kalerkantho


গল্প

স্বপ্নে দেখা কাঁচা রোদ্দুর

আফসানা জাকিয়া

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



স্বপ্নে দেখা কাঁচা রোদ্দুর

অঙ্কন : এসএম রাকিবুর রহমান

(আজও সবুজ পাড়ে সূর্যটা ডুবতে দেখে মনে হলো যেন সূর্যটার মঙ্গা অবস্থা হয়েছে। সেই দাপুটে সূর্য কেন জানি দিন মৃত্যুর আগ মুহূর্তে এমন করুণ দেখতে লাগে, তা এক ব্যক্তির বোধের বাইরে। প্রতিদিন তার এত এত বোধের ফুল ফোটে, তবু কেন যে দাপুটে...দিন মৃত্যু...নিয়ে ভাবতে হয় তার। অসংখ্য চোখে ফুটে ওঠে অসংখ্য আইনি চিৎকার। অন্যদিকে আরেক ব্যক্তি তেজি সূর্যটা হাতে নিয়ে হাঁটে। সেদিন মৃত্যুর সংজ্ঞায় বন্দিভুক্ত থাকতে চায় না। দিনের দাপুটে স্বভাবের কারণেই রাতেরবেলায় নিজেকে স্নিগ্ধ সুবাসিত চন্দ্রের মতো ভাবতে থাকে। মৃত্যু আর স্নিগ্ধের মতো সুবাসিতকে যথেষ্ট পরিমাপে তুলনা করলে দেখা যায়, মৃতের মৃত্যু ঘটে আর বেঁচে রয় স্নিগ্ধ সুবাসিত কলমধারী। বিশেষত এ কারণেই শ্মশানে তৈরি হয় সুজনি ছায়া। তেঁতুল পাতায় বসত গড়ে নয়জন। সবার দৃষ্টির অগোচরেই দিন দিন বেঁচে থাকে রাঘব বোয়াল। আর তাদের পেটের ভেতর ভস্ম হয় চুনোপুঁটি।)

মহসীন আলী আগে থেকেই কথাটা শুনে মাথা চুলকাতে থাকে। চুলকাতে চুলকাতে একসময় সাহস করে বলে ফেলে যে সে রাজি। অন্য কাউকে বাজিতে উঠে আসার আগেই প্রতিবদ্ধ হয় মহসীন আলী। গত পরশু রাতে ভাত খেয়েছে মহসীন। এরপর থেকে পেটে দানা জোটেনি, শুধু পানি জুটেছে। পানিটুকুও যে বিনা মূল্যে তা বলার জো নেই। লাইনের আগে গেলেও কপালদোষে সবার পরে কলস নলকূপের মুখে পাততে হবে। এই দুনিয়ায় মোড়টা বোঝা মুশকিল। আজ যারা গল্পের নায়ক, তারাই ছিল বাঁশতলার বাসিন্দা। লবণ দেওয়া মাড় খাওয়া ছিল তাদের বহুকালের অভ্যাস। এখন সেই মায়াময় দিনগুলো ঘুরে ভেসে চলে গেছে মহসীন আলী। তাই শুধু ডাল-ভাত আর খিচুড়ি-ভাত খাবে বলে তার আগ মুহূর্তে এক পোয়া চুন খাওয়া বাজি ধরেছে আসমত মেম্বারের সঙ্গে। মহসীন কয়েক দিন ডাল-ভাত খাওয়ায় লোভটা সামলাতে পারেনি বলেই এমন বাজি ধরেছে। কাউকে কিছু না জানিয়েই। ঘরে মেয়ে-বউ আছে। তাদের মুখে দানাপানি পৌঁছানোর একটা কৌশল পেয়েছে জেনেও মহসীন খুশি।

মহসীন সুন্দর যুক্তি দাঁড় করায়। মানুষের কথার ফাঁকে ফাঁকে সে ভাবে নরম নরম চুনের মাখনগুলো যদি বিস্কুট আকার করে টপাটপ গিলে ফেলা যায়, তাহলেই তো বাজিমাত। পেটের ভেতর চালান করতে পারলেই সব পরিশ্রম সার্থক। গরিবের পেট এমন এক জিনিস, যা লোহাকেও হজম করে দেয়। আর তো এক পোয়া চুনের দলা!

