kalerkantho


আমি বিএনপির সদস্য নই

অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের কৃতী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, গুণী শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। সে সবই জানলেন ওমর শাহেদ। ছবি তুললেন কাকলী প্রধান

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আমি বিএনপির সদস্য নই

বিএতে তো সারা পূর্ব বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম, তাহলে এমএতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে তৃতীয় হয়েছিলেন কেন?

গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে। ১৯৫২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহী কলেজ থেকে বিএ পাস করে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএতে ভর্তি হলাম। ফজলুল হক মুসলিম হল ইউনিয়ন ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলাম। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে বরখাস্তের পর ‘চিহ্নিত’ হিসেবে আর সব হলের মতো ফজলুল হক হল থেকে ১৯৫৪ সালের ৩১ মে আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো। জেল থেকে বেরোনোর পর এমএ পরীক্ষার জন্য ১৮ কি ১৯ দিন সময় ছিল। ফলে ফল হলো দ্বিতীয় শ্রেণিতে তৃতীয়। এই ফলের পর বসে না থেকে ইংরেজিতে এমএ করলাম। সেখানেও দ্বিতীয় শ্রেণি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে পারলেন না কেন?

আমি নিজে ও আমার শিক্ষকরাও আশা করছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেব। কিন্তু সেটি হলো না। বিভাগের চেয়ারম্যান কে জে নিউম্যান ভয়ংকর বেয়াড়া ছিলেন। জেলে যাওয়াটা তাঁর কাছে এত বড় হীন অপরাধ যে কিছুতেই মাফ করা যায় না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এমন ছেলে কখনোই শিক্ষক হতে পারে না। শিক্ষক সংকট থাকার পরও আমাকে চলে যেতে হলো। বাগেরহাটের পিসি কলেজে ১৯০ টাকা বেতনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিলাম। প্রায় ১০ বছর বিভিন্ন কলেজে কাজ করতে হলো।

শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলেন কবে? 

যে রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ পেলাম না, ১৯৬৯ সালে সেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার পর কে জে নিউম্যান চলে গেলেন এবং মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী (ম্যাক) বিভাগের প্রধান হলেন। উপাচার্য তখন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। ম্যাক স্যার তখন আমাদের সেই তিনজন—আমি, এ বি এম আবদুল লতিফ ও সরদার ফজলুল করিমকে পত্র দিলেন, আপনাদের অভিশাপ কেটে গেছে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছি, চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে পারেন।

তখন আপনি কোথায়?

চুয়াডাঙ্গা কলেজে। আমার বেতনও বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষকদের চেয়ে বেশি—এক হাজার ২৫০ টাকা। এরপর সাক্ষাত্কার দিয়ে ১৯৬৯ সালে নিয়োগ পেলাম। পুরনো কলেজে লেনদেন চুকাতে মাসখানেক লাগল। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে আমার বিভাগে যোগ দিলাম।

কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়নি?

কলেজে পড়িয়েছি, পড়াতে প্রস্তুতি বা খুব লেখাপড়ার প্রয়োজন হয় না। তবে এখানে এসে আমার লক্ষ্য হলো—আমাদের আইডল ‘ম্যাক’ স্যারের মতো চমত্কার বাংলা ও ইংরেজিতে পাঠদান করতে চাই। তিনি কিন্তু সবাইকে ‘আপনি’ বলতেন। এ জন্য সাতটি বছরের দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হলো। ভালো শিক্ষক হওয়ার অর্থ—শ্রেণিকক্ষে চমত্কার পাঠদান, নিজে গবেষণা করা এবং অপরকে গবেষণা করানো। সে কারণেই শিক্ষকরা ১৯৭২ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে আমাকে কানাডার অন্টারিওর কিংসটন শহরের কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে দুই বছরের জন্য পিএইচডি করতে পাঠালেন। এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে মাসে ২০০ টাকা বৃত্তি পেতাম। মাঝে ১৯৭৫ সালে দেশে ফিরে এলাম। পরে ১৪ মাসের জন্য আবার ফিরে গেলাম। কমপ্রিহেনসিভে ভালো করেছিলাম বলে আইডিআরসি (ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার) ফান্ড থেকে ৫০০ ডলার বৃত্তি পেয়েছি। ফলে স্বচ্ছন্দে চলতে পেরেছি। তখন আমার সংসার হয়েছে। লেখাপড়া শেষে ১৯৭৭ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নতুনভাবে ফিরে এলাম।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডিও তো আপনার হাত দিয়ে শুরু?

