kalerkantho

সাবধান!

মো. সাখাওয়াত হোসেন

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সাবধান!

আমাদের এলাকার পল্টু ভাইকে দেখে সব সময় হিংসা হতো। প্রথম কারণ, ওনার কোনো কাজ ছিল না। সকালে উঠে বিশাল এক মগ চা নিয়ে, লুঙ্গি পরে আমাদের এলাকা পরিদর্শনে বের হতো। এখানে পরিদর্শন কথাটার একটা অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। পরি+দর্শন মানে এলাকার যত পরির মতো সুন্দরী মেয়ে তখন স্কুল-কলেজে যেত, তাদের দর্শনে বের হতো। আমরা তখন ঘুম ঘুম চোখে, সরিষার তেল মাথায় দিয়ে এক পাশে সিঁথি করে স্কুলে যাচ্ছি স্যারদের প্যাঁদানি খাওয়ার জন্য। উনি তখন রাস্তার পাশ থেকে আমাদের দেখে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলতেন, ‘কী রে রামছাগলের দল, কই যাস?’

আমরা কিছু বলতে পারতাম না। কেননা বিকেলে আমরা যে ক্রিকেট খেলি, তার সব সরঞ্জাম পল্টু ভাইয়ের। উনিই সব কিছুর জোগানদাতা। আর হবেন নাই বা কেন, বাবার একমাত্র সন্তান। যে কয়টা ব্যবসা আছে, সব পল্টু ভাইয়ের বাবা দেখেন। উনি শুধু কলেজে বিকম না কি একটাতে যেন ভর্তি হয়ে আছেন। বছরে একবার ক্লাসে যান, কখন পাস করবেন বা আদৌ করবেন নাকি তার কোনো ঠিক নেই। এভাবেই যখন দিন চলছিল, তখন একদিন বিকেলে ঘটল ঘটনা। আমরা যথারীতি খেলছিলাম। পল্টু ভাই হঠাৎ বলে উঠলেন—‘চল, নদীর তীরে যাই।’

‘খেলবেন না?’ আমরা অবাক।

‘না, তোদের সঙ্গে কথা আছে। তোরা ছাড়া আমার আর কেই বা আছে, বল।’

আমরা পুলকিত হয়ে উঠলাম। কারণ পল্টু ভাইয়ের এই ‘তোরা ছাড়া আমার আর কেই বা আছে’ মানে ভালো খাওয়াদাওয়া হবে আজকে। আর পল্টু ভাই অবশ্যই কোনো একটা ঝামেলায় পড়েছেন, যেটার সমাধান আমাদের করে দিতে হবে। আমরা সরল অঙ্ক, পাটিগণিতের সমাধান দিতে না পারলে কী হবে, এই সব কাজের আবার ভালো সমাধান দিতে পারি।

নদীর পাড়ে গিয়ে হেব্বি খাওয়াদাওয়ার পর পল্টু ভাই একটা সিগারেট ধরিয়ে (ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর) বললেন, ‘আমি ধরা খাইছি রে!’

‘কোথায়? আবার খালুর পকেট থেকে টাকা...।’ মুখভর্তি তখনো খাবার প্রাণেশের।

‘আরে না রে গাধা। আমি প্রেমে পড়েছি।’

‘প্রেম!’ আমরা সবাই অবাক।

‘আমি আগেই বুঝছিলাম, এটা নারীঘটিত ব্যাপারস্যাপার।’ রাজু আমাদের মধ্যে একটু বেশিই পরিপক্ব। পেকে একেবারে টসটসে হয়ে গেছে।

‘কার প্রেমে?’ তারকা খচিত প্রশ্নটা ছাড়লাম।

‘রিনা!’

‘ওরে বাপ রে, রিনা আপা!’ তারেক বলল। ‘মনে আছে, একবার ওনাদের বাড়ির জানালার কাচ ভাঙছিলাম বলে উনি লাঠি নিয়ে দৌড়ানি দিছিলেন?

‘ওই সব বাদ দে। এখন কিভাবে রিনাকে ইম্প্রেস করা যায় বলে ফেল।’

‘মেয়েরা কসমেটিকস খুব পছন্দ করে। এক ডজন পাউডার দিয়ে দেন।’ মাথামোটা প্রাণেশ বলল।

‘এক ডজন!’ অবাক আমি। ‘এক ডজন দিয়ে কী করবে?’

