kalerkantho


মিতা আর আমাকে দিয়েই টিভিতে জুটির শুরু

মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। বিটিভির সেরা অভিনেতাদের একজন হয়েছেন। প্রযোজনা করেছেন সংশপ্তকের মতো বিখ্যাত নাটক। তুলে এনেছেন আফজাল-সুবর্ণা, কুমার বিশ্বজিেক। সিনেমায়ও সংলাপ লিখেছেন, অভিনয় করেছেন। আল মনসুর-এর বর্ণময় জীবনের গল্প করছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



মিতা আর আমাকে দিয়েই টিভিতে জুটির শুরু

বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে বাংলায় পড়েছেন কেন?

আমি জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেছি। বড় ভাইজান (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) আমার আট বছরের বড়।

আমরা ১১ ভাই-বোন। আমি ছয় নম্বর। তিনি ভাইদের মধ্যে সবার বড়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়েছেন বলে আমারও খুব শখ হলো বাংলায় পড়ব। তবে সে বছর সরকার আইন জারি করেছিল, যারা বিজ্ঞান থেকে পাস করবে, তারা কলা অনুষদের কোনো বিষয়ে ভর্তি হতে পারবে না। বিজ্ঞানের ছাত্র কম ছিল বলে ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এখন বুয়েট) ছাত্র পাওয়া যেত না। কিন্তু আমি তো বাংলায় পড়ব। ফলে আবার আইএতে ভর্তি হয়ে পাস করে ১৯৭০ সালে বাংলায় ভর্তি হলাম।

 

তখন তো আন্দোলন-সংগ্রামের কাল।

১৯৬৯ সালে প্রতিদিন দল বেঁধে মিটিং-মিছিলে গেছি। তবে রাজনীতিতে কোনো দিনই উৎসাহ পাইনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমি আর ছোট ভাই (আবদুল্লাহ আল মাহমুদ) যুদ্ধে চলে গেলাম। স্বাধীনতার পর ফিরে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম।

 

অভিনয় জীবনের শুরু?

মুন্সীগঞ্জ হাইস্কুলে পড়ার সময় স্কুলনাটকে অভিনয় করেছি। নাটকের দলে অভিনয়ও করেছি। প্রচলিত মেলোডিনির্ভর নাটক করব না বলে নিজেরা নাটক লেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘আপতিক’ নামে নাটকের দল তৈরি করেছিলাম। আর ঢাকায় আসার পর বড় ভাইজান ও মেজ ভাই (আবদুল্লাহ আল মামুন) মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বৈশাখী’ গড়েছিলেন। সেখানেও অভিনয় করেছি। নামটি ভুলে গেছি। মুক্তিযুদ্ধের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ও চিন্ময় মুত্সুদ্দীদের সাংবাদিকতা বিভাগের নবীন বরণের নাটক লিখেছিলাম। এরপর টিএসসির অডিটরিয়াম দেখতে গেলাম। বিমগুলোর ওপর অজস্র কবুতর বাসা বেঁধেছে। ওদের মলে অডিটরিয়ামের মেঝেতে তিন স্তর পড়েছে। কয়েকজন মিলে পরিষ্কার করলাম। পেছনে পর্দা, লাইট লাগালাম। টিএসসির ইলেকট্রিশিয়ান সালফিউরিক অ্যাসিড মেশানো পানি আর দুটি তামার তার ঝোলানো পাইপ নিয়ে এসে উঁচু করে ঝুলিয়ে ডিমারের ব্যবস্থা করলেন। আগে এভাবে স্টেজে ডিমার বানানো হতো। ড্রামের ভেতরে সালফিউরিক এসিড মেশানো দুটি তামার কয়েল নামিয়ে সেটিকে ওঠা-নামা করানো হলে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতো। ম্যানুয়ালি লাইট আস্তে আস্তে কমত, বাড়ত (হাসি)। ১৯৭২ সালে নাটকটি মঞ্চায়ন করা হলো। নামটি মনে নেই। বাংলার সহপাঠী রুমি, মানিক, মিনু বিল্লাহ, সাইদুল আনাম টুটুল এতে অভিনয় করলেন। অডিটরিয়াম দর্শকে ভরে গেল। আমি নির্দেশনা দিয়েছি, অভিনয় করিনি। হয়তো টিএসসিতে এটিই প্রথম মঞ্চ নাটক।

 

নাটকটির রি-অ্যাকশন?