১৯৩৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অনেক জ্ঞানী-গুণী শিক্ষক ছিলেন। তার পরও এ বিভাগে আমার হাত দিয়েই পিএইচডির শুরু কেন হলো? ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী আমার ছাত্রী ছিল। তাকে সর্বপ্রথম পিএইচডি দিলাম। এমফিল, পিএইচডি মিলিয়ে তিন ডজন পিএইচডি করিয়েছি—গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি একটি রেকর্ড, কোনো বিভাগেও নেই। আমার ছাত্র-ছাত্রীরা এখন ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছে। দিলারা চৌধুরীর পিএইচডির সুপারভাইজারও আমি। এমনকি এখন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চেয়ারম্যান ড. নুরুল আমিন বেপারীর পিএইচডিও আমি করিয়েছি।

লেখালেখির ভুবন?

যেভাবে পিএইচডি, উচ্চশিক্ষা নিয়েছি, তাতে আমার সামনে বিস্তৃত জগত্ খুলে গেল। একটির পর একটি ক্ষেত্র খুঁজে কাজ শুরু করলাম। ১৯৬৫ সালে আমার লেখা ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা’ প্রকাশিত হয়, এমন কোনো বছর নেই যে এর সংস্করণ হয়নি। ‘বাংলাপিডিয়া’র অন্যতম সম্পাদক, ১১ খণ্ডের ‘বাংলাদেশের সেক্টরভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধ’র অন্যতম সম্পাদক। ৬০-৬৫টি বই আছে আমার।

প্রশাসনিক দায়িত্বে কিভাবে এলেন?

তখন ফজলুল হালিম চৌধুরী উপাচার্য। লেখাপড়া, গবেষণা, শিক্ষকতা নিয়ে আমি ব্যস্ত। তিনি হঠাত্ একদিন ডেকে বললেন, “আগে বলুন আপনি ‘না’ করবেন না।” ‘ঠিক আছে, স্যার বলুন।’ ‘আপনাকে প্রক্টর করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-শৃঙ্খলার পরিবেশ দেখবেন।’ এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে চলে এলাম। এমন একসময় দায়িত্বপ্রাপ্ত হলাম, যখন দেশেই আইন-শৃঙ্খলার পরিবেশ ছিল না, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিভাবে থাকবে? এটি এরশাদের সময়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়। ‘এই বাজে কাজটি আমাকে দিয়ে করাবেন?’ তিনি উত্তর করলেন, ‘ছোট্ট একটি পুরস্কার আপনাকে দেব। সূর্য সেন হলের প্রভোস্টের বাংলো খালি আছে, সেখানে উঠবেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আপনার উদ্যোগের কথা এখনো অনেকে স্মরণ করেন।

১৯৮৬ সালের মাঝামাঝি উপাচার্য আবদুল মান্নান মাসখানেকের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার আগে আমাকে ভারপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব দিয়ে গেলেন। তখন জাসদ ছাত্রলীগ ও বিএনপির ছাত্রদলের মধ্যে ব্যাপক মারপিট হলো। বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে গেল। প্রক্টর হিসেবে আগে থেকেই নানা সমস্যায় জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের ডেকে তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলাপ করতাম। ফলে তাঁদের ভাবনাগুলোর সঙ্গে যেমন আমি শরিক হতাম, তেমনি তাঁরাও আমারটি সম্পর্কে জানতেন। এই সহিংসতার পর তাঁদের নিয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরি করলাম। আমার উদ্যোগে ‘পরিবেশ পরিষদ’ গঠিত হলো। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪টি ছাত্র সংগঠন ছিল। সব দল থেকে পাঁচজন করে নেতৃস্থানীয় সদস্য নিয়ে একটি বিশাল কমিটি করা হলো। সিদ্ধান্ত হলো, যখনই তাদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব হবে, গোলমালের আভাস আমরা পাব, সভাপতি হিসেবে উপাচার্য এই পরিষদের সভা ডাকবেন এবং বিবদমান সংগঠনগুলোর নেতৃস্থানীয়দের পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেবেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি, অতি হালকা বিষয় নিয়েও তারা দ্বন্দ্ব বাধাত। এত ছোট একটি ব্যাপার নিয়ে মারামারি পর্যন্ত করে ফেললে? এ কথা বলার পর লজ্জায় মাথা নিচু করে তারা সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে আস্তে করে বেরিয়ে যেত। বছরতিনেক প্রক্টর ছিলাম।

