kalerkantho

ভানুমতী

শাহ্‌নাজ মুন্নী

২৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ভানুমতী

অঙ্কন আতিক

ভোরবেলার ফোন মানেই আমাদের মতো রাত জেগে কাজ করা মানুষদের কাছে অসময়ের ফোন, আর অসময়ের ফোন মানে অশুভ ফোন, যা দুঃসংবাদ বয়ে আনে। আত্মীয়-পরিজনদের বলা আছে খুব জরুরি না হলে ভোরে ফোন না করার জন্য। সপ্তাহে তিন দিন রাত ২টা পর্যন্ত শেষ নিউজটা চালিয়ে এসে বিছানায় যেতে যেতেই তো ৩টা বাজে, সকাল ৬টা-৭টাকে ভোরের মতোই মনে হয় তখন। সহকর্মীরা অনেকে বলেন, ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখতে তো পারেন, যাতে ঘুমের ডিস্টার্ব না হয়। কিন্তু সব দিন সেটা করতে হয়তো মনে থাকে না। তা ছাড়া সাংবাদিকতাজগতে যখন প্রথম পা দিয়েছিলাম, তখন আমার শ্রদ্ধেয় বস কিংবা শিক্ষাগুরুই বলা যায়, তিনি বলেছিলেন, সাংবাদিকতা ২৪ ঘণ্টার পেশা। প্রকৃত সাংবাদিকের ফোন কখনো বন্ধ থাকে না। অবচেতনে সেই শিক্ষাটা হয়তো রয়েই গেছে।

প্রায় সময়ই দেখেছি, অসময়ের ফোন আসে কোনো ভয়াবহ বিপর্যয়ের খবর নিয়ে—হয়তো কোথাও ভয়ানক আগুন লেগেছে, নয়তো কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিকের জন্য এ সবই নিছক ঘটনা মাত্র তো নয়, তাকে এসব ঘটনায় সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিতে হয়। ফোনটা বাজছিল কানের কাছে নরম সুর তুলে। একবার ভাবলাম বাজে বাজুক, ধরব না। চোখের পাতা দুটো মনে হচ্ছিল একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া লেগে আছে, তবু কষ্ট করে বিছানার পাশের টেবিল হাতড়ে ফোনটা তুলে ঘুম-জড়ানো গলায় বললাম, হ্যালো। ওপাশ থেকে ভানু বেগমের গলা, ‘অ মা, ভালো আছ মা?’

ওফ্্! ভানু বেগম! কে তোমাকে বোঝাবে, কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে ভালো থাকা যায় না।

‘আমি যে তোমারে কইছিলাম মা, আমারে একটিবার দ্যাশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়া যাও, তো তুমি তো আমাক নিয়া গ্যালা না মা, রোগে-শোকে আমার বড় কষ্ট হতিছে গো মা, বড় অভাবে আছি, তোমার তো কত জানাশোনা, একটিবার আমাক তার সাথে দেখা করায়া দ্যাও না, মা...’

ভানু বেগম একটানা বলে যায়।

হুম্, আচ্ছা দেখি কী করা যায়। পরে কথা বলব, এখন রাখি।

বলে ফোনটা কেটে আবার ঘুমিয়ে পড়ি। ভানু বেগমের কথা আর আমার মনে থাকে না। বছর পাঁচেক আগে ভানু বেগমের সঙ্গে পাবনার এক গ্রামে আমার প্রথম দেখা হয়। তখন আমি একটা নামি টেলিভিশন চ্যানেলের স্পেশাল করেসপনডেন্ট। কোনো একটা স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে পাবনা গেছি। পাবনা শহরের ভেতর বয়ে চলা ইছামতী নদীর দুর্দশা নিয়ে একটা রিপোর্টের মালমসলা নিয়ে হোটেলে ফিরছি, আর পরদিন চলে যাওয়ার আগে অন্য কী করা যায়, তা নিয়ে ভাবছি। হঠাৎ করেই আমাদের জেলা প্রতিনিধি উত্পল কথায় কথায় বলল, ‘পাশের গ্রামে একজন মহিলা মুক্তিযোদ্ধা আছে, যাবেন ওর কাছে?’

