kalerkantho

পসন্নবালা

হরিশংকর জলদাস

২৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



পসন্নবালা

অঙ্কন : মানব

ওই যে বুড়িটাকে দেখছেন, ওর নাম পসন্নবালা।

-পসন্নবালা!

-ঠিক তা না। ওর নাম আসলে প্রসন্নবালা জলদাসী।

-তো আপনি পসন্নবালা বললেন যে?

-মানুষের মুখে মুখে এ রকম হয়ে গেছে। একটা নাম মানুষের মুখে মুখে অদ্ভুত চেহারা নেয়—যুধিষ্ঠির হয়ে যায় জুষ্টি, জোনাব আলী হয়ে যায় জোয়ালী।

-তো!

-সেই বিকৃতির কলে পড়ে একদার প্রসন্নবালা আজ পসন্নবালা।

-ও। তা এই অপরবেলায় এই নির্জন সমুদ্রপারে একা একা সে কী করছে? বয়সও তার কম নয়। দেখে তো মনে হচ্ছে আশি পেরিয়ে গেছে। মাথায় একবোঝা পাকা চুল। এলোমেলো। উকুনও আছে বলে মনে হচ্ছে। দাঁতটাও আছে কি না কাছে গেলে বোঝা যাবে।

-ওই বুড়ি সম্পর্কে আপনার বেশ তো কৌতূহল দেখছি। আপনি ঠিকই বলছেন—পসন্নবালার শরীরের জীর্ণদশা। খড়ি ওঠা চামড়া। দাঁত পড়ে গেছে অনেক আগে। কাছে গেলে দেখবেন—তার দুচোখভরা পিচুটি। মেরুদণ্ডটা বেঁকে গেছে। তার পরনে ওই যে কাপড়টা দেখছেন, তা কদিন  আগে ধুয়েছে কে জানে! রং চটে গিয়ে এমন যে হয়ে গেছে, তা শাড়ি, না ধুতি বোঝার উপায় নেই।

-বয়স?

-আপনি ঠিকই ধরছেন—বয়স তার কমবেশি আশি-বিরাশি হবে। বাবার মুখে শুনেছি—একাত্তরের যুদ্ধের সময় পসন্নবালার বয়স চৌত্রিশ-তেত্রিশ ছিল। আর হ্যাঁ, ওই সময় উনিশ-কুড়ির তার একটা ছেলেও ছিল।

-ছিল বলছেন কেন? এখন কি ছেলেটি নেই?

-না। চিন্তাহরি এখন নেই। যুদ্ধের সময় মারা গেছে। চিন্তাহরিকে মেরে ফেলা হয়েছে ডিসেম্বরের ৭ তারিখে।

-মেরে ফেলা হয়েছে। কে মারল চিন্তাহরিকে! ও বুঝি প্রসন্নবালার একমাত্র সন্তান ছিল?

-শুধু সন্তান নয়, পসন্নবালার স্বামীও ছিল—জগবন্ধু। স্বামী-স্ত্রী মিলে বড় আহ্লাদ করে চিন্তাহরিকে বিয়েও করিয়েছিল যুদ্ধের আগে আগে।

-কারা মারল চিন্তাহরিকে? জগবন্ধু বেঁচে আছে তো? বউটির কী হলো?

-পসন্নবালা সম্পর্কে জানার দেখি আপনার প্রবল আগ্রহ?

-তা তো বটেই। এই প্রসন্নবালা, এই নির্জন সমুদ্রকূলের বেড়িবাঁধে উপুড় হয়ে মাটি খোঁড়া, মুক্তিযুদ্ধ, জগবন্ধু, চিন্তাহরির মৃত্যু—এসব মিলেমিশে আমার ভেতরে তোলপাড় হচ্ছে মশাই। শুধু আমি নই, যেকোনো মানুষ এসব শুনলে অবশ্যই আগ্রহী হয়ে উঠবে। আপনি বলুন না, কী হয়েছিল?

-আপনি বীরাঙ্গনাদের খোঁজে এসেছেন না?

-হ্যাঁ, তা তো ঠিক। বাংলাদেশের নানা গ্রামগঞ্জ ঘুরে ঘুরে আমি বীরাঙ্গনাদের একটা পঞ্জিকা তৈরি করছি। কোন গ্রামে তাঁরা কতজন ছিলেন, লাঞ্ছনার ধরন, সমাজে তাঁদের অবস্থান—এসব নিয়ে আমি আমার মতো করে কাজ শুরু করে দিয়েছি। আমারও বয়স কম হয়নি। জানি না আমি এ কাজ শেষ করে যেতে পারব কি না?

