kalerkantho

গল্প

হাতবদল

মোহীত উল আলম

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



হাতবদল

অঙ্কন : নাজমুল আলম মাসুম

অরিতার বিয়ে হওয়ার চার মাসের মধ্যে পেটে ধরা নতুন ভ্রূণটার স্খলন হয়। সেদিন আকাশে দুপুরের পর মেঘ জমেছিল, মেঘ থেকে বৃষ্টিও ঝরেছিল। অরিতার কান্না বৃষ্টির সঙ্গে মিশে গেছিল। প্রকৃতি আর মানুষ দুঃখে এক হয়ে গেলেও অরিতার অনুশোচনা হয়েছিল, কেন সে তার আগের দিন বিকেলে রবিনের সঙ্গে একে একে দুটি চারতলার সিঁড়ি ভেঙে তার বন্ধু সুস্মিতার নবজাতক সন্তানকে দেখতে গেছিল! প্রথম চারতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে জানতে পারল যে সুস্মিতারা থাকে ঠিক পাশের ভবনটির চারতলায়। তার মনে মনে আশা ছিল, সুস্মিতার নবজাতককে দেখে তার ভবিষ্যৎও সে অনুমান করে নেবে। দুটি পর পর চারতলা সিঁড়ি ভাঙার কষ্ট সে ঠিক টের পেয়েছিল, মাথাও একটু ঘুরেছিল, ঘামছিলও প্রচুর। কিন্তু বুঝতে পারেনি, কতটা তার ক্ষতি হয়ে গেল।

রবিন একটা ফাইবার অপটিকস কম্পানিতে কাজ করছে বছর দুয়েক। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারে ডিগ্রি নেওয়ার পর তার এই চাকরি। বিকেলে অফিস থেকে ফিরে অরিতার কান্না থামাতে তাকে স্টার কাবাব থেকে চিকেন টিক্কা আর পরোটা আনতে হয়েছিল। রবিন বলল—ধুস, এটা নিয়ে চিন্তা কোরো না। বাচ্চা আবার হবে।

রবিনের আশাবাদ সত্য হয়নি। চার বছর পার হলেও অরিতার পেটে আর বাচ্চা ধরেনি। রবিনও এ বাপারটা মেনে নিয়ে সংসার চালিয়ে গেছে।

একটা সপ্তাহ এলো শুক্রবার আর শনিবারের সঙ্গে মিলে রবিবারও সরকারি ছুটি পড়ল। একটা পূর্ণিমার যোগ আছে, যদি তাদের ভাগ্যে থাকে। বৃহষ্পতিবারটাও সঙ্গে যোগ করে রবিনদের অফিস থেকে তারা কয়েক সহকর্মী মিলে ঠিক করল, কক্সবাজার বেড়াতে যাবে। মোট তারা চার দম্পতি হলো, এবং রবিন আর অরিতা ছাড়া বাকিদের একটা কি দুটি করে বাচ্চা। কক্সবাজারে নতুন একটা পাঁচতারা হোটেল হয়েছে; নাম ‘সমুদ্রের ঢেউ’। সেই হোটেলে তারা তিন রাতের জন্য রুম বুকিং দিল। ঢাকা থেকে একটি চালু বিমান কম্পানির জাহাজে করে যেদিন তারা কক্সবাজারে পৌঁছল, আকাশে মেঘ থাকলেও, বিমান সামান্য কাঁকড়ার মতো আচরণ করলেও বিমানচালক ঠিকমতোই বিমানটি নামাতে পারলেন। হোটেল ‘সমুদ্রের ঢেউ’ কক্সবাজার থেকে মাইল বারো দূরে, হিমছড়ির কাছাকাছি। বিমানবন্দর থেকে যাত্রী আনার জন্য হোটেলেরই মাইক্রোবাস ছিল। রবিনের সহকর্মীরা সবাই রবিনের মতোই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। অরিতা যেমন একটি ব্যাংকে চাকরি করে, হামিদের বউ লীনাও ব্যাংকে চাকরি করে। তাদের দুটো বাচ্চা—মেয়ে বড়, পাঁচ বছরের, নাম সোনা; আর ছেলে ছোট, তিন বছরের, নাম কৃতী। মালেকের বউ সাজনা চাকরি করে একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। তাদের একটি ছেলে, তারও তিন বছর বয়স, নাম বাচন। আর তৃতীয় বন্ধুর নাম হিরণ্ময়, তার বউয়ের নাম কলাবতী। তাদের আবার দুটো বাচ্চা—দুটোই মেয়ে; জবা পাঁচ বছরের আর কুসুম তিন বছরের। কলাবতী পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরে চাকরি করে।

