kalerkantho


সেদিন কাঁটা বিঁধেছিল

ইমরান

২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সেদিন কাঁটা বিঁধেছিল

আঁকা : মাসুম

লাঞ্চ করতে গিয়ে বেসাইজের একটা মাছের কাঁটা গলায় বিঁধল। মাকে বললাম, কাঁটা বের করে দাও।

মা বিরক্ত হয়ে বললেন, ছি ছি, এত বড় ছেলে এখনো গলায় কাঁটা আটকায়! গারগেল করে আয়, তারপর দেখছি।

একটা চিমটা আর একটা টর্চ নিয়ে অনেকক্ষণ উঁকিঝুঁকি দিয়েও মা কিছু দেখতে পেলেন না। মনে হয় অনেক নিচে গিয়ে আটকেছে।

মা বললেন, তোর বাবাকে বল ইএনটিতে নিয়ে দেখাতে।

আমি সম্মতি দিলাম না। কাঁটার কথা বাবাকে বলা যাবে না। বাবার গলায় কাঁটা আটকানোর ধাত আছে। ইলিশ থেকে রুই, এমন কোনো মাছ নেই যার কাঁটা বাবার গলায় আটকেনি! দুবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে কাঁটা খসাতে হয়েছে। আমি সেটা নিয়ে প্রায়ই হাসাহাসি করি। এখন বাবাকে বলতে গেলে মান-ইজ্জত যাবে। বাধ্য হয়ে মাকে বললাম, তুমি দেখতে না পেলে কি ডাক্তার দেখতে পাবে?

মা বললেন, জিবে অ্যানাস্থেসিয়া দিলে আরো একটু ভেতরে দেখা যাবে।

আমি বললাম, তার চেয়ে পেটের ডাক্তারের কাছে যাই। একটা এন্ডোস্কোপ গলা দিয়ে ঢোকালে ধাক্কা দিলে কাঁটাটা নেমে যাবে।

মা অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, হ্যাঁ, আর আসার পথে একটা কামান নিয়ে আসিস, বাসায় মশার কয়েলটা কাজ করছে না।

আমি অবাক হলাম। ছেলের এই অবস্থা আর মা রসিকতা করছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই হয়তো মা বললেন, কাঁটা নিয়ে এত গবেষণা করতে হবে না। লেবুর রস খা। নেমে যাবে।

লেবুর রসে এসিড আছে। এসিড দিলে গলে কাঁটা বেরিয়ে আসবে। নিজেকে বলতে বলতে আস্ত একটা লেবু খেয়ে ফেললাম চিপে চিপে। তখন যন্ত্রণায় সালফিউরিক এসিডও খেয়ে ফেলা কঠিন ছিল না। ঘোড়ার ডিমের লাভ হলো।

রহিমার মা মসলা বাটছিল, সে দেখি মুখে আঁচল চেপে হাসছে। আচ্ছা, রহিমা হওয়ার আগে রহিমার মাকে সবাই কী বলে ডাকত?

বাবা যথারীতি টিভিতে মেগা সিরিয়াল দেখছেন। সাত পাকে বাধা। একটা পর্ব দেখলে মনে হয় যে গাঁজার ক্ষেতে আগুন লেগেছে আর তার মাঝখানে বসে নাট্যকার গল্পগুলো লিখেছেন। কিন্তু যেকোনো জায়গা থেকে গোটা চারেক পর্ব দেখলেও কেমন যেন নেশা চলে আসে। পুতুলের মেয়েটাকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে? মেয়েটার আসল স্বামী কোনটা? শাশুড়িটা কি আসলেই শয়তান? মাথার মধ্যে কুটকুট করতে থাকে।

আচ্ছা, ছেলেটার গলায় যে কাঁটা ফুটেছে এতক্ষণ ধরে কোনো খেয়াল আছে? মা বাবাকে বললেন।

দীর্ঘদিন ধরে মায়ের চিৎকার শুনতে শুনতে বাবার ইমিউনিটি এসে গেছে। যথারীতি এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। তিনি বললেন, অ্যাঁ?

ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেন, ধুর!

কাঁটা ফুটেছে, কোথায়? আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন বাবা।

আমার মাথায়। বিরক্ত হয়ে বললাম।

মাথায় আবার কাঁটা ফোটে কিভাবে? বাবা অবাক।

রহিমার মা আমাদের কথা শুনে আর চুপ থাকতে পারল না, খালাম্মা, বিড়ালের কাছে মাফ চাইলে মনে হয় নাইমা যাইব।

