kalerkantho


দূরে যাওয়ার গল্প

সামনেই ভালোবাসা দিবস। ভালোবাসার গল্প শুধু কাছে আসার নয়, দূরে যাওয়ারও। সেই রকম দুটি ‘দূরে যাওয়ার গল্প’ নিয়ে হাজির হয়েছেন এই বিষয়ে বহুল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মো. সাখাওয়াত হোসেন

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০




দূরে যাওয়ার গল্প

১. রাহাত খুব স্বাস্থ্যসচেতন। ছোটকাল থেকেই সে পড়ে আসছে, ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।’ জীবনের সব সুখের সন্ধানে সে স্বাস্থ্যের প্রতি দারুণ খেয়াল রেখে আসছে। সেই ক্লাস নাইনে থাকতেই বুকডন দেওয়া থেকে শুরু করে, সাইক্লিং, সাঁতার—সব চর্চা করত। এই সময়ে যখন সে ভার্সিটিতে যায়, মেয়েদের পাশাপাশি অনেক ছেলেরাও তার দিকে হিংসামিশ্রিত প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকায়।

জীবনের অন্য সব জিনিসের মতো রাহাতের জীবনেও প্রেম এলো। ভার্সিটিরই একটা মেয়ে, তারিন। চমত্কার হাসি-খুশি। সবাই দেখল, চমত্কার সেই মেয়েকে নিয়ে প্রায়ই বাইক চালিয়ে সবার চোখের সামনে একরাশ ধুলো উড়িয়ে চলে যাচ্ছে রাহাত। তারিনকে পেয়েই যেন রাহাত নিজ স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরো সচেতন হয়ে ওঠল।

‘আমি প্রতিদিন একটি আপেল খাই ডাক্তারদের দূরে রাখার জন্য। ডেইলি একগ্লাস পুদিনাপাতার জুস খাই ত্বকের বলিরেখা দূরে রাখার জন্য’—ভার্সিটির ক্যান্টিনে বসে বন্ধুদের এই গল্প শোনাচ্ছে সে। বন্ধুরা যখন সস দিয়ে তেলে ভাজা শিঙাড়া আর পুরি খাচ্ছে, তখন রাহাত খাচ্ছে এক প্লেট সালাদ।

‘ইদানীং আমি আরো বেশি ভেষজ ব্যাপারস্যাপারের দিকে আগাচ্ছি। ইস! তোরা যে এসব তেলে পোড়া খাবার ক্যামনে খাস?’ এই বলে রাহাত সেই টেবিল থেকে উঠে গেল।

তাই দেখে আশিক বলল, ‘আমরা ডেইলি এই সব তেলে ভাজা খাবার খাই তোদের মতো ছাগলাদের দূরে রাখার জন্য।’

সবাই হো হো করে হেসে ওঠল।

এদিকে রাহাতের মন ইদানীং ভালো নেই। কেন জানি তারিন তার থেকে দূরে দূরে থাকে। মেসেঞ্জারে ঠিকই কথা বলে; কিন্তু কাছে আসলেই চুপচাপ, দূরে দূরে।

সমস্যা কী, কোনোভাবেই বের করতে পারছে না সে। তারিনকে জিজ্ঞেসও করেছে। তারিন ‘কিছু না, কিছু না’ বলে এড়িয়ে গেছে। এরপর একদিন তারিন ছোট একটা মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দিল, তার পক্ষে সম্পর্ক আর রাখা সম্ভব হচ্ছে না কিছু ব্যক্তিগত কারণে। এরপর অনেকবার তারিনের সঙ্গে দেখা করতে চাইল রাহাত। শুধু কারণটা জানার জন্য, তারিন দেখা করল না।