হাজি মহসিন হলের অছাত্রদের বের করলেন কিভাবে? 

এরপর এই হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব নিলাম। যেকোনো হলেই তখন গায়ের জোরে বেশ কিছু অছাত্র থাকত। প্রতিটি হলেই আবাসিক, সহকারী আবাসিক শিক্ষকরা থাকেন। তাঁরা দায়িত্ব পালনে আগ্রহী হলেও রাজনৈতিক ছাত্রদের বিরোধিতার কারণে অছাত্রদের হল থেকে বের করে দিতে পারেন না। আমি এই হল পরিষ্কারের চেষ্টা করেছি। পরিবেশ পরিষদের সদস্যদের সামনে রেখে, হলের ছাত্রনেতাদের নিয়ে সিনেট ভবনে বড় সভা করে কথা বলা শুরু করলাম, ‘এত চেষ্টা করে, এত লেখাপড়া করে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছ, তোমরা ভদ্রঘরের ছেলে—তোমরাই হলে থেকে অছাত্রদের হলে রাখবে? তাহলে তো আরেকটি ছেলে, যার প্রয়োজন, সে থাকতে পারবে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।’ তারা এরপর সম্মত হলো যে এই বিশ্ববিদ্যালয় হবে প্রকৃত ছাত্র-ছাত্রীদের। আমার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হয়ে তারা বলল, কোনো অছাত্র হলে রাখবে না। জরুরি প্রয়োজনে কোনো আত্মীয় এলেও বড়জোর দুই দিনের জন্য থাকবেন। তাঁকে রুমে রাখার জন্য প্রাধ্যক্ষের অনুমতি নেবে। ১৫ দিনের মধ্যে সব বহিরাগত হল ত্যাগ করবে, না হলে তাদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হবে। আবাসিক শিক্ষকরা নিয়মিত ছাত্রদের হাজিরা নেবেন, হল কর্তৃপক্ষ সিট দেবে। হলের খাবারের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ যত্নবান হবে। এগুলোর বেশির ভাগই পূরণ হয়েছে। ১৯৮৮ সাল থেকে বছর চারেক উপ-উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছি। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে উপাচার্যের দায়িত্ব পালনে খুবই সহযোগিতা করেছে।

উপাচার্য হলেন কিভাবে?

১৯৯২ সালের ২৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার লেখা চিঠি পেলাম, আপনার সঙ্গে কিছু আলোচনা করব, আসুন। গেলাম। প্রধানমন্ত্রীসহ আরো চার-পাঁচজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারও আছেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দুই-তিন বছর সেশনজটের কারণে পিছিয়ে আছে, কিভাবে সমাধান সম্ভব? আমি নিজের পরামর্শ দিলাম। বেরোনোর সময় শিক্ষামন্ত্রী জানালেন, আপনাকে আমরা উপাচার্য হিসেবে চাইছি। নিয়োগের মাস তিনেকের মধ্যে সিনেট অধিবেশনের মাধ্যমে স্থায়ী করে নেবেন। ১৯৯২ সালের ২৯ অক্টোবর নিয়োগপত্র হাতে এলো। রেজিস্ট্রারকে বললাম, ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞার কবে সুবিধা হবে জেনে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। কোনো সমস্যা ছাড়াই দায়িত্ব হস্তান্তর হলো। সিনেট অধিবেশনের মাধ্যমে ৫১ ভোটে নির্বাচিত হলাম। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ৩২ কি ৩৩ ভোট পেয়েছিলেন।

