kalerkantho


বিশেষ রচনা

মানবতার মূল্যহ্রাস

হানিফ সংকেত

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



মানবতার মূল্যহ্রাস

আমাদের দেশে ঈদ এলেই জমে ওঠে ঈদের বাজার। ঈদকে উপলক্ষ করে শহরে-নগরে-বন্দরে, গ্রাম-গ্রামান্তরে, ঘরে ঘরে নানা দামে নানা দরে সবাই সাধ্যমতো কেনাকাটা করে। ঈদের অনেক আগেই, রোজার শুরু থেকেই কেনাকাটার ধুম নিয়ে ঘুম ছুটে যায় অনেকের। ঈদের আনন্দে সানন্দে কেনাকাটা করতে গিয়ে অনেকের মধ্যেই ইদানীং ঢুকেছে ঠকার ভয়। যা কিনছি তা কি খাঁটি, নাকি খাঁটি নয়। উত্কৃষ্ট দ্রব্যের সঙ্গে নিকৃষ্ট দ্রব্যের মিশ্রণের ফলেই এই ভয়, অর্থাৎ ভেজাল। ফলে এই ভেজালের জালে নাজেহাল হচ্ছে অনেকেই—কখনো ক্রেতা, কখনো বা বিক্রেতা। এসব বিষয় আমরা ‘ইত্যাদি’তে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছি। ইদানীং কাপড় কিনতে গেলেও মান অনুমান করতে না পেরে অনেকে আঙুলে ঘষে কাপড়ের মান ও রং পরীক্ষা করে। যেহেতু মান বিশেষজ্ঞ নয়, তাই রং নিয়ে অনেকেই তর্ক জুড়ে দেয়—এটা কি পাকা রং, নাকি এক ধোয়াতেই পরিষ্কার? এই রং নিয়ে বিভিন্ন সময় অনেকের সাংসারিক অশান্তি হয়। আমার এক বন্ধুর প্রতিবেশীর স্ত্রী গ্যারান্টি সিল দেখে একবার একটি শাড়ি কিনেছেন। কয়েক দিন পর এই শাড়ি দিয়েছেন লন্ড্রিতে। কাজের লোককে স্লিপ দিয়ে পাঠালেন শাড়ি আনতে। শাড়ি দেখে শীতকালেই ভদ্রমহিলার মাথায় বজ্রপাত। কাজের লোকের ওপর চড়াও হলেন তিনি, ‘এটা কার শাড়ি এনেছিস?’

কাজের লোকের সহজ উত্তর, ‘আপনার শাড়ি। স্লিপের নম্বর মিলাইয়াই আনছি।’

কাজের লোকের কথা শুনে গৃহকর্ত্রী আরো খেপে গেলেন, ‘আমি তো লন্ড্রিতে প্রিন্টেড শাড়ি দিয়েছি। এ রকম সাদা শাড়ি দিইনি। শাড়ি সাদা হলো কী করে?’

কাজের লোক গৃহকর্ত্রীর কথা শুনে অবাক। সাহস সঞ্চয় করে বলল, ‘খালাম্মা, রাগ কইরেন না, একটা কথা কই। আইজকাল অনেকেরই শরীরে জন্মদাগ থাকে। যেমন চোখের পাপড়িতে তিল, ঘাড়ে কালো দাগ, হাতের ওপর কাটা দাগ। এইডি দেইখা অনেকে হারানো মানুষ খুঁইজা পায়। সঠিক পরিচয়ও জানতে পারে। আপনার শাড়িতে সেই রকম কোনো চিহ্নটিহ্ন আছিল না?’

গৃহকর্ত্রী একটু বিরক্ত হলেও পরে খুশি হয়ে শাড়িটা কাছে টেনে নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তাইতো, আমার শাড়ির আঁচল একটুখানি ছেঁড়া ছিল। সেটা আছে কি না দেখি তো।’ শাড়িটা নেড়েচেড়ে দেখে আবারও গৃহকর্ত্রীর মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ সেই ছেঁড়া আঁচলের চিহ্ন তিনি শাড়িতে পেয়েছেন। তাহলে এটা সাদা হলো কেন?