এই নাটক হওয়ার পর অনেকেই উৎসাহ দেখিয়েছেন। শেখ কামাল বলেছিলেন, ‘নাটকটি খুব ভালো লেগেছে। ’ তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমরা কি নিয়মিত নাটক করবে?’ ম. হামিদ তখন ছাত্র ইউনিয়ন করেন। এই সংগঠনের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক রাজনীতির মূল ব্যক্তি। সংগঠনটি তখন খুব জনপ্রিয়, নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করে। রাজনীতির সূত্রে হামিদের মধ্যে সাংগঠনিক ব্যাপার ছিল। তিনি, হাবিবুল হাসান, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, রাইসুল ইসলাম আসাদ ও আমি তখন নাটক নিয়ে ভাবতাম। হামিদ পরিকল্পনা করলেন, আন্তহল নাট্য প্রতিযোগিতা করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের সাত ও মেয়েদের দুটি হলে হৈহৈ পড়ে গেল। প্রতিযোগিতার নিয়ম ছিল, লেখক, অভিনেতা-অভিনেত্রী সবাইকে হলের ছাত্রছাত্রী হতে হবে। মেয়েদের হলে ছেলে বা ছেলেদের হলে মেয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রী প্রয়োজনে নেওয়া যাবে। ১৯৭৩ সালে ৯ দিনে ৯টি নাটক হলো। বাংলা বিভাগের ছাত্র ও মহসিন হলের বাসিন্দা সেলিম আল দীন তাঁর হলের জন্য নাটক লিখল ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’। হলের অনাবাসিক ছাত্র বাচ্চু পরিচালনা করল। এসএম হলের অনাবাসিক ছাত্র শেখ কামাল আমার লেখা ‘রোলার ও নিহত এলএমজি’তে অভিনয় করলেন। এটিই তাঁর জীবনের প্রথম অভিনয়। দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। মানুষের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিকাশের ধারা শোষক শ্রেণির সঙ্গে সংগ্রামের মাধ্যমে টিকে থাকা—এখানে প্রতীকিভাবে তুলে ধরেছি। নাটকে অভিনয় করিনি, রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছি। আন্তহল প্রতিযোগিতায় সেলিম সেরা নাট্যকার হলো, আমি দ্বিতীয়।

 

নাটকের দল কিভাবে গড়লেন?

প্রতিযোগিতাটি শেষ হওয়ার পর একটি নাটকের দল তৈরির কথা হামিদের মাথায় এলো। পুরনো বন্ধুদের নিয়ে ‘নাট্যচক্র’ তৈরি হলো। আমরা দ্বিতীয়-তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। দল থেকে দু-একটি নাটকও হলো। আমরা অভিনয় করলাম, দলের সঙ্গে পুরোপুরি জড়িয়ে থাকলাম। কিছুদিন পর ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে রেসকোর্স ময়দানে (এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিরাট মঞ্চ তৈরি হলো। সেখানে কয়েক দিন ধরে টানা অনুষ্ঠান চলবে। সিদ্ধান্ত হলো, নাট্যচক্রের নাটকও মঞ্চস্থ হবে। ভাবলাম, আমরা তো নাটক করতে এসেছি, রাজনীতি করতে নয়। নাট্যচক্র রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলে কিভাবে কাজ করব?

 

 

এ কারণেই কি ঢাকা থিয়েটারের জন্ম হলো?

হ্যাঁ। তখন প্রতি সন্ধ্যায় রমনা রেস্তোরাঁর পাশের ছোট আমগাছের নিচে আমরা ৩০-৪০ জন বসতাম। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত গল্প হতো। সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী, সেলিম, আমি, বাচ্চু, হাবিবসহ অনেকে থাকতেন। আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন শফিকুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন, জগন্নাথ কলেজে পড়াতেন। এখন নিউ ইয়র্ক প্রবাসী। অভিনয় বা নাটক না লিখলেও তিনি অসাধারণ সংগঠক ছিলেন। একদিন তিনি, আমি, সেলিম, বাচ্চু, আসাদ, হাবিব, জাকী ভাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা শুধু নাটক করব, অন্য কিছু নয়। আমাদের আলাদা প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন। আমরা আলাদা নাটকের দল গড়ব। যেহেতু সবাই ঢাকায় থাকি, দলের নাম হবে ‘ঢাকা থিয়েটার’। শফিক ভাই কমিটি তৈরির প্রস্তাব দিলেন। তবে আমি বললাম, যেখানে কমিটি সেখানেই অকর্ম, যেখানে কর্ম হয়, সেখানে কমিটি লাগে না। যাত্রার মঞ্চের মতো আমরা থাকব উন্মুক্ত। চারদিকে সিঁড়ি থাকবে। যার যোগ্যতা আছে, সে উঠে আসবে। যার নেই, তার নেমে যাবার পথও খোলা রইলো। এই একটি কারণে ঢাকা থিয়েটারের আজও কোনো কমিটি নেই। দলটিও ভাঙেনি। অফিস বলতে রমনা পার্কের সেই আমগাছের তলা। সেখানে বসেই সব সিদ্ধান্ত হতো। এখনো আমাদের অফিস নেই। টিএসসিতে রিহার্সাল করতাম, সেখানেই নাটক করতাম। ঢাকা থিয়েটারের জন্ম ১৯৭৩ সালের শেষে।

 

তখন কোন বর্ষে পড়েন?

আমি দ্বিতীয় বর্ষে, সেলিম এক ব্যাচ ওপরে। বাচ্চু, হাবিবুল হাসান আমার ব্যাচমেট, আসাদ কলেজে পড়ে।

 

ঢাকা থিয়েটার প্রথম নাটক কবে করল?