 

দুই

 

চাঁদনি রাত। ঝলমলে আকাশের সঙ্গেই পাল্টে যাবে মহসীনের পরিবারের সবার জীবন। মহসীনকে ঘিরে আছে গ্রাম-বাজারের শত শত লোক। সামনের সারির চেয়ারে বসা কয়েকজন মুরব্বি গোছের লোক। মাঝখানে বেঞ্চের ওপর বসা মহসীন, সামনে এক জগ পানি আর একটা গ্লাস। তার পাশে এক প্লেট মিষ্টি। অবশ্য বাজি খেলা শুরু হয়ে যাওয়ার আগেই মহসীনকে মাংস-ভাত খাওয়ানো হয়েছে। মহসীন প্লেট থেকে একটি মিষ্টি খায়। আরেকটি মুখে পুরতে গিয়ে তার বউ, মেয়ের কথা মনে পড়ে। সে ভাবে বাজিতে জিতে বাড়িতে গিয়ে সবাই একসঙ্গে মিষ্টিমুখ করা যাবে। তাই সে আর দেরি না করে চুনের নরম স্তূপের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দেয়। চাক চাক করে বিস্কুট আকৃতি করে নেয়। সে মনে মনে ভাবে, যদি চার টুকরা করা হয় তাহলে এক নিমেষেই খাওয়া সম্ভব। অনেকক্ষণ সাতপাঁচ ভেবে মহসীন আলী চার টুকরা করে মুখের সামনে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে ভুভুজেলা, বাঁশি, মুখের সিটি চারদিক থেকে তাকে আরো আলোড়িত আরো উদ্দীপ্ত করে তোলে। এবার প্রস্তুত মহসীন আলী। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সে এখন একা। কেন জানি এখন তার বউ ও মেয়ের কথা মনে পড়েছে। সে জানে না, তার মায়াময়ী মেয়ের মুখের ছবি ভেসে ওঠে চোখের নদীতে। কিন্তু সে নিজেকে ধিক্কার দেয়, অভাগা বাবা বলে। আর চোখ বন্ধ করে মুখে পুরে দেয় চুনের চাক করা বিস্কুট। এক চাক মুখে পুরে শেষ না হতেই আরেক চাক! তারপর আরেক চাক! এভাবেই তিন চাক মুখের মধ্যে আটকে থাকে। পানি দিয়ে সরানোর চেষ্টা করে মহসীন। কিছুক্ষণ পর সফল হয় মহসীন। কিন্তু হায়! পেটের ভেতর থেকে পাল্টা জবাব আসছে যে। কেন জানি পেটের ভেতর থেকে পাক দিয়ে দিয়ে বিষবাষ্প উঠছে। চুন কি অভিশাপে লাল হয়ে বের হচ্ছে। খুব জ্বালাতন হচ্ছে। মহসীন বেঞ্চের ওপর গড়িয়ে পড়ে। চারদিকে হৈচৈ। কিছু শোনা যাচ্ছে না। সবাই বলাবলি করছে দুর্দান্ত। দুর্দান্ত। শাবাশ। শাবাশ। এভাবে কিছুক্ষণ চলল। যে যার মতো কথা বলছে। কিন্তু হায়! মহসীন যে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। সবাই মহসীনকে ঘিরে রেখেছে। মহসীনের মুখভর্তি রক্ত। রক্ত গলগল করে পড়ছে। মহসীনের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মেয়ের কথা খুব মনে পড়ছে। বউয়ের কথা মনে পড়ছে। একবার যদি মেয়েটাকে অর্থাৎ আদরের ধনটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারত। কিন্তু হায়! সে আশা মনে হয় আর পূরণ হওয়ার নয়। মহসীন শেষবারের মতো আসমত মেম্বারকে ডাকে। আসমত মেম্বার কাছে আসতেই মহসীন আধো আধো কণ্ঠে কষ্ট করে বলে—‘আমার মেয়েটাকে দেখবেন মেম্বার। আমি চলে যাচ্ছি। আমার বাজির টাকাটা আমার মেয়ের হাতে তুলে দেবেন।’ আসমতুল্লাহ বলে, ‘আমি কি তোর টাকা মেরে দেব? তোর টাকা যথাস্থানে পৌঁছে যাবে।’ কথা শোনামাত্রই মহসীন আলীর বুকের ভেতর থেকে শেষ নিঃশ্বাসটুকু বেরিয়ে যায়। দলা পাকিয়ে লোকজন জটলা বাঁধে। সবার করুণাকামী হয় মহসীন। লোকজন পা বাড়ায় মহসীনের বাড়ির দিকে সংবাদটা পৌঁছে দেওয়ার জন্য। বাজারের সবার চোখে পানি ঝরলেও মেম্বারের চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি ঝরছিল কি না সেটা কেউ লক্ষ করেনি।

