মের ভিত্তিতে তো থাকতে পারছে না। রাষ্ট্রগুলো মিশে যাচ্ছে না একসঙ্গে। কেউ চাইলেও যাবে না। মনুষ্য স্বভাব এমনই, রাষ্ট্রের ধরনও এ রকম। আমাদের টানাটানি করলে হবে কেন? সে জন্য পাকিস্তান টেকেনি। মাঝখান থেকে কী ভোগান্তিই না হয়েছে। পশ্চিম বাংলার কত মুসলিম এখানে এসেছে। সবাই যে ভালো থেকেছে, চাকরি-বাকরি করেছে তা তো না। তেমনি এখান থেকে যেসব হিন্দু গেছে, তারা ওখানে বস্তিতেও বাস করেছে। জাতীয়তাবাদ উগ্র হলেই সেটি মানবতার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। উগ্র রূপটি হলো ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সংঘর্ষ।

 

রুকুকে কিভাবে পেয়েছেন?

গ্রামের দিকে তাকালে, গ্রামে বাস করলে চোখে পড়ত—এসব মেয়ে রাত-দিন ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে ভদ্রলোকের মেয়ে।

 

গল্পটি এত অসাধারণ হলো কিভাবে?

লেখা কেমন করে হয় তা তো কেউ জানে না। আমিও জানি না। কখনো কি বলা হতে পারে কেমন করে লেখা জন্মাল? কেমন করে লেখা শুরু হলো? এটি কেউ বলতে পারে না। এমনি পটভূমিটি বলা যেতে পারে, মনে হয় বসন্তকালে, আমাদের ওই গ্রামের বাড়িতে, ফুলতলায় বসে লেখা। দুই দিনের মধ্যে শেষ করেছিলাম।

 

এটি প্রথম কারা ছাপিয়েছে?

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও হায়াৎ মামুদরা মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ‘কালবেলা’ বলে একটি কাগজ করত। সেখানেই প্রথম ছাপা হয়। জ্যোতি ড. জিসি (গোবিন্দচন্দ্র) দেবের পালিত পুত্র। সে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার একটি বাড়িতে থাকত। ঢাকায় গিয়ে চার দিন-পাঁচ দিনও ওর সঙ্গে থাকতাম। হায়াৎ আসত, এখলাসউদ্দিন আহমদ, মাহমুদুল হক (বটু) আসত। বটুর সঙ্গে অনেক আলাপ, গল্প হয়েছে। সে ভালো লেখক।

 

মাহমুদুল হক কোনোভাবে আপনাকে

প্রভাবিত করেছেন?

বরং উল্টো কথা জিজ্ঞাস্য হওয়া উচিত—কোনোভাবে আমি মাহমুদুল হককে প্রভাবিত করেছি কি? আমি ওর চেয়ে সাত-আট বছরের বড়। আমরা লেখালেখি শুরু করেছি ষাটের পর থেকে। আর ও তো আরো পরে লেখা শুরু করেছে।

 

এটি তো লিখলেন ১৯৬৬ সালে?

লেখা শেষ হয় ১৯৬৬ সালে, প্রকাশ পরের বছর। এই গল্প পুরো বাংলা সাহিত্যের ১২টি গল্পের একটি বলে চিহ্নিত হয়েছিল। সে অন্যরা বলে, আমার তো বলার কিছু নেই। অন্য গল্পগুলোর মতো এটি সম্পর্কেও নানা রকম লেখা হয়েছে। সেগুলোর কিছু পড়তে পারি আর কিছু শুনতে পাই। কিছু পড়তেও পারি না। নিন্দা-মন্দও যে দু-একটি শুনিনি, তা নয়। ভালো-মন্দ মিশিয়ে শুনেছি। তবে মোটের ওপর আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে এই—লেখক হিসেবে কেমন জানি না, মানুষ হিসেবে মানুষ আমাকে ভালোই বেসেছে। কখনো বিদ্বেষের পাত্র বা শত্রু হয়েছি, এ রকম কিছু হয়নি। এমন কিছু আমি বলতে পারব না।

 

লেখার রসদ কিভাবে জোগাড় করেন? 

