kalerkantho

গল্প

বিলাই চিমটি

মেহেদী ধ্রুব

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বিলাই চিমটি

অঙ্কন : সারা টিউন

এই পারের মানুষ নিশ্চুপ ভোমরা-বল্লার টোপের মতো দম ধরে পড়ে আছে; কারণ এখানে পাঞ্জাবিরা ঢুকতে পারে নাই, বহু আগেই জোয়ান পোলারা কাঠের পুলটা ভেঙে ফেলেছে। তবে ওরা আসতে না পারলে কী হবে, এই পাড়ার মাথা খারাপ পোলা হাসুইন্নার নতুন নতুন খেলায় অথবা কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে কেউ কেউ। কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না ওকে, বেশ মজা নিয়ে খেলছে ও। অবশ্য একটা আধাপাগলকে শায়েস্তা করার সময় কই। যা দিনকাল পড়েছে, এক্কেবারে ঠাডাপড়া ব্যাপার যাকে বলে, চিন্তার ঠ্যালায় মাথার সমস্ত মগজ ছ্যাগলাব্যাগলা হয়ে যাবে যেন। বারবার মনে হয়, এই বুঝি ওরা ঢুকে পড়ে, এই বুঝি তছনছ করে দিয়ে যাবে আঁকাবাঁকা পথ, নিথর ছায়া, ফসলের মাঠ, বাঁধানো ঘাট।

এই পারের মানুষ যখন এই সব স্বস্তি ও অস্বস্তি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করে, তখন হাসুইন্না পরনের কাপড় খুলে ফেলে। কিন্তু এই খেলায় কেউ হাসে না। এই পারের সবাই জানে, হাসুইন্নার খেলা নতুন কিছু নয়, ১৯৫২ সাল থেকে খেলে আসছে ও। ১৯৪৭ সালে জন্ম হলেও তার খেল কিন্তু শুরু হয়েছে পাঁচ বছর পর থেকে। সেই সময় কেউ কেউ বুঝতে পারে ওর মাথা ঠিক নাই। অবশ্য অনেকে বলেছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভালো হয়ে যাবে ও। কই, এত বছর পার হয়ে গেলেও সামান্য বোধবুদ্ধির নামগন্ধ পর্যন্ত নাই।

ওর খেলার শেষ নাই, কত রং কত ঢং জানে ও! এই যেমন—কথা নাই বার্তা নাই হঠাৎ করে মাছ রাখার ডুলার ভেতর মাথা ঢুকিয়ে ক্যা ক্যা করে, গরুর মুহায় মুখ দিয়ে হাম্বা হাম্বা করে, অচেনা কাউকে দেখলে চোখ উল্টায়া ভয় দেখায়, পরনের লুঙ্গি পেট পর্যন্ত তুলে ‘ইন্দুর গেল রে, ইন্দুর গেল’ বলে চিৎকার করে, জোয়ান মেয়ে-ছেলে দেখলে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করে, অথবা লুঙ্গি উঁচু করে ধরে দেখায়, মাঝে মাঝে পথেঘাটে এটা-সেটা ত্যাগ করে।

ওই পারে ব্রিটিশ আমলের কাছারিতে পাঞ্জাবিরা রাজা-বাদশাহর মতো জীবন অতিবাহিত করে। মাঝে মাঝে রাজারা যেভাবে ছদ্মবেশে বের হয় সেভাবে ওরাও বের হয়, বিশেষ করে দুপুরের খাবার খেয়ে। নাও তো খাড়া, এই পারে আসতে দেরি নাই হয়তো! কিন্তু পরের দিন সকালে এক কাণ্ড করে বসে হাসুইন্না। অবশ্য যারা এখনো ঘরদোর ছেড়ে যায় নাই তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ওর কপালে চুমো দিতে চায় তারা। তারা ভাবে, শালার আধপাগল হলে কি হবে, কাম করছে খাসা। ওই পার থেকে নাও নিয়ে আসছে। আজব ব্যাপার, এই নাও ক্যামনে নিয়ে আসল ও, কোন সময় গেল? দেখতে দেখতে দশ-বারোজন দলা হয়ে যায়। তারা দেখে, গাঙ বায়া খালের ভেতরে নিয়ে আসছে নাও। এখান থেকে গাঙ পর্যন্ত দেখা যায় না। ও নাও নিয়ে দোল দিচ্ছে। ওদের নাও উধাও হয়ে যাওয়ার পর ওরা আরো খেপে গেছে মনে হয়, বিশেষ করে চেয়ারম্যান সাব। এই পারের ঝোপঝাড়ে লুক্কি মেরে বসে থাকলে দেখা যায় তার ব্যস্ততা অথবা টাকি দৌড়ে যাওয়া-আসার দৃশ্য। দেখে মনে হয় পাঞ্জাবিরা আরো সতর্ক।

