kalerkantho


শুভ গত বর্ষ

মো. সাখাওয়াত হোসেন

১০ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



শুভ গত বর্ষ

পহেলা বৈশাখে ভার্সিটিতে একটি অনুষ্ঠান হবে। সেখানে কিছু একটা করতে হবে। গতবার গান করেছিলাম। সেই থেকে সবাই নাম দিছে ‘কাউয়া শাকিল!’ যুগে যুগে প্রতিভাবানরা এভাবেই অপমানিত হয়েছে, হবে। এবার চিন্তা করলাম অন্য কিছু করি। কী করব, ভেবে কাছের বন্ধু আতিককে কল দিলাম—‘আতিক, পহেলা বৈশাখে অন্য কিছু করতে চাইছি, যেন সবাই খুব খুশি হয়। চমকে যায়। কী করতে পারি রে?’

সবাইকে খুশি করতে চাইছিস তো?

হ্যাঁ।

তাহলে বাসায় বসে থাক। কিছুই করিস না।

এরাই আমার বন্ধু। এদের সঙ্গেই আমাকে চলাফেরা করতে হয়। কী জীবন!

হঠাত্ করেই আইডিয়াটা এলো মাথায়। যেভাবে স্লিপে হঠাত্ করে ক্যাচ আসে। একটা ভিডিও করি না কেন। নিজের একটা ছোটখাটো ইউটিউব চ্যানেল আছে, ওখানে শেয়ার করা যাবে। ভিডিওটায় সবাইকে এই বছরের বাংলা সালটা জিজ্ঞেস করা হবে। আমি শিওর, অনেকেই পারবে না। খুব মজা হবে। রাতুল নামে আমার এক ফ্রেন্ড আছে, যে আমার সব সু আর কুকর্মের সাক্ষী। তাকে সঙ্গে নেওয়া যাবে।

পহেলা বৈশাখ পাঞ্জাবি-জিন্স পরে রেডি হয়ে গেলাম। ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন সঙ্গে রাতুলকে নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। যাওয়ার আগে আমাদের আলমারিতে লাগানো গত বছরের বাংলা ক্যালেন্ডারের সালটা দেখে গেলাম। সত্যি কথা বলতে কী, এবার বাংলা কত সাল, নিজেও জানতাম না।

ভার্সিটিতে আসতেই আমাদের দারোয়ান ভাইকে দিয়ে শুরু করলাম, ‘কালাম ভাই, এইটা বাংলা কত সাল জানেন?’

আর বাংলা সাল। ভার্সিটির ক্যান্টিনে পান্তা-ইলিশ খাইয়া পেটের অবস্থা ১২টা বাইজা গেছে!

চমত্কার শুরু বলতেই হবে। সামনে গিয়ে চোখে পড়ল আমাদের লাইব্রেরিয়ানকে, ‘এই যে তারেক ভাই, শুভ নববর্ষ। এটা বাংলা কত সাল বলবেন?’

এটা? চিন্তার বিষয়। কালকেও মনে ছিল, বুঝলা? সকালে পাঞ্জাবি কোনটা পরব—এটা চিন্তা করতে করতে ভুলে গেছি। সরি!

সামনে এগিয়ে গেলাম। মজাই লাগছে। অন্যের অজ্ঞতা দেখতে ভালোই লাগে- কোথায় যেন এটা পড়েছিলাম।

সামনে গিয়ে দেখলাম, দুই সুন্দরী মেয়ে লাল শাড়ি পরে খুব সেলফি

তুলছে, ‘শুভ নববর্ষ!’

‘শুভ নববর্ষ!’ রিনরিনে কণ্ঠে জবাব এলো।

কেমন লাগছে অনুষ্ঠান?

চমত্কার! খুবই চমত্কার লাগছে। এত ফেস্টিভ লুক! খুবই ভালো লাগছে!

আচ্ছা, আমাদের প্রশ্ন হলো—এটা বাংলা কত সাল বলতে পারবেন?

দুজনেই আমার প্রশ্ন শুনে হেসে দিল। আমি লজ্জায়ই পড়ে গেলাম। এরা মনে হয় ভাবছে, এত সহজ প্রশ্নও কেউ জিজ্ঞেস করে?