কিছুদিন আগেই এক সেমিনার কাভার করতে গিয়ে শুনেছিলাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও তাদের সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করেছিল। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীর অবদান সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। নারীর ভূমিকা কেবল ‘নির্যাতিত’ ও ‘ধর্ষণের শিকার’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। যে কারণে খেতাবপ্রাপ্ত ৬৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে মাত্র দুজন নারী বীরপ্রতীক রয়েছে। আরেকটা বিষয়ও সেই সেমিনারেই বলা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নারীকে মূল ধারায় না আনার একটি কারণ হচ্ছে, এই যুদ্ধে ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিল নিম্নবর্গের দরিদ্র নারীরা।

কথাগুলো খুব নাড়া দিয়েছিল আমার মনে। উত্পলের কথা শুনে তাই কৌতূহলী হয়ে উঠলাম।

বললাম, চলেন যাই।

পরদিন উত্পল আমাকে নিয়ে গেল ভানু বেগমের গ্রামে। একে-তাকে জিজ্ঞেস করে শেষ পর্যন্ত পৌঁছতে পারলাম ভানু বেগমের জীর্ণ কুটিরে। কিন্তু পৌঁছে দেখি, ভানু বেগম বাড়িতে নেই। গ্রামেরই কয়েকটা ছোট্ট ছেলে-মেয়েকে পাঠানো হলো ভানুকে খুঁজে আনতে। মিনিট দশেক পরে এক বস্তা গাছের ভাঙা ডালপালা আর শুকনো পাতা নিয়ে বাড়ির উঠানে পা রাখল ভানু। বয়স হয়েছে তার, শ্যামলা চেহারায় অপুষ্টি ও দারিদ্র্যের ছাপ, তবু তার মুখশ্রীতে বেশ একটা প্রতিমামূর্তির আদল খুঁজে পেলাম আমি।

উত্পল বলল, ‘এই যে, ঢাকা থেকে আসছেন উনি, তোমার কাছ থেকে যুদ্ধের কথা শুনবেন।’

ভানু ঘর থেকে একটা নড়বড়ে চেয়ার এনে দিল উঠানে।

‘অ মা, বসেন। বলেন কী জানিবার চান।’

‘যুদ্ধের সময়কার গল্পটা বলেন।’

ভানু বেগম একটু দম নেয়। কী যেন ভাবে। তারপর বলে, “যুদ্ধের সময় তো আমার নাম ছেল শ্রীমতী ভানুমতী সরকার। হিন্দুর ঘরের বউ ছিলাম। তবে বিধবা হইছিলাম গো অল্প বয়সেই, বাপ-মাও ছিল গরিব, তাই গেরামের যারা একটু অবস্থাপন্ন, তাগো বাড়িতে কাজকম্ম কইরে খেতাম। তো, যখন কিনা যুদ্ধ লাগল, কত মানুষজন পালায়ে ইন্ডিয়া চইলে গেল। আমি আর কই যাব? গেরামেই রয়ে গেলাম। যে বাড়িতে ফাইফরমাইশ খাটতাম, সেই বাড়ির কর্তারে ডাকতাম কাকামণি বইলে। কাকামণির ছেলে হইল অসিত কুমার দাশ। আমি ডাকি অসিতদা বইলে। তো, যুদ্ধ লাগার পর কাকামণি কাকিমা আর তাগো জোয়ান দুই মেয়ে সাবিত্রী আর কুমকুমকে নে ইন্ডিয়া চইলে গেলেন। আমারেও যাতি বলেছিলেন, তো আমার বুড়ো মা তখনো বাঁইচে আছেন, তারে রেখে যাই কেমনে? আমি গেরামেই খেয়ে না খেয়ে থেইকে গেলাম। যুদ্ধের মইদ্যে একদিন অসিত দাদা আমারে ক’ল, ‘ও ভানু, আটঘরিয়ার দিকে একটা ক্যাম্প হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাগোর, ওদের খাবারদাবারের বড় কষ্ট, তুই একটু রেঁধেবেড়ে দিতে পারবি?’