পৃথিবীতে পাগলের সংখ্যা এত বেশি কেন ভাবতে ভাবতে ঘুমাতে গেলাম।

ঘুম এলো না। আচ্ছা, কাঁটাটা যদি ভোকাল কর্ডে গিয়ে ঢোকে, তাহলে তো কথাই বলতে পারব না। যদি কোনো দিন বের না হয়? বিড়ালের পা ধরলে কি আসলেই নামে? না হলে এমন বুদ্ধি কার মাথায় আসবে? সব কুসংস্কারের শুরুর দিকে তো কিছু লজিক থাকে। আমি যদি বিশ্বাস করি যে এটা কাজ করবে, তাহলে হয়তো গলার মাসল রিল্যাক্স করে কাঁটাটা নেমে যাবে।

হঠাৎ হোমিওপ্যাথির কথা মনে পড়ল। হোমিওপ্যাথিতে কাঁটা নামানোর ওষুধ আছে, কিন্তু বাসায় কাউকে বললে ত্যাজ্যপুত্র হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তার চেয়ে ঘুমিয়ে থাকি, ঘুমের মধ্যে গলার মাসল রিল্যাক্স করলে কাঁটাটা এমনিই নেমে যাবে।

পরদিন ব্রাশ করার সময় মনে হলো কাঁটাটা নেমে গেছে। চা খাওয়ার সময়ই আবার খ্যাঁচ করে দাঁড়িয়ে গেল। অগত্যা হোমিওপ্যাথির দোকানে হাজির হলাম। লোকজন বেঞ্চিতে বসে আছে। বসে বসে ব্রশিওর পড়তে থাকলাম। বোঝা গেল যে এলোপ্যাথি এইডস, ডেঙ্গু আর বার্ড ফ্লুর মতো ফালতু জিনিস নিয়ে পড়ে থাকলেও গালের তিল ওঠানো, গলার কাঁটা নামানো, হাতের টিউমার ভ্যানিশ, কিডনির পাথর হজম ইত্যাদি সত্যিকার মিরাকল হোমিওপ্যাথিই আবিষ্কার করেছে। হোমিওপ্যাথি জার্মানিতে আবিষ্কৃত। জার্মানিতেও মানুষের গলায় কাঁটা আটকায় ভেবে চমত্কৃত হলাম। রিসেপশনিস্টকে একবার জিজ্ঞাসা করলাম কাঁটা নামানোর ওষুধ আছে নাকি। কাঁটা নামানোর কথা শুনে রোগীদের একজন নড়েচড়ে বসলেন।

রিসেপশনিস্ট বললেন, আরে কাঁটা নামানোর খুব ভালো ওষুধ আছে। আমার মায়ের আটকেছিল, এক ফোঁটা খেতেই ১০ মিনিটের মধ্যে কাশি দিয়ে বেরিয়ে এলো।

কল্পনা করলাম, কাশি দিয়ে আমার কাঁটাটা বেরিয়ে এসেছে। আহা! কিসের কাঁটা সেটা রিসেপশনিস্টকে জিজ্ঞাসাও করতে হলো না। নিজেই বলে দিলেন। খেজুরগাছের কাঁটা। পায়ে ফুটেছিল, ওষুধ পড়তেই কাশি, তাতেই কাঁটা বেরিয়ে এলো। এ কী কোথায় যাচ্ছেন?

আর ওষুধ লাগবে না। যা গল্প বললেন, কাঁটা এমনিতেই নেমে গেছে। বেরিয়ে পড়লাম। গলার খচখচ নিয়ে বাসে উঠলাম। বেকার ছেলে আর অবিবাহিত মেয়ে মা-বাবার গলায় কাঁটার মতো। যেই হতভাগা এই ফাউল প্রবচনটা বানিয়েছে ভেবেচিন্তেই বানিয়েছে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যন্ত্রণা হচ্ছে গলার কাঁটা।

কাঁটাবনের জানোয়ারদের খাঁচাগুলোর সামনে

এলোপাতাড়ি হাঁটলাম অনেকক্ষণ। খরগোশগুলো কেমন মরামরা। কুকুরগুলোও বেশি আনন্দে আছে বলে মনে হলো না। পাখিগুলোই বেশ শব্দ করছে। হাঁটতে হাঁটতে বিড়ালের খাঁচার সামনে এলাম। রহিমার মায়ের কথা মনে পড়ল। অনেক পুরনো প্রবাদ। কাজ হতে পারে ভেবে ধরলাম এক বিড়ালের পা চেপে। ক্যাঁচ করে হাতে খামচি বসিয়ে দিল। দোকানদার হি হি করে বিরক্তিকর হাসি দিয়ে বললেন, ‘ভাইজানের গলায় কাঁটা হান্দাইছে মনে লয়’!

হাত দিয়ে রক্ত ঝরছে। কিন্তু কী আশ্চর্য, গলার কাঁটাটা মনে হয় নেমে গেছে। খামচি খেয়ে যে আঁতকে উঠেছিলাম তাতেই মনে হয় কাঁটাটা ছুটে গেছে।


মন্তব্য