সালটি মনে নেই, তারিখ মনে আছে, ৯ জুন। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের দক্ষিণে, যেখানে কাবাডি ফেডারেশন, সেখানে ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের (ডিডিএসএ) একটি মিলনায়তন ছিল। খোলা হলরুম, চেয়ার-টেবিল নেই। তাতে ছুটির দিন রবিবারে নাটক মঞ্চায়নের সিদ্ধান্ত হলো। তবে রাত থেকে তুমুল ঝড় হচ্ছিল। ঝড় মাথায় নিয়ে পৌঁছে গেলাম। ঠিক ১১টায় নাটক শুরু হলো। পরিচিত অল্প কয়েকজন দর্শক ছিলেন। দুই টাকা টিকিট। হাবিবের ‘সম্রাট এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীগণ’ ও সেলিমের ‘সংবাদ কার্টুন’ প্রদর্শিত হলো। দুটিই ৪০-৪৫ মিনিটের নাটক। সেদিনই পেশাদার মঞ্চে সেলিমের প্রথম নাটক হলো।

 

কোনটিতে কোন চরিত্রে অভিনয় করেছেন?

‘সংবাদ কার্টুন’ রম্য নাটক। আমি প্রেমিক চরিত্রে অভিনয় করেছি। প্রেমিকার কাছে প্রেম নিবেদনের পর প্রেমিকা ত্যাগ করে চলে গেল। সেই দুঃখে, মেয়ের হাত না পেয়ে নিজের আঙুল ধরে চলে গেলাম—এই দৃশ্যটি দর্শকরা খুব পছন্দ করেছিল। ‘সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ’-তে প্রতিবাদী যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেছি।

 

ঢাকা থিয়েটারের জীবন?

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাস করে ঘুরে বেড়িয়ে বিকেলে রিহার্সাল, গল্পগুজব সেরে রাত ৮টা-৯টায় বাসায় ফিরতাম। দলের যেকোনো নাটকে অবধারিতভাবে অভিনয় করতাম। নাটক নিয়ে চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইলসহ কয়েক জায়গায়ও গেছি। তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। তা ছাড়া আমি তো ভ্যাগাবন্ড টাইপের, ছন্নছাড়া। বেশ কটি নাটক করার পর ১৯৮১ সালের পর ঢাকা থিয়েটারে থাকিনি। দলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই, নিতান্তই এটি আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। মানুষ অনেকভাবে আত্মহত্যা করে। আমার এই সিদ্ধান্তও এক ধরনের আত্মহত্যাই ছিল। আমার মঞ্চজীবনের স্মৃতিগুলো খুব অস্পষ্ট। তবে মনে আছে—একজনকে ভালোবাসতাম, আজও বাসি। পাগলের মতো, উন্মাদের মতো, কালবৈশাখী, টর্নেডো, মহাপ্রলয়ের মতো ছিল সে ভালোবাসা। সে এক অন্যরকম জীবন ছিল।

 

বিদায় মোনালিসার গল্প?

চারুকলা বিভাগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিল মারুফ হাসান। সে চলচ্চিত্রাভিনেতা এনাম আহমেদের বড় ছেলে। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে অনুরোধ করল, বেলাল (আমার ডাক নাম), নবীনবরণে নাটক করতে চাই। লিখে দিলাম। প্রধান দুই চরিত্র পুরুষ। মারুফ ভালো অভিনয় করে। সে এক চরিত্র করবে। অন্যটি কে করবে? তাকে বললাম, তোমাদের কলেজে যারা অভিনয়ে উৎসাহী, তাদের একসঙ্গে করো। ৩৫-৩৬ জন ছেলে এলো। নাম জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু কেউ-ই অভিনয় পারবে বলে মনে হলো না। ঘরের কোণে ছবি আঁকার সরঞ্জামের পাশে তিনটি ছেলে দাঁড়ানো। ওদের মধ্যে একজনকে দেখে মনে হলো, সে পারবে। জিজ্ঞেস করলাম, অভিনয় করবে? সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘অভিনয় করতে চাই না, দেখতে এসেছি। ’ মারুফকে বললাম, ওকে ধরে আনো। সে এলো। বললাম, তোমার কাছে দুটি অপশন আছে। যদি বলো অভিনয় করব না, তাহলে কিছু বলার নেই। কিন্তু যদি বলো অভিনয় করতে পারব না, সেই দায়িত্ব আমার। সে বলল, ‘পারব না। ’ তখন বললাম, ঠিক আছে, কাল থেকে রিহার্সালে এসো। সেই ছেলেটিই আজকের আফজাল হোসেন। সে ‘বিদায় মোনালিসা’য় অভিনয় করল। ঢাকা থিয়েটারও এই নাটকটি মঞ্চায়ন করল। সেখানেও এই চরিত্রের জন্য আমি তাঁর নাম প্রস্তাব করলাম। এভাবেই আফজাল ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল।

 

সুবর্ণা মুস্তাফাকে কিভাবে অভিনয়ে আনলেন?