লেখকের উপাদান হলো তাঁর লব্ধ অভিজ্ঞতা। তিনি বহু মানুষ দেখেন, বহুজনের সঙ্গে মেশেন। প্রতিনিয়তই তাঁর ভেতরে গল্প তৈরি হয়। এই যে আজ এখানে বসেছি, ইচ্ছা করলেই তো এখানকার মানুষ, পরিবেশ নিয়ে একটি গল্প লিখতে পারি, পারি না? কোনো অসুবিধা নেই, পারা যাবে। লেখক এভাবেই উপাদান সংগ্রহ করেন। তিনি জীবন থেকেই লেখার উপাদান সংগ্রহ করেন, তাঁর সঙ্গে কল্পনা মেশান। একটু চিন্তা মেশান, যদি ভালোবাসা থাকে, ভালোবাসা মেশান। ভালোবাসা যদি না থাকে, ঘৃণা-বিদ্বেষ তা-ও মেশাতে পারেন। এসব মিলিয়েই তো লেখা তৈরি হয়। কেউ যদি কেউ সৃজনশীল থাকেন, জিজ্ঞেস করলে তিনি এ সম্পর্কে বলতে পারবেন না। কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়—আপনার এই বুদ্ধিটুকু কী করে হলো? তিনি বলবেন, আমার এই বুদ্ধি জন্মের পরে যা হওয়ার হয়েছে। তারপর সেটির সঙ্গে আমার নানা জিনিস যোগ হয়েছে। সব সময় দেখেছি, এখনো চারপাশ, লোকজন, দুনিয়া দেখি। সেগুলো মগজে, স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা হয়। এভাবেই তো হয়। আমাদের লেখকদেরও ঠিক তাই। আমার কথাই বলি—জন্মেছি পশ্চিম বাংলার বর্ধমানে, কাটোয়া মহকুমার মঙ্গলকোট থানার যবগ্রামে। ছোটবেলা কেটেছে গ্রামে। মাঠে মাঠে ঘুরেছি। অত্যন্ত সাধারণ আমার জীবন। বয়স দশ-বারোর আগে পায়ে জুতা ওঠেনি, খালি পায়েই থাকতাম। ও দেশে তো মাঠগুলো শুকনো, ফাঁকা, মাটি শক্ত। কাঁটাগাছ প্রচুর জন্মায়। বাবলাগাছ খুব বেশি হয়। আমি তো খালি পায়ে ঘুরতাম, মায়ের (জোহরা খাতুন) কোনো বারণ মানতাম না। বাবা (দোয়া বখশ) সাধারণত দিনের বেলায় বাড়িতে থাকতেনই না। আর তিনি আমাকে হাটে-মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াতে দেখলেও তেমন কিছু বলতেন না। ঘুরে ঘুরে পায়ে কাঁটা ফুটত। আর যখন পারতাম না, তখন হয়তো সপ্তাহে একদিন কাঁটাগুলো বের করতে বসতাম। বেশি দেরি হলে আবার কাঁটায় পুঁজ-রক্ত তৈরি হবে, ঘুরতেও পারব না। কিন্তু পায়ের ময়লা পাতার নিচে তাকিয়ে দেখতাম, কাঁটাগুলো একেকটি একেক অবস্থায় রয়েছে। এখনকার শিশুরা যে কেউ আমার পায়ের অবস্থা দেখলেই ভয় পাবে। কোনোটিতে খুব ব্যথা করত, ফলে বুঝতাম সেটি কাল ফুটেছে। এখনো মাংসের গভীরে যেতে পারেনি। আবার কোনোটিতে একেবারেই ব্যথা নেই। কিন্তু পুঁজ হয়েছে। সেটি এক সপ্তাহের পুরনো। পুঁজসুদ্ধ কাঁটা বের করে ফেলতাম। তার পরও বেশির ভাগ সময়ই আমাকে মাঠেঘাটেই পাওয়া যেত। নানা দুরন্তপনা করতাম। কখনো তালগাছের মাথায় উঠছি, কখনো পুকুরে ঝাঁপ দিচ্ছি। কিন্তু আশপাশের লোকের ক্ষতি হবে এমন কিছু কখনো করিনি। 

 

আপনার জীবনযাপন কেমন ছিল?   

