kalerkantho


মাঝ রাতে ভূতের সাথে

সাব্বির রায়হান

৬ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মাঝরাত। সময় কাটছে না। হঠাৎ বুদ্ধি এলো, প্ল্যানচেট। প্রথমে একটু ভয় ভয় লাগলেও একসময় সব ভয়টয় দূরে সরিয়ে বসে পড়লাম ওইজা বোর্ড নিয়ে। আপনারা আবার ভেবে বসেন না, একা একা এসব হয় নাকি? নিয়ম ঠিক থাকলে সবই হয়। তার ওপর মনে ক্ষীণ আশা, যদি ওনারা কেউ এসেই পড়ে, তাহলে বলে-কয়ে সেমিস্টার ফাইনালের প্রশ্নটা বাগানোর পাঁয়তারা করব। এসব যখন ভাবছি, তখনই গায়েবি সাউন্ড...

তিনি : কী রে, ডাকছস কেন?

তুই-তুকারি শুনে মনটাই ভেঙে গেল। বুঝলাম, দীর্ঘদিন ভূত ফরম্যাটে থেকে আদব-লেহাজের এই বাজে অবস্থা। সামান্য সৌজন্যবোধটুকুও ভুলে গেছে। অন্তত একটা ‘হায়’ও তো দিতে পারত। আর দেখেন, আমার কপাল! আসছেই যখন, তখন কিউট দেখে একটা মেয়ে ভূতও তো আসতে পারত। তা না। এনার গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছে, জীবদ্দশায় এনার অর্ধেক সময় কেটেছে লোকাল বাসের কন্ডাক্টরের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝগড়া করতে করতে, আর মাছের বাজারে গুঁড়া মাছের ভাগার দাম নিয়ে দরাদরি করতে করতে।

যা-ই হোক, উল্টাপাল্টা চিন্তা বাদ দিলাম। এনারা তো আবার অন্তর্যামী। এনাকে নিয়ে এসব ভাবছি, টের পেলে কাফন ছাড়া দাফন করে দেবে। তাই দেরি না করে কথা শুরু করলাম।

আমি : জনাব, কেমন আছেন?

তিনি : এখানে ভাব-ভালোবাসা বিনিময় করতে আসি নাই। আগে বল, ডাকছস কেন?

এহ! ভাষার কী ছিরি! বললাম—জি, এমনিতেই। সময় কাটছিল না। তাই গল্প করার জন্য ডাকলাম।

তিনি : আরেব্বাস! কী জামানা আইল রে! বাঁইচা থাকতে ভূত না দেখেই ভূতের ভয়ে প্যান্ট ভিজাইয়া ফেলতাম, আর তোরা আজব পোলাপান! এত এত ফেসবুক-টুইটার থাকতে নিঃসঙ্গতা কাটাতে ভূত ডাকস। খাইছে!

আমি : বাহ! ফেসবুক সম্পর্কেও জানেন দেখি। আছে নাকি আইডি?

তিনি : নাহ! আমাগো কি আর তোদের মতো যোগাযোগে সমস্যা নাকি?

আমি : হুম! তা আপনার আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো? অবশ্য বায়বীয় ফরম্যাটে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথাও না।

তিনি : আর সমস্যা! তোরা মানুষরা তো মানুষ না। যখন বাঁইচা ছিলাম, তখন ছিল অধিক জনসংখ্যার সমস্যা। মানুষ বেশি। সকাল সকাল সবগুলা গাড়ি নিয়া বের হইতি। এ কারণে টাইমমতো অফিসে পৌঁছতে না পেরে জ্যামের কারণে খাইতাম বসের ঝাড়ি। আর রাতে বাড়ি ফিরলে ঝাড়ি দিত বউ।

আমি : তা এখন কী সমস্যা? এখন তো ভূত। বাতাসের বেগে চলাফেরা করেন।

তিনি : হ! কইছে তোরে। কইলাম না, তোরা মানুষ না। আগে বছরে দু-একজন অপঘাতে মারা গিয়ে ভূত হতো। আর এখন ওই দিনকার চ্যাংড়া চ্যাংড়া পোলাপান, হাফপ্যান্ট পরে, তাগো নাকি জীবনে ডিপ্রেশন। তারও কারণ কী! গার্লফ্রেন্ড গেছে গা, নয়তো পরীক্ষায় বাজে রেজাল্ট। এসব কারণে আত্মহত্যা করে সবগুলা ভূত হয়ে ভূতনগরে ভূতের সংখ্যা বৃদ্ধি করতেছে। আমাদের ওখানেও এখন ট্রাফিক জ্যাম। মইরাও শান্তি নাই!