ওর বাবা (অভিনেতা গোলাম মুস্তফা) অনেক সিনিয়র হলেও বন্ধুর মতো ছিলেন; কাউকে ছোট-বড় করে দেখতেন না, একনজরে বিচার করতেন, আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মগবাজারের কাজী অফিসের পাশে সুন্দর একতলা বাড়িতে থাকতেন। বাড়ির সামনে ঘাসে ঢাকা উঠান। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। তাঁর বাসায় যেতাম। কত যে গল্প করতেন। বিকেলে আমাদের সামনে সেই উঠানে ছোট্ট সুবর্ণা দড়ি লাফ খেলত। এক-দুই দিন দেখার পর মুস্তফা ভাইকে বললাম, আপনার মেয়েটিকে আমাকে দিয়ে দিন। তিনি বললেন, ‘ওকে নিয়ে কী করবে?’ অভিনয় করাব। তিনি হাসতে লাগলেন, ‘ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। ’ আমি তো নাছোড়, ওকে দিয়ে হবেই। পরে ডাক দিলাম, কিসে পড়ো?  ‘এইটে পড়ি। ’ নাইনে উঠলে আমাকে মনে করিয়ে দেবে। তোমাকে আমি নিয়ে যাব। নাইনে ওঠার পর ওকে ঢাকা থিয়েটারে নিয়ে গেলাম। অভিনয় করতে গিয়ে সুবর্ণা তো লজ্জায় লাল। বারবার বলল, ‘আমাকে বাসায় দিয়ে এসো। ’ কিছুদিন আসা-যাওয়ার পর সে স্বাভাবিক হয়ে এলো। তখন তো আমার ছন্নছাড়া জীবন। কোথায় থাকি না-থাকি ঠিক নেই। আসাদ পল্টনে থাকে। ওর বাসা থেকে মগবাজার কাছে। ওকে সুবর্ণার আনা-নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো। এভাবে সুবর্ণা অভিনয় ও ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হলো।

 

আরো অনেককেও তো আবিষ্কার করেছেন?

বিটিভিতে গানের অনুষ্ঠান ‘শিউলিমালা’র প্রযোজক ছিলাম। বড়দের অনুষ্ঠানে গায়নি, নাচেনি—এমনদের নিয়ে অনুষ্ঠানটি হতো। শামীম আরা নীপা, শুভ্রদেব, তপন চৌধুরীরা অনুষ্ঠানটি থেকে উঠে এসেছে। বেবী নাজনীন আগে ফোক গাইত। একদিন গান শুনে বললাম, তোমার গলা তো আধুনিকের, ফোক গাও কেন? এই অনুষ্ঠানেই সাবাতানি, শম্পা রেজা প্রথম টিভিতে আধুনিক গান গেয়েছে। সোমা (সামিনা চৌধুরী), নুমা (ফাহমিদা নবী) শিশুদের অনুষ্ঠানে গাইত। সোমা তখন নবম শ্রেণিতে পড়ে। ওকে অনুষ্ঠানে গান করানো হলো—‘ফুল ফোটে, ফুল ঝরে’। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার বন্ধু আমিনুর রহমান নিঝু আমাদের বাড়ির দুই বাড়ি পরে থাকত। সে-ই বলল, ‘শান্তিনিকেতনে আমার এক বন্ধু আছে। আমরা আপনার অনুষ্ঠানে গাইব। ’ ওরা গাইল—‘তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা’ একজন বাংলায়, অন্যজন ইংরেজিতে। সুপারহিট হলো। বন্যা ও নিঝু তখন শান্তিনিকেতনে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। নায়িকা দিতিও আমার আবিষ্কার।

 

কুমার বিশ্বজিেক কিভাবে পেলেন?

আগে হাতে গোনা গুটিকয়েক রেকর্ডিং স্টুডিওতে গিয়ে বা চেয়েচিন্তে পাওয়া ক্যাসেট থেকে গান শুনে তারপর গায়কদের অনুষ্ঠানে আনতাম। একদিন একটি রেকর্ড শুনে চমকে গেলাম। ক্যাসেটের ওপর লেখা কুমার বিশ্বজিৎ, সঙ্গে চট্টগ্রামের একটি টেলিফোন নম্বর। ফোন করার পর ওষুধের দোকানের একজন ধরে বললেন, ‘আমি ওর বন্ধু। সে আমার পাশের বাড়িতে থাকে। ’ তাকে বলবেন আমার নাম আল মনসুর, বিটিভি থেকে ফোন করেছি। তিনি যেন আমাকে ফোন করেন। বিশ্বজিৎ আধ ঘণ্টার মধ্যে ফোন করল। বললাম, আজ রাতের ট্রেনে ঢাকা আসবে। ট্রেন না পেলে বাসে আসবে। বাস না পেলে হেঁটে আসবে, কাল সকালে তোমাকে বিটিভিতে দেখতে চাই। গেটে পাস দেওয়া থাকবে। সকাল ১০টায় বিটিভিতে ঢোকার সময় দেখি, দাঁড়িয়ে আছে। বললাম, তুমি তো অসাধারণ শিল্পী। ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানটি সে রেকর্ড করে এনেছিল। গাওয়ার পর বিখ্যাত হয়ে গেল।  

 

বিটিভিতে প্রযোজকের জীবন?