রাঢ়ে আমাদের বিরাট পরিবার ছিল। ধান, চাল কি তরিতরকারির কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু মাছ পাওয়া যেত না, মাংসও। গাঁয়ে তো বেশির ভাগই হিন্দু পরিবার। ফলে গরু জবাই হতো না। মাসতিনেক পর পর হয়তো কিছু মানুষ উদ্যোগী হয়ে একটি গরু কিনে নিয়ে আসতেন। এরপর মুসলমানদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, এক, দুই, তিন সের—কার কত লাগবে? তখন গরুর মাংস খাওয়া যেত। কিন্তু খাসির মাংস খাওয়া প্রায় সম্ভবই ছিল না। তবে অনেক সময় ছাগির মাংস খাওয়া যেত। এবার মাছের কথা বলি—ছোট ছোট মাছ যেমন চুনো, পুঁটি এগুলো পাওয়া যেত। বড় মাছ খাব কী করে? সে-ও বুদ্ধি ছিল—বড় বোয়াল শুকিয়ে শুঁটকি মাছ তৈরি করা হতো। অনেক শুঁটকি মাছ খেয়েছি। বড় মাছ তো পেতাম না। আমার দেশে তো ইলিশ পাওয়া যায় না। ফলে নোনা ইলিশের চল খুব বেশি ছিল। কাটা ইলিশের ওপর-নিচে পরত করে ভাজা নুন দিয়ে মিশিয়ে চারপাশ আটকে ছয় মাস রেখে দিতে হতো। পরে সে ইলিশ বের করে বারবার ধুতে হতো, অনেক নুন থাকত তো। সেটি বেগুনের তরকারিতে রান্না করে বা বাটা মরিচ, পেঁয়াজ মিশিয়ে ভেজে খাওয়া হতো। খেয়ে খুব আরাম লাগত।

 

আর বিনোদন?

বাড়িতে আব্বার বন্দুক ছিল। তিনি সেটিতে হাত দিতে দিতেন না। কিন্তু যখন বেশ বড় হয়ে গেলাম, তখন আর ধরতে কি, নিয়ে বেরোতে দিতে আপত্তি করেননি। সেটি দিয়ে মাঝেমধ্যে শামুক খোল বা বড় কাস্তে চোরা কিংবা ছোট ছোট পাখি—সবই শিকার করতাম। আমাদের বাড়িতে চমৎকার একটি গ্রামোফোন ছিল। সেটিতে হেমন্ত, সন্ধ্যা, কণিকা মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সুচিত্রা মিত্র—সে সময়ের বড় শিল্পীদের অজস্র গান শুনেছি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নতুন, পুরনো মিলিয়ে প্রচুর গান শুনেছি। আব্বাসউদ্দীন আহমদের ইসলামী গানও অনেক শুনেছি। গ্রামোফোনে নিজেরা যেমন গান শোনা যেত, তেমনি প্রতিবেশীদেরও শোনানো যেত। এখনো মনে পড়ে, ছোট ছোট পিন কিনে এনে গ্রামোফোনের রেকর্ড বাজাতে লাগাতে হতো। দুইবার বাজিয়ে সেই পিন ফেলে দিয়ে আবার নতুন পিন লাগাতে হতো। গান শোনার সে অভ্যাস এখনো আমার আছে। প্রায় প্রতি রাতেই গান শুনি। বাবার সেই গ্রামোফোনটিও আমার বোনের বাড়িতে আছে। ভাবছি, জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য দিয়ে দেব। পালাও দেখেছি অনেক। মীর কাশিম থেকে শুরু করে চন্দ্রগুপ্ত—এমন প্রচুর পালা দেখেছি। ছোটবেলাটি আমার খুব মজায় কেটেছে।

সাইকেল ছিল না?

ওখানেও গরিব লোকের বাড়িতে নয়, মোটামুটি অবস্থাপন্ন লোকের বাড়িতে সাইকেল থাকত। আমার আব্বারও ছিল। শুধু তাই নয়, আমাদের টোপর দেওয়া খুব চমৎকার একটি গরুর গাড়ি ছিল। মা, খালারা সেটিতে চড়ে নানাবাড়ি, আত্মীয়বাড়ি যেতেন। আমাদের বাড়িতে পালকিও ছিল। ডাকলেই বেহারারা চলে আসত। সে পালকি নিয়ে আমরাও এখানে, ওখানে ঘুরে বেড়াতাম। এগুলোই কিন্তু আমার সব লেখার উপাদান। আমার জীবনের এসব অভিজ্ঞতা বিনে আর কিছু কিন্তু নেই। অন্য গল্পগুলোর আমার ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ এ-ও তাই।

 

আপনার পরিবারের আর কেউ লেখালেখি করতেন?