‘দোকান দেবে আর কি।’ রাজু বলল।

এভাবে একের পর এক আইডিয়া আসতে থাকল আর সবগুলোই বাতিল হয়ে গেল।

‘আমি দেখছি, সকালে রিনা আপার কলেজে যেতে খুব ঝামেলা হয়। রিকশা পাওয়া যায় না। প্রায়ই ওনার দেরি হয়। আপনি একটা স্কুটি কিনে ফেলেন না কেন? একদিন সকালে ওনাকে স্কুটিতে কোনোভাবে তুলে কলেজে পৌঁছে দেবেন, ব্যস!’ রাজুর আইডিয়া শুনে লাফিয়ে উঠলেন পল্টু ভাই।

আমরা সবাই রাজুর দিকে হিংসার দৃষ্টিতে তাকালাম।

‘পেকে গাছ থেকে পড়ার সময় হইছে!’ বিড়বিড় করল তারেক।

পরের ব্যাপারগুলো খুব ঝটপট ঘটতে লাগল। ফটফট শব্দ করে—এ রকম একটা স্কুটি কিনে ফেললেন পল্টু ভাই। এক শুভক্ষণে সেটির পিছে বসেও পড়লেন রিনা আপা। শুরু হলো প্রেমকাহিনি। আমাদের ব্যাট-বলের অভাব দেখা দিল। কারণ পল্টু ভাইয়ের খেলায় মন নেই।

‘হইছে তো এখন? কাবিলে বুদ্ধি দিছে! এখন আঙুল চুষো।’ আমরা চান্স পেয়ে একেবারে ধুয়ে দিলাম রাজুকে।

তারপর একদিন বিকেলে পল্টু ভাই আবার আমাদের নদীর পাড়ে নিয়ে এলো।

‘ভাই, খেলতে আসেন না যে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘সব সময় যে খেলা খেলা করিস, প্রথম ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট জিতছে কে, বল দেখি?’

আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম। প্রাণেশের মুখে মাছি ঢুকে পড়ল।

‘পারলি না তো। পারবি কিভাবে? ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তারপর ক্রিকেট পিচের দৈর্ঘ্য কত জানিস? জানিস না? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম কোনটা?’

একনাগাড়ে পল্টু ভাইয়ের প্রশ্ন দেখে ভয় পেয়ে গেলাম আমরা।

‘ভাই, কী হইছে আপনার?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল রাজু।

‘আমাকে বিসিএস দিতে হবে। রিনা বলেছে, বিসিএস পাওয়া ছাড়া ওর আব্বা মেয়ে বিয়ে দেবে না।’

‘কাম সারছে!’ ফস করে আমি বলে উঠলাম।

‘তো আর কি। একেই বলে আটকপালে। আটকপালে মানে জানিস তো? হতভাগ্য।’

‘খেলবেন না আর?’

‘না, খেলা ঘঁষষ ধহফ াড়রফ। এর মানে কী জানিস তোরা?’

‘নান আর ভাজি?’ ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল প্রাণেশ।

মাথায় একটা গাট্টা মেরে পল্টু ভাই বললেন, ‘গর্দভ! ঘঁষষ ধহফ াড়রফ মানে বাতিল।’

সরল-সহজ ও তরতাজা পল্টু ভাই চোখের সামনে বদলে গেলেন। সারা দিন বিড়বিড় করেন। এলাকায় রটে গেল, উনি পাগল হয়ে গেছেন। আমরা দল বেঁধে একবার ওনাকে দেখতে গেলাম।

আমাদের দেখে উনি খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘এই রামছাগলের দল, বল দেখি বাংলার প্রাচীনতম জনপদ কী?’

আমরা পালিয়ে এলাম।

পরিশিষ্ট : এর মধ্যে অনেক বসন্ত পার হলো। রিনা আপার বিয়ে হয়ে গেল। পল্টু ভাইকে নিয়ে ওনার মা-বাবা অন্য শহরে চলে গেলেন। আমরা স্কুল পেরিয়ে কলেজে চলে এলাম। এলাকায় সুমন নামে নতুন এক ভাইয়া এলেন। আমাদের সঙ্গে খেলতেন। সুখেই দিন কাটছিল। একদিন উনিও ভূতের কিল খেলেন।

প্রেমে পড়ে গেলেন এক সুন্দরীর। এক সন্ধ্যায় এসে ফিসফিস করে বললেন—‘এই, তোরা যে সব সময় খেলা খেলা করিস, বল দেখি প্রথম ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট জিতছে কে?’

প্রাণেশ হাত থেকে চা ফেলে জামা কাপড়ে করে ফেলল।


মন্তব্য