হাসুইন্না নতুন খেলা পেয়েছে, এই পারের ঘাটে বসে ঘাটের দুই পারে দুইটা খুঁটা গাড়ে। খুবই নড়বড়ে খুঁটা, দেখে মনে হয় কারো চারাগাছের খুঁটা হবে অথবা বেড়া থেকে খুলে আনা। তারপর খুঁটার ওপরে কঞ্চির মতো আড়া বেঁধে রাখে। ওতে একটা ঘরের মতো মনে হয়। এই ঘরের মুখে বসে থাকে ও, বাবুসাবের মতো। ওর এই কাণ্ডে বিরক্ত হয় না কেউ। ঘাট দিয়ে ওপরে উঠতে হলে এই বেড়া মাড়িয়ে আসতে হবে, সামান্য হলেও তো এটা একটা প্রতিরোধ। মানুষ ভাবে, হয়তো মুক্তিরা আছে এর পেছনে। তাই নিজের জমিজমা ছেড়ে যারা চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয় তারা ফিরে আসে। তারা বিশ্বাস করতে থাকে মুক্তিরা নিশ্চয় আসবে, এই বুঝি মুক্তিরা জনসমক্ষে আসবে। তাই তারা ভেতরে ভেতরে একটা শক্তি অনুভব করে। কিন্তু ওই পারের ঘটনা দেখে ভয় পেয়ে যাওয়ার জোগাড়। চেয়ারম্যান সাব কোত্থেকে যেন চার-পাঁচটা নাও নিয়ে আসছে। এবার নাওগুলো ডুবিয়ে রাখা হয় নাই, ঘাটে বাঁধা আছে। কয়েকজন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে।

এই খবর সবাই পায়, তবে তারা বিশ্বাস করে মুক্তিরা ঠিক আসবে, সময় হলে নিশ্চয় আসবে। তাদের মধ্যেই হয়তো কেউ গোপনে খবর দেবে, তাদের মধ্যেই হয়তো মুক্তি লুকিয়ে আছে, হয়তো তারা জানে না, অথবা তাদের মধ্যেই হয়তো আছে মুক্তিদের গুপ্তচর। তবে তারা আন্দাজ করতে পারছে, যেকোনো সময় হামলা করবে ওরা।

পরের দিন সকাল না হতে আসমান ফেটে তাফাল নামে। মাথার মগজ গলে পড়বে যেন, এই রোদ দেখে হাশরের ময়দানের কথা মনে পড়ে। সেই সময় নাকি আধহাত ওপরে থাকবে সূর্য। যাকগে, আপাতত আউলাঝাউলা বাতাস কিছুটা হলেও তাফাল কমিয়ে দেয়, গাঙের পানি চিকচিক করে, ঢেউ আর ঢেউ, ক্ষণে ক্ষণে শুশুক উথাল মারে। কিন্তু একসময় এই পারের মানুষ ক্ষেতপাতালে দৌড়ায়, ঝোপের ভেতর থেকে খেয়াল করলে দেখা যায়, চার-পাঁচটা নাও নিয়ে আসছে ওরা, ঘাটে কেউ নাই, শুধু হাসুইন্নার বেড়া বাতাসে দোল খায়, এই বুঝি পড়ে যায়, এই বুঝি উড়ে পড়ে গাঙের জলে।

