kalerkantho

এই শহরে

মো. সাখাওয়াত হোসেন   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এই শহরে

* বাজারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। বাজারে ইদানীং কম যাই।

কম বয়সে হার্টের রোগী হয়ে লাভ কী? আজকে অনেক দিন পর এসেছি। মাঝেমধ্যে এসব জায়গায়ও আসা লাগে। দেশের অবস্থা কেমন বোঝা যায়। এক বন্ধু কদিন আগে মাছ, মাংস আর সবজি কিনতে বাজারে গিয়েছিল। আমরা সবাই মিলে এখন তাকে হাসপাতালে দেখতে যাই।

বাজারের কাছাকাছি আসতেই এক দোকানদারের চিত্কার শুনতে পেলাম, ‘এই ফাটাইন্যা পেঁয়াজ আছে, ফাটাইন্যা পেঁয়াজ। ’

কৌতূহলী হয়ে কাছাকাছি গেলাম। ‘কী, ভাই? ফাটাইন্যা পেঁয়াজ মানে?’

‘এই যে ফাটাইন্যা পেঁয়াজ। ’ সে আমাকে একটি পেঁয়াজের ঝুড়ি দেখাল।

‘কত করে?’ আগ্রহী হয়ে দাম জিজ্ঞেস করলাম আমি।

‘১০০ টাকা কেজি!’

‘ওরে বাপ রে! ১০০ টাকা!’

‘এই তো ফেটে গেল!’

* শহরের মাঝেই ছিমছাম একটি জায়গা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কোনো কোলাহল নেই। এক ভিক্ষুক তার পরিবার নিয়ে গুছিয়ে বসেছে। তিনটি ছোট ছেলে-মেয়ে খেলাধুলা করছে। ভিক্ষুকের স্ত্রী রান্না চড়িয়ে দিয়েছে। ভিক্ষুক লোকটি বিশাল এক টিনের মগে করে চা পান করছে। চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর তাকিয়ে আছে বিশাল নীল আকাশের দিকে। আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী অবস্থা?’

‘আর অবস্থা!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভিক্ষুক বলল।

‘কেন, কী হয়েছে?’

‘আরে দেখেন না, রোহিঙ্গারা আইসা কী ঝামেলা পাকাই বইছে। আমাদের কি এত সম্পদ আছে নাকি হেরারে খাওয়াইবার। ’

আমি অবাক হলাম। বাহ! কত ভাবছে সে দেশ নিয়ে।

‘এখানে আজ কত দিন?’

‘এই জায়গায় উঠছি গত মাসে। ’ 

‘কেমন বুঝছেন?’

‘ভালাই। বৃষ্টির মৌসুমেও আরামে থাকি। ’

আমি ভিক্ষুককে ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। একটি গ্যারেজ। মোটরসাইকেলের। বেশ কিছু মোটরসাইকেল রাখা। সবাই কাজ করছে। মালিকের কাছে গেলাম।

‘কয় দিন হলো এখানে ব্যবসা শুরু করেছেন?’

‘এই তো গত মাস থেকে। ’

‘কেমন কাস্টমার?’

‘আছে, খারাপ না। চ্যাংড়া চ্যাংড়া পোলাপাইন বাইক কিনছে। আতাইল্যা-ফাতাইল্যা বাইক চালায়ে এর-ওর গায়ের উপ্রে উঠায় দেয়। এখানে আসে ঠিক করতে। ’

ভালোই লাগছে জায়গাটা। ছিমছাম। আরেকটু সামনে এগোতেই দেখি, কয়েকটি ছেলে বসে কী যেন খাচ্ছে।

‘ভাই, কী করছেন আপনারা এখানে?’

‘কী দরকার আপনার?’

‘না, মানে এমনিতেই। ’

‘এমনিতেই কিছু করা ভালো না। অতি আগ্রহ দেখায় বলেই আগুনের মইধ্যে ঝাঁপ দিইয়া পোকা মরে। দেখেন নাই কখনো?’

আমি আস্তে করে সরে এলাম। আগুনে না, কোথাও ঝাঁপ দিয়ে মরার ইচ্ছা আপাতত নাই।

* অফিসে যাব। দাঁড়িয়ে আছি। ঘ্যাচ করে পাশে একটি সিএনজি থামল।

‘ভাই, কই যাবেন?’

‘না, যাব না। ’

‘আরে ক্যান ভাই, চলেন না। আপনি ধানমণ্ডি যাইবেন। জানি তো। ’

‘আরে চমত্কার! কোথায় যাব সেটিও জানেন। ’

‘হ, ভাই। চলেন। ’

‘না, যাব না। ’ আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বললাম।

‘ভাই, মিটারে যামু। ’

‘তো যান না। মিটারে যান, সেন্টিমিটারে যান—আপনাকে কে ধরে রাখছে?’

‘চলেন, দিয়ে আসি। বউনি করি নাই এখনো। ’

‘আরে দূর ভাই। সকাল সকাল কী শুরু করলেন। যাব না বলছি না। ’

‘আচ্ছা, যান। মিটারে যা আসে তার থেকে ২০ টাকা কমাই দিয়েন। ’

আমি চুইংগাম চাবাচ্ছিলাম। সেটি মুখ থেকে পড়ে গেল।

বলে কী ছাগলা! মিটার থেকে কম। এটা কোথায়? ঢাকা? বাংলাদেশ?

‘না, ভাই। যাব না!’ আমি আমার এই একজীবনে সিএনজিচালকদের থেকে পাওয়া যত দুঃখ, অপমান, যন্ত্রণা—সব ভুলে গেলাম।

সেই সিএনজিচালকের পাশে ঘ্যাচ করে একটি বাইক থামল। আমি সেটিতে উঠে চলে গেলাম।

সিএনজিচালকের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিতে গিয়েছিলাম। একসঙ্গে দুটি চোখ বন্ধ হয়ে গেল। খুব সম্ভবত খুশিতে।


মন্তব্য