বাঙালির কাজকারবার আসলেই রহস্যজনক, দুর্বোধ্য! ফুলে ভরা বসন্ত, স্নিগ্ধ শরৎ, আহা বর্ষা, সবজি ভরা শীতকাল; কোনোটাকেই ডাকার নাম নেই, ডাকো কেবল বৈশাখকে! তালু ফাটা গরম, ঘেমে কেদো কেদো, ছাতিফাটা তৃষ্ণা, রোগবালাই আর গরমে অতিষ্ঠ হয়ে যাওয়া বৈশাখ। তার পরও আসুন আসুন! কোলে এসে বসুন হে বৈশাখ! আপনি না আসলে তো মুমূর্ষুরা সুস্থ হতে পারবে না! (অথচ সুস্থদেরই মরার দশা!)। কী তাজ্জব! তাবৎ ঋতুতে প্রকৃতি কত ঠাণ্ডা। বৈশাখ এলেই শুরু হয় খেপা তাণ্ডব। নার্গিস, লায়লা, রেশমী ও মহাসেনরা নর্তনকুর্দন করতে আসেন বৈশাখে। একেকটা ঝড়ে কী পরিমাণ প্রাণহানি আর ক্ষয়ক্ষতি! তার পরও বৈশাখকে আসতেই হবে! বলি, কালশীত বা কালবসন্তের নাম কেউ শুনেছেন? কাল আছে কেবল বৈশাখীর আগেই। কানে কানে বলি, এই পহেলা বৈশাখ নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করার রেওয়াজটা চালু করে দিয়েছেন ঘোরতর অবাঙালি মোগল সম্রাট আকবর। তার পরও বৈশাখ নিয়ে আমাদের সে কি সংস্কৃতিপনা! আচ্ছা থাক থাক, এসব বললে আবার দোষ হয়ে যাবে। কী বললেন? বৈশাখ আগেও পালন করা হতো, মানলাম। কিন্তু এই যে বৈশাখ নিয়ে এত চেঁচামেচি, বলুন তো পহেলা বৈশাখ কত তারিখে হয়? জানি, গলা ফাটিয়ে বলেছেন, 'জানি নে মানে! ১৪ এপ্রিলেই পহেলা বৈশাখ! ১৩তেও নয়, ১৫তেও নয়।' হুম...যাক ভালোই খোঁজখবর রাখেন! পহেলা বৈশাখ আসলে ১৪ এপ্রিলেই পালিত হয়। কারণ দুই দিন আগেও যদি জিজ্ঞেস করতাম, বলেন তো আজকে চৈত্রের কত তারিখ? বলতে পারতেন? পারতেন না। সুতরাং ১৪ এপ্রিল ঠিক করে দেয় আমাদের পহেলা বৈশাখ। এবার বলুন তবে, এই সংস্কৃতি আপনি কোথায় লালন করেন? বুকে না পাকস্থলীতে? যাহ! পাকস্থলীর কথা এসেই গেল। বৈশাখ এসেছে। ইলিশ চাই ইলিশ! প্রজনন মৌসুম! ওটা আমার দেখার বিষয় নয়। বাজারে আছে, তাই খাই। উহু ঘ্রাণ নেই তো! আরে এখনকার ইলিশ এমনই, নদীতে যা পলিউশন। তো? মুখে পুরুন আর কল্পনাশক্তি কাজে লাগান। দাম? অ্যা মা গো! বলে কী! হালি ১০ হাজার! এ টাকা দিয়ে তো আরজিৎ সিংয়ের কনসার্টেই যাওয়া যায়! কম কত? সাত? আচ্ছা সাড়ে সাতেই সই। সংস্কৃতি বাঁচানো বলে কথা! বচ্ছরে তো একটা দিনই। এদিকে আবার ও কী শোনা যায়! ইটিং খাবার ডট কম সাইট হোম ডেলিভারিতে পান্তা দিচ্ছে? ইয়ো ম্যান! লোল! লোল! [লোল : লাফ আউট লাউড US; vi, vt উচ্চ স্বরে হাসিয়া ওঠা (তুল.smile) (ক) আমোদ লাভ করা: n. হাস্যাস্পদ ব্যক্তি। adv. সহাস্যবদনে]। তা ক্যাশ অন ডেলিভারিতে