kalerkantho

কোড নেম

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



কোড নেম

এক

 

রুমটা ছোট। মাথার ওপর ঘটাং ঘটাং করে চলা ফ্যানটা ঘরের ভাপসা গরম আরো যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। রুমের তিন সদস্যের একজন ছোটন। সে মেঝেতে তেল চিটচিটে কাঁথা বিছিয়ে সেটির ওপর ঘুমাচ্ছে।

রুমের একমাত্র খাটটা তপনের। বিশাল এক মগে চা খাচ্ছে সে। শেষ সদস্য রাজীব পেপার পড়ছে। তপনের চা খাওয়ার সুড়ুত সুড়ুত শব্দে ঘুমের ডিস্টার্ব হচ্ছে ছোটনের। খানিক বাদেই সে খেঁকিয়ে উঠল, ‘কী ভাই? সকাল সকাল কী তামাশা শুরু করসেন? যেভাবে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ টান দিতেছেন, একটু পর তো চায়ের মগসহ ভিত্রে হান্দায় যাইব!’

‘তুমি দেখি বেয়াদবের মতো কথা বলতেছ।’ তপন জবাব দিল।

‘মতো না। ও আসলেই একটা বেয়াদব!’ পেপারে চোখ রেখেই বলল রাজীব।

‘আপনি আবার এর মধ্যে হান্দাইতেছেন ক্যান?’ উঠে বসল ছোটন।

‘ওঠো ওঠো। আর গুইসাপের মতো কোঁতাকুঁতি করিয়ো না। আজকে গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন।’ রাজীব বলল। দলটির অঘোষিত নেতা সে।

আজ আসলেই এই তিনজনের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। নিজেদের সব অর্থনৈতিক দুর্দশা দূর করার ফন্দি এঁটেছে তারা। একটা ব্যাংক লুট করবে। অনেক দিনের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটাবে আজ।

‘পিস্তল দুইটা রাতে তেল দিয়া পরিষ্কার করছ তো?’ জানতে চাইল তপন। চা শেষ করেছে সে।

‘করছি করছি।’ এই বলে আবার শুয়ে পড়ল ছোটন।

‘এই, তোমরা কী শুরু করছ। ওঠো ওঠো। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হও। টাইম হয়ে আসছে।’ রাজীবের নির্দেশে উঠে বসল ছোটন। ব্যাংক ডাকাতির পুরো ব্যাপারটা মনে করে পেটে মোচড় দিয়ে ওঠল তার।

 

দুই

সকাল সাড়ে ১০টা। ব্যাংক থেকে কিছুটা দূরে একটা টং দোকানে বসে আছে তপন আর রাজীব। ছোটন পুরো এলাকাটা একবার ঘুরতে গেছে। কাজ শেষে সে-ও এসে বসল দোকানে।

‘কী খবর?’ নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল রাজীব।

‘একটা জিনিস মিস করসি আমরা।’ জবাব দিল ছোটন।

‘কী?’ কাছে চলে এলো তপন।

‘আরে মিয়া দূরে যান। দাঁত মাজেন নাই ক্যান আজ?’ ছোটন বলল।

‘আর দাঁত। যেদিন থেকে এই কামের পরিকল্পনা শুরু করছ, সেদিন থেকেই টেনশনে আর দাঁত মাজি না!’

‘কাম সারছে!’ ফিসফিস করল ছোটন।

‘এই, থামবা তোমরা? কী হইছে, বলো।’ রাজীব থামাল দুইজনকে।

‘সিসিটিভি। সিসিটিভি ক্যামেরায় মুখ দেখা যাবে। মাস্ক পরতে হবে।’

‘শিট! ভুলেই গেছিলাম।’ ফিসফিস করল রাজীব।

‘সমস্যা নাই। মোড়ে মাস্ক বিক্রি হচ্ছে, দেখে আসছি আমি। ধুলাবালি এড়ানোর জন্য যেগুলো ব্যবহার হয়।’

‘তিনটা কিনে আনো, যাও।’

‘আমি একটু টয়লেটেও যাব।’ ছোটন বলল।

‘এই সময় আবার টয়লেট!’ বিড়বিড় করল তপন।

মাস্ক কিনে একটা মার্কেটের টয়লেটে গেল ছোটন। গিয়ে দেখে, সেখানে এক বয়স্ক লোক হাঁটাহাঁটি করছে।

ছোটন টয়লেট থেকে বের হওয়ার পরও দেখে, সেই লোক হাঁটাহাঁটি করছে।

‘কী ব্যাপার চাচা, খালি নাই?’

