kalerkantho


বিদেশ ভ্রমণ

সত্যজিৎ বিশ্বাস

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিদেশ ভ্রমণ

নারীর বুদ্ধি ছাড়া পুরুষ মানুষ অচল। সে মাঠে কাজ করা কৃষকই হোক আর এলাকা চালানো এমপি। এ কথায় শতভাগ বিশ্বাসী সোবাহান সাহেব। এলাকার এমপি হতে আক্ষরিক অর্থেই কাঠখড় কম পোড়াতে হয়নি তাঁর। প্রতিপক্ষের নির্যাতনে তার বাগানের গাছ, জমির ফসল পুড়ে যাওয়ার দৃশ্য ভিডিও করে এলাকাবাসীকে দেখিয়েছেন।  নিজের সম্পদ নিজে পোড়ানোর মতো রিস্কের কাজ করতে তিনি অবশ্য রাজি ছিলেন না। তখন যেসব চিকন বুদ্ধির সাপ্লাই পেয়েছেন, তার বেশির ভাগই বউয়ের কাছ থেকে পাওয়া। বউয়ের চিকন বুদ্ধির সাপ্লাই দেখে সোবাহান সাহেব মুগ্ধ হয়ে কথা দেন—যদি এমপি হতে পারি, বছরে অন্তত দুবার বিদেশ সফর করাব।   

বউভাগ্য আর সৌভাগ্য একসঙ্গে বেশির ভাগ পুরুষের কপালে থাকে না। সোবাহান সাহেবের কপালে আছে। তিনি প্রচুর সিমপ্যাথি ভোটে ইলেকশনে পাস করলেন। সোবাহান সাহেব অকৃতজ্ঞ নন। এমপি হয়ে জনগণের কাছে ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলেও বউকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুললেন না।   

অন্য অনেক কিছুর মতো বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তুতির দায়িত্বও ছেড়ে দিলেন বিলকিস বানুর হাতে। জগতে কিছু মানুষ আছেন, তাঁরা যেমন হিসাবি, তেমন সাবধানীও। বিলকিস বানু যেন তারই জলজ্যান্ত মডেল। সেই মডেলকে দুই কেজি কাপড় কাচার গুঁড়া সাবান ব্যাগে ভরতে দেখে সোবাহান সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—এগুলো কেন?

বিলকিস বানু অবজ্ঞার হাসি দিয়ে বলেন, বিদেশে যাবে, ওখানে কাউকে চেনো? শুনেছি বিদেশে সব কিছুরই অনেক দাম। কাপড় ময়লা হয়ে গেলে কাপড় কাচবে কী দিয়ে?

সোবাহান সাহেব মাথা নাড়ান, তাই তো? কিছুক্ষণ পর বউ যখন ২০ ফুট লম্বা নাইলন দড়ি, পেরেক, হাতুড়ি ব্যাগে ভরছিলেন, তেড়ে এলেন সোবাহান সাহেব। এসবের মানে কী? এগুলো নিয়ে কী হবে? আমরা কী কাউকে কিডন্যাপ করতে যাচ্ছি নাকি?

বিলকিস বানু মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, তোমার মাথায় যদি এক ফোঁটা বুদ্ধিও থাকত। কিডন্যাপ করতে যাবে কেন? হোটেলের বাথরুমে না হয় কাপড় কাচলে। সেই কাপড় কেচে শুকাতে দেবে কোথায় শুনি? দড়ি লাগবে না? তার জন্য দড়ি। ওই দড়ির মাথা কি আমি আর তুমি দুজন ধরে দাঁড়িয়ে থাকব সারা দিন? সেই জন্যই পেরেক। আর হাতুড়ি যে তোমার কপালে ঠোকার জন্য না, পেরেক ঠোকার জন্য—এটাও কি বুঝিয়ে বলতে হবে?