‘বাংলা কত সাল, এটা বলতে পারব না কী বলেন?’ একজন জিজ্ঞেস করল।

না না, পারবেন না কেন? বলুন, প্লিজ!

‘এই, তুই বল।’ এক বান্ধবী আরেকজনকে ইশারা করল।

আরে তুই বল!

না, তুই বল!

‘ইয়ে প্লিজ, একজন বলে ফেলেন!’ নিজের নাকটা গলালাম আমি।

‘ও বলবে।’ একজন আরেকজনকে ইশারা করল।

‘আরে না, ও বলবে!’

আমি রাতুলকে ইশারা করলাম কেটে পড়তে।

এরপর ক্যামেরা নিয়ে অন্যদিকে এগোলাম। তখনো পেছনে আপুরা ‘এই, তুই বল, তুই বল’ করেই যাচ্ছে।

একজন খুব বডিবিল্ডার ছেলেকে পেলাম, ‘শুভ নববর্ষ!’

‘শুভ নববর্ষ!’ ভনভনে কণ্ঠ ছেলেটার। কণ্ঠ শুনে রাতুল একটু দূরে সরে দাঁড়াল।

আচ্ছা, আমরা একটা ইউটিউব চ্যানেল থেকে এসেছি। এটা কোন সাল বলতে পারবেন?

২০১৮!

না, মানে বাংলাটা।

ও, আচ্ছা। ইংলিশটা ২০১৮ হলে বাংলাটা ১৪১৮, তাই না?

খুক করে হেসে ফেলল রাতুল। আবার ছেলেটার বাইসেপের দিকে তাকিয়ে হাসিটা গিলেও ফেলল।

সামনে যেতেই আমাদের ডিপার্টমেন্টের ছেলেদের পেলাম। প্রথমজনকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, ‘থাপ্পড় খাইস না। সর এখান থেকে।’

আরেকজনকে জিজ্ঞেস করতেই সে একটা লাথি হাঁকাল। আমরা তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়ালাম ওখান থেকে। কখন সবাই মিলে আবার গণধোলাই দিয়ে দেয়।

দুজনে হয়রান হয়ে ক্যান্টিনে গেলাম ঠাণ্ডা কিছু পান করতে। দুজনে দুটি কোল্ড ড্রিংকস নিতেই আমাদের ডিপার্টমেন্টের এক স্যারকে পেলাম।

চল, স্যারকে প্রশ্নটা করি।

‘পাগল নাকি।’ রাতুল বলল।

আরে চল না। উনি পারবে। ওনাকে দিয়েই এই ফুটেজ শেষ করি।

স্যার, শুভ নববর্ষ!

শুভ নববর্ষ! কী অবস্থা বলো।

স্যার, আমরা ফান করে একটা ভিডিও করছি। এটা বাংলা কত সাল একটু বলেন।

স্যার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি যে সবাইকে এই প্রশ্ন করে বেড়াচ্ছ,  নিজে জানো?’

‘জি, স্যার। ১৪২৪।’ আমি মাথা সোজা করে বুক ফুলিয়ে জবাব দিলাম।

গবেট। এটা ১৪২৫। নিজে আগে শিখো।

‘স্যার, আপনার মনে হয় ভুল হচ্ছে। গত বছর ছিল ১৪২৩, এবার তাহলে ১৪২৪।’ আত্মবিশ্বাসের সুরে বললাম।

গতবার ছিল ১৪২৪। যাও এখান থেকে।

ওখান থেকে সরে তাড়াতাড়ি আম্মাকে কল দিলাম, ‘আম্মা আমাদের আলমারিতে লাগানো বাংলা ক্যালেন্ডারটা গত বছরের না?’

‘বাংলাটা?’

‘হ্যাঁ। বাংলাটা।’

‘না, ওটা তো গত বছরের আগের বছরের। আর পরিবর্তন করা হয় নাই।’

পুরো এক বছর একটা পুরনো বাংলা ক্যালেন্ডার দিয়ে কাটিয়ে দিলাম, টেরই পেলাম না। পাশ থেকে খেয়াল করলাম, ক্যামেরা চালু রেখেছে রাতুল, মুখে ভিলেন মার্কা হাসি ঝুলছে।



মন্তব্য