খুব দ্রুতগতিতে নাওগুলা ঘাটে লাগে। সঙ্গে আছে চেয়ারম্যান সাব। তরুণ টগবগে একেকটা পাঞ্জাবি। ওরা পজিশন নিয়ে খেয়াল করে আশপাশ—কই, কোত্থাও কেউ নাই, মুক্তি আসবে কোত্থেকে। ওরা যখন বুঝতে পারে আশপাশে কারো আনাগোনা নাই, তখন একসঙ্গে ওপরের দিকে ওঠে। একটু ওপরে উঠতেই বেড়ার সম্মুখীন হয়। একজন সৈন্য ভালো করে পরখ করে—না, বোমাটোমা কিছু নাই, একটা সাধারণ বেড়া, ধাক্কা দিলেই পড়ে যাবে। ওরা হাসে, যাকে বলে দাঁত কেলিয়ে। কয়েকজন চোখ চাওয়াচাওয়ি করে একসঙ্গে লাত্থি মারে বেড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে ওড়ানো ছাইয়ের মতো উড়ে যায় কিসব, দমকা বাতাসে মাখিয়ে যায় ওদের গায়ে। সঙ্গে সঙ্গে ওদের একজন ঘাড়ে চুলকাতে থাকে, আরেকজন পেটে হাত ঢুকিয়ে দেয়, একজন গলায় চুলকাতে থাকে। গাছের আগায় বসে এই দৃশ্য দেখে কে যেন হাসে। দেখতে দেখতে পাঞ্জাবিরা বিচ্ছুর মতো ছিট পারতে থাকে আর উর্দুতে চেঁচাতে থাকে। গাছ থেকে একটার পর একটা ঢিল আসতে থাকে, অনেকটা হাতবোমার মতো। আমগাছের ঝোপের ভেতর থেকে ওকে দেখাও যাচ্ছে না, বোঝার উপায়ও নাই। পাঞ্জাবিরা দিশাহারা হয়ে যায়। কয়েকজন মুক্তি বলে আতালেপাতালে লাফায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওদের অবস্থা আরো ভয়াবহ রূপ নেয় এবং ওরা পুরা শরীরে চুলকাতে চুলকাতে কাপড়চোপড় খুলে ফেলে। অর্ধনগ্ন হয়ে লাফ পাড়তে পাড়তে কয়েকজন নাওয়ে ওঠে, দু-একজন ঝাঁপিয়ে পড়ে গাঙে। নাওয়ের মাঝি কখন যে পালিয়েছে কে জানে, হয়তো সে-ও মনে মনে অথবা জোরেশোরে আওয়াজ তুলে জয় বাংলা বলে।

গাছ থেকে লাফ দিয়ে নামে ও। ও হলো আধপাগল হাসুইন্না। তারপর দানবের মতো হাসে আর পাক্কুর পাড়ে। হঠাৎ উদ্ভ্রান্তের মতো গাঙের ঢালে ছুটে চলে ও, ওখানে কে? গাঙের ঢালা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছে চেয়ারম্যান, চোর যেভাবে পালিয়ে যায়। হাসুইন্না গিয়ে তার সামনে দাঁড়ায়। চেয়ারম্যান প্রথমে ভাবে মুক্তিরা হয়তো তার পিছু নিয়েছে। এত বড় গাঙ সাঁতার দিয়ে পাড়ি দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। এত দম কই, সেই দিন থাকলে কখন পড়ত গাঙে। তো, ওকে দেখে এদিক-ওদিক তাকায় চেয়ারম্যান—কই, মুক্তিরা কই। আরেকটু ভালো করে তাকালে বুঝতে পারে, আসলে মুক্তিদের কেউ নাই এখানে। তাহলে এতক্ষণ যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল তা কে করল, এই মাথা খারাপ হাসুইন্না! এবার তার চান্দিতে রাগ উঠে যায়, ‘ওরে হারামজাদা, নাফরমানের বাচ্চা, তরে পাগল কয় কোন শালায়, তুই দেখি একটা বদমাইশ, তুই বিলাই চিমটি দিয়া বেড়া দিছিলি! খাড়া, জাহান্নামে পাঠাইতাছি তরে’—এই কথা বলে বন্দুক তাক করে ওর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ও হুংকার দিয়ে পড়ে চেয়ারম্যানের ঘাড়ে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি। পাগলার সঙ্গে মানুষ পারে কেমনে। যাক, পাগলা এমন খ্যাপা খেপছে যে চেয়ারম্যানের গলায় এমন কামড় দেয় যে ঢোর ছিঁড়ে রক্ত বের হতে থাকে। ছিদ্র হয়ে যাওয়া ঢোর দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে না সে। গোঙানি আর গোঙানি। একসময় পড়ে যায়, বলির পশুর মতো ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে যায়।

তখন হাসুইন্না পরনের লুঙ্গিটা মাথায় বেঁধে কাচিবাছুরের মতো চক্কর পাড়ে।



মন্তব্য