দুটো মাটির বাসনও অর্ডার দেওয়া যায় কি না দেখবেন নাকি! কাপড়টা আমি দেখেশুনেই কিনতে চাই। ইন্টারনেটে বিশ্বাস নেই। মিসেস কী চান দেখি তো? আচ্ছা, বৈশাখী মোটিফের পাকিস্তানি লন পাওয়া যাবে না? সারা বছর তো লনটন বেশ চলে। এই এক দিনের জন্য স্পেশাল কিছু বের করলেই পারত। পত্রিকা খুললে কেবল লুঙ্গি-গামছার ছবি। ওসব আর কত দেখব! কোয়ালিটি আর অভিনবত্বের সঙ্গে এক চিমটি সংস্কৃতি তো চাই। ফ্যাশন হাউস দরকার? সোজা চলে যান ডুগডুগিস নয়তো ফাটাফাটিস্টিকের শোরুমে। ট্রেন্ডি কালার আর কাটিংয়ের সঙ্গে ম্যাচ করে একটা দোতরা কিংবা হাতপাখার প্রিন্ট পাবেন বৈকি। বৈশাখের এই গুটিকতক অ্যাম্বাসেডরই প্রতিবছর দেদার বেচা হয়। সব প্রস্তুতি সারা। এবার বলুন বৈশাখের দিন কী করবেন? কিছু করার আছে? বাঙালি কিছু করতে জানে! জানে বৈকি! ফ্ল্যাশমব! মোড়ে মোড়ে, অলি-গলিতে, চিপায়-চাপায় ফ্ল্যাশমবের রেকর্ড হয়ে গেছে এতক্ষণে। গিনেসের লোকজন খবর পেলেই হয়! বৈশাখেও চলুক ফ্ল্যাশমব। কোনো একটা অ্যাডফার্মের শেখানো নাচের মুদ্রায় গোটা বিশেক বন্ধুবান্ধব নিয়ে তাধিন তাধিন নেচে ফেলতে পারেন এসো হে বৈশাখের রিমিক্স ভার্সনের তালে। যাঁরা নাচতে জানেন না, তাঁরা সেজেগুঁজে কোনো একটা রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত দর দর করে ঘামতে ঘামতে হেঁটে নিন। ঘাম ঝরিয়ে সংস্কৃতি উসুল করুন। যাঁরা মনে করছেন ঈদের মতো অফিস থেকে বৈশাখী বোনাস পাইনি বলে আমার এত বৈশাখবিদ্বেষ, তাঁরা ভুল করবেন। বৈশাখ ঘনিয়ে এলে আসলে মেজাজ ঠিক থাকে না। শোকের একুশে ফেব্রুয়ারি বলুন আর বৈশাখ, বাঙালির সব কিছুই বেচা চাই। আর সেই তালে কিনতে না পারাটাও যেন ব্যর্থতা। বৈশাখী অমুক, তমুক অফার। আরেক দল আছেন, যাঁরা চান বাঙালি দিনকে দিন বাচাল হয়ে যাক, বাকসর্বস্ব হয়ে টিকে থাকুক সম্পর্ক। তাঁরা চান, আমরা কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলি। বৈশাখের দিন ২৪ ঘণ্টা কথা বলুন, বোনাস পাবেন, সেই বোনাস দিয়ে আরো বকবক করুন। করতেই থাকুন। বোনাস বকবক, বোনাস বকবক। বৈশাখী অফার গড়ায় পেডিকিউরে। নখের আগা ঘষে মিহি করবেন? তাতেও এক চামচ বৈশাখ না বেচলে চলবে না। আচ্ছা, শরৎ-হেমন্তে কোনো অফার দেওয়া কি নিষিদ্ধ? নাকি ওই দুটো ঋতু ইংরেজি কোন তারিখে শুরু হয় তা জানা নেই বলে অফারও নেই। এসব চিন্তাভাবনায় ইচ্ছা হয় নতুন করে লিখি, হে বৈশাখ তোমার আসার দরকার নাই। তুমি বিদেয় হও। yahoo@dhrubonil.com