তখন বিটিভিতে তরুণ প্রযোজকরা কাজ করতেন। তাঁরা কিছু নতুন ছেলে নিতে চাইলেন। নিজেরাই ঠিক করে ১৯৮০ সালে আমাকে, আলী ইমাম, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, রিয়াজ উদ্দিন বাদশা, আহসান হাবিব, খ. ম. হারুন, আবু তাহের, মাহবুব আলম, মেনকা হাসান, শাহেদা আরবীকে নিলেন। প্রযোজক হিসেবে অনুষ্ঠান তৈরি করা নেশা হয়ে গেল। ২৪ ঘণ্টাই অনুষ্ঠান নিয়ে ভাবতাম, অনুষ্ঠান তৈরি করতাম। অভিনয়ের কথা মাথায় আসত না, প্রায় বাদই দিয়ে দিয়েছিলাম। ‘শিউলি মালা’ থেকে এ দেশের নাচ ও গানের সেরা শিল্পীরা উঠে এসেছে। শিশুদের অনেক অনুষ্ঠান তৈরি করেছি। সবই সফল হয়েছে। ঈদের নাচের অনুষ্ঠানে ঈশিতা (রুমানা রশীদ) এসেছিল। কথাবার্তা খুব সুন্দর লাগল বলে ওকে নিয়ে পরিকল্পনা করে সিরিয়াল তৈরি করলাম। মামার মেশিনের মধ্যে ঢুকে সে হঠাৎ ধোঁয়া হয়ে যায়। বাবার কোলে বসে থাকলেও ওর পুরো শরীর ধোঁয়ার মধ্যে থাকে। ভিন গ্রহের মানুষও আসে। ‘রূপকথা নয়’ নামের এই সায়েন্স ফিকশন সিরিয়ালটি প্রচারের পর মানুষের তাক লেগে গেল, খুব জনপ্রিয় হলো। ফরীদি-সুবর্ণাও এতে অভিনয় করেছে। একদিন ফরীদি বলল, ‘কাল একটু দেরিতে আসব। ’ পরে দেখি, দুজনে একসঙ্গে এলো। কী ব্যাপার? ফরীদি বলল, ‘আমরা বিয়ে করে এসেছি। ’ ফিলিপাইনের ম্যানিলায় বিভিন্ন ধরনের টিভি অনুষ্ঠানের প্রতিযোগিতা হতো। খালেদা ফাহমি বললেন, “তোমার ঈদের অনুষ্ঠান ‘হাসি-খুশি’কে ৩০ মিনিট করে দাও। ” সেই রূপকথার অনুষ্ঠানকে সম্পাদনা করে সাড়ে ২৯ মিনিট করলাম। জমা দেওয়ার পর ১৯৮০ সালে শিশুতোষ বিভাগে এটি সেরা অনুষ্ঠানের অ্যাওয়ার্ড পেল। এটিই বাংলাদেশের কোনো অনুষ্ঠানের প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মাননা। ‘আমি তুমি সে’ নামে জনপ্রিয় ধারাবাহিকও তৈরি করেছি। সিডনি ভাই, আবদুল্লাহ আল মামুন ভাই, ফেরদৌসী (মজুমদার) আপা মূল চরিত্রে ছিলেন। প্রযোজক হয়েও অভিনয় করছেন, জনপ্রিয় হচ্ছেন বলে মামুন ভাইয়ের পেছনে ঈর্ষাপরায়ণরা লেগে গেল। ক্ষোভে-দুঃখে তিনি বললেন, ‘বেলাল, বাদ দাও। ’ কোনো রকমে সিরিয়াল শেষ করে দিলাম।

 

অভিনেতা আল মনসুরের জন্ম কিভাবে?

