kalerkantho


জসিম সাহেবের ডিকশনারি পড়া

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জসিম সাহেবের ডিকশনারি পড়া

অন্যের ক্ষতি করার কোনো ইচ্ছা জসিম সাহেবের নেই; তবে উপকার করে মহৎ হওয়ার উচ্চাভিলাষও তাঁর নেই। এমনকি কারোর অনুরোধেও উপকার করতে আগ্রহ বোধ করেন না। একজন নির্লোভ অনুপকারী মানুষ। মানুষের রসিকতা বোঝেন; কিন্তু রসিকতায় অংশ নেন না। হাসেন; হাসান না। তবে আমাদের অফিসে মাঝেমধ্যে তিনি একটি জ্যান্ত কৌতুক।

আমার ডেস্কের ওপরে মোটা মোটা চার-পাঁচটা ডিকশনারি আছে, ডেস্কের এক পাশে পরিপাটি করে সাজানো। কেউ কোনো শব্দ আটকে গেলে আমাকে ফোন দেয়। আমি ডিকশনারি পড়ে অর্থ বলে দিই। কারোর বাচ্চা হলে বায়না নিয়ে আসে, ‘ভাই, একটা ভালো নাম রেখে দেন, ছেলে বাচ্চা।’ মাঝেমধ্যে বড় স্যাররাও ফোন দেন। বিশেষ করে কোনো শব্দের বানান আটকে গেলে। আমি ডিকশনারি পড়ে উত্তর দিই।

এমডি স্যার অফিসের কাজে সুনামগঞ্জ যাবেন। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও পুত্র। এক ফাঁকে হাওরে ঘুরে আসবেন। হাওর নাকি সমুদ্রের মতো বিশাল। জসিম সাহেবকে দায়িত্ব দিয়েছেন ট্যুর প্ল্যান করার। জসিম সাহেব এক টুকরা সাদা কাগজে ট্যুর প্লান টাইপ করে এনেছেন। সেখানে তিনবার হাওর শব্দটি ব্যবহার করেছেন, তিনবারই বানান ভুল—‘হাওড়’। এমডি স্যার সংক্ষেপে জসিম সাহেবকে বোঝালেন, ‘জামান সাহেবের মতো ডিকশনারি দেখার অভ্যাস করবেন। সব সময় সব বানান মনে থাকে না, ডিকশনারি দেখে নিতে হয়।’ দুর্ভাগ্যক্রমে সে সময় আমিও স্যারের চেম্বারে ছিলাম। জসিম সাহেবের সঙ্গে আমার একবার চোখাচুখি হয়েছিল।

এর পর থেকে জসিম সাহেবের আচরণে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। শব্দের বানান ও অর্থ নিয়ে তাঁর নবকৌতূহল চোখে পড়ার মতো। কখনো আমার ডেস্কের সামনে বসে মনোযোগ দিয়ে ডিকশনারির পাতা উল্টাচ্ছেন, আবার কখনো পিয়ন পাঠিয়ে ডিকশনারি ধার নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে দিনে দু-একবার না হলেও, দু-এক দিনে একবার আমার ডিকশনারিগুলো তাঁর ডেস্ক থেকে ঘুরে আসে। এমডি স্যারের চেম্বারে কোনো শব্দের অর্থ বা বানান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জসিম সাহেব আমার ডেস্কে এসে অবশ্যই ডিকশনারি খুলে খানিকক্ষণ পাতা উল্টিয়ে যান। যাওয়ার সময় আমার দিকে কটমট করে একবার তাকান। মন ভালো থাকলে সরাসরি আমার সঙ্গে কথা পাড়েন। সেদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই, মুমূর্ষু শব্দডার বর্তমান পরমিত (প্রমিত) বানানডা কী?’ আমি জসিম সাহেবকে আশ্বস্ত করলাম, ‘শব্দের বানান পাল্টায়নি। বানান আগে যা ছিল, এখনো তা-ই আছে। শুধু বিকল্প বানানগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ একটিকে গ্রহণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর বিদেশি শব্দগুলোর বানান একমুখী করা হয়েছে। জসিম সাহেব বললেন, ‘ও, আইচ্ছা।’

সেদিনের কথা। সরকারি অফিস থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ চিঠি এসেছে। এমডি স্যার ডিএমডি স্যারদের নিয়ে চিঠিটা পড়ছিলেন। জসিম সাহেব এবং আমি আগে থেকেই রুমে ছিলাম, নোট নেওয়ার জন্য। একটা শব্দের ওপর এমডি স্যারের মনোযোগ নিবদ্ধ হলো। তিনি দুবার শব্দটি উচ্চারণ করলেন, ‘পরিবীক্ষণ, পরিবীক্ষণ।’ ডিএমডি স্যারদের দিকে তাকালেন। ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ বললেন ডিএমডি স্যারদের একজন। এমডি স্যারের অর্থটা বোধ করি মনঃপূত হলো না। জসিম সাহেবের সঙ্গে আমার একবার চোখাচুখি হলো।

ডেস্কে এসে দেখি, জসিম সাহেব আমার ডেস্কের সামনে একটা মোটা ডিকশনারি বের করে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পড়ছেন। আমাকে আসতে দেখে তাঁর মনোযোগ আরো গভীর হলো।

‘জসিম ভাই, আমি জানি আপনি কী দেখছেন।’ আমি বললাম। জসিম সাহেব কোনো জবাব দিলেন না। ডিকশনারিটা হাতে নিয়ে তাঁর ডেস্কে চলে গেলেন। সেদিন অফিস ছুটির আগে জসিম সাহেব আমার ডেস্কে এলেন। হাতে ডিকশনারিটা। আমি ডেস্ক থেকে মাথা না তুলেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘জসিম ভাই, ‘পরিবীক্ষণ’ শব্দটা ডিকশনারিতে পেয়েছেন?’ জসিম সাহেব হুঁ করলেন। ‘অর্থ দেখেছেন?’ আবার জিজ্ঞেস করলাম। জসিম সাহেব আবারও হুঁ করলেন। তারপর ডিকশনারিটা আমার ডেস্কের ওপর রাখতে রাখতে বিজ্ঞের মতো বললেন, ‘আমগোরে পরচুর পড়াশুনা করা উচিত। পড়াশুনার বিকল্প নাই। পরতেকের পড়তে অইব।’

এবার আমি মাথা তুললাম। দেখলাম জসিম সাহেব দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। ডেস্কের ওপর ডিকশনারিটা বাঁকা করে রাখা। শব্দের অর্থ জানার জন্য জসিম সাহেব সারা দিন ধরে যে ডিকশনারিটা পড়ছিলেন, সেটি হচ্ছে জামিল চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমির বানান অভিধান, যেখানে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সব শব্দের তালিকা রয়েছে, কিন্তু বানান অভিধান বিধায় কোনো অর্থ লেখা নেই।



মন্তব্য