kalerkantho

গল্প

মানবী

মাজহারুল ইসলাম

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



মানবী

অঙ্কন : ফারজানা জাহান

মকবুল হোসেন ভারী লেন্সের চশমার ভেতর দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। মাঝেমধ্যে শব্দ করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর দু-একটি প্রশ্ন করছেন। লাল টি-শার্টের সঙ্গে নীল জিন্সের প্যান্ট পরা। হাতে ওয়াকিটকি। দারোগা মকবুল নামে এলাকার সবাই তাঁকে চেনে। ভীষণ রাগী ও করিৎকর্মা মানুষ। বাঘে-মহিষে এক ঘাটে পানি খাইয়ে ছাড়েন তিনি।

 

এখানে আসার পর নিজেই এসব সফিককে বলেছেন। তাঁর কথা শুনে সফিক নিশ্চিত, চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধার করেই মকবুল দারোগা এখান থেকে যাবেন।

চায়ে চুমুক দিয়ে বিষম খেলেন মকবুল।

কাশতে কাশতে জিজ্ঞেস করলেন, নাম কী?

জরিনা।

বাড়ি কোথায়?

চাঁদপুর।

চাঁদপুর কোথায়?

মালতীপাড়া।

বাপের নাম কী?

আব্দুল কুদ্দুস।

মকবুল সাহেব যেখানে বসেছেন তার ডান দিকের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জরিনা। তার চেহারায় ভয়ের কোনো ছাপ নেই। স্বাভাবিকভাবে দারোগার সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। সফিকের মা নিজের ঘরে শুয়ে আছেন। অসুস্থ শরীরে তিনি এখানে আসবেন না। দারোগার সঙ্গে দুজন সিপাই এসেছে। তারা খানিকটা দূরে বসে আছে। মকবুল হোসেন চায়ে চুমুক দিয়ে আবার প্রশ্ন করলেন—

এই বাড়িতে কাজ করিস কত দিন হলো?

তিন মাস।

এর আগে কোথায় ছিলি?

এই স্যারের সাথেই ছিলাম অন্য বাড়িতে।

সেখানে কত দিন ছিলি?

সাত মাস।

তোর বাপ-ভাই কেউ এর মধ্যে দেখা করতে আসছিল এই বাড়িতে?

আমার ভাই নাই। বাপের শইল খারাপ ম্যালা দিন।

ঠিকঠাকমতো উত্তর দিবি। মিথ্যা বলবি তো খবর আছে। জিব টাইনা ছিঁড়া ফালামু। আমার নাম মকবুল দারোগা।

এবার মনে হলো জরিনা কিছুটা ভয় পেয়েছে।

স্যার, আমি সত্য বলতেছি।

এই প্রথম সে দারোগাকে ‘স্যার’ বলল। তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞেস করল—স্যার, আরেক কাপ চা খাইবেন? কড়া কইরা বানাইয়া দিমু।

না।

সফিক চিন্তা করছে, দারোগা সাহেব মূল কথায় আসছেন না কেন? টাকা চুরির বিষয় নিয়ে কেন জেরা করছেন না? সফিক বারবার ঘড়ি দেখছে—তার শ্বশুরের আসতে দেরি হচ্ছে কেন? অবশ্য রাস্তাঘাটে আজকাল যা জ্যাম লেগে থাকে! তার শ্বশুর সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর। নাম ইস্কান্দার আলী। অবসর নিলে কী হবে, তাঁদের ক্ষমতা কখনো কমে না। বলে না—মরা হাতিরও লাখ টাকা দাম! তিনিই তো থানায় ফোন করে দারোগা সাহেবকে এনেছেন। সফিক ফোন করলে কি আর দারোগা সঙ্গে সঙ্গে আসতেন? তার ধারণা, শ্বশুরমশাই এসে পৌঁছলেই দারোগা সাহেবের আসল চেহারা দেখা যাবে। জরিনাকে এমন শাস্তি দেবেন যে ভয়ে সে সব স্বীকার করে ফেলবে।

মকবুল হোসেন সফিককে বললেন, আপনাদের অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ানকে নিচ থেকে ডেকে আনুন। ওর সঙ্গে কথা বলা দরকার।