অবশেষে কারণটা জানা গেল। ইদানীং রাহাত প্রতিদিন দুটি রসুন খেত হার্ট ভালো রাখতে। সেই রসুনের ভয়ানক দুর্গন্ধে তার সঙ্গে কথা বলাই দায় হয়ে পড়েছিল তারিনের। অবশেষে রাহাত বুঝতে পারল, ‘প্রতিদিন দুটি রসুন শুধু হার্টের অসুখ দূরে রাখে না, প্রেমিকাকেও দূরে সরিয়ে দেয়।’  

 

২. সাদিয়া আর রাজুর প্রেমটি বেশিদিনের না। কিন্তু এর মধ্যেই তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বাচ্চাকাচ্চা হলে নাম কী রাখবে, সেসব না। বাচ্চাকাচ্চা কোন স্কুলে পড়বে, তাদের হোম টিউটর কে হবে—তারা এখন এসব নিয়ে কথাবার্তা বলে।

সাদিয়া একদিন বলল, ‘কালকেই আসো বাসায়। তোমাকে বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। এভাবে লুকোচুরি করে আর কত দিন?’

আরে এখন কেন? এখনো পড়ালখা শেষ করিনি, চাকরিবাকরি নেই, কিছু নেই।

আরে চাকরিবাকরি পরে দেখা যাবে। আগে বাবার সঙ্গে দেখা তো করো। আমার যে পছন্দ আছে, বাবা দেখে রাখুক। পরে আবার ছেলেপেলে ঠিক করে ফেললে ঝামেলা হবে।

রাজু দেখা করতে গেল পরদিন সাদিয়ার বাবার সঙ্গে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সাদিয়ার বাবার গোঁফখানা দেখে ভয় পেয়ে গেল রাজু।

‘ভবিষ্যত্ প্ল্যান কী?’ কোনো কথার ধার না ধেরে সরাসরি জিজ্ঞেস করল সাদিয়ার বাবা।

‘প্ল্যান তো আপনার মেয়েকে বিয়ে করা।’ মনে মনে এটা বললেও মুখে বলল, ‘আগে পড়াশোনাটা ঠিকঠাক শুরু করা।’

শুরু করা মানে? এখনো শুরু করোনি?

না, স্যির। মানে শেষ করা।

গুড। প্লিজড টু হিয়ার দ্যাট। তোমাকে সাদিয়া পছন্দ করে, তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তোমাকে বিসিএস পেতে হবে। এখন থেকেই পড়ালেখা শুরু করো। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বিসিএসের পড়াশোনা শুরু করবে, এই প্ল্যান যদি করো, তাহলে পিছিয়ে পড়বে। বুঝতে পেরেছ?

জি, স্যার।

আরে স্যার বলছ কেন? নাও চা নাও, ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

জি স্যার, নিচ্ছি। না মানে আংকল নিচ্ছি।

বইমেলা থেকে উপন্যাস, গল্পের বই কেনার জন্য যে বাজেট ছিল, তা দিয়ে বিসিএসের বই কিনে আনল রাজু। কোমরে লুঙ্গি বেঁধে পড়াশোনা শুরু করল।

আগে সাদিয়ার সঙ্গে রোমিও জুলিয়েট, সংসার, বাচ্চাকাচ্চার ব্যাপার নিয়ে গল্প হতো, এখন রাজুর গল্প হয় কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, সাম্প্রতিক বিশ্ব, ব্রেক্সিটের আপডেট নিয়ে। প্রায়ই সে সঙ্গে করে চিরকুট নিয়ে আসে, যেখানে পাঁচটি করে ভোকাবুলারি থাকে। সেগুলো মুখস্থ করে আবার সাদিয়াকে পড়া ধরতে বলে। ধীরে ধীরে সম্পর্ক আকর্ষণ হারাতে থাকে।

রাজুর গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতে হতে সে বিসিএসের প্রস্তুতির জন্য অনেক দূর এগিয়ে গেল। আর তাদের সম্পর্ক থেকেও। তত দিনে সাদিয়া আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। শোনা যাচ্ছে, সেই ছেলেও নাকি সম্প্রতি এক গাদা বিসিএসের বই কিনে এনেছে।

 



মন্তব্য