পুরো বাড়ি এই লন্ড্রিফেরত সাদা শাড়ির রংবিভ্রাটে উত্তপ্ত। এরই মধ্যে কর্তা বাড়ি ফিরেছেন। ঘরের পরিস্থিতি দেখে এবং সব কিছু শুনে বিজ্ঞের মতো বললেন, ‘তাহলে বোধ হয় রং চলে গেছে।’

গৃহকর্ত্রী চিৎকার করে উঠলেন, ‘হতেই পারে না। পাকা রং গ্যারান্টি সিল দেখে শাড়ি কিনেছি।’

কাজের লোক তখন একটু গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আম্মা, এইবার বুঝছি, আপনি ঠিকই কইছেন—ওই সিলের রংটা পাকাই। দেখেন, পুরা শাড়ির রং গেছেগা, কিন্তু পাকা রঙের সিলটা যায় নাই। আমার মনে হয়, এই শাড়ি কম্পানির নামের ছাপটাই পাক্কা রং দিয়া করা।’

স্বামী কাজের লোকের কথায় একমত প্রকাশ করে মৃদুস্বরে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘তবে আর কী করা।’

স্ত্রী রেগে কটমট করে স্বামীর দিকে তাকান। আর কাজের লোক পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।

অর্থাৎ ঈদে রংও একটি বিষয়। রংটা রাইট না হয়ে রং (Wrong) হলে খুশি নয়, বরং Wrong রঙের জন্য মেজাজ টং হয়ে যায় অনেকের। রংজনিত কারণে এই স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বা কথার রগড়ারগড়িতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা কোন দিকে যায় বোঝা মুশকিল। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে অনেকে আবার বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়। কিন্তু সেখানেও ইদানীং ভেজাল ঢুকেছে। কারণ ঈদের ছুটিতে বিদেশ থেকে কেউ এলে পরিবারের সবাই তাকিয়ে থাকে—ঈদের ছুটিতে বিদেশফেরত আত্মীয় কার জন্য কী নিয়ে এসেছে। আর স্বজনদের অপেক্ষার বিষয়টি বিদেশফেরত আত্মীয়রও জানা। কিন্তু পরিবারের সবার জন্য বিদেশ থেকে এত জিনিস আনা একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ অর্থ সমস্যা ও ওজন সমস্যা। তাই অনেকেই আসার সময় বুদ্ধি খাটিয়ে বিদেশ থেকে এখন বিভিন্ন দোকানের নাম লেখা কিছু প্যাকেট নিয়ে আসে। উদ্দেশ্য, দেশ থেকে জামাকাপড় কিনে সেগুলো বিদেশি প্যাকেটে প্যাকেটজাত করে আত্মীয়-স্বজনকে প্রদান করা। ব্যস, বিদেশি প্যাকেট দেখলেই সবাই খুশি—ভেতরে কী আছে সেটা যাচাই করারও প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না অনেকে। যেন বিদেশি পণ্য পেলেই আমরা ধন্য। মূল্যস্ফীতির প্রকট প্রকোপে ব্যাগের আকার-প্রকার প্রকৃতপক্ষে প্রকৃত ক্রেতার প্রকৃতিতে প্রভাব ফেলে। সেই প্রীতির প্রভাবের কারণেই দেশের আত্মীয়দের জন্য এই বিদেশি পণ্য প্যাকেট। তবে এসব প্যাকেটে উৎসাহী না হয়ে আমাদের সবারই দেশি পণ্যকে গণ্য করে ধন্য হওয়া উচিত। শুধু বিদেশ থেকেই নয়, ঈদের জমজমাট ভিড়ে দমজমাট হয়ে গেলেও ঈদের কটা দিনে ভালো কিছু চিনে কিনে আনতে সবাই ব্যস্ত। কিনতে পারলে ক্রেতা খুশি, বিক্রি করে বিক্রেতা খুশি। তবে ঈদে কাপড় কিনতে গিয়েও অনেকে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে ফাঁপরে পড়ে যায়। যেমন এক দম্পতি ঈদের শপিং করতে গিয়ে একটি বড় কাপড়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ স্বামীকে একটি দোকানের সামনে থামিয়ে সেই দোকানে ঢুকতে বলল। এত দোকান থাকতে হঠাৎ ওই নির্দিষ্ট দোকানে কেন যেতে হবে জানতে চাইলে স্ত্রী দোকানের সামনের একটি সাইনবোর্ডের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে স্বামীকে দেখাল। স্বামী তাকিয়ে দেখে ওখানে লেখা রয়েছে, ‘যতবার খুশি বদলাইতে পারিবেন’। স্ত্রীর চাপে স্বামী দোকানে ঢুকেই প্রথমে দোকানিকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই, আপনারা এই যে লিখেছেন যতবার খুশি বদলাইতে পারিবেন, এটার মানে কী?’