১৯৭২ সালে আলী ইমামের ‘বীরগাঁথা’র মাধ্যমে শিশুতোষ নাটকে অভিনয় শুরু করেছিলাম। এরপর আরো কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছি। এরপর মুস্তাফিজুর রহমান রবিবারের বড়দের নাটকে সুযোগ দিলেন। তখন বিটিভির প্রধান অভিনেতা সৈয়দ আহসান আলী সিডনির বন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করলাম। তবে অভিনেতা আল মনসুরের জন্ম হলো সমরেশ বসুর ‘অয়নান্ত’ উপন্যাসের মাধ্যমে। এটির প্রধান চরিত্র রাজা, ১৮-১৯ বছরের ছেলে। উপন্যাসটি পড়ার পর মনে হলো, এটি দুর্ধর্ষ টিভি নাটক হবে। চরিত্রটি করার জন্য খুব মন চাইল। তখন প্রতি রবিবারেই বিটিভির অন্যতম পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনের নাটক প্রচারিত হতো। তাঁর পরিচালনা মানেই অসাধারণ নাটক। আমি, হাবিব, টুটুল, বাদশা, আসাদ—অবসরে ডিআইটির সিঁড়িতে আড্ডা দিতাম। ভয়ে ভয়ে তাঁকে দেখতাম। আড্ডায়ই শুনলাম, তিনি ‘অয়নান্ত’ নিয়ে নাটক করবেন। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় বজ্রাঘাত হলো। কারণ তাঁর তো সাগরেদ বাহিনী আছে। তাদের ফেলে তো তিনি আমাকে নেবেন না। একদিন সিঁড়িতে বসে আছি। ওঠার সময় তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এদিকে এসো। ’ গেলাম। রুমে গিয়ে বসলেন, আমি দাঁড়িয়ে। চশমার ফাঁক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘অয়নান্ত পড়েছ?’ জি। ‘রাজা চরিত্রটি খেয়াল করেছ?’ জি, দারুণ চরিত্র। খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। আমি নিশ্চিত রাজার কয়েকজন বন্ধুর যেকোনো একজনের চরিত্র তিনি করতে বলবেন। মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, আমিও সঙ্গে সঙ্গে ‘মামুন ভাই, অভিনয় করতে পারব না’ বলে চলে যাব। যখন তিনি আমাকে বললেন, ‘রাজা চরিত্রটি তুমি করবে। ’ পাঁচ-ছয় মিনিট কোনো কথাই বলতে পারিনি। এই নাটকে আমার বিপরীতে মিতা চৌধুরী ছিলেন। ‘রাজা’র মাধ্যমে ১৯৭৪ সালের শেষে আল মনসুর-মিতা চৌধুরী জুটির জন্ম। আমাকে-মিতাকে দিয়েই টিভিতে জুটির শুরু।

 

আপনাদের জুটির গল্প শুনব।

আমাদের সব নাটকের নাম মনে নেই। তবে অয়নান্তর কথা এ কারণেই মনে আছে—এটির মাধ্যমেই বেলাল থেকে আমি আল মনসুর হলাম। আমার নতুন জন্ম হলো। মিতারও তাই। আমরা খুব বেশি নাটকে অভিনয় করিনি। সব মিলিয়ে সাত-আটটি, যেমন—‘নন্দিত নরকে’। এমনিতেও আমরা বেশি নাটক করতাম না। দুই-তিন মাসে একটি নাটক করেছি। বছরে চার-পাঁচটির বেশি নাটক করিনি। তবে তখন প্রতিটি নাটকই এত শক্তিশালী, চরিত্রগুলো এত অসাধারণ ছিল যে ৩০-৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও দর্শকরা আজও সেগুলোর কথা ভোলেনি। ১৯৭৬ সালে দস্তয়ভোস্কির ‘ইডিয়ট’-এর নাট্যরূপ দিলাম। দুই ঘণ্টা ৩২ মিনিটের এই নাটকটি বিটিভির প্রথম দীর্ঘ নাটক। খুব ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করেছি। একটি ছোট্ট দৃশ্য—ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে দুই হাতে বাদাম তুলে মুখের মধ্যে ছুড়ে দিচ্ছি আর শম্পার (রেজা) সঙ্গে কথা বলছি। এখনো দর্শকরা আমাকে দৃশ্যটির কথা বলে। আসলে অভিনয়ের কারণে মানুষ আমাদের মনে রেখেছে। এখনকার ৩০টি নাটক, ১৬টি সিরিয়ালের অভিনেতাদেরও তো মানুষ চেনে না। পুরো অভিনয়জীবনে আমি ৩০টি নাটকে অভিনয় করেছি বলে মনে পড়ে না।

 

তার পরও আপনাদের জুটিকে টিভি নাটকের অন্যতম সেরা জুটি কেন বলা হয়?

অভিনয়জীবনের শুরুতে মিতা ক্লাস টেনে পড়ত। অভিনয় নিয়ে আমার মতো তারও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। সে-ও সহজাত, প্রাকৃতিক শিল্পী। চলচ্চিত্রের কবরীকে যেভাবে মানুষ গ্রহণ করেছে, মিতাকে সেভাবেই টিভি দর্শকরা গ্রহণ করেছে। জীবনে কোনো দিন দাড়ি কাটিনি। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর প্রথম শেভ করলাম। ছেলেমানুষী দাড়ির ধরনটিও অন্য রকম। একটু চাপা, লম্বা দাড়ি, মুখের কোথাও কম, কোথাও বেশি, গোছা চুল। টিভিতে তখন কোনো অভিনেতারই দাড়ি নেই (পরে আসাদুজ্জামান নূর ভাই এলেন)। ফলে আমার এই দাড়ি একটি ইউনিক ব্যাপার ছিল। সবার কাছে ভালো লাগায় ফ্যাশন হয়ে গেল। আমার অভিনয়ও স্বাভাবিকতার কারণে মানুষের ভালো লেগেছিল। যে চরিত্রই করি না কেন, খুব স্বাভাবিকতা রাখতে চেষ্টা করতাম। মোস্তাফিজুর রহমানের নাটকে পকেটমারের অভিনয় করেছি। বৈচিত্র্যই আমার গ্রহণযোগ্যতার বড় কারণ। প্রতিটি নাটকে আমার-মিতার মধ্যে চমত্কার আদান-প্রদান হয়েছে। আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছি। ফলে মানুষের চোখে আমাদের দেখে খুব আরাম লাগত, স্বাভাবিক লাগত। যিনি অভিনয় করেন, সেই শিল্পীকে মানুষ মনে রাখে না।

 

আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?