একজন সিপাই বলল—স্যার, আমি যাচ্ছি। এখনই দারোয়ানকে ধরে আনছি।

মকবুল হোসেন ধমক দিয়ে বললেন, তোমাকে যেতে হবে না। সফিক সাহেবই যাবেন।

সফিক দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। নতুন অ্যাপার্টমেন্ট। এখনো লিফট লাগেনি। আরো অনেক কাজই অসম্পূর্ণ। কিছুক্ষণের মধ্যে দারোয়ানকে নিয়ে সফিক হাঁপাতে হাঁপাতে ওপরে উঠে এলো। দারোয়ানের নাম আবুল। সবাই ডাকে আবুল মিয়া। এই বিল্ডিং বানানোর সময় মাটি কাটা শুরু হওয়ার দিন থেকে এখানে কাজ করছে সে। ল্যান্ডলর্ডের পরিচিত। সফিক এখানে ভাড়া থাকে তিন মাস হলো। সে দারোয়ানকে আবুল ভাই বলে ডাকে। দারোগার সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ে আবুলের অবস্থা কাহিল। তার হাত-পা কাঁপছে। দারোগা আবুলকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন—

বাড়ি কোথায়?

নেত্রকোনা, স্যার।

কত দিন হলো এখানে কাজ করছ?

প্রায় চাইর বছর, স্যার।

জরিনাকে চেনো?

জি স্যার।

কিভাবে চেনো?

সফিক স্যারের বাসায় কাম করে, সেইখান থেইকা চিনি।

হুম্। অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে কোথাও যাবে না।

জি স্যার।

আবুল যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দারোগাকে সালাম দিয়ে দ্রুত হেঁটে বের হতে গিয়ে দরজার চৌকাঠের সঙ্গে বাড়ি খেল।

 

দুই মাস আগে সুমির সঙ্গে সফিকের আক্দ্ হয়েছে। আক্দ্ মানে তো একরকম বিয়েই। অনেকে আকেদর পর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে রাত্রিযাপনও করে। সফিকদের পরিবারে এ বিষয়ে ভিন্ন নিয়ম। ঘটা করে বউ তুলে না আনা পর্যন্ত একসঙ্গে থাকার নিয়ম নেই। সুমির বড় ভাবি জানিয়েছিল, যেদিন আক্দ্ হলো সেই রাতে তারা সফিককে তাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চায়। সফিকের বড় চাচা বলেছেন, আমাদের মধ্যে এ রকম নিয়ম নেই। আর ওর মায়েরও একই মত। দূর থেকে সফিকের কানে কথাগুলো এসেছিল। মনে মনে সে বলেছিল, বড় চাচার সব কিছুতেই গোঁড়ামি। চাচার মুখের ওপর কিছু বলার সাহস তার নেই। সফিকের বয়স যখন তেরো, তখন সড়ক দুর্ঘটনায় ওর বাবার মৃত্যু ঘটে। তার পর থেকে বড় চাচাই তো অভিভাবক। যদিও মুখের সান্ত্বনা ছাড়া কিছুই পায়নি চাচার কাছ থেকে। এ মাসের ১৬ তারিখ তাদের বিয়ে। সময় ও খরচ বাঁচাতে দুই পক্ষ একসঙ্গে অনুষ্ঠান করছে। আর মাত্র তেরো দিন বাকি। বিয়ের বাজার প্রায় শেষ। পূরবী জুয়েলার্সে গয়না অর্ডার দেওয়া আছে। সফিকের মা অসুস্থ শরীর নিয়েও নিজে গিয়ে গয়না অর্ডার দিয়ে এসেছেন। আজ ডেলিভারি আনতে যাওয়ার কথা। দুপুরে বসকে বলে ছুটি নিয়ে বাসায় এসেছে সফিক। অনেক দিন পর এই সময় মায়ের সঙ্গে কই মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছে। গত দুই শুক্রবার অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে ছিল। সফিকের মা জাহানারা বেগম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। নানা রকম সমস্যা তাঁর। ব্লাড প্রেসার হাই, ডায়াবেটিস, কিডনিজনিত সমস্যা, হাঁটুতে ব্যথা ইত্যাদি।

সফিক দুপুরে বাসায় খাবে বলে মা জরিনাকে দিয়ে শুঁটকি মাছ রান্না করিয়েছেন। গফরগাঁওয়ের বেগুন দিয়ে ঝাল করে শুঁটকির চচ্চড়ি সফিকের খুব পছন্দ। অনেক দিন পর মা-ছেলে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছেন। ছুটির দিন ছাড়া এ সুযোগ হয় না।