বিক্রেতার কাছে যেন জবাব প্রস্তুত। সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল, ‘অনেকে জামা নেওয়ার পর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কথায় ফেরত দিয়ে অন্য রঙের বা অন্য চেকের জামা নিতে চায়। অনেকে আবার সাইজ না মিললেও বদলাইতে চায়। এসব ক্ষেত্রে অনেক দোকানে বড়জোর একবার বদলাইয়া দেয়, অনেকে দেয়ও না। সেই জন্য ঈদ উপলক্ষে আমাদের বিশেষ অফার—যতবার খুশি বদলান, পছন্দেরটা নিয়ে যান।’

বিক্রেতার কথা শুনে স্ত্রী খুশি হলো এবং কয়েকটি জামা বাছাই করল। সেখান থেকে হয়তো দুটি জামা কিনবে।

বিক্রেতা ক্রেতার ইতস্তত ভাব লক্ষ করে বলল, ‘আপা, এত না বাইছা চাইর-পাঁচটা লইয়া যান, ভালো না লাগলে নিয়া আইসেন। আমরা তো আছিই, বদলাইয়া দিমুনে।’

এমন সময় দোকানের আরেক পাশে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আরেকজন বিক্রেতার তর্কাতর্কি হচ্ছিল এই জামা বদলানো নিয়েই।

দোকানদার বলছে, ‘ওই মিয়া, বেচা জিনিস কি ফেরত হয়?’

ক্রেতা বলছে, ‘কিন্তু আপনি তো লিখেছেন—যতবার খুশি বদলাইতে পারবেন। এর মানে কী? আপনাদের কথায় আর কাজে তো কোনোই মিল নাই।’

‘কেমনে মিল নাই? আমরা তো বদলাইয়া দিতাছি, খালি পয়সা ফেরত দেই না।’

ক্রেতা খেপে উঠল, ‘পয়সা ফেরত তো দেনই না, বরং প্রত্যেকবার বদলাইলেই আপনারা বাড়তি পয়সা চান। এটাকে কি বদলানো বলে? আর বদলানো জিনিসের দাম কি সব সময় বেশি হয়? এইটা তো মিয়া ক্রেতাদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।’

অনেকক্ষণ একনাগাড়ে বলে ভদ্রলোক কাঁপতে থাকে। স্ত্রী স্বামীর উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যার ভয়ে কোনো রকমে তাকে দোকান থেকে বের করে নিয়ে আসে। শুধু এই দোকানেই নয়, ঈদের সময় বিভিন্ন দোকানেই দেখা যায় এ রকম বাড়তি চাপ, কারণ দামের উত্তাপ। আবার সুযোগসন্ধানী অনেক বিক্রেতাই এই সুযোগে ক্রেতা আকর্ষণের জন্য নানা উপায় উদ্ভাবন করে বিজ্ঞাপন দেয়। কেউ ফ্রি, কেউ গাড়ি, কেউ লটারি অর্থাৎ নিজেদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় প্রতিযোগিতায় নেমে একেক দোকান একেক রকম আকর্ষণীয় পুরস্কারের বিচিত্র সব ঘোষণা দেয়। অনেকেই যেসব দোকানে আকর্ষণীয় উপহার বা লটারির ঘোষণা দেওয়া হয় সেখানে যেতে চায়। এ নিয়েও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হয়। স্বামী খেপে গিয়ে স্ত্রীকে বলে, ‘শপিং করতে এসেছ, লটারি ধরতে নয়। কখনো কি শুনেছ এই লটারি কেউ পেয়েছে? লটারিতে কী পেয়েছে? কোথায় পেয়েছে? আর তোমার পরিচিতদের মধ্যে কি কেউ কখনো এসব লটারি জিতেছে?’

আসলে লটারি যে কখন হয় তার খোঁজও অনেকেই রাখে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, লোক-দেখানো ঘোষণা করা হয়। নিজেদের লোকেরাই কিছু পুরস্কার পায়। তা ফেরতযোগ্যও হতে পারে। সুতরাং অনেকের কাছে এসবও হচ্ছে ক্রেতা আকর্ষণের লোভনীয় উপায়। যেহেতু লটারিতে কাউকে কেউ দেখেনি জিততে, তাহলে কী লাভ এই ভাগ্য খেলায় মেতে?