-না পারলেও ক্ষতি নেই। শুরু তো করলেন। আপনার দেখানো পথ ধরে আরেকজন এগিয়ে আসবেন। এ ধরনের কাজগুলো কাউকে না কাউকে শুরু করতে হয়। শুরু করেছেন যখন, শেষও হবে একদিন। এ জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলার দরকার নেই।

-আচ্ছা, কথা বলছিলাম প্রসন্নবালাকে নিয়ে, মাঝখানে হঠাৎ বীরাঙ্গনার কথা পাড়লেন কেন?

-কারণ তো একটা আছেই।

-কী কারণ?

-পসন্নবালা একজন বীরাঙ্গনা। আপনার তালিকায় একজন বীরাঙ্গনা বাড়বে। এই কালীপুর গাঁয়ের পসন্নবালার নামটি আপনার পঞ্জিকায় যুক্ত হবে। গোটা দেশের মানুষ জানতে পারবে পসন্নবালা জলদাসী নামের একজনের সম্ভ্রমও বিসর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য। অনেক কঠিন কঠিন শব্দ বললাম, কিছু মনে করবেন না। মনে অনেক আবেগ জমা হয়ে গিয়েছিল। আপনাকে পেয়ে উগরে দিলাম।

-আসলে কী হয়েছিল—খুলে বলবেন?

-আমার বয়স তখন দশ কি বারো। যুদ্ধ, স্বাধীনতা, রাজাকার, পাকিস্তানি সেনা, মুক্তিযোদ্ধা, ধর্ষণ, খুন—এসব বোঝার বয়স হয়নি তখন আমার। শুধু বুঝেছিলাম—দেশে কোনো একটা প্রবল ঢেউ এসে লেগেছে। সেই ঢেউয়ের তোড়ে সব কিছু ভেসে যাচ্ছে, সব কিছু তছনছ হতে শুরু করেছে। বিদঘুটে পোশাক পরে দলে দলে সেনারা গাঁটি ঘিরে অবস্থান নিয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ওই বেড়িবাঁধে ঘাঁটি গেড়েছে। আপনাকে যা বলব, তা সব আমার স্মৃতিতে ধরা নেই। কিন্তু আমার বাপ রামকানাই জলদাস দিনের পর দিন, বছরের পর বছর যুদ্ধের কথাগুলো, যুদ্ধকে ঘিরে এই জেলেপাড়ার মানুষদের জীবনের আখ্যানগুলো বারবার আমাকে বলে গেছে।

-তো!

-সেই জন্য আপনাকে যা বলব, তাতে কোনো মিথ্যে নেই। আমার বাপের চোখে দেখা ঘটনাগুলোই শুধু আমি আমার মুখ দিয়ে বলে যাব।

-আমি এই কালীপুর গাঁয়ে ঘটে যাওয়া সমস্ত যুদ্ধকালীন ঘটনা জানতে চাই।

-গোটা কালীপুরের ঘটনা তো আপনাকে বলতে পারব না। শুনতে চাইলে এই জেলেপাড়ার কাহিনিটুকু আপনাকে বলতে পারি। হ্যাঁ, জেলেপাড়ার সব কাহিনিও আপনাকে বলা যাবে না। কারণ সময়ের অভাব। আপনি পরিচয়ের প্রথম দিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ঢাকা থেকে আপনি বীরাঙ্গনা নামের মৃত্যুঞ্জয়দের খোঁজে এসেছেন। এবং আজকের রাতের ট্রেনেই আপনি ফিরে যাবেন। সূর্য পশ্চিমে গড়িয়ে গেছে। হাতে তেমন সময় নেই। তাই শুধু পসন্নবালার কথাটুকুই বলি।

-তা-ই বলুন।

 

দুই.