শুনেছি, নানা (সাবুজান মোল্লা) লিখতেন। মায়ের কাছে শোনা, তিনি পুঁথি বা ফারসি বয়াত লিখতেন।

 

প্রথম গল্প কোথায় ছাপা হয়েছে?

প্রথম যেখানে পাঠ হয়েছে, সেটি তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। ভালোভাবে গল্প প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬০ সালে। সেটি ‘শকুন’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘সমকাল’ ছেপেছিল। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটু সাড়া জাগিয়েছে। এরপর আরো দু-চারটি গল্প সমকালে লিখেছি। তার পর থেকে তো লিখেই যাচ্ছি।

 

এই গল্পটির রি-অ্যাকশন মনে আছে?

তার আগেই তো আমার একটি বই বেরিয়ে গেছে—‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’। তখন আমার বয়স ২৬-২৭ হবে। এই গল্পটির রি-অ্যাকশন ভালোই হয়েছে। এই লেখাগুলো তো আমি নিজে পড়ব বলে লিখিনি। লিখেছি অন্যদের জন্য। তাঁরা কতটা আলোড়িত হয়েছেন, কতটা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তাঁরাই জানেন। সে জন্য পাঠকদের প্রতিক্রিয়াই আমার জানার বিষয়।

 

এই গল্পগ্রন্থটি তো বাবাকে উৎসর্গ করেছেন?

তিনি আমার জীবনে খুব প্রভাব বিস্তার করেছেন। (উৎসর্গে আছে, ‘আব্বাকে, যার ছায়ায় রোদ্রে ফিরেছি বারবার।’)

 

আরো অনেক লেখককেই তো দেশভাগের শিকার হতে হয়েছে। কেন দেশভাগের ক্ষত আপনাকে পোড়ায়?

এখান থেকে মানুষ ওখানে গেছে, ওখানকার মানুষ এখানে এসেছে। যাঁরাই যেখানে গেছেন, চরম দুর্গতির শিকার হয়েছেন। হিন্দুরা যে এখান থেকে চলে গেছে, তারা যে শুধু সাম্প্রদায়িকতার কারণেই গেছে, তা নয়। লোভও অন্যতম কারণ ছিল। বাসভূম ছেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের যে সম্পত্তি-বাড়ি, দীঘি, বাগান, জমি পড়ে থাকবে, সেগুলো দখল করার ইচ্ছাও কিন্তু তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের ছিল। সেখানেও তাই। কাজেই এসব প্রতিবেশী তাদের পরিবারের প্রধানদের উত্সাহিত করেছে, আপনি চলে যান, না হলে বিপদ হবে। এমনও হয়েছে, আবার সত্যি সত্যি বাড়িঘর পুড়িয়ে তাদের আবাসভূমি ছাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৪৭ সালে এই বাঙালিকে দ্বিখণ্ডিত করা, বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করা, বাঙালির সংস্কৃতিকে দ্বিখণ্ডিত করা—গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের এসব ঘটনার চেয়ে শোচনীয় কোনো ঘটনা আমার মনে হয় আর হয়নি।

 

কিন্তু তার পরের অভিজ্ঞতাকে কিভাবে দেখেন?