শুধু লটারিই নয়, এসব বাজারে যেসব লটারি, ফ্রি বা মূল্যহ্রাসের ঘোষণা দেওয়া হয় তাতে মূল্যবান, মূল্যহীন বা মূল্যহ্রাসের মূল্যায়ন করতে গিয়ে অনেকেরই অমূল্য সময় নষ্ট হয়। ঈদ ঘিরে, মানুষের ভিড়ে ধীরে ধীরে জমে ওঠে বাজারমূল্য নিয়ে ফন্দিফিকিরও হাজার। যে জামা অনেকেই দুই মাস আগেও দুই হাজার টাকায় কিনেছে, সেটিই দেখা যায় কোনো এক বিশাল সজ্জিত দোকানে দুই হাজার টাকা লিখে মূল্যহ্রাস লাগিয়ে রাখা হয়েছে। অনেকে এসব বিজ্ঞাপনে ফেঁসে, স্বভাবদোষে ঠকে; তারপর ভাগ্যটাকে বকে। অনেকেই লেখে, অবিশ্বাস্য মূল্যহ্রাস। আর দোকানের ভেতরে এ নিয়ে কথা হয়, বাদ-বিবাদ হয়। তখন ক্রেতা হয়তো উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘এটা অবিশ্বাস্য।’

বিক্রেতাও সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে, ‘অবিশ্বাস্য তো আমিও জানি, আপনারা বিশ্বাস করবেন না বলেই লিখে রেখেছি, অবিশ্বাস্য মূল্যহ্রাস।’

কাকে কী বলবেন? এসব শুনে অনেকেরই বাক্রুদ্ধ হয়ে যায়। ভাষা খুঁজে পায় না উত্তরের। মনে হয় সব কিছুর দামই বাড়তির দিকে। শুধু জীবনেরই মূল্য হ্রাস পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিবেচনায় জীবনের কোনো দাম আছে? সবচেয়ে সস্তা হচ্ছে জীবন। সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদপত্রের কিছু শিরোনাম দেখলে এটাই মনে হয় বাস্তব, এটাকেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। আসলে জীবনেরই বোধ হয় দিন দিন মূল্য হ্রাস পাচ্ছে। পত্রিকায় যখন নবজাতক শিশুকে নিয়ে বিভিন্ন লোমহর্ষক-কষ্টদায়ক সংবাদ পড়ি, কষ্ট পাই। চোখ ভিজে যায় নিজের অজান্তেই। কারণ সবচেয়ে কষ্টকর ও ঘৃণ্য কাজটি হচ্ছে নবজাতকের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা।

শিশুর জন্মের সময় হাসপাতালে এসে, টাকার জন্য প্রসূতি যান ফেঁসে, টাকার জন্য শিশু অদলবদল হওয়া অনেক হাসপাতালেই ঘটছে। সিসিইউ, আইসিইউ, ইনকিউবেটরে নানা কারণে বাড়ছে বিলের মিটার। এর সঙ্গে আছে কিছু কিছু হাসপাতালের শিশুদের জীবন নিয়ে অবিশ্বাস্য ঘৃণ্য সব কর্মকাণ্ড। এই বিষয়টি এবার আমরা ঈদের ‘ইত্যাদি’তেও তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। দেশের শীর্ষস্থানীয় কিছু পত্রিকার শিরোনাম দেখলেই বোঝা যায় মানুষের বিবেক এখন কোন পর্যায়ে নেমে গেছে। নবজাতকের মৃত্যু নিয়ে সাম্প্রতিককালে পত্রিকায় প্রকাশিত তেমনই কয়েকটি শিরোনাম :

‘নবজাতকের মৃত্যুর পর টাকার জন্য প্রসূতিকে আটকে রাখল ক্লিনিক’

‘নবজাতকের মৃত্যু, লাশ আটকে টাকা আদায়ের চেষ্টা’

‘মৃত নবজাতককে আইসিইউতে ফেলে অর্থ আদায়ের অভিযোগ’

‘হাসপাতালের ডাস্টবিনে নবজাতক’

‘ঢামেক হাসপাতালে নবজাতক বদল—জন্মের পর খবর এলো ছেলের, কিন্তু কোলে দিল মেয়ে’