‘অয়নান্ত’ করার পর আমাদের মধ্যে অদ্ভুত রসায়ন গড়ে উঠল। দুজন দুজনকে বুঝতে পারতাম। ফলে তিনি অনেক ভালো নাটক করেছেন, সেগুলোয় অভিনয় করেছি। যেসব নাটকে অভিনয় করিনি, প্রডাকশন টিমে কাজ করেছি। মামুন ভাইয়ের স্ত্রী আমাকে ছেলের মতো দেখতেন। তাঁর ছেলে-মেয়েরা আমাকে বন্ধু মনে করত। সপ্তাহের চার-পাঁচ দিন তাঁর বাসায় রাতের খাবার খেতাম। তিনি আমার টেলিভিশনের গুরু। তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি খুব পরিশ্রমী ছিলেন, একাগ্রতা নিয়ে কাজ করতেন। যখনই দেখেছি, তিনি কাজ করছেন।

 

তখন তো আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বিটিভিতে উপস্থাপনা করতেন।

বড় ভাইজান তখন আনন্দমেলা করতেন। টিভিতে যে অত্যন্ত রুচিশীল বিনোদন করা যায়, সেটি তিনি সার্থকভাবে দেখিয়েছেন, শিখিয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে ‘সপ্তবর্ণা’ করতেন। সেটিও খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর প্রতিটি অনুষ্ঠানে চিত্রনাট্য লেখা, অভিনয়—মানে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে ছিলাম। সপ্তবর্ণার প্রতি পর্বে আমি আর মিতা খুব মজার ছোট ছোট পর্ব করেছি।     

  

উপন্যাসের নাট্যরূপও তো দিয়েছেন?

হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ হাতে এলো। পড়ে মামুন ভাইকে বললাম, এত অসাধারণ উপন্যাস। দারুণ নাটক হবে। তিনি বললেন, ‘লিখে ফেলো। ’ চিত্রনাট্য লিখলাম। সে নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করলাম। সুপারহিট হলো। ১৯৮০ সালে করলাম হাবিবুল হাসানের ‘আমার দেশের লাগি’। এ নাটকটি সম্ভবত বাংলাদেশ টেলিভিশনের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক। টিত্রনাট্য, নির্মাণ, চরিত্র—সবই অসাধারণ।

 

আপনি তো সংশপ্তক-এর প্রযোজক ছিলেন?

এই নাটকের প্রথম ১৬ পর্ব পর্যন্ত মামুন ভাইয়ের সঙ্গে ছিলাম। আমি আর আবদুল্লাহ আল মামুন মিলেই এই সিরিয়াল করেছি। আমি নাটকটির সহ-প্রযোজক ছিলাম। আমৃত্যু তিনি বলেছেন, ‘বেলাল না থাকলে সংশপ্তক হতো না। ’ এই নাটক নিয়ে ২৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করেছি, অন্য কিছু করিনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত বিটিভিতে থেকেছি। চিত্রনাট্য লিখেছি, লোকেশন দেখতে গেছি, শিল্পীদের নিয়ে এসে রিহার্সাল করিয়েছি, শিল্প-নির্দেশকদের সঙ্গে সেটের পরিকল্পনা করেছি। সেট বানানোর দিন সকাল ৭টায় চলে যেতাম। নিজের হাতে পেরেকও মেরেছি। প্রতি সপ্তাহে আউটডোরে শুটিং করতাম। এটিই বিটিভির শ্রেষ্ঠ আউটডোর নাটক। এ জন্য এখনো অসাধারণ লাগে। মুস্তাফা মনোয়ারের ‘রক্তকরবী’ বিটিভির শ্রেষ্ঠ একক নাটক। তবে সিরিয়ালের বিচারে সেরা ‘সংশপ্তক’। কারণ এর দলগত কাজ অসাধারণ! উপন্যাস, নাট্যরূপ—সবই আসাধারণ। তখন শিখিয়ে এনে অভিনয় করানো হতো না। সেরা অভিনেতা বাছাই করাই মূল কাজ ছিল। নাটকে মামুন ভাই খুব দক্ষভাবে তা করেছেন। এখানেই সংশপ্তকের অভিনবত্ব। তখন তো মামুন ভাইয়ের আশপাশে অনেক ভিলেনই ছিলেন। ফরীদি মামুন ভাইয়ের তোষামোদকারীও ছিল না। চরিত্র নির্বাচনের সময় তিনি স্বজনপ্রীতিতে না গিয়ে নিষ্ঠুরভাবে চরিত্রাভিনেতা বাছাই করেছেন। সে কারণেই ফরীদি, খলিল উল্লাহ খান ও ফেরদৌসী মজুমদার তাঁদের জীবনের সেরা অভিনয় করতে পেরেছেন। নাটকের প্রথম ১৬ পর্ব পর্যন্ত আমার নাম আছে। এরপর তো যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলাম।

 

সংশপ্তকের মতো নাটক চলার সময় চাকরি ছেড়ে দিলেন কেন?