সেটিও তো আমাদের কালের সবারই কমবেশি আছে। এখানে ২৩ বছরের পাকিস্তানি শোষণ ও শাসন প্রায় ঔপনিবেশিক পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে এটিও আমাদের ভোগ করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং সে সংগ্রামে এই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। কিন্তু এই বর্তমান বাংলাদেশ তার নাগরিকদের জন্য কী করছে সেটি আর আমি বলছি না। সেটি সবাই বুঝুক যে কী কারণে বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল আর কী পরিস্থিতিতে পাকিস্তান থেকে আমাদের বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছিল? কী জন্য স্বাধীন দেশের সংবিধান তৈরি করতে হয়েছে? সেই বাংলাদেশ তার অধিবাসীদের জন্য কী করেছে? গরিব, সাধারণ, সব মানুষকে জমি দিয়েছে? দেশের সম্পদের ভাগ সবার মধ্যে সমবণ্টন করেছে? চিকিত্সা, স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করেছে? কী করেছে? সবাই চিন্তা করে দেখুন। বলছে যে মানুষ দুটি খেতে পাচ্ছে। কিন্তু তা-ও কী দেখেছে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে? গ্রামে যান যাঁরা, তাঁরা দেখেছেন মানুষের দুয়ারে গিয়ে তাঁরা কেমন আছেন? জমি থাকলেও, ধান থাকলেও সেসব যে বেচে দিতে হয় জানেন? এই বাংলাদেশে এত যে চাল হয়, বলে চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ; সেগুলোর মালিক কারা? যে কৃষক চাষ করেন, তিনি, নাকি যাঁর জমি তিনি? তাহলে কৃষকের কী হবে? কোনো কিছুই তো তাঁরা খুঁটিয়ে দেখেন না, কেউ-ই দেখেন না।

 

সে জন্যই কী আপনার লেখা এমন?

এই যে বাংলাদেশের এত ক্লিন চেহারা, সেটিও তো আমার বলার বিষয়। সেসব আমি তুলে ধরি। আমি জানি, এ কারণে আমার ওপর বিভিন্ন সরকারের অনেক অসন্তোষ জন্মেছে। কিন্তু যা দেখেছি, দেখছি, তা-ই তো আমি লিখব?

 

এখন আপনার বয়স কত?

৭৮, ১৯৩৯ সালে জন্ম আমার।

 

জীবনটা তাহলে রাজশাহীতেই কাটিয়ে দিলেন?

ইচ্ছা করেই অন্য কোথাও যাইনি। আমরা সবাই যদি ঢাকায় চলে আসি, তাহলে জনপদগুলো বিরান হয়ে যাবে গো। তা করব কেন?  

 

অনেক ওষুধ খেতে হয়?

প্রচুর, হার্টের রোগ তো কখনো যায় না।

 

বয়সকালে সিগারেট খেতেন?

খুব, তবে কবে ছেড়ে দিয়েছি। স্বাভাবিক জীবনে এসেছি, তা-ও ৪০ বছর হয়েছে।

 

বিহাসে আপনার কয়তলা বাড়ি?

দোতলা, ওখানে তিনতলার ওপরে বাড়ি করা যাবে না, কেউ করতে পারবে না। প্রতিটি বাড়ি পাঁচ কাঠার ওপর। গাড়ি বারান্দা করতে হয়েছে বলে ফুলবাগান করার মতো অতটা জায়গা পাইনি। তবে সামনের জায়গাটুকুতে আমসহ নানা জাতের বড় বড় গাছ রোপণ করেছি।

 

আপনার দেখাশোনা করে কে?

একটি ছেলে দেখাশোনা করে, গাড়ি চালায়, আমার সব রকম কাজ করে দেয়। চলাফেরার জন্য আমার গাড়ি আছে বটে, কিন্তু সেটি আমি খুব বেশি একটা ব্যবহার করি না। সেটিতে চড়ে আমার নাতি স্কুলে যাতায়াত করে। 

 

এত অল্প ভাত খান?

এই বেশি!

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর

আক্রমণ, হত্যা হয়েছে। আপনার অসুবিধা কখনো হয়েছে?

কখনো কখনো হুমকি দিয়েছে, কিন্তু ওসবের তোয়াক্কা আমি করিনি।

 

আপনাকে আপনার বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবে সম্মানিত করেছে?

না, ৩৩ বছর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছি, সেখানে কোনোভাবেই আমাকে সম্মানিত করা হয়নি।

 

ঢাকায় এসে কোথাও যান?

বোনের, মেয়ের বাড়ি আছে। যাই না বলেই তো তারা রাগ করে।

 

গল্পকার হিসেবে আপনি তৃপ্ত?

কোনো লেখকই বোধ হয় নিজের লেখা নিয়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারেন না। ফলে আমার নিজের কাছে নিজের লেখা কোনো প্রিয় গল্প নেই। নিঃসন্দেহে যে লেখাটি আমি লিখতে চাই, সেটি লেখা হয়নি।

    

(১১ ডিসেম্বর, ২০১৭, ঢাকা)


মন্তব্য