kalerkantho

সেক্টর-১

মুক্তিবাহিনীর কেছকা মাইর

আবুল বশির চৌধুরী, গ্রাম-সইত্যনগর, উপজেলা-ছাগলনাইয়া, জেলা-ফেনী। প্রথমে ভারতের চোত্তাখোলা ক্যাম্পে এবং পরে হায়ার ট্রেনিং করেন হরিণায়। যুদ্ধ করেছেন ফেনী ও ছাগলনাইয়ার বিভিন্ন এলাকায়

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মুক্তিবাহিনীর কেছকা মাইর

কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে ভর্তি হতে হবে শান্তি কমিটিতে। গুপ্তচরের মতো জেনে আসতে হবে পাকিস্তানি সেনাদের সব পরিকল্পনা। কাজটি ছিল ঝুঁঁকিপূর্ণ। তবু রাজি হই। সঙ্গী হন হাফিজ, তারেক ও হাবিব। আমাদের সাহায্য করেন কানু মিয়া। তিনি ছিলেন ছাগলনাইয়ায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান; কিন্তু গোপনে তাঁর যোগাযোগ ছিল মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে।

দুই দিন ট্রেনিং শেষে আমাদের পাঠানো হয় শান্তি কমিটির ফেনী অফিসে। সেখানেই পরিকল্পনা চলে এক অপারেশনের।

ছাগলনাইয়ার পূর্ব পাশে শ্রীনগর এলাকা। সেখানে একটা বড় ব্রিজ ছিল ভারতীয় সীমানায়। ওই পথেই মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশে ঢুকত। সেটাকে উড়িয়ে দিতে হবে। এক্সপ্লোজার লাগানোর দায়িত্ব পড়ে আমাদের তিনজনের ওপর। ব্রিজ থেকে একটু দূরেই ছিল ছোট্ট পাহাড়। সেটিও ভারতীয় সীমানায়। সেই পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে ব্রিজটি উড়িয়ে দেবে পাকিস্তানি সেনারা—এমনটাই ছিল পরিকল্পনা। এ খবর আমাদের মাধ্যমে চলে যায় ক্যাপ্টেন শামসুল হুদার কাছে।

ফলে ওই রাতে পাহাড়ের তিন দিকে অবস্থান নেয় ভারতীয় সেনা ও মুক্তিযোদ্ধারা। এক পাশ দিয়ে পাহাড়ে ঢোকে পাকিস্তানি সেনারা। এক্সপ্লোজার ব্রিজে না লাগিয়ে আমরা পাশে কয়েকটি গাছে লাগিয়ে আসি। সেখান থেকে বিস্ফোরণের জন্য তার এনে পৌঁছে দিই পাকিস্তানি সেনাদের কাছে। খানিক পরই ওরা বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটায়; কিন্তু ব্রিজ তখনো অক্ষত থাকে।

সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের চারপাশ থেকে ভারতীয় সেনা ও মুক্তিবাহিনী সার্চলাইট জ্বালে। হতভম্ব হয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। নিরুপায় হয়ে অস্ত্র ফেলে হাত উঁচিয়ে আত্মসমর্পণ করে।

‘মুক্তিবাহিনীর কেছকা মাইর’ শিরোনামে এ খবরটি ওই সময় বহুবার প্রচারিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে। তখন প্রশংসাও পেয়েছিলাম; কিন্তু যে কানু মিয়ার জন্য জয় পেয়েছিলাম, তাঁকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।

যুদ্ধদিনের কথা এভাবেই বলছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশির চৌধুরী। আমির হোসেন চৌধুরী ও মাধু বিবির দ্বিতীয় সন্তান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ছাগলনাইয়ার চাঁদগাজি হাই স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্র।

সারা দেশে পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করেছে। গ্রামেই তখন বাঁশের লাঠি দিয়ে ট্রেনিং করেন বশিররা। বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ওবায়দুল ছিলেন ট্রেনার। ওই ট্রেনিংই যুদ্ধের জন্য তাঁদের মনোবল তৈরি করে দেয়।