কিভাবে সেশনজট দূর করলেন? 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা সুযোগ পেলেই পরীক্ষা পেছানোর দাবি করে। দুটি অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীরা ১৯৯৩ সালের মার্চে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে মাইক লাগিয়ে তাদের দাবি উপস্থাপন করছে এবং রীতিমতো উপাচার্যকে ধমক দিয়েই বলছে, পরীক্ষা পেছাতেই হবে। এরপর তাদের কয়েকজনকে ডেকে কত দিন পেছানো প্রয়োজন জানতে চাইলাম। তারা ছয় মাসের কথা বলল। তোমরা তো ফাইনাল ইয়ারে পড়ো, ছয় মাস নয়, বরং দুই বছর পেছানো হলো। তাহলে আরো বেশি দিন ক্যাম্পাসে থাকতে পারবে—প্রস্তাব দিলাম। এই অবসরে আমি কাজে মনোযোগ দিলাম। আসলে আমি সেশনজট দূর করার উপায় খুঁজছিলাম। ২৫ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর এই বিশ্ববিদ্যালয় তখন সেশনজটে তিন বছর পিছিয়ে আছে। সে জন্য একাডেমিক ক্যালেন্ডার তৈরি করলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস শুরুর প্রথম দিন থেকে কবে তাদের পরীক্ষা হবে, শিক্ষকরা কবের মধ্যে ফলাফল দেবেন—সব কিছু সেই ক্যালেন্ডারের মধ্যে দিলাম। সেভাবে দ্বিতীয় বর্ষ, তৃতীয় বর্ষ—সবার ক্লাস, পরীক্ষা, ফলাফলের শিডিউল, ছুটি ক্যালেন্ডারে রইল। তিন বছরের মধ্যে পুরোপুরি সেশনজট দূর হয়ে গেল। ক্যালেন্ডারটি আমরা পাঁচ টাকায় বিক্রি করেছিলাম।

চার বছরের অনার্স আপনার চালু?

সেটির পেছনের কারণ হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তত দিনে চার বছরের অনার্স চালু করে ফেলেছে। ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের তিন বছরের ডিগ্রিটি গ্রহণ করছিল না। এমনকি ভারতও আমাদের ডিগ্রি অনুমোদন বন্ধ করে দিল। উপাচার্য হিসেবে আমার একটি কৌশল ছিল, যেকোনো সমস্যা হলেই আমি সব শিক্ষককে টিএসসিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলাপ করে, ভাবনাগুলো নিয়ে, আমার ভাবনা জানিয়ে সমস্যার সমাধান করতাম। তাঁদের ডেকে বললাম, চার বছরের অনার্স না করার কোনো সুযোগ নেই। তাঁরাও সমর্থন জানালেন। এরপর ১৯৯৩-৯৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়ে প্রথমে ‘আইন’, এরপর একে একে বাকি বিভাগগুলোতেও চার বছরের অনার্স করে ফেললাম। বারতিনেক তাদের সঙ্গে নানা বিষয়ে এভাবে উন্মুক্ত আলোচনা করেছি।