‘না, বাবা...আছে। আমি আসলে কয়েক মাস ধরে একটু কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছি। তাই আগে একটু পানি খেয়ে হাঁটাহাঁটি করে নিচ্ছি। এই মার্কেটে আমার একটা দোকান আছে।’

‘চাচা, আমি কিন্তু আপনার রোগটা সারিয়ে দিতে পারি।’

‘কিভাবে, বাবা? আসলে আমি অনেক ওষুধ খেয়েছি, লাভ হয়নি।’

‘ভয় পাবেন না তো?’ ছোটন জিজ্ঞেস করল।

‘আরে না, ভয় কিসের?’

আশপাশে আর কেউ নেই, নিশ্চিত হয়ে পকেট থেকে পিস্তলটা বের করল ছোটন।

‘যান, টয়লেটে যান। ফাইজলামি পাইছেন, না?’ পিস্তল দেখিয়ে ইশারা করল ছোটন।

ভয়ে দৌড়ে টয়লেটে ঢুকে গেল লোকটি। ভেতরে ব্যাপক পানি ব্যবহারের শব্দ শুনে বাইরে দাঁড়ানো রাজীব মুচকি হেসে নিশ্চিত হলো, কাজ হয়েছে।

টং দোকানে ফিরে আসতেই রাজীব বলল, ‘কী ব্যাপার, এত দেরি?’

‘এই তো টয়লেট থেকে আসলাম! এই নেন মাস্ক, এদিকে কী অবস্থা?’

‘টাই-স্যুট পরা এক লোক ঢুকেছে ব্যাংকের ভেতরে, অনেকক্ষণ হয়েছে।’

‘কী করে এতক্ষণ, কে জানে?’ বিরক্ত তপন।

খানিক বাদেই বের হয়ে এলো সেই ভদ্রলোক। হাতে দুইটা ব্যাগ।

‘মাস্কগুলো পরে নাও সবাই। প্ল্যান ঠিক আছে তো?’ রাজীব বলল।

‘হ্যাঁ।’ কোলা ব্যাঙের আওয়াজ বের হলো তপনের গলা দিয়ে।

তিনজনই হুড়মুড় করে ব্যাংকে ঢুকে পড়ল। পিস্তল বের হয়ে এসেছে ছোটন আর তপনের হাতে।

‘কেউ নড়বে না। আমরা কাউকে আঘাত করতে চাই না। এই তিনটা ব্যাগে সব টাকা দিয়ে দাও।’ ক্যাশের দিকে গিয়ে রাজীব কথা শেষ করল।

ফিক করে হেসে ফেলল ক্যাশিয়ার লোকটা।

‘এই, হাসেন কেন?’ অবাক রাজীব।

‘তিনটা কেন? একটা ব্যাগের অর্ধেকও ভরবে না। একটু আগে মঘা সাহেব বের হলো না? উনি সব টাকা লোন নিয়ে গেছে।’

‘বলেন কী!’ অবাক তপন।

‘আরে তুমি গেটে না থেকে এখানে কী করো?’ ধমক দিল রাজীব।

‘আরে টাকা নাই বলছে তো।’ অবাক তপন।

‘তুমি গেটে যাও।’ চেঁচিয়ে উঠল রাজীব।

এরই মাঝে হাজির হলো পুলিশ। নিমেষে ধরে ফেলা হলো এদের। তিনজনকেই গাড়িতে তোলা হলো। তখনো মাস্ক পরে আছে ছোটন।

 

পরিশিষ্ট

ছয় মাস পর। জেলে বসে আছে তিনজন। প্রত্যেকেরই সাজা হয়েছে। জেলের বাইরে গার্ড থাকা কনস্টেবল চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে খেতে বলল, ‘বেকুব দেখছি। আপনাদের মতো দেখি নাই!’

‘কেন? কী হইছে আবার?’ তপন বলল। সারা মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি তার।

‘আজকাল পিস্তল-বন্দুক নিইয়া কেউ ব্যাংক ডাকাতি করে? আপনাদের আগেই দেখেন না মঘা সাহেব কেমন গায়ে সেন্ট দিয়া, গাড়ি নিয়া আইসা চা নাশতা খাইয়া সব টাকা নিয়া গেসে।’

‘উনি তো লোন নিসে।’ অবাক তপন।

হা হা হা করে আরেক ধমক হাসল কনস্টেবল।

‘এখন এই সব কাজরে ওরা লোনই বলে। কোড নেম আর কি!’



মন্তব্য