আগে থেকেই আমার ভেতরে হতাশা কাজ করতে শুরু করেছিল। জন্ম থেকে বিটিভি স্বাধীন শিল্পমাধ্যম ছিল। তবে ১৯৮৭ সাল থেকে আমরা বিভিন্নভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করলাম—এটি শিল্পমাধ্যম নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান। অনুষ্ঠান নিয়ে নানা নির্দেশনা আসছে। তখনকার তথ্যমন্ত্রী একবার এসে বললেন, ‘আপনারা মা-বাবা বলেন, এসব তো হিন্দুদের ভাষা। আম্মা-আব্বা বলবেন। ’ তখন এক সিনিয়র প্রডিউসার বলেছিলেন, ‘এর মধ্যে খারাপ কী আছে?’ তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘তাহলে অন্য কাজ করুন। ’ এ পরিস্থিতি আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আমি বিটিভিকে পুরোপুরি শিল্পমাধ্যম হিসেবে দেখেছি। তাতে বিনোদনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে জাতীয় পার্টির শেষ দিকে এই নোংরামি শুরু হলো। স্বৈরতন্ত্র যত অজনপ্রিয় হয়, ততই সে মুঠি শক্ত করে। তাই ঘটতে শুরু করল। বিটিভির ভবিষ্যৎ ভেবে হতাশ হয়ে গেলাম। পদে পদে ঝগড়া করলে কাজ কখন করব? বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ছোট ভাই মামুন মিয়াজী আর্ট কলেজে পড়ত। অভিনয় করত। সে যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। তাকে বলার পর একদিন বলল, ‘বেলাল ভাই, চলে আসেন। ’ ১৯৮৯ সালে বিদেশে চলে গেলাম।

 

কবে দেশে ফিরলেন?

মাঝে তিন-চার বছর টানা দেশে আসিনি। মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হলেই বলেন, ‘কত দিন আসিস না। ’ বোঝাতাম, ‘রোজার ঈদে আসব। কখনো বলতাম গরমে আসব। কিন্তু আসা হতো না। এভাবে অনেক বছর পেরিয়ে গেল। একবার হঠাৎ পরিকল্পনা করলাম—এসে এক মাস থাকব। সেই এক মাস এখনো শেষ হয়নি। এখন গিয়ে এক কী দুই মাস থেকে ফিরে আসি।

 

সিনেমায় কাজের শুরু কিভাবে?

আতা (খান আতাউর রহমান) ভাই মামুন ভাইকে ‘আবার তোরা মানুষ হ’র জন্য কিছু তরুণ অভিনেতা দিতে অনুরোধ করলেন। আমি, আসাদ তাঁর অফিসে গেলাম। তিনি কয়েকটি সংলাপ বলতে বললেন। মাস দুই-তিন পর তাঁর এক সহকারী বাসায় এসে বললেন, ‘ছবির শুটিং শুরু হবে। ’ ছবির সাত মুক্তিযোদ্ধার আমি অন্যতম। তখন আমার ২২-২৩ বয়স। কোনো এক সূত্রে ১৯৭৩ সালে এহতেশামের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। তাঁর ‘বন্দিনী’ সিনেমার চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখলাম। ভিলেন চরিত্রে অভিনয়ও করেছি। ভিলেন হিসেবেই আমি সবচেয়ে ভালো করতাম বলে মনে হয়। তবে কেউ চরিত্রটি করাননি।

 

সংলাপ ও চিত্রনাট্য রচয়িতা হিসেবে বিখ্যাত পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন।

তখন সবাই বলতেন আমার সংলাপ ইন্টারেস্টিং। যেমন একটি মেয়েকে প্রতারিত করে ভিলেন বলছে, তুমি তো জানো আমি নতুন জুতা পরতে ভালোবাসি। পুরনো জুতা আমি ঘরে সাজিয়ে রাখি না। ডাস্টবিনে ফেলে দিই। ’ রাজ্জাক, শাবানা—আমার সংলাপে অভিনয় করে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। আর মামুন ভাইয়ের ছবি ‘সখী তুমি কার?’, ‘এখনই সময়’সহ চারটি ছবিতে অভিনয় করেছি। আমার লেখা চিত্রনাট্যে ‘মাটির পুতুল’, ‘নির্যাতন’, ‘আয়না’, ‘অলংকার’, ‘চোখের মণি’, ‘কথা দিলাম’ হিট। টিভিতে যোগ দেওয়ার পর সিনেমায় কাজ করিনি। একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি কাজ তো করতে পারি না।  

 

শ্রুতলিখন : মাসুদ রানা আশিক

(১ মার্চ ২০১৭, উত্তর শাহজাহানপুর, ঢাকা)

 


মন্তব্য