অবকাঠামোগত উন্নয়নও তো করেছেন।

স্যার এ এফ রহমান হলের ভিত্তিটি দিয়ে ঠিকাদারকে বলেছিলাম, ‘আপনার কাজ করুন, কেউ বিরক্ত করবে না।’ তাঁর কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য ছাত্রদের ডেকে বলেছিলাম, ‘টাকা-পয়সা দাবি বা কাজ করার সময় বাধা সৃষ্টি করতে দেবে না।’ তারা পুলিশের মতো গার্ড দিয়েছে। এক বছরের মাথায় সেই ভবনের প্রথম তলার নির্মাণ শেষ হলো এবং ছাত্ররা থাকতে উঠে গেল। এই রেকর্ড আর কোনো হলের ক্ষেত্রে এখনো নেই। সেভাবে ১৯৯৫ সালে নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরী হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছি। বিজনেস স্টাডিজ ভবনের ভিত্তিও আমার দেওয়া। শিক্ষকদের জন্য শহীদ গিয়াস উদ্দিন আবাসিক এলাকায় আমি ৬০টি ফ্ল্যাটের কাজও সম্পন্ন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিঞা চেষ্টা করেও এই কাজ কিছুতেই এগিয়ে নিতে পারছিলেন না। কিছু বিপথগামী ছাত্র টাকার জন্য ঠিকাদারকে কাজ করতে দিত না, মারধর করে তাড়িয়ে দিত। পুলিশ দিয়ে এই কাজ হয় না, ছাত্ররাই তাদের শোধরাতে পারে—সে জন্য তাদের নিযুক্ত করলাম। এ জন্য আমাকে নানাভাবে ১৫ মিনিটের বক্তৃতা দিতে হয়েছে—তোমরা যদি চাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতি ঘটুক, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তারা সম্মত হলো, বছরখানেকের মধ্যে ফ্ল্যাটগুলো তৈরি হলো। বরাবরই উপাচার্যরা শিক্ষকদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে আগ্রহী হন, কিন্তু তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ভাবেন না। আমি তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ১০০টি এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ১২০টি ফ্ল্যাট তৈরি করে দিয়েছি। এখনো তাঁরা কৃতজ্ঞ হয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। প্রতিটি হলেই মৌলভিরা আজান দেন ও নামাজ আদায় করান, তবে তাঁদের বেতন বাড়ে না। বেতন বাড়ানোর ফাইল রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তারা আটকে দেন। আমি বললাম, ইমাম হিসেবে তাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁরা বিয়ে করবেন না? পরিবার হবে না? তাঁরা একটি পর্যায় পর্যন্ত উন্নতি করবেন না? তাঁদের বেতন বাড়বে না? এরপর তাঁদের স্কেল করে দেওয়া হলো এবং তাঁরা হলের বাসাও পেলেন। এক কোটি ৯৭ লাখ টাকায় চারুকলা ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে এয়ারকুলার সংযোজন করেছি। 

বিভাগ বাড়িয়েছেন?

আমার সময় কম্পিউটার সায়েন্স, নৃতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি ও সংগীত চালু হয়েছে। ফার্মাসি বিভাগকে অনুষদে রূপান্তর করেছি। বিভিন্ন বিভাগের মাস্টার্স প্রিলিমিনারির অবসান ঘটিয়ে সেগুলো অনার্সের আওতায় নিয়ে এসেছি।

আপনার মতো ব্যক্তির রাজনীতি করা ভুল হয়েছে বলে মনে করেন?

ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে আমার মতো রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের তাঁরাই কাছে ডেকে নেন, আর এই দেশে আমাদেরই তথ্যের প্রয়োজনে তাঁদের কাছে যেতে হয়। ফলে ভুল করার প্রশ্নই ওঠে না। বরং আমার কাছে নতুন নতুন ক্ষেত্র এসে গেছে। সেগুলো নিয়ে গবেষণা করেছি। জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলো হিসেবে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর প্রথম বইটি (সার্ক সিডস অব হারমনি) আমি লিখেছি। এই সহযোগিতার উদ্যোগ জিয়াউর রহমান নিয়েছিলেন। সামরিক অভ্যুত্থান কেন হয়, একে দূর করতে হলে কী করতে হবে—১০০-র বেশি দেশে এই অভ্যুত্থান কেন হয়েছে, সেসব বিশ্লেষণ করে আমি বই (মিলিটারি রুল অ্যান্ড মিথ অব ডেমোক্রেসি) লিখেছি, এ বিষয়ে আমার তত্ত্বই আছে। এগুলো খণ্ডানোর কোনো যুক্তি কারো নেই। আমি তো বিএনপির সদস্য নই। এখানে আমার মতো লোককে বিএনপি নেতাদের কিছু তথ্য দেওয়ার জন্য যেতে হয়েছে, আর তাতে আমারও সুবিধা হয়েছে—তাঁরা কী কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, সেগুলো কিভাবে সামলাবেন সেসব জানিয়ে দেওয়ার।

(১০ নভেম্বর, ২০১৭, কাঁটাবন, ঢাকা)



মন্তব্য