এরপর সফিক নিজের ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আলমারি খুলে টাকা বের করতে গেলে দেখে, ড্রয়ারে পঞ্চাশ হাজারের একটা বান্ডেল এতিমের মতো পড়ে আছে। পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে বাকি নয় বান্ডেল নেই। টাকা নিয়ে  ধানমণ্ডি থেকে মামাতো বোন সালমা আপাকে তুলে চাঁদনী চকে পূরবী জুয়েলার্সে যাবে গয়না আনতে। অথচ টাকা উধাও! সফিকের মাথাটা যেন চক্কর দিয়ে উঠল। আবার মনে হলো, আলমারির অন্য কোথাও রাখেনি তো! আলমারির সব কাপড় নামিয়ে ফেলল। জরিনা একবার এসে উঁকি দিয়ে বলল—ভাইয়া, চা খাইবেন? দিমু এক কাপ লাল চা বানাইয়া?

সফিক বিরক্ত হয়ে বলল, চা লাগবে না। তুই এখান থেকে যা।

জরিনা চলে গেল।

আলমারির প্রতিটি কাপড়ের ভাঁজ খুলে আলাদা করে দেখল সফিক। কোথাও টাকা নেই। সে, মা ও জরিনা ছাড়া এ বাড়িতে চতুর্থ কোনো প্রাণী থাকে না। কে নেবে টাকা? আলমারি তো লক করাই ছিল। সে নিজে চাবি দিয়ে খুলেছে। বিয়ে উপলক্ষে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে পাঁচ লাখ টাকা লোন করেছে সফিক। গত পরশু দিন ব্যাংক থেকে টাকাটা তুলে এনে নিজে আলমারির ড্রয়ারে রেখেছিল।

কী করবে বুঝতে পারছে না সফিক। মাকে বলবে? নাকি জরিনাকে ডেকে জিজ্ঞেস করবে? মা শুনলে নিশ্চিত হার্ট অ্যাটাক করবেন। তার পরও মাকে না বলে উপায় কী!

সফিক ফ্যাকাসে মুখে মায়ের ঘরে ঢুকল। জাহানারা বেগম ছেলের চেহারা দেখে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন—কী হয়েছে, বাবা?

সফিক মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। জাহানারা বেগম কিছুই বুঝতে পারছেন না। এইতো কিছুক্ষণ আগে একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে ঘরে গেল ছেলেটা। সফিক দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে মাকে সব বলল। জাহানারা বেগম খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, তোমার শ্বশুরকে আগে জানাও। তিনি কী বলেন, শোনো। চিন্তা কোরো না, বাবা। আল্লাহপাক সব ব্যবস্থা করবেন।

এর মধ্যে সালমা আপার ফোন—কিরে, তুই বের হোসনি! আমার তো সন্ধ্যায় একটা বিয়ের দাওয়াত আছে। তোর দুলাভাইয়ের আত্মীয়। সময়মতো যেতে হবে। তুই তাড়াতাড়ি বের হ। একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল।

সফিক সালমা আপাকে টাকা হারানোর বিষয়টা বলতে গিয়ে আবারও হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।

সালমা বলল—কাঁদিস না, ভাই। আমি তোর অবস্থা বুঝতে পারছি। কত কষ্ট করে তুই টাকা জোগাড় করেছিস! আমি তো সব জানি। তোর শ্বশুরকে এখনই ফোন কর। সামরিক বাহিনীর লোক। থানায় ফোন করলে পুলিশ এসে জরিনাকে ধরলে সব বের হয়ে যাবে।

সফিক বলল—আপা, আলমারি তো তালা মারা ছিল। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

সালমা বলল, বোকা কোথাকার! তিনজন মানুষ বাসায় থাকিস। জরিনা ছাড়া এই কাজ কে করবে? ফুফু তো সারা দিন বিছানায় পড়ে থাকেন। ও নিশ্চয়ই লোক নিয়ে এসে ডুপ্লিকেট চাবি বানিয়েছে। মাথা ঠাণ্ডা রাখ। জলদি শ্বশুরকে সব বল। আর শোন, পুলিশ বাড়িতে না আসা পর্যন্ত জরিনাকে কিচ্ছু বলবি না। পরে দেখবি পালিয়ে যাবে।

সালমার খুব খারাপ লাগছে সফিকের জন্য। তার নিজের কান্না পাচ্ছে। এই মুহূর্তে সফিকদের বাসায় একবার যাওয়া দরকার। ফুফু নিশ্চয়ই খুব ভেঙে পড়েছেন। ড্রাইভার ছুটিতে। কী করবে বুঝতে পারছে না। ইশতিয়াককে অফিসের গাড়ি পাঠাতে বললে সে প্রথমেই ক্যাটক্যাট করে উঠবে। বলবে, কাজের লোক টাকা চুরি করেছে, সেখানে তুমি গিয়ে কী করবে?

শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের বিষয়ে ইশতিয়াক সব সময়ই উদাসীন। সালমা একটা সিএনজি নিয়ে রওনা হবে কি না ভাবছে। এটাও ইশতিয়াক পছন্দ করবে না। তা ছাড়া উত্তরা যেতে-আসতেও অনেক সময় লাগবে। সময়মতো বিয়েতে যেতে না পারলে এটা নিয়ে এক কথা দুই কথা থেকে শুরু হয়ে যাবে ঝগড়া। থাক, শুধু শুধু ঝগড়া বাধিয়ে লাভ কি?

সফিক শ্বশুরকে ফোন করে বিস্তারিত জানাল। তিনি সব শুনে বললেন, তোমার মামাতো বোন ঠিকই বলেছে। আমারও মনে হচ্ছে, তোমার কাজের লোকই টাকাটা নিয়েছে। চিন্তা কোরো না, আমি থানায় ফোন করছি। নিজেও আসছি।

সফিক কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবার সুমিকে ফোন করল। সুমি ফোন ধরেই বলল, আমি আব্বুর পাশেই ছিলাম। সব শুনেছি। তুমি চিন্তা কোরো না। আমিও আব্বুর সঙ্গে আসছি।

কী বলো! তুমি আসবে?

কেন আসব না, সফিক?

না...মানে, বিয়ের আগে তুমি আসবে, ভাবতেই পারছি না।

কী বলছ তুমি! তোমার এত বড় বিপদে আমি পাশে থাকব না? ফোন রাখো। সময় নষ্ট না করে আব্বুকে নিয়ে আমাকে আসতে দাও।

ঠিক আছে, আসো।

সফিকের কী যে ভালো লাগছে! সুমি তাঁর বাড়িতে আসছে। কিছুক্ষণের জন্য টাকা হারানোর কষ্ট ভুলে গেল সফিক।

 

মকবুল হোসেন চায়ের কাপ হাতে বারবার ঘড়ি দেখছেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তিনি সফিককে বললেন, ফোন করে দেখুন আপনার শ্বশুর কোথায়। আমার উঠতে হবে। রেললাইনের পাশের বস্তিতে মারামারি হয়েছে। ফোর্স চলে গেছে। আমাকেও যেতে হবে।

দ্বিতীয় দফা জরিনা চা বানিয়ে দিয়েছে মকবুল হোসেনকে। ঘরে বানানো খেজুরের গুড়ের পায়েস দেওয়া হয়েছিল। মকবুল হোসেন মুখে দেননি। তবে সিপাই দুজন বেশ আরাম করে পায়েস খেয়েছে।

সফিক শ্বশুরকে ফোন করতে যাবে, এর মধ্যেই কলিংবেলের আওয়াজ। ইস্কান্দার সাহেব মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। দারোগা উঠে সালাম দিলেন। বললেন—স্যার, আসুন। আপনার জন্য অপেক্ষা করছি।

ইস্কান্দার সাহেব ঢুকেই জরিনাকে রান্নাঘরে যেতে বললেন। তারপর দারোগার পাশে বসে ফিসফিস করে বললেন, এটা জরিনারই কাজ। ও ছাড়া এই কাজ আর কে করবে? আপনি ওকে শক্ত করে জেরা করুন। লাঠি দিয়ে দুইটা বাড়ি দেন—দেখবেন সব স্বীকার করবে।

জরিনাকে ডাকা হলো। দারোগা জরিনাকে বললেন, টাকাগুলো কোথায় রেখেছিস? ঠিকমতো বের করে দে, নইলে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে রিমান্ডে দিয়ে দেব। তখন বুঝবি মজা।

জরিনা বলল, আমি টাকা নেই নাই। আলমারি তো তালা মারাই ছিল। আমি কেমনে টাকা নিমু? মিছামিছি কইলেই হইল?