-জগবন্ধুর বাপ ছিল ম্যারা ধরনের। গায়ে-গতরে বল ছিল না তেমন। বউ-ই গাঁয়ের পাড়ায় পাড়ায় মাছ বেচে সংসার চালাত। এই ভাঙাচোরা সংসারে জৈবিক কারণে জগবন্ধু এলো। জগবন্ধুকে বড় ভালোবাসত তার বাপ। মা তো অন্ন জোগাড়ে ব্যস্ত থাকত। বাপই জগবন্ধুকে খাওয়ানো-নাওয়ানোর কাজগুলো করত।

-তাদের ঘরে আর কোনো সন্তান আসেনি।

-জেলেদের ঘরে অধিক সন্তানই তো আসার নিয়ম। কিন্তু ঘটনা এটা যে জগবন্ধুর আর কোনো ভাই-বোন হলো না।

-তারপর?

-তারপর জগবন্ধু ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠল। অন্যজনের নৌকায় মাছ ধরতে যাওয়া শুরু করল। তাদের কোনো নাও-জাল ছিল না। কামলাগিরিই করত জগবন্ধু অন্য বহদ্দারের নৌকায়।

-নৌকা-জালের মালিক হওয়া কঠিন বুঝি?

-নৌকা-জাল করতে তো টাকা লাগে। ওই পরিমাণ টাকা সাধারণ জেলেদের হাতে আসবে কী করে! বেশির ভাগই দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ।

-জগবন্ধুর বাপও....।

-ঠিক ধরেছেন, জগবন্ধুর বাপের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসার। তো এই রকম একটা কঠিন সংসারে একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল জগবন্ধুর মা আর বাপে মিলে।

-কী ঘটনা?

-জগন্ধুর বয়স ষোল পেরোতে না পেরোতেই বিয়ে করিয়ে দিল।

-এত কম বয়সে!

-কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার আর বিয়ে করানোর রেওয়াজ যে জেলেসমাজে আছে।

-তারপর!

-পসন্নবালা জগবন্ধুর বউ হয়ে এই কালীপুরে এলো। তেরো-চৌদ্দ বছরের চটপটে একটা মেয়ে। ওই বয়সেই মেয়েটি সংসারের হাল-হকিকত বুঝে গেল।

-বুঝে গেল?

-বুঝবে না, গরিব ঘরের মেয়ে যে!  এই সব অভাব-অনটন, এক-দুবেলা উপোস থাকা ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে পসন্নাবালা।

-তো!

-তাই অভাবের ঘরে খাপ খাইয়ে নিতে বেগ পেতে হলো না পসন্নবালাকে। জগবন্ধু আদরে-সোহাগে পসন্নবালাকে ভরিয়ে রাখল। তাতেই খুশি পসন্নবালা।

-এরপর!

-সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। দিন গেল, মাস গেল, বছরও গেল। এরপর বছরের পর বছর গড়াল। একদিন টুপ করে...।

-টুপ করে! টুপ করে কী!

-ভেদবমি হয়েছিল জগবন্ধুর। সে রাতে খুব ভালো খাবার রাঁধা হয়নি। কলমি শাক আর খেসারির ডাল। মোটা চালের ভাত। খেতে খেতে একটু রাতও হয়ে গিয়েছিল। শেষ রাতের দিকে বমি-পায়খানা শুরু হয়েছিল জগবন্ধুর। রাত পোহানোর আগেই শেষ। এরপর...।

-একটু আগেই তো বলেছেন, জগবন্ধুর ছেলে ছিল—চিন্তাহরি। তাকে বিয়ে করানো হয়েছিল।

-ঠিকই বলেছি। চিন্তাহরি তখন তরুণ। ঘরে বউ—সোহাগি।

-পসন্নবালার কী হলো?

-কিছুই হয়নি। স্বামীর মরণকে কপালের লেখা বলে মেনে নিল। মনমরা হয়ে থাকল বেশ কিছুদিন। তারপর গা ঝাড়া দিল। ছেলের সংসারকে আঁকড়ে ধরল। শাশুড়ির মতো পাড়ায় পাড়ায় মাছ বিক্রি করতে চাইল। চিন্তাহরি বলল, মা, আমি কি মরে গেছি? পসন্নবালা বলল, অভাব যে! চিন্তাহরি বলল, তিনটা মাত্র মুখ, মা। ঈশ্বরের আশীর্বাদে চলে যাবে। যাচ্ছিলও তাই।

-পরে কি আর যাচ্ছিল না? অভাব ঢুকেছিল ঘরে?

-যাচ্ছিল। ঘরে অভাব নয়, ত্রাস ঢুকেছিল। শুধু চিন্তাহরির ঘরে নয়, গোটা জেলেপাড়ায়, গোটা গাঁয়ে, গোটা দেশে ত্রাস-সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়েছিল।

-মানে!

