kalerkantho


হলে ওঠার দিনগুলো

মো. হাসিবুর রশীদ

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হলে ওঠার দিনগুলো

তখন সবে মাত্র অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি, থাকি পাইকপাড়ায়। প্রতিদিন ভোরে উঠে চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে ক্যাম্পাসের বাস ধরি। মাঝেমধ্যে চোখটা বেশি মুছতে গিয়ে দৌড়ের গতি হারিয়ে ফেলি, ফলে বাস মিস হয়ে যায়। তখন ওই লাইনের লোকাল বাসই ভরসা। বাসের গেটে ভিড়ের ভেতর মাথাটা গলিয়ে দিই আর শ্যামলী, আসাদগেট, কলাবাগানের জ্যাম সাঁতরে ক্যাম্পাসে আসি। শক্ত হাতে ক্লাস, প্রেজেন্টেশন, পরীক্ষা, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট সামাল দিয়ে আবার সন্ধ্যা নাগাদ কলাবাগান, আসাদগেট, শ্যামলীর জ্যামে উল্টো সাঁতরে বাসায় ফিরি। বাসায় এসে আবার হরেক কিসিমের ঝামেলা শুরু হয়। বুয়া এক দিন আসে তো তিন দিন ঐচ্ছিক ছুটি কাটায়। প্রতি মাসের শেষে সম্মানী বাড়ানোর দাবিতে স্যাবোটাজ করে তরকারিতে ঝাল বেশি, লবণ কম ইত্যাদি অত্যাচার করে। চক্রাকারে ঘুরে মাঝেমধ্যে মেসের হিসাবপত্রের খাতা আমার টেবিলে হাজিরা দেয়। আমি ঘুমানোর আগে খাতা বগলদাবা করে প্রতিটা রুমে হানা দিয়ে সব বোর্ডারের মিলের হিসাব, বাজারের খরচ টুকে রাখি। মাস শেষে দেখা যায়, দু-তিন শ টাকার হিসাব মিলছে না। সেই ভর্তুকিটাও আমার হ্যাংলা-পাতলা পকেট থেকে বেরিয়ে যায়। এত সব হ্যাপার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে শরীফের দরবারে হাজির হলাম।

‘দেরি না করে হলে উঠে যা’—আমার সব ঘটনার শানেনুজুল শুনে শরীফ স্পষ্ট প্রেসক্রিপশন দিল। ‘ওখানে বুয়া বিল, কারেন্ট বিল নেই। জ্যামও ঠেলতে হবে না।’

বুদ্ধিটা পছন্দ হলেও মনে মনে ভয় পেলাম। কারণ, হলে ওঠা তো আর মুখের কথা না। বড় ভাইদের তেল মারতে হবে, সপ্তাহে দু-তিনবার মিছিলে যেতে হবে, আরো কত কী!

সাত-পাঁচ বারো ভেবে শরীফের এক পরিচিত নেতাগোছের বড় ভাইয়ের রুমে উপস্থিত হলাম। উনি তখন দিবা শিফটের ঘুমে ব্যস্ত। পাক্কা দুই ঘণ্টা পর উনি আমাদের সামনে তাশরিফ আনলেন। শরীফ তোষামোদ করে ওনাকে সব বুঝিয়ে বলল। তা শুনে এবং আমার ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্ট দেখে বড় ভাই মোটামুটি ফিদা হয়ে গেলেন।

‘আচ্ছা ঠিক আছে, তোমার রেজাল্ট তো বেশ ভালো। তুমি হলে উঠবা, সমস্যা নাই। ঠিকমতো পড়াশোনা করবা, আমি তোমাকে কোনো পলিটিক্যাল প্রগ্রামে ডাকব না।’ উনি আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন।

আমার তো তখন খুশির ঠ্যালায় হার্টের পৌনে একটা বিট অলরেডি মিস করেছে। ঠিক তখনই তিনি তার নেক্সট বয়ান ঝাড়লেন, যেটা শুনে আমার পুরো একটা বিট মিস করল, ‘প্রগ্রামে ডাকব না ঠিক আছে, তবে তোমাকে রক্ত ঝরাতে হবে। হল লাইফটাই এমন। কখন কার রক্ত ঝরে তার ঠিক নেই...।’

এটুকু শুনেই আমি তড়াক করে উঠে ছুট লাগালাম। আমার পেছনেও ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ পেলাম। হলের উঠোনের অর্ধেকটা আসতেই ভাইয়ের চ্যালারা আমাকে ধরে ফেলল। চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে ভাইয়ের সামনে দাঁড় করাল। ওদিকে আমার ভয়ার্ত পাংশু মুখ দেখে সবাই হাসতে শুরু করল...

‘আরে আমার কথা শেষ করার আগেই তুমি কই যাও? আমাদের হলে ব্যাপক ছারপোকা। তোশক, বালিশ, চেয়ার-টেবিলের ফাঁকফোকর—সব জায়গায় রক্তচোষা ছারপোকা। ওদের কারণে তোমাকে রক্ত ঝরাতে হবে। মারামারি করে নয়। এবার খুশি?’ বড় ভাই হেসে বললেন কথাগুলো।


মন্তব্য