সফিকের শ্বশুর এবার প্রচণ্ড জোরে ধমক দিলেন। বললেন, তুই ছাড়া কে নেবে? আমার বিয়ান বেশির ভাগ সময় বিছানায় পড়ে থাকেন। সফিক থাকে অফিসে। তুই নিশ্চয়ই বাইরে থেকে লোক এনে চাবি বানিয়েছিস। সোজা কথায় রাজি হয়ে টাকাগুলো ফেরত দে। নইলে তোর খবর আছে।

ইস্কান্দার সাহেবের চিৎকারে সফিকের মা ও সুমি ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সুমি শাশুড়িকে ধরে এনে পুব দিকে একটা চেয়ারে বসাল।

দারোগা চোখ পাকিয়ে বললেন, স্বীকার না করলে থানায় নিয়ে যাব। সেন্ট্রি, ওকে হাতকড়া পরাও।

সেন্ট্রি দুজন এগিয়ে আসতেই জরিনা চিৎকার করে উঠল। খবরদার, আমারে ধরবেন না কইলাম! আমি সব কইয়া দিমু। সফিককে দেখিয়ে বলল, এই ব্যাটা প্রায় রাইতে আমারে তার রুমে নিয়া ইটিসপিটিস করে। কাইল রাইতেও আমার হাত ধইরা টানাটানি করছে। সফিকের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল—কন, কাইল রাইতে টানাটানি করেন নাই? করেন নাই টানাটানি? আমি রাজি হই নাই দেইখা আইজ পুলিশ ডাইকা আনছেন! আমারে চোর বানাইতাছেন!

সফিক চিৎকার করে ওঠে—শয়তান! মিথ্যা কথা বলার জায়গা পাস না! টাকা চুরি করে আবার আমার নামে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছিস, আজ তোকে আমি...বলে হাত উঠিয়ে মারতে যায়।

ইস্কান্দার সাহেব সফিকের হাত ধরে ফেলেন। ওকে টেনে এনে সোফায় বসান। সফিকের মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার সোনার টুকরা ছেলেরে নিয়া তুই এসব কী বলিস? ওরে শয়তান, তোরে কত বিশ্বাস করে রাখছিলাম। আমার ছেলের আক্দ্ হয়েছে। দুদিন পর নতুন বউ ঘরে আসবে। আর তুই এইটা কী বললি, শয়তান! আপনারা কেউ ওর কথা বিশ্বাস করবেন না। আমার ছেলে এই কাজ করতে পারে না। ওরে আমি জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব। দারোগা সাহেব, আপনি ওকে অ্যারেস্ট করেন।

সুমি এক পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কখন যে তার চোখ ভিজে উঠেছে, নিজেও বুঝতে পারেনি। নিজেকে সামলে নিয়ে শাশুড়ির পাশে বসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। জরিনা আরো কী যেন বলতে যাচ্ছিল, দারোগা তাকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়ে ইস্কান্দার সাহেবকে ডেকে নিয়ে গেলেন পাশের রুমে। তিনি বললেন—স্যার, ঘটনা তো বুঝতে পারছেন। আমি জানি, আপনার জামাই ভালো একটা মানুষ। সে এ রকম কাজ করতেই পারে না। সমস্যা হলো, এসব ক্ষেত্রে সেটা প্রমাণ করা কঠিন। সামনে আপনার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান। এ অবস্থায় মামলা, রিমান্ড—এগুলো করতে গেলে চারদিকে জানাজানি হয়ে যাবে। এ ধরনের মামলায় টাকা উদ্ধার করাও খুব কঠিন।

ইস্কান্দার সাহেব কোনো কথার জবাব দিচ্ছেন না। তিনি পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন। তাঁর মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে—মেয়েটা এসব শোনার পর স্বাভাবিক থাকতে পারবে কি?

দারোগা আবার কথা শুরু করলেন—স্যার, আমি বলি কি, জরিনাকে বিদায় করে দেন। সেটাই সম্মানজনক হবে। এসব বিষয় যত কম ঘাঁটাঘাঁটি করা যায় ততই ভালো। মামলা-মোকদ্দমা হলে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী জানবে। পত্রিকায় নানা কেচ্ছা-কাহিনি ছাপা হবে। আপনি মানী লোক। আপনার সম্মান রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। তাই এত সব কথা বললাম। সিদ্ধান্ত আপনার। আপনি বললে আমি হাতকড়া পরিয়ে এখনই জরিনাকে থানায় নিয়ে যাব।