হোটেল কাউন্টার থেকে যার যার রুমের চাবি নেওয়ার পর হামিদ সবাইকে বলল, ঠিক দুটোয় খেতে নামব। এখন সবাই রুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিই। খেয়েদেয়ে তারপর ঠিক করব, কী করব।

হামিদের বউ লীনা যেন নামের সঙ্গে বরাবর মিল—ছিপছিপে গড়ন, মুখ ব্রণে ভর্তি। কথা বলে বাংলায় এ রকম শুদ্ধ উচ্চারণে কেউ কথা বলতে পারে কি না অরিতার সন্দেহ হয়। চিনচিনে গলায় অরিতাকে বলল—ভাবি, খুব সুন্দর হচ্ছে না বেড়ানটা? আমার আইডিয়া। আজকে আকাশ পরিষ্কার থাকলে চাঁদ উঠবেই। হিরণ্ময়দা আর কলাবতী বউদি দুজনেই চমত্কার গান করেন, আজকে বিচে বসে শুনব।

অরিতা হেসে বলল—যদি, কালবৈশাখী না আসে আর কি।

রুমে ঢুকে রবিন বলল—দেখলে তো, লীনা ভাবি ক্রেডিটটা নিয়ে নিলেন। কোথায় কি, আমি হামিদের মাথায় প্রথমে আইডিয়াটা ঢোকাই।

দূর, বাদ দাও, এগুলো কোনো ব্যাপার না, বলে অরিতা শাওয়ারে ঢোকে।

গোসলটোসল সেরে তৈরি হয়ে রবিন আর অরিতা নিচে খাবারের ঘরে নেমে এলো। খাবারের ঘরটা দোতলায়। রবিন পরেছে একটা কটনের শর্টস, অরিতা একটা ইজেরের পাজামা আর ওপরে কালো বুটি বুটি একটা টি-শার্ট। রবিনের বুকে লেখা, লাভ ইউ। অরিতার চুল ছাড়া। ওর মেদহীন শরীরে গোসলের তরতাজা ভাব যেন গায়ের ফরসা রঙের সঙ্গে ফুটে উঠছিল। অরিতার চোখের মণি কটা। হঠাৎ হঠাৎ তাকে বিদেশি মেয়ে মনে হয়। রবিনও খুব সুশ্রী পুরুষ। একেবারেই রামফরসা। নিয়মিত জিমে যায়। সে জন্য তার শরীরটা খুব ঝরঝরে।

ডাইনিংরুম থেকে কাচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরে একটা বিরাট কৃত্রিম সরোবর। পানিতে টইটম্বুর। অরিতা ভেবেছিল বুঝি সুইমিংপুল। দুজনে কাছে গিয়ে দেখল, ওটা আসলে অতিথিদের দৃষ্টিনন্দনের জন্য জলাধার। রবিন আর অরিতা টেবিলে ফিরে আসার অনেকক্ষণ পর নামল মালেক আর সাজনা, সঙ্গে তাদের ছেলে বাচন। সাজনা মাথায় বিরাট এক ট্যুরিস্ট হ্যাট পরেছে, চোখে কালো গগলস। বয়স হিসেবে বেশ ভারী তার শরীর। একটা লাল রঙের থ্রিপিস পরেছে। মালেক একেবারে অফিসের পোশাকেই নেমেছে। ঘি রঙের ট্রাউজার, নীল রঙের ফুলশার্ট, পায়ে কালো চকচকে জুতা। রবিন বলল—কী ব্যাপার ভাই, আপনি অফিসে যাচ্ছেন নাকি?