আমি : বলেন কী! আপনাদের তো তাহলে বাজে অবস্থা।

তিনি : কইলাম কী তোরে। এই তো সেদিন, বিকেলে গেছি পার্কে একটু হাওয়াটাওয়া খামু। উঁচা দেইখা গাছের মগডালে বসতে গেছি। কে জানি চিল্লাইয়া উঠল, ‘আরে চাচা, বুইড়া হইয়া কি চোখের মাথা খাইছেননি। চাপেন।’ তাকাইয়া দেখি হাঁটুর বয়সী এক ভূত গার্লফ্রেন্ড লইয়া বইসা আছে। নতুন নতুন ভূত হইছে তো, দাপাদাপি বেশি। মইরাও স্বভাব বদলায় নাই। আরে খালি কী এইডাই। দুনিয়াতে নাকি কী এক গেম আইছে, ‘ব্লু হোয়েল’। এইডার কারণে গত কয়েক বছরে ভূতের সংখ্যা প্রায় ২০০ বাড়ছে। বুঝসই তো, এমনিতেই গ্যাসীয় স্টেজে চিকনচাকন একটা ভূতই বিশাল জায়গা খাইয়া ফেলে, তার ওপর আরো নতুন ২০০ যোগ হইলে বুঝ কী অবস্থা!

আমি : হুম! তা এগুলা নিয়া আপনিও তো মনে হয় ভালই ডিপ্রেশনে আছেন। আবার আত্মহত্যাটত্যা করে ফেলবেন না তো?

তিনি : আরে নাহ! এগুলোও না হয় মানলাম। তবুও আজ মেয়ের বাসায় গিয়ে মনটাই ভেঙে গেল। নাতি-নাতনিগুলারে দেখতে গেলাম এত দিন পরে। ভাবলাম, ছোটখাটো ভয়টয় দেখিয়ে আসব। কিন্তু কী? সব শেষ।

আমি : কেন, কী হইছে?

তিনি : আর বলিস না। গিয়ে দেখি, সবগুলা লাইট নিভিয়ে বসে কম্পিউটারে কী যেন ভূতের মুভি দেখছে, আর একটু পর পর চিৎকার করে একটা আরেকটার ওপর গিয়ে পড়ছে। মনটাই ভেঙে গেল। এভাবে মেকি ভয় পেয়ে কী লাভ? কত আশা করে গেলাম, সত্যিকারের ভয় দেখাব। কিসের কী? এসব দেখে হতাশ মনে চলে যাচ্ছিলাম, তুই ডেকে বসলি।

কথাবার্তায় বুঝলাম, ইনি আমাদের চেয়েও কঠিন ডিপ্রেশনে আছেন। যেকোনো সময় কিছু একটা করে ফেলবেন। তাই আর দেরি করলাম না। আসল কথায় আসলাম। লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বলেই ফেললাম, আমাকে সেমিস্টার ফাইনালের প্রশ্ন জোগাড় করে দেন না। কিছুতেই যে পাস হচ্ছে না।

কোনো উত্তর নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি আবার বললাম। না, এবারও কোনো উত্তর নেই। আমি আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। না, কোনো সাড়া নেই। বুঝলাম, যা হওয়ার হয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে মেয়েদের ইনবক্সে যখন বলি, ‘হাই আপি, তুমি কি সিঙ্গেল?’ মেয়েরা কোনো রিপ্লাই না দিয়ে নীরবে ব্লক মেরে চলে যায়, ইনিও সেইম কাজ করেছেন। কী আর করা। আসলে আমার কপালটাই পোড়া।


মন্তব্য