সোবাহান সাহেব মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন বউয়ের দিকে। বিলকিস বানু ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ওষুধের বাক্স নিয়ে। বাক্সের সাইজ দেখে মনে হচ্ছে গোটা এক ডিসপেনসারি। পেট খারাপের ওষুধ থেকে মাথা খারাপের (মাথা ব্যথার) ওষুধ, প্রেসারের ওষুধ থেকে শ্বাসকষ্টের ইনহেলার—কী নেই সেখানে? আছে গজ, ব্যান্ডেজ, চায়নিজ বাম, টাইগার বাম, ঘায়ের মলম, পোড়ার মলম, নাক বুজে গেলে ড্রপ, সার্জিক্যাল কাঁচি, তুলা, হেক্সাসোল, হট ওয়াটার ব্যাগ, আইস ব্যাগ মোট কথা পৃথিবীতে যত রকম অসুখের নাম মনে এসেছে, সেসব টাইপের প্রাথমিক চিকিত্সার সরঞ্জাম। সোবাহান সাহেব মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—  এসবের মানে কী? আমরা কি বিদেশে ফার্মেসি খুলতে যাচ্ছি নাকি?

বিলকিস বানু মুহূর্তেই পাল্টা বাক্যবাণে বিঁধে ফেললেন—আচ্ছা, বিদেশে গিয়ে কী তুমি না খেয়ে থাকবে? যেসব খাবার জীবনে খাওনি, তা খেয়ে যদি পেট নামে, তখন কী করবে? ভীষণ ঠাণ্ডায় যদি গলা বসে যায় কিংবা আবহাওয়া স্যুট না করে জ্বর আসে, কোথায় যাবে? মাথা ব্যথা শুরু হলে যাবে কার কাছে?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিলকিস বানু আবার শুরু করলেন—আসলে ঠিকই বলেছ, তোমার এত এত সমস্যার কথা ভাবার আমার কোনো দরকার নেই। ওখানে গিয়ে বিছানায় পড়ে কোঁকাতে থাকবে, না হয় দামি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিত্সা করাবে, টাকার শ্রাদ্ধ হবে। আমার কী? থাক তাহলে সব, কী বলো?’ সোবাহান সাহেব অনুশোচনায় মাথা নিচু করে ফেললেন।       

সোবাহান সাহেবের ১০ সেট জামাকাপড় নেওয়া হলো এক স্যুটকেসে। সব নেওয়া শেষ হলে সোবাহান সাহেব অবাক হয়ে খেয়াল করলেন—বিলকিস বানুর এক সেট জামাকাপড়ও সেখানে নেই। এমনকি বিশাল কসমেটিকসের বাক্স, যেটা  সব সময় যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখেন, সেটাও নেওয়া হলো না। চমকে উঠে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন—একি? তুমি কি আমার সঙ্গে যাচ্ছ না?

বিলকিস বানু মুচকি হেসে বললেন—তোমার কী মনে হয়?

‘না মানে, তোমার এক সেট জামাকাপড়ও নিলে না, এমনকি একটা কসমেটিকসও না, এর তো একটাই মানে হয়, তাই না?’

শুনে এবার বিলকিস বানু ভুবন ভুলানো হাসি দিয়ে বললেন—তোমার জন্য সব কিছু নেওয়ার পর আমার কিছু নেওয়ার আর জায়গা আছে, বলো?

‘তাই বলে কিছুই নেবে না সঙ্গে?’ সোবাহান সাহেব অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন বউয়ের দিকে।     

‘না, নেব না। বিদেশ থেকেই সব কিনব। না হলে তোমাকে সুস্থ রাখার জন্য এত কিছু বয়ে নিয়ে যেতাম? যে টাকাগুলো বাঁচালাম, সে টাকাগুলোর একটা সদগতি করতে হবে না? তা ছাড়া বিদেশে গিয়ে যদি শপিংটাই না করতে পারি, তাহলে আর বিদেশ ভ্রমণই বা কেন? শূন্য হাতে যাচ্ছি, পূর্ণ হয়ে ফিরব বলেই তো।’

গিন্নির কথা শুনে সোবাহান সাহেব বাকরুদ্ধ।



মন্তব্য