না তো কি? মালেকের চটপট উত্তর। আপনার ভাবির এক খালাতো বোন থাকেন বাহারছড়া। খেয়ে ওখানে যাব। বিকেলের মধ্যে সানসেট দেখতে চলে আসব। আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন না, আপনারা বিচে চলে যাবেন, আমরা এসে জয়েন করব। বাচন নাদুসনুদুস একটা ছেলে। শ্যামলকান্তি। সাজনার মতোই একটু ভারী। তাই খুব আদর করতে মন চাইছিল। অরিতা ওর গালে ঠোনা দিয়ে বলল—কী নাম তোমার, বাবা। বাচন চোখ নাচিয়ে, ঠোঁট দুটো গোল করে বলল—বাচন। আমি ভালো কথা বলতে পারি।

বাহ্, তুমি কী কথা বলতে পারো?

আমি, আমি...এই বলে সে মায়ের দিকে তাকাল।

সাজনা তাকে সাহস দিল—কী বলতে পারো বলো আন্টিকে।

বাচন বলল, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকের ওপর হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।

এইটুকু বলে বাচন একটু হাঁপাতে লাগল। পরম মমতায় অরিতা তাকে কোলে তুলে নিল।

বাচনের বক্তৃতা অন্যান্য টেবিলের অতিথিরা শুনে জোরে হাততালি দিল। হিরণ্ময়রাও নেমে এসেছে। কিন্তু হামিদরা আর নামে না। শেষে রবিন মোবাইল দিল। এই নামছি এই নামছি করে আরো আধাঘণ্টা পরে হামিদরা নামল বাচ্চা দুটো নিয়ে। হিরণ্ময় আর কলাবতীর মেয়ে দুটোও বাচনের মতো মিশুক। কিন্তু হামিদ আর লীনার বাচ্চাগুলো মা-বাবার সঙ্গে সেঁটে রইল, দুটোই কোলে। হিরণ্ময় আর হামিদ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেছে, লীনা আর কলাবতী পরেছে সুতির সাদা শাড়ি, কালো পাড়।

সাজনা বলল—কি ভাবি, আগে থেকে প্যাক্ট ছিল নাকি—একই ড্রেস!

লীনা ঠিক বাংলা বই থেকে পাঠ করছে এই সুরে বলল—শাড়িটাই কমফোর্টেবল, না ভাবি। কী বলেন?

কলাবতীর গায়ের রং বেশ শ্যামলা। চেহারায় আবার অসম্ভব ধার। মনে হয় যেন দেবী। গানের গলাও খুব ভালো। হিরণ্ময় সুপুরুষ। চিবুকের দিকে খানিকটা নামানো না হলে তাকেও রবিনের মতো আকর্ষণীয় মনে হতো।

অরিতা হেসে হিরণ্ময় আর কলাবতীর দিকে তাকিয়ে বলল, মেইড ফর ইচ আদার।

লীনা বলল—ভাবি, ঢং করবেন নাতো, আপনারাই হলেন আসল মেইড ফর ইচ আদার।

হামিদ মেন্যু ঠিক করে নিল। সাদা ভাত, কাঁচা কলা আর কাঁকরোলের ভর্তা, লইট্টা মাছের ভাজি, রূপচাঁদা মাছ আর ডাল, বাচ্চাদের জন্য চিকেন। সঙ্গে কোক, সেভেন আপ, যার যা ইচ্ছা।

লীনা লইট্টা মাছের বাটিটা ঠেলে দিয়ে বলল—বাবা রে, আমি লইট্টা মাছ ছোঁব না। যা গন্ধ! আমার বাচ্চারা তো খাবেই না।

