kalerkantho


দে তালি, গল্প এক ঘালি

মো. সাখাওয়াত হোসেন

২১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দে তালি, গল্প এক ঘালি

♦ এই তো কয় দিন আগে বার্সেলোনা জিতে যাওয়ার পর লাফালাফি করতে গিয়ে পা মচকে ফেললাম। সবাই দেখতে এলো।

আমাকে খুশি করতে পাশের বাসার এক আন্টি বলল, ‘ভালোই হয়েছে। রেস্ট হবে কয়েক দিন। ’

অফিসে আমার খুব কাছের এক বন্ধুর হঠাৎ করে চাকরি চলে গেল। আমার মন অনেক খারাপ। আরেক কলিগ আমাকে খুশি করতে চাইল, ‘দেখেন, যা হওয়ার ভালোই হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বন্ধুবান্ধব থাকাটা আসলে কাজের কথা না। ’

বাসায় ফিরছিলাম একদিন। সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। আসার পথে কোথা থেকে এক পাগলা কুকুর এসে কামড়ে দিল। টিকাফিকা নিয়ে এক অবস্থা। আত্মীয়স্বজন দেখতে এলো। আমাকে খুশি রাখতে একজন বলল,

‘ভালোই হয়েছে একদিকে। এ সময় অনেক ভালো খাওয়াদাওয়া করবে, বিশ্রাম করবে, ডাক্তারদের পর্যবেক্ষণে থাকবে। ’

তার ঠিক দুই মাস পর ব্যালকনিতে বসে পেপার পড়ছিলাম। কামড়ে দিল একটি মৌমাছি। তাও নাকের ওপর। সার্কাসের ক্লাউনের মতো লাগছিল। এলাকার যে ডাক্তার দেখালাম, আমাকে খুশি করতেই বলল, ‘একটা ভালো দিক কী জানেন? মৌমাছি কামড়ালে কিন্তু বাতের ব্যথা হয় না। ’

ক্লান্ত দুপুরে বিছানায় শুয়ে ভাবছি। বাতের ব্যথা হবে না, অফিসে আপনজন নেই, সমস্যা হবে না; কয় দিন আগেই হাসপাতালে কত রেস্টে ছিলাম। কত সুখী আমি। পটাস করেই চিন্তাটা মাথায় এলো, ‘আচ্ছা, কাউকে সুখী করতে কামড়ে দেব নাকি!’

♦ ‘আস্ত একটা হাদারাম’ নিজের টাইটা ঠিক করতে করতে ভাবল সাইদ।

‘হালা বদ্ধ-উন্মাদ!’ আয়নায় দাঁড়িয়ে চুলটা ঠিক করতে করতে ভাবল সে।

‘এই অকাট্য মূর্খকে নিয়ে কোথায় যাব? না আছে সেন্স, না আছে কিছু। ইডিয়ট একটা। গাধাও। না না, মহাগাধা। কথা বলার সময় মনে হয়, কেউ কামান দাগাচ্ছে। বলদা কুহানকার। ’

ভাবতে ভাবতে বসের রুমের দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল সে।

‘গুড মর্নিং স্যার। ভালো আছেন?’ সতেজ একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল সাইদ।

♦ শুধু দুটি শব্দ আছে বলেই সবাই আমাকে খুব হিংসা করে। শুধু দুটি শব্দ যদি আপনি রাখতে পারেন নিজের অভিধানে, কুছ পরোয়া নেহি।

এই যেমন—আমার কলিগ রহমান সাহেব সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটি জ্যাকেট কিনেছিল। তাতে কী! এই জিনিস তো পরতে পারবে শীতকালে। তাও এবার তো শীতই পড়েনি।

এই যেমন আমাদের পাশের বাসার নিয়াজ সাহেব। তাঁর চমৎকার একটা নীল গাড়ি আছে। তাতে কী! তাঁর মোটা ভুঁড়ির জন্য সে তো ড্রাইভিং সিটেই বসতে পারে না।

আমার বন্ধু রাহুল বিয়ে করেছে দারুণ ধনীর এক মেয়েকে। সারা দিন শুধু দাওয়াতে ঘুরে বেড়ায়। তাতে কী! তার তো গ্যাস্ট্রিক।

বান্ধবী নীলার স্বামী পিএইচডি করা। বেতন নাকি মাসে তিন লাখ। তাতে কী! তার মেয়ে গত টার্মে অঙ্কে পেয়েছে ৪০। কী মজা!

আর তারেক। তার বিশাল এক বাসা। পাঁচটা নাকি বাথরুমই আছে। তাতে কী! তার বাসায় সারাটা বছর মেহমান লেগেই থাকে।

শব্দ দুটি খুঁজে পেয়েছেন তো?

তাতে কী!

♦ ‘আচ্ছা, বিয়ে করতে যেমন রেজিস্ট্রি করতে হয়, তেমনি বন্ধুত্বের সময়ও রেজিস্ট্রি করলে কেমন হয়?’ চা পান করতে করতে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তন্ময়কে জিজ্ঞেস করলাম।

‘মানে কী?’ অবাক তন্ময়।

‘এই যেমন কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। রেজিস্ট্রি হলো। একেবারে অনুমোদন নিয়ে। তারপর কোনো কারণে বিচ্ছেদ হলে সেটাও আবার রেজিস্ট্রি করেই হবে। তবে বন্ধুত্ব রেজিস্ট্রি ধুমধাম করে ফেললেই হবে না। বন্ধুত্ব রেজিস্ট্রি করার আগে তারা দুই মাস সময় পাবে—একজন একজনকে যাচাই করে নেবে, সত্যিই তারা বন্ধুত্বের উপযোগী কি না। আর রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে পরস্পর পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। দুজনের দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকবে দুইজনকে দেখে রাখার। বন্ধু কোনো বিপদে পড়লে আইনগতভাবে তার...’

‘দূর শালা। তোর বন্ধুত্বের নিকুচি করি। ’ এই বলে তন্ময় উঠে চলে গেল।

কিন্তু আজকে রেজিস্ট্রি করা থাকলে এ রকম ফট করে উঠে যেতে পারত?


মন্তব্য