উঠতি বয়সী মেয়েকে যেভাবে আগলে রেখেছিল মহসীনের বউ আর মহসীন। তার কিছুটা ছেদ পড়ে মহসীনের মৃত্যুতে। মেয়ে মানুষ। তার মধ্যে হাঁপানি রোগী। শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যায় ওষুধ নিতে পারে না পয়সার অভাবে। তাই তো স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই মৃত্যুর পথ পাড়ি দেয় সে। অকালে মৃত্যুবরণ করতে হয় তার।

আসমত মেম্বারের কপাল খুলেছিল মহসীনের মৃত্যুতে। তার ওপর ডাবল ধামাকা। তার শিকারি তার হাতের ডগায়। তার শরীরের ভেতর এখনো বুনো উদ্দাম। তার শরীর এখন এপাশ-ওপাশ চুলকায়। রক্তের শিরা-উপশিরায় বয়ে যায় নোংরা ভাইরাস। যার একমাত্র অ্যান্টিবায়োটিক হলো মহিনুর। ঘোড়া দেখে খোঁড়া হওয়ার মতো অবস্থা। এমনিতেই মহিনুরের শরীরে উঠতি বয়সের চিহ্নগুলো ফুটে ওঠে। পেটের ক্ষুধার পাশাপাশি শরীরের ক্ষুধাও দেখা দেয়। তার ওপর একাকিত্ব বোধ তাকে সারাক্ষণ কুরে কুরে খায়। তাইতো আলা-ভোলা, সহজ-সরল, কর্মঠ হাফিজুর আলীর প্রেমে পড়ে যায়।

গরিবের প্রেম কী আর প্রকাশ করার জো রাখে। হাফিজুরও কেন জানি মহিনুরের মায়াবী চোখের মধ্যে সুন্দর সংসারের স্বপ্ন দেখে। মহিনুরের সঙ্গে তার মিল অনেক। তারা দুজনই অনাথ। মা-বাবা ছাড়া দুনিয়ায় কেউই ছিল না। তার মা-বাপও মারা গেছে। আসমত মেম্বারের বাড়িতেই হাফিজুর জমিজমা চাষবাস ও      গরু-মহিষের দেখাশোনা করে। তাই ভালোবাসা কিংবা বিয়ের কথা বলতে চাইলে আসমত মেম্বারকেই বলতে হবে। সে তার কাছে ভগবানের মতো। খাওন-পরনের ব্যবস্থা করেছে। হাফিজুর ও মহিনুর তাদের সহনশীলতার গুণেই একে অপরের সঙ্গে গড়ে তোলে নিবিড় সম্পর্ক। দুঃখ-জ্বরা এই প্রতিকূল অবস্থায়ও তারা নিভু নিভু লণ্ঠনের মতো জ্বলতে থাকে। তবু মহিনুর আসমত মেম্বারের কুকীর্তির কথা হাফিজুরকে বলতে গিয়েও বলতে পারে না। মুখের কপাট বন্ধ হয়ে যায়। দাঁতের পাটি শক্ত হয়ে বসে। বুকের ভেতর, অন্ত্রের অন্ধকারে দুঃখ বসে থাকে তার।

 

তিন.