রবিন একটু তারস্বরে বলল—বলেন কি ভাবি, লইট্টা মাছের মতো ডেলিকাটিসিন হয় না। ভাজা নয়, কারিই খাওয়াব আপনাকে।

অরিতা বলল, লইট্টা মাছে প্রচুর ফসফেট থাকে, হাড্ডির জন্য ভালো। অনেক বাচ্চাই তো পছন্দ করে।

লীনা তার জিবটা ওপরের ঠোঁটের সঙ্গে আস্তে করে চাটিয়ে বলল—ভাবি, আপনার তো বাচ্চা নেই, আপনি বুঝবেন না। বাচ্চারা ভালো জিনিস কোনোটাই খেতে চায় না।

অরিতা একেবারে চুপ, যেন বোমা খেয়েছে। রবিন ভেতরে ভেতরে নিজের ওপর একটু বিরক্তই হলো। কেন সে যেচে লইট্টা মাছের পক্ষে বলতে গেল। এটা একেকজনের ব্যক্তিগত রুচি। মাঝখান থেকে অরিতাটা ঢিট খেল।

মালেক খেতে খেতে বারবার ঘড়ি দেখে আর সাজনাকে তাড়া দেয়। তাড়াতাড়ি করো, আমাদের তো আবার সানসেট দেখতে ফিরতে হবে।

রবিন বলল, বিকেলটা কী এ অদ্ভুত নামের হোটেলের বিচে কাটাব, নাকি লাবনী পয়েন্টে যাব। ওখানটাতে জমে বেশি। লোকজন সব ওদিকেই যায়।

সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা বাগড়া দিল। না না, এখানেই থাকি, নিরিবিলি পরিবেশ। মালেক বলল, নামটা কিন্তু আমার সুন্দরই লাগে, ‘সমুদ্রের ঢেউ’।

লাবনী পয়েন্টে গেলে আবার জার্নি করতে হবে না, এতগুলো বাচ্চা নিয়ে? হামিদ বলল।

হিরণ্ময় একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, গান গাওয়ার জন্য একটু গলা পরিষ্কার করতে হবে না?

কলাবতী যেন বোঝে না এভাবে বলল—কী, ওই সব আজাগোজা এনেছ নাকি। ওসব করলে কিন্তু আমি বিচে থাকব না।

অরিতা সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমরা মেয়েরা কেউ থাকব না। তোমরা পার্টি করবা, ব্যাটারা ব্যাটারা।

পুরুষগুলো সব মুচকি হাসল। ব্যাপারটা কিভাবে এগোবে, কতটুকু বাড়বে, কতটুকু কমবে, এটা যেন তাদের জানা।

 

দুই

 

হোটেল ‘সমুদ্রের ঢেউ’ তাদের হোটেলের পেছনে সমুদ্রের সঙ্গে লাগোয়া তীরটি তাদের অতিথিদের জন্য এক্সক্লুসিভ করে নিয়েছে। পেছনের চত্বরের সম্পূর্ণ অংশটি অতিথিদের মনোরঞ্জন ও সময় কাটানোর জন্য বিভিন্ন পরিবেশনা দিয়ে সজ্জিত। সুইমিংপুলটা বেশ বড়। গোলাকার বা আয়তাকার নয়, বরং বো টাইয়ের মতো দুটো উইং দুদিকে টানা। একটা অংশের সঙ্গে লাগোয়া শাওয়ার, জিম, বাচ্চাদের গেমস রুম, বড়দের জন্য স্পা এবং হট বাথের ব্যবস্থা।