তা আমি ক’লাম, পারব না কেনে? বসেই তো আছি সারা বেলা। অসিতদার সাথে গেলাম আটঘরিয়ায়, গে দেখি, ওখানে ২০-২৫ জন মানুষ। আমাগের গেরামের শাহাবুদ্দিন ভাইরেও চিনলাম। আরো অচেনা মানুষজনও ছিল। তাগো দুই বেলা গিয়ে ভাত রান্না কইরে দিই, সাথে খানিক আলু ভর্তা বা পাতলা ডাইল। মাঝেসাজে গেরস্তবাড়ির কেউ একটা-দুটো মুরগি দে যায়, মসলাপাতি তেমন থাকে না, পাতলা ঝোল করি। আর চুপচাপ এক কোনায় বইসে বইসে যুদ্ধের গল্প শুনি। ঈশ্বরদী-বেড়া-সাঁথিয়া-সুজানগর-চাটমোহরে কত অত্যাচার করতিছে পাঞ্জাবিরা; মানুষজন মারতিছে, মেয়ামানষির ইজ্জত নিয়ে যাচ্ছে। শুনি আর গায়ে কাঁটা দিয়া উঠে। মাজাট গেরামে আটজন, রতনপুরে তিনজন মানুষরে নাকি লাইন ধইরে দাঁড়া করায়া গুলি কইরে মাইরে ফ্যালাইছে। এর মইদ্যে একদিন দেখি ক্যাম্পে খুব আলোচনা, কমান্ডার সাবও খুব চিন্তিত। রান্নার ফাঁকে কান উঁচা কইরে রাখি, ব্যাপারটা বোঝার জন্যি। তাদের আলাপসালাপে ঠিক পাই, একটা ঝামেলা হইছে। ঝামেলাটা হইল, মুক্তিরা অপারেশনে যাবে বলে ঠিক করেছে, কিন্তু সমস্যা হলো, বন্দুকের গুলি তারা লুকায়ে রাখছে কাকামণিদের বাড়ির গোয়ালঘরে। এখন ওই বাড়ি থেকে গুলি নিয়ে আসলেই হয়, কিন্তু যে পথ দিয়ে আনতে যাবে, সেই পথেই আছে রাজাকারের ঘাঁটি। গুলি আনতে গেলেই রাজাকাররা ধইরে ফেলবে। তাগো চোখ ফাঁকি দিয়া কে ওই গুলি নিয়া আসতে পারবে, তাই নিয়াই কথাবার্তা হচ্ছে।”

যেতে চাচ্ছে অনেকেই, কিন্তু কমান্ডার তো ঝুঁকি নিতে রাজি না। রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লে বেঘোরে প্রাণটা তো যাবেই, অপারেশনের পরিকল্পনাটাও মাঠে মারা যাবে। তারা বলাবলি করছে, এমন একজনকে পাঠাতে হবে, যাকে রাজাকাররা দেখলেও সন্দেহ করবে না। কিন্তু কে আছে সেই রকম?

ভানুমতীর ততক্ষণে ভাত রান্না শেষ হয়েছে। সে কমান্ডারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বলে, ‘বেআদবি না নিলে একটা কতা বলতি চাই, দাদা।’

কমান্ডার ভ্রু কুঁচকে তাকায়, হয়তো একটু বিরক্তই হয়। ভানুমতী আবার বলে—

‘আপনি অনুমতি দিলে আমি গে গুলিগুলান নে আসতে পারি, আমাক কেউ সন্দেহ করবি না গো। শাড়ির আঁচলের ভেতর লুকায়ে নিয়ে আসব।’

কমান্ডারকে প্রথমে একটু বিভ্রান্ত দেখায়। হয়তো সে ভাবে, এই নারী কি পারবে?

‘গুলি কিন্তু বেশ ভারী। বয়ে আনতে পারবে তো? ধরা পড়লে?’

‘ধরা পড়ব না। যত ভারীই হোক, এনে দিতে পারব, দরকার পড়লে মাথায় করে আনব।’

‘কী বলে মাথায় করে আনবে?’

‘না, দাদা, খড়ির বস্তায় লুকায়ে নিয়ে আসব।’

‘এক কাজ করো, একবারে না এনে কয়েকবারে অল্প অল্প করে আনো। বুঝতে পারিছো?’

কমান্ডার বুদ্ধি দেয়। ভানুমতী মাথা নাড়ায়। ‘ঠিকাছে দাদা, তা-ই আনব।’

পরদিন সকালবেলা। ক্যাম্পের এক মুক্তিযোদ্ধা ছোকরা বলে, ‘দিদি, আজ তাহলি তোমার ফাস্ট অপারেশন...’