ফেনী দখল করে পাকিস্তানিরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে থাকে। বন্ধু কাশেম, লতিফ, নূর ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে বশির তখন সুপ্তনগর বর্ডার পার হয়ে প্রথমে ভারতের কৃষ্ণনগরে এবং পরে চোত্তাখোলা ক্যাম্পে চলে যান। ট্রেনিং নেন ২১ দিনের। পরে ১৪ দিন হায়ার ট্রেনিং হয় হরিণায়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনবার আহত হন এই যোদ্ধা। প্রথমবার সেপ্টেম্বরের শেষে, চাঁদগাজিতে। পাকিস্তানি সেনাদের মর্টারের স্প্লিন্টার ঢুকে যায় তাঁর পিঠে ও বাঁ হাতে। ভারতের কৃষ্ণনগরে তিন দিন চিকিত্সার পর আবার ফিরে আসেন রণাঙ্গনে। পরে এক সম্মুখযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। গুলিটি তাঁর বাঁ পায়ের ঊরুর হাড় ভেঙে বেরিয়ে যায়। কী ঘটেছিল রক্তাক্ত সেদিন, জানতে চাইলে তিনি বলেন— ‘পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, রেজু মিয়া, নুরজাহান তখন মুক্ত। ফেনী এসে মুক্তিবাহিনীরা সম্মিলিতভাবে ভাগ হয় দুই ভাগে। এক ভাগ চলে যায় চট্টগ্রামের দিকে। অন্য ভাগ কুমিল্লার দিকে। আমি কুমিল্লার দলটির সঙ্গে থাকি।

লাকসাম রেলওয়ে স্টেশনের পশ্চিমের একটি গ্রামে এসে জড়ো হয় দুদিকের পাকিস্তানি সেনারা। চারদিক থেকে ওই গ্রামে আক্রমণ করি আমরা। ওরা মাঝখানে। থেমে থেমে গুলি চলছিল। ফাস্ট লাইনে আমি। একটু পরপর বৃষ্টি হচ্ছিল। দেড়-দুই দিন খাওয়া নেই আমাদের। ৮ ডিসেম্বর দুপুরবেলা। সবাই পজিশনেই। মাথা তোলার উপায় নেই। গুলি চলছে। ক্রলিং করে একটু এগোই। তিন শ গজ সামনেই ওদের বাংকার। কাদামাটির পিচ্ছিল পথ পেরোচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগে বাঁ পায়ে। তবু কিছুই টের পাই না। পাশেই ছিলেন সহযোদ্ধা আইজ্জা। তিনি বললেন, ‘ওই চৌধুরী, তোরে মনে হয় জোঁকে ধরছে।’

তাকিয়ে দেখি পেছনে লাল রক্তের লাইন। রক্ত দেখে মাথাটা চক্কর দেয়। বাঁ পায়ে কেমন যেন ব্যথা অনুভব করি। গুলির জায়গায় আঙুল দিতেই হাড়ের গুঁড়া বেরিয়ে আসে। চোখ দুটি তখনই ঝাপসা হয়ে আসে।

যখন জ্ঞান ফেরে, তখন আমি ভারতের বাংলাদেশ মেডিক্যালে। বাঁ পায়ের হাড়ে লোহার পাত দেওয়া। গৌহাটি হাসপাতালে এসেছিলেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। বললেন, ‘তোমরা বাঘের বাচ্চা। তোমরাই বীর। জাতি তোমাদের ভুলবে না।’ এখনো কানে বাজে তাঁর কথাগুলো।’

স্বাধীন দেশে কেউ যখন সততার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করে, তা দেখে বুক ভরে যায় মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশিরের। মিথ্যাকে সত্য বানানো, একের দোষ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এবং বড় বড় কথার রাজনীতি যারা করে, তাদের ঘৃণার চোখে দেখেন তিনি। স্বাধীন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে এই যোদ্ধা বলেন, ‘পাপ যে করে, কখনো না কখনো তাকে সেটার সাজা পেতেই হবে। অনেক আগেই এদের বিচার করা উচিত ছিল। পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলো তো ওদের লালন করেছে। বিচারের পরিবর্তে ওদের স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী ও এমপি বানিয়েছে। এটা ছিল লজ্জা আর অপমানের।’

পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি পাহাড়সম আশা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশির চৌধুরীর। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা লেখাপড়া করে যোগ্য মানুষ হইয়ো। কাজের প্রতি সৎ থেকো। দেশপ্রেমের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যেয়ো স্বাধীন দেশটাকে।’

মন্তব্য