 

মাঝেমধ্যে হাফিজুর ও মহিনুর দেখা করত রাতের অন্ধকারে এক জামতলায়। যেটা মেম্বারের বাড়ির পেছনে পুকুরপারটা পেরিয়ে কয়েক ক্রোশ দূরে। মেম্বারের বাড়ির দুর্যোগ দিবসের অবসান হলে, মত্ত উল্লাস বিদায়ী পর্ব শেষে তারা নীলাকাশের নিচে অপূর্ব নিস্তব্ধতায় প্রকৃতির বুকে দাপাদাপি করত। স্বপ্নিল অনুভূতিগুলো বাস্তবতার জগতের সঙ্গে সযত্নে লালন করত। এমন সময় অপূর্ব সংগীত লহরির সৃষ্টি অনুভব করে তারা। নদীতীরে জল ছোঁয়ার বাসনা করে তারা। মহিনুর হাফিজুরকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘চলো, হামরা পালে যাই। অনেক দূর...বহুদূর...। যেখানে আসমত মেম্বারের মতো কেউ থাকবে না।’ হাফিজুর যেন চমকে ওঠে মহিনুরের কথায়, তার তখন হিসাব মিলে যায়। দুই দিন আগে যখন সে মেম্বারের কাছে তার এত দিনের পারিশ্রমিক নিতে চাইছিল, মহিনুরকে বিয়ে করবে বলে অনুমতি চাইছিল আসমত মেম্বারের কাছে, তখন সে দেখেছিল আসমত মেম্বারের রক্তবর্ণ চক্ষু। কণ্ঠস্বরের সর্বোচ্চ ঝাঁঝ। মহিনুর হাফিজুরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। হাফিজুর এই প্রথম কোনো নারীর সংস্পর্শে আসে। নদীর বুকে চারপাশের উন্মুক্ততা, মৃদুমন্দ বাতাসের মাতামাতি, নদীর জলের কলকল-ছলছল ধ্বনি তরঙ্গে তারা যেন কোথাও হারিয়ে যায়।

 

চার.

 

ভোর হয় কারো লাঠির আঘাতে। ‘হারামজাদা—হামার খাস, হামার পরিস আর হামার বাড়ির কাজের লোকের সঙ্গেই মাতামাতি। আজ তোর একদিন কি হামার একদিন।’ লোকজন আগেই মনে হয় ঠিক করা ছিল। পাঁচ-দশ মিনিটের মধ্যেই হাজার লোকের সমাগম। কেউ বলছে, হাফিজুরকে এক শ ঘা বেত মারো। কেউ বলছে, ওদের বিয়ে দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দাও। কেউ কেউ আবার বলে, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারো। হাফিজুরের এক কথা, ‘হামি মহিনুরকে ভালোবাসি। ওকে বিয়ে করতে চাই।’ কিন্তু সে কথায় আসমত মেম্বার রাজি না হওয়ারই কথা। সবার গুঞ্জন থামিয়ে আসমত মেম্বার বলে ওঠে, ‘মহিনুরের গর্ভের সন্তান বল তোর। তোর কুকর্মের ফসল।’ এই কথা শোনামাত্রই হাফিজুরের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। ভাবে, ছিন্নমূল মানুষগুলোর একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্যই কি এই পরিণাম? হাফিজুর মহিনুরকে বলে, ‘শেষ পর্যন্ত তুমিও!’ মহিনুর কোনো কথা বলে না। শুধু অঝোরে নয়ন ঝরে তার। মহিনুর হাফিজুরকে ঠকাতে চায়নি। তাই সে স্বেচ্ছায় মৃত্যুর পথ বেছে নেয়। তার মাথায় প্রতিধ্বনি হয়—

তোর বাবাকে এক পোয়া চুন খাইয়ে কে মেরেছে?

তোর মাকে গলা টিপে কে হত্যা করেছে?

‘হামি! হামি! হামি!

দুই দুইটা মানুষকে হামি মেরে ফেলেছি। হামি একজন খুনি। আরো একটা মানুষকে হামি হত্যা করতে যাচ্ছি। হামি রাক্ষসী। হামি রাক্ষসী। হামি খুনি। হামি রাক্ষসী’ বলে চিৎকার দিতে দিতে দৌড়ে সবার অগোচরে চলে যায়। কখন যে সবার দৃষ্টির বাইরে গিয়ে সেই জামতলায় পৌঁছেছে কেউ জানে না। জামগাছের এক মোটা ডালকে আপন করে পরনের শাড়ির সঙ্গে বেঁধে নিয়েছে কেউ জানে না।

 

 

পাঁচ.

 

অনেক শক্তপোক্ত প্রমাণ পেয়েই লাশটা কাটা হয়েছিল এবং হাফিজুরকেই আদালত চড়টা মেরেছিল!



মন্তব্য