ভানু আর মুখে কিছু না বলে ঠাকুরের নাম জপ করতে করতে সোজা চলে যায় অসিত কুমারের বাড়ির গোয়ালঘরে। বাড়িটা কিছুদিন আগে পাকিস্তানিরা জ্বালিয়ে দিয়েছে। পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া বাড়িটা ভূতের মতো একা দাঁড়িয়ে আছে। আহা, একি অবস্থা! সোনার লঙ্কা পুড়িয়ে একেবারে শ্মশান বানায়া ফেলছে! তবে পুড়লেও এ বাড়ির সবই চেনা ভানুমতীর, সে চুপচাপ আধপোড়া গোয়ালঘরের পেছনে চলে যায়। সেখানেই মোটা চটের বস্তায় ধানের তুষের মধ্যে ছোট্ট পুঁটলিতে বুলেটগুলো লুকানো। ভানু তুষের মধ্যে হাতড়ে গুলির পুঁটলিটা বের করে আনে। আসলেও অনেক ওজন। একসঙ্গে সব নেওয়া যাবে না। ভানুমতী সঙ্গে করে একটা খালি বস্তা নিয়ে এসেছিল, তার তলায় গুলির পুঁটলিটা চালান দিয়ে ওপরে কয়েকটা ঘরপোড়া কাঠ ঢুকিয়ে বস্তাটা মাথায় তুলে হনহন করে বেরিয়ে এলো।

অর্ধেক পথ ভালোই গেল, গ্রামজুড়ে তো জনমনিষ্যি নাই, সবই সুনসান, নীরব। হঠাৎই পথের মধ্যে এক মাঝবয়সী লোক পথ আটকে দাঁড়াল তার, ‘এই বেটি, তুই কে রে? কই যাস? মাথার মধ্যে কী?’

ভানুমতী একটু থমকে যায় প্রথমে, তারপর বলে, ‘আমি ভানু, বেইরেছিলাম ওই রানবার জন্য কাঠ টোকাতে, পোড়া ভিটায় কিছু কাঠ পেলাম, তাই নে বাড়ি যাচ্ছি...’

‘কোন বাড়ি?’ লোকটা জিজ্ঞেস করে।

‘ওই ইমাম সাবের বাড়ির পেছনে থাকি...’

লোকটার সন্দেহ তবু কাটে না। সে বলে, ‘বস্তা নামা, বস্তায় কী আছে দেখব?’

ভানু এবার একটু ঘাবড়ে যায়। লোকটা তখন ঝটকা মেরে ভানুর মাথা থেকে বস্তাটা মাটিতে ফেলে দেয়, পোড়া কাঠের কোনা লেগে কপাল কেটে রক্ত বেরিয়ে যায় ভানুর। পড়ে যাওয়া বস্তা থেকে পোড়া কাঠের কয়েকটা টুকরা বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পথে। ভানুর মাথার রক্ত দেখে লোকটার মন হয়তো একটু নরম হয় আর ছড়ানো-ছিটানো পোড়া কাঠগুলো দেখে বোধ হয় এবার ভানুর কথা বিশ্বাসও হয় তার। সে চলে যেতে বলে, ‘জোয়ান মেয়াছেলে, পোড়া কয়টা কাঠের জন্যি বাড়ির বাইরে ঘুরাঘুরি করিস না। যা, তাড়াতাড়ি বাড়ি যা। পাঞ্জাবিরা ধরলে পরে জান-ইজ্জত কিছুই থাকবে নানে।’

ভানুর বুকে এবার যেন প্রাণ ফিরে আসে। তাড়াতাড়ি কাঠের টুকরাগুলো টুকিয়ে বস্তায় ভরে সে আবার মাথায় তুলে নেয়। বাকি পথটুকু আর কোনো সমস্যা হয় না। ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধারা উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল ভানুর, দূর থেকে তাকে ফিরতে দেখে হৈহৈ করে উঠল তারা। কোনো রকমে মাথা থেকে বস্তাটা নামিয়ে ধপাস করে মাটিতেই বসে পড়ে ভানুমতী। কম পথ তো নয়, চার-পাঁচ মাইল তো হবেই, একে তো মাথায় বোঝা নিয়ে চলার পরিশ্রম, তার ওপর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়, টেনশন—সব মিলিয়ে ভানুর অবস্থা তখন বিপর্যস্ত। ধপ করে ভানু বসে পড়ার পরই সবার চোখ গেল তার কপাল ভেসে যাওয়া রক্তের দিকে। একটা কম বয়সী ছাত্র ছিল ক্যাম্পে, সে কাটা জায়গাটা পানি দিয়ে ধুয়ে কয়েকটা দূর্বাঘাস দুই হাতে পিষে কপালে লাগিয়ে দিল।

‘এই যে মা দেখো, হাত দিয়ে ধইরে দেখো’—কপালের চুলগুলো সরিয়ে আমাকে দেখাল ভানুমতী, ‘এই যে এখনো কপালে সেই কাটার দাগ আছে।’

‘তারপর কী হলো? ওই বুলেট দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা অপারেশন করতে পেরেছিল?’