-৭ই মার্চ এসেছিল। হুংকার উঠেছিল—এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। ২৫শে মার্চের কালরাতের পর বাঙালির হাতে অস্ত্র উঠেছিল। মুক্তিসেনা, মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, ত্রাস, খুন-ধর্ষণ, রাজাহানি, লুণ্ঠন...।

-কী ব্যাপার, চুপ করে গেলেন যে!

-আর বলতে ইচ্ছা করছে না।

-সে কী! শেষ করবেন না। চিন্তাহরি, প্রসন্নবালা, তার সোহাগি বউটি! গোটা জেলেপাড়াটিরই বা কী হলো? ভাই, মাথা নিচু করে থাকবেন না। এ কী, আপনি কাঁদছেন কেন!

-একটু কাঁদতে দিন আমায়। চিন্তাহরি, পসন্নবালা—এদের কথা শেষ পর্যন্ত শুনলে আপনিও না-কেঁদে পারবেন না।

-আমি একটু কাঁদতে চাই, ভাই। এত দিন কত গাঁয়ে-গঞ্জে গেলাম, কতজনের দুঃখকথা শুনলাম; কিন্তু প্রসন্নবালার মতো একজন জলদাসীর জীবনকথা শুনিনি আগে।

-পাকিস্তানি সেনারা গোটা জেলেপাড়া বেড় দিয়ে পরিখা খুঁড়ল। রাজাকাররা বুঝিয়েছে—এরা মালাউন, ইন্ডিয়ার চেলা। বিপদ যদি আসে, তাহলে এই পাড়া থেকেই আসবে।

-কেন, কালীপুরে কি বর্ণহিন্দুপাড়া ছিল না?

-ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা গাঁ ছেড়ে চলে গেছে।

-জেলেরা গেল না কেন?

-দুটি কারণে যায়নি। প্রথমত তারা ভেবেছে—জেলে মানুষ তারা। তারা কোনো রাজনীতি-ধর্মঘটে নেই। তাদের কেউ কিছু করবে না। আর যাওয়ার জন্য তাদের কোনো জায়গাও ছিল না।

-না পালিয়ে কি তারা ভালো করেছে?

-না, মোটেই না। ভুল করেছে তারা। শেষ পর্যন্ত ভুলের মাসুলও গুনতে হয়েছে তাদের।

-কী রকম!

-জেলেপাড়াটিকে ঘিরে আস্তানা গাড়ল পাকুরা। পাড়ার পশ্চিম দিকে সমুদ্র। জলহামলা এলে ওদিক থেকেই আসবে ভেবে পশ্চিমের বেড়িবাঁধে কড়া পাহারা বসাল হানাদাররা।

-জেলেদের কী অবস্থা হলো? সমুদ্রে মাছ মেরেই তো তাদের সংসার...।

-ঠিকই বলেছেন। জাল নিয়ে জলে নামতে না পারলে জেলেদের জীবন চলবে কী করে! সেই সুযোগটাই নিয়েছিল পাকুরা। জল অচল করে দিল পাকুরা। তারা যে বিষয়টা ভালো করে জানত, এমন নয়; কিন্তু সহযোগী রাজাকার-আলশামসরা বুঝিয়ে দিল—মালাউনদের হাতে না মেরে ভাতে মারার একমাত্র পথ হলো মাছ মারা থেকে তাদের বিরত রাখা।

-পাকুরা শুনল রাজাকারদের পরামর্শ।

-বললাম তো জেলেদের সমুদ্রে যাওয়ার পথটি একেবারেই রুদ্ধ করে দিল পাকিস্তানি হানাদাররা।

-জেলেদের খাওয়াদাওয়া! তাদের জীবন!

-মাছ ধরতে না পেরে হাহাকার শুরু হলো জেলেপাড়ায়।

প্রথমে ধারধুর করে চলল দু-এক দিন। তারপর উপোস দিতে শুরু করল। কান্না, হাহাকার, আর্তনাদ। এক ভোররাতে দুঃসাহসিক কাজ করে বসল চিন্তাহরি।

-কী দুঃসাহসিক কাজ?