ইস্কান্দার সাহেব বললেন—দারোগা সাহেব, আমার মাথা কাজ করছে না। আপনি যেটা ভালো মনে করেন সেটাই হবে।

মকবুল হোসেন ইস্কান্দার সাহেবের কানে কানে আরো কী যেন সব বললেন। তারপর তাঁরা দুজন বেরিয়ে গেলেন। দারোগা সিপাই দুজনকে বললেন, এই মেয়েকে সোজা সদরঘাট নিয়ে লঞ্চে তুলে দেবে। লঞ্চ না ছাড়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে। আর জরিনাকে বললেন, আমার স্যার দয়ালু মানুষ। তাই এবারের মতো তোকে ছেড়ে দিলাম। ঢাকা শহরে তোরে যেন আর না দেখি।

মকবুল হোসেনের কথা শুনে সফিক স্তম্ভিত। সে চিৎকার করে উঠল, জরিনাকে ছেড়ে দেবেন না। টাকা চুরি করে আমার সম্পর্কে সে মিথ্যা বানোয়াট নোংরা কথা বলল, আর তাকে আপনারা এভাবে ছেড়ে দিচ্ছেন! এটা হতে পারে না। আমি এটা মানতে পারছি না। আমি মানব না। আমার কষ্টের এতগুলো টাকা নিয়ে যাবে আর আপনারা ওকে ছেড়ে দেবেন! সফিক শ্বশুরের কাছে গিয়ে বলল—প্লিজ, দারোগা সাহেবকে বলেন ওকে গ্রেপ্তার করতে। আপনি চুপ করে থাকবেন না। কিছু একটা বলেন।

ইস্কান্দার সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন—সফিক, এটা আমার সিদ্ধান্ত। তুমি এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলবে না।

সফিক হতভম্ব হয়ে গেল। শ্বশুরের এ ধরনের সিদ্ধান্তের জন্য মোটেও তৈরি ছিল না। তাহলে কি তিনি জরিনার কথা বিশ্বাস করেছেন? জরিনার সঙ্গে তো তাঁর কোনো কথা হয়নি। তাহলে নিশ্চয়ই দারোগা তাঁকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়েছেন। শুরু থেকেই দারোগার আচরণ সফিকের কাছে সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল।

জরিনা তার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ব্যাগ তার আগে থেকেই গোছানো ছিল। দরজার কাছ থেকে ফিরে এসে সে বলল, আমার কোরবানির মাংস ফ্রিজে রাখা আছে। আমার হকের জিনিস। নিয়া যাই।

ডাইনিং টেবিলের পাশে ফ্রিজ রাখা। নতুন ফ্রিজ। বিয়ে উপলক্ষে সফিকের শ্বশুরবাড়ি থেকে ঈদের আগেই ফার্নিচারের সঙ্গে একটা ফ্রিজ ও ৪০ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন এসেছে। জরিনা সবার সামনে সেই ফ্রিজ খুলে মাংসের পোঁটলা নিয়ে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে সফিকের মাকে সালাম করতে গেলে তিনি জোরে ধমক দিয়ে বলেন—খবরদার, আমাকে তুই ছুঁবি না। তুই আমার সর্বনাশ করেছিস। তুই একটা নিমকহারাম। এখনই আমার সামনে থেকে দূর হ—বলে তিনি কান্না শুরু করলেন।

সুমি শাশুড়ির কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। সফিক রাগে ছটফট করছে। মুরগি জবাই করার পর জানটা বের হওয়ার আগ পর্যন্ত যেভাবে ছটফট করে, সফিকের অবস্থা হয়েছে সে রকম। শ্বশুরের কথার ওপর কিছু বলতে পারছে না সে। আবার তাঁর সিদ্ধান্ত মেনেও নিতে পারছে না। শ্বশুরের সঙ্গে দারোগার কী কথা হয়েছে সে জানে না। সফিক বুঝতে পারছে না, কেন দারোগার কথায় তিনি জরিনাকে এভাবে ছেড়ে দিতে বললেন!