আবার দেশের বাস দুর্ঘটনার দিকে তাকালে জীবনের মূল্যহ্রাসের আরো কিছু উদাহরণ দেওয়া যায়। সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে চলছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। কারো হাত, পা, মাথা চলে যাচ্ছে, থেঁতলে যাচ্ছে কোমর।

অতি সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু সড়ক দুর্ঘটনার শিরোনাম :

‘দুই বাসের রেষারেষি, হাত হারালেন কলেজছাত্র রাজীব’

‘হাত নয়, প্রাণও গেল রাজীবের’

‘রাজীবের পর হাত হারালেন হৃদয়, সিরাজের দুই পা ঝুঁকিতে’

‘এবার দুই বাসের চাপায় মেরুদণ্ড ভাঙল গৃহবধূর’

‘এবার বিআরটিসি বাস কেড়ে নিল তরুণীর পা’

‘বগুড়ায় বাসের ধাক্কায় ছিঁড়ে গেল শিশুকন্যার হাত’

‘এবার নারী পোশাক শ্রমিকের পা থেঁতলে দিল বাস’

‘পায়ের পর প্রাণও হারাল নিলয়’

‘চাকার নিচে মা, বাস ঠেলছে ছেলে’

‘নৈরাজ্যের শেষ নেই পরিবহনে। ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের পায়ের ওপর দিয়ে গেল বাস’

‘বেপরোয়া চালক, অসতর্ক পথচারী, অনিরাপদ সড়ক’

‘কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ’

সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে—গাড়ির অতি গতি, গাড়ি চালানোর লাইসেন্স না থাকা, চালকের দক্ষতার অভাব, সড়ক-মহাসড়কের করুণ অবস্থা, গাড়ির ফিটনেস না থাকা ইত্যাদি কারণ। এসব কারণেই সড়কে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ। আর এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ ‘নিয়ন্ত্রণহীন গতি’, অর্থাৎ গতিসীমা না মেনে গাড়ি চালানোর ফলেই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে। এভাবে কোনো সভ্য দেশ চলতে পারে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক আইন কার্যকর করা, প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করাও প্রয়োজন বলে মনে করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দেশের কিছু হাসপাতালের দিকে তাকালে আরো ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। অনেকেরই প্রশ্ন, হাসপাতালে মানুষ যায় চিকিৎসা নিতে, নাকি জীবন দিতে?

ভুক্তভোগী অনেক রোগী বা স্বজনের কাছেই এখন ‘হাসপাতাল বিল’ রীতিমতো ‘মুক্তিপণ’ হিসেবে বিবেচিত। ছোট থেকে বড় সব প্রাইভেট হাসপাতালেই রোগীদের টেনে নেওয়া হয় নানা প্রচারণায় প্রলুব্ধ করে, ফুসলিয়ে কিংবা দালালের জালে ফেলে। পরে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডাক্তারের ভিজিটিং ফিসহ নানা খাতে বিলে ভারী হতে থাকে কাগজ। শোধ করতে না পারলে ঘটে জিম্মি করার ঘটনা।

মৃত রোগীকে আইসিইউয়ে রেখে টাকা আদায়ের ঘটনা এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। লাইফ সাপোর্টের নামে মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু হাসপাতাল ব্যবসায়ী যেনতেনভাবে আইসিইউ, সিসিইউ সাজিয়ে প্রতারণার জাল পেতে বসেছে। আর এই হাসপাতালগুলোতে লাশ আটকে রেখে আইসিইউয়ের ব্যবসা চলছে জমজমাট। তবে চিকিৎসা খরচ দিতে না পারলেও কোনো ক্লিনিক কিংবা হাসপাতালে রোগীর লাশ জিম্মি করে রাখা যাবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট।

মিথ্যার চাদরে ঢাকা মূল্যহ্রাসের সর্বনাশী চক্রে আমরা অনেকেই ঘুরপাক খাই। কিন্তু সেই অর্থে পণ্যের মূল্যহ্রাস হয়নি। বরং দামের উত্তাপ বেড়েই চলেছে। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় এ কথা বলতেই হয়, আসল মূল্যহ্রাস হয়েছে মানুষের। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ে মূল্যহ্রাস হয়েছে মানবতার। তাই বলতেই হয়—মূল্যহ্রাস মূল্যহ্রাস, মানবতার মূল্যহ্রাস।



মন্তব্য