-আগের বেলা রান্না হয়নি ঘরে। তার আগের বেলা শুধু শাক খেয়েছে। মা আর বউয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না চিন্তাহরি। সে রাতেই ঠিক করেছিল—ভোরে সমুদ্রে হুরিজাল বাইতে যাবে। যা ভাবল, তা-ই করল চিন্তাহরি। ভোরের দিকে জাল-দুইজ্যা নিয়ে চুপি চুপি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। পাকুরা বোধ হয় গোটা রাতের পাহারায় ক্লান্তি নিয়ে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

-তাই চিন্তাহরি সমুদ্রে গিয়ে নামতে পেরেছিল।

-ঠিক ধরেছেন আপনি। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল ফেরার সময়। ফেরার সময় পাকুদের হাতে ধরা পড়ে গেল চিন্তাহরি!

-ধরা পড়ে গেল!

-কোনো বাছবিচার করল না হায়েনারা। কোনো কিছু জিজ্ঞেসও করল না চিন্তাহরিকে। সরাসরি গুলি চালাল।

-তা-র-পর!!

-খুলি উড়ে গিয়েছিল চিন্তাহরির। খবর পেয়ে আথালিপাথলি দৌড়ে গিয়েছিল পসন্নবালা। দেখেছিল—চিন্তাহরির দেহটা চিৎ হয়ে পড়ে আছে। মাছভর্তি দুইজ্যাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ছেলের বুকের ওপর আছড়ে পড়েছিল পসন্নবালা। কতক্ষণ বেহুঁশ হয়ে ছিল জানে না পসন্নবালা। হুঁশ এলো যখন দুজন পাকু টেনেহিঁচড়ে চিন্তাহরির দেহটা একটা গর্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। পাকুরা একটা গর্ত খুঁড়ে ফেলেছিল। চায়নি ডেড বডিটা মছলিখোরদের হাতে যাক। তাই তারা মাটিচাপা দিয়েছিল চিন্তাহরির দেহটাকে।

-তারপর।

-পসন্নবালার দেহ থেকে তখনো যৌবন বিদায় নেয়নি।

-কী বলতে চাইছেন আপনি?

-সেই সকালে উপর্যুপরি পসন্নবালাকে ধর্ষণ করেছিল হানাদাররা। চেতনা হারিয়েছিল পসন্নবালা। একটা সময়ে চেতনা ফিরলে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিল পসন্নবালা। ঘটনা কী জানেন? একটা অদ্ভুত ঘটনা।

-এত বড় ঘটনার পর আবার কী ঘটনা বাকি আছে?

-আছে। ঘটনা বাকি আছে।

-কী রকম!

-চলতে শুরু করার আগে মাছভর্তি দুইজ্যাটা কাঁধে তুলে নিয়েছিল পসন্নবালা।

-কেন?

-গত দুই বেলা যে ওরা ভাত খায়নি। এই মাছ বিক্রি করে সামনের কয় বেলা যে খেতে পাবে পসন্নবালা আর চিন্তাহরির বউটি।

-ওই মাছে যে চিন্তাহরির রক্ত লেগেছিল!

-পুকুরের জলে রক্তমাখা মাছগুলো ধুয়ে নিয়েছিল পসন্নবালা।

-ওহ্ গড! এমনও হয়!

-হয়। বেঁচে থাকা বলে কথা। ক্ষুধা যে কী, ভুক্তভোগী ছাড়া বোঝে না।

 

তিন.

-প্রসন্নবালা এই এত বছর পরে বেড়িবাঁধের ওই জায়গাটিতে কী করছে?

-এরপর একেবারেই বোবা হয়ে গেছে পসন্নবালা। দিন গেছে, রাত গেছে, বছর গিয়ে গিয়ে সাতচল্লিশ বছর। এই সাতচল্লিশটি বছর কারো সঙ্গে একটি বাক্যও বলেনি পসন্নবালা। শেষের দিকে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। যত্ন না নিয়ে না নিয়ে তার শরীরের এই হাল।

-বেড়িবাঁধে কী করছে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

-ও হ্যাঁ, বলছি। তার আগে বলুন আজ কত তারিখ?

-ডিসেম্বরের ৭।

-এই তারিখে খুব ভোরে পসন্নবালা ওই জায়গাটিতে চলে আসে। গোটাটা দিন পড়ে থাকে ওখানে। কাঁদে। দশটি আঙুল দিয়ে ওইখানটার মাটি খামচাতে থাকে পসন্নবালা।

-কেন?

-ওইখানটায় যে তার ছেলেকে মাটিচাপা দিয়েছিল হানাদাররা।



মন্তব্য