দারোগা বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে সফিকের কাঁধে হাত রেখে বললেন, মানুষের জীবন বড়ই বিচিত্র। এসব নিয়ে ভাববেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

সফিক তাঁর কথার কোনো উত্তর দিল না। ইচ্ছা করেই দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেও গেল না। তার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে।

জাহানারা বেগম মূর্তির মতো বসে আছেন। সুমি মাথা নিচু করে তাঁর পাশে বসা। ইস্কান্দার সাহেব আর সফিক দাঁড়ানো। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। সফিক কোনোভাবেই সুমির দিকে তাকাতে পারছে না। তার ধারণা, সুমি জরিনার সব কথা বিশ্বাস করেছে। সেটাই তো স্বাভাবিক। যেকোনো মেয়ে তা-ই করবে। সফিক নিশ্চিত, তাদের বিয়েটা ভেঙে যাচ্ছে।

ইস্কান্দার সাহেব মেয়েকে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে-মুখে বিমর্ষতার ছাপ। এ রকম পরিস্থিতির জন্য তিনি তৈরি ছিলেন না। এর মধ্যে সফিকের মা বললেন—বিয়াই সাহেব, বউমা আজ আমার সঙ্গে থাকবে। আপনি না করতে পারবেন না। ইস্কান্দার সাহেব লক্ষ করলেন, ভদ্রমহিলা দুই চোখের পানি আটকে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর শরীর কাঁপছে। একপর্যায়ে আর অশ্রু সংবরণ করতে পারলেন না। সেদিকে না তাকিয়ে ভাবলেশহীন ইস্কান্দার সাহেব বললেন, তা কী করে হয়! মানুষজন, আত্মীয়-স্বজন নানা কথা বলবে। এটা ঠিক হবে না। তা ছাড়া মেয়েটাকে একটু একা থাকার সময় দিন। ওর মানসিক অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর সুমির দিকে তাকিয়ে বললেন, চলো মা। আমাদের এখন উঠতে হবে।

সুমি মাথা তুলে বলল—বাবা, তুমি চলে যাও। আমি আজ রাতে মায়ের সঙ্গে থাকব। আর শোনো, মানুষের কথায় কিছু যায়-আসে না।

ইস্কান্দার সাহেব কপাল কুঁচকে অবাক বিস্ময়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। সফিক লজ্জায়-অপমানে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। একপর্যায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চলে গেল। সুমি বাবার কাছে এসে দাঁড়ালে ইস্কান্দার সাহেব পরম মমতায় মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। সুমির চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা পানি তাঁর হাতে পড়ল।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। জানালা গলে জোছনার আলো ঘরে ঢুকেছে। সেই আলোতে সফিকের মা নামাজ পড়ছেন। সফিক অনেকক্ষণ ধরে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সুমি কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি। সুমি বলল, ছাদে যাবে?

সুমির দিকে মাথা তুলে তাকাতে পারছে না সফিক। আস্তে করে বলল, চলো।

দুজনে ছাদের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। সফিকের মাথায় ঘুরছে নানা কথা। সে ভাবছে, জরিনাকে কেন পুলিশ ছেড়ে দিল? তার সম্পর্কে আজেবাজে নোংরা কথাগুলো কি সবাই বিশ্বাস করেছে—বিশেষ করে তার শ্বশুর? সুমি? হঠাৎ সফিকের মনে হলো, সিপাইদের বাদ দিয়ে দারোয়ানকে নিচ থেকে ডাকার জন্য তাকে কেন তখন পাঠিয়েছিল দারোগা? তখন কি জরিনার সঙ্গে বিশেষ কোনো কথা হয়েছে তার? তা না হলে জরিনাকে ছেড়ে দেবে কেন? ইস্কান্দার সাহেব চলে যাওয়ার সময় তাকে কোনো কিছু না বলে চলে গেলেন কেন? তাহলে কি তিনি...। জরিনা যেভাবে তার চরিত্র নিয়ে সবার সামনে মিথ্যা কথাগুলো বলল, তার পরও সুমি তার সঙ্গে থাকবে, এটা চিন্তা করেনি। সুমি সাধারণ কোনো মেয়ে না। এ রকম নানা কথা, রাজ্যের সব প্রশ্ন সফিকের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার পাশে যে সুমি দাঁড়িয়ে আছে কিছুক্ষণের জন্য, তা সে ভুলে গিয়েছিল। এই প্রথম সে সুমির দিকে তাকাল। সুমি তাকিয়ে আছে দূরের কোনো লাইটপোস্টের দিকে। সিঁড়িঘরের পাশে লাগানো মাধবীলতার ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে ছাদজুড়ে।

প্রখর জোছনার আলোয় সুমিকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। অনেক পবিত্র লাগছে। সফিক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুমির দিকে। সুমি বলল, আমার হাতটা একটু ধরবে?



মন্তব্য