‘সে কি আর বলতে? পরদিনই অপারেশন হইল, বেশ বড় একটা যুদ্ধ হইছিল, পাকিস্তানি সেনাগো সাত-আটজন মারা পড়ছিল শুনছি, এরচে বেশি আর জানিনে...’

এর পরের ইতিহাস করুণ। যুদ্ধ শেষে ভানুমতীর মা মারা গেলেন। ভানুকে বিয়ের প্রস্তাব দিল তাদের গ্রামেরই এক বিপত্নীক মুসলমান কৃষক আব্দুল মান্নান। ভানুমতী ধর্ম পরিবর্তন করে ভানু বেগম হয়ে মান্নানের সংসার করতে থাকল। তিন মেয়ে, দুই ছেলের জন্ম হলো সেই সংসারে। একসময় মান্নানও মারা গেল। সংসার, ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভানুর জীবনযুদ্ধ চলতেই থাকল।

মুক্তিযুদ্ধের যে গল্প ভানু বেগম শোনাল সেটা কতটুকু সত্য, জানতে আমি এলাকার মুক্তিযোদ্ধা সংসদে খোঁজ নিতে গেলাম। সেখানে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান মাথা চুলকে ভেবেটেবে বলল, ‘হ্যাঁ, ভানুমতী যুদ্ধের সময় ক্যাম্পে আমাগের রান্নাবান্না কইরে দিত বটে।’

‘মাথায় করে বুলেট এনে দেয়নি?’

‘হুম্, একবার, হ্যাঁ, মনে পড়িছে, ওই বুলেট আনতে মুক্তিযোদ্ধারা যাতি পারতেছিল না, পরে ভানু লুকায়ে গিয়ে বুলেটগুলা আইনে দিছিল।’

‘তাহলে ভানু তো মুক্তিযোদ্ধা, ওর নাম তালিকায় নেই কেন?’

‘মুক্তিযোদ্ধা? এটুক করে মুক্তিযোদ্ধা?’

‘কেন? যে কাজটা অন্যরা পারেনি, সেটাই তো ভানু করেছিল। তাহলে সে কেন মুক্তিযোদ্ধা নয়?’

‘না, আসলে কোনো মেয়েছেলের নাম তো মুক্তিযোদ্ধার নামের তালিকায় নাই। তাই আমরা আর ওর নাম তুলিনি।’

‘কিন্তু সেটা তো ঠিক না। ভানুর নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রাখা দরকার ছিল। আপনারা এটা ঠিক করেননি।’

ভানু বেগম সঙ্গেই ছিল। সে বলল, ‘ও মা, মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম উটল কি না উটল সেটা নিয়া আমি ভাবি না, তুমি একবার শুধু আমারে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করায়ে দ্যাও দিনি। তার কাছে আমার যুদ্ধের সময়কার কথা বলার খুব ইচ্ছা।’

ওকে মুখে মুখে শুকনো আশ্বাস দিয়ে সেদিনই পাবনা থেকে ঢাকায় ফিরে এসেছিলাম আমি। একটা রিপোর্টও করেছিলাম ভানুমতীকে নিয়ে। উত্পল জানিয়েছিল, এই রিপোর্ট প্রচারিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসক ভানু বেগমের বাড়িতে গিয়েছিলেন। বিজয় দিবসে তাঁকে জেলা পরিষদের সম্মেলনকক্ষে নিয়ে গিয়ে বিশেষ সম্মাননাও দেওয়া হয়েছিল।

তার পরও ভানুমতী বছরে দু-একবার আমাকে এই রকম ভোরবেলা অসময়ে ফোন করে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে অনুরোধ করে। আমি বিরক্ত হই। কিন্তু সেই বিরক্তি মুখে প্রকাশ না করে ফোনটা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়ি।



মন্তব্য