সুইমিংপুলের পাশে একটি রেস্টুরেন্ট, যেখানে ডিজের ব্যবস্থা আছে। আবার পাশে একটা গ্রিলহাউস, অর্ডার দিয়ে গরম গরম কাবাব আর পরোটা খাওয়া যায়। অনেক ধরনের চেয়ার পাতা প্রাঙ্গণময়। অতিথিদের সেবা করতে হোটেল ব্যবস্থাপনা যেন উন্মুখ। হোটেলের সীমানাদেয়ালের সঙ্গে একটি ছোট্ট লোহার গেট আছে। সেটা ঘুরিয়ে বের হওয়া বা ভেতরে ঢোকা।

হামিদ বলল, আমরা কিছু গ্রিল আর পরোটা অর্ডার দিয়ে যাই, বিচ চেয়ারে বসে সানসেট দেখি, ওরা সার্ভিস দিয়ে যাবে।

কিন্তু আকাশে মেঘের তোলপাড় শুরু হলো। সারা দিন খুব রোদ পড়েছে। বিকেল থেকে মেঘ জমতে শুরু করেছে। বৈশাখ মাস শেষ হয়ে জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের আবহাওয়ার কয়েক বছর ধরে এদিক-সেদিক আচরণ। হামিদ একটা চেয়ারে গা পেতে দিয়ে জানাল, ঝোড়ো বাতাসের ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি। হোটেলের প্রান্তসীমায় গোসল করার লোকদের সতর্কীকরণের জন্য একটা ঝাণ্ডা উড়ছে। সেটি এখন লাল পতাকা, অর্থাৎ সমুদ্রস্নান করা যাবে না।

তাদের গ্রিল এলো, পরোটা এলো, চিপস, চানাচুর, সেভেন আপ, কোক, চা-কফি মিলে ঝড়ের মুখেও তারা এগুলো খুব আনন্দের সঙ্গে সাবাড় করল। দুটো প্লাস্টিকের বল বাতাসে ছোটাছুটি করছে আর সেগুলোর পেছনে বাচ্চাগুলো দৌড়ে পেরে ওঠে না।

তারপর সন্ধ্যা লেগে এলো, সারা আকাশ কালো মেঘে ছাওয়া। দিগন্তে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চিকুর হানছে। প্রবল বাতাস হচ্ছে, বৃষ্টির খ্যাপা ফোঁটা গায়ে লাগছে, কড়কড় করে বাজ পড়ছে দূরে-কাছে, কিন্তু বর্ষণ হচ্ছে না। হোটেলের অন্য অতিথিরা একজন-দুজন করে হোটেলে ফিরে যাচ্ছে। তখন হিরণ্ময় বলল, এক কাজ করলে হয় না। চাঁদ আর আজকে কই উঠবে! ভাবিদের হোটেলে পাঠিয়ে দিই বাচ্চাদেরসহ, আমরা কিছুক্ষণ থাকি। এই বলে হিরণ্ময় তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটার প্রতি ইঙ্গিত করল। এর মধ্যে হামিদের টেলিফোনে মালেক বলল, তারা আত্মীয়ের ওখান থেকে ফিরছে; বিচে যাবে, নাকি হোটেলে ফিরবে।

হামিদ টেলিফোন কানে রেখেই রবিনকে জিজ্ঞেস করল কী বলবে।

রবিন বলল—বলেন, ভাবিরা বাচ্চাসহ হোটেলে ফিরে যাচ্ছে, আমরা কিছুক্ষণ আছি।

মালেক ওদিক থেকে বলল—সাজনা বলছে, আর কিছুক্ষণ আপনারা বিচে থাকেন, আমরা আসছি।

অপেক্ষা করার অল্প সময়ের মধ্যেই মালেকরা এসে পৌঁছল। মনে হলো, বেড়ানোর ওই বাসা থেকে মুক্তি পেয়ে এখানে এসে যেন তারা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে।

অন্ধকার হয়ে গেলে হোটেলের বিভিন্ন আলো বিচের গায়ে আর সমুদ্রের পানিতে প্রতিসরণরেখা তৈরি করছিল। মালেক বলল, ভারি সুন্দর তো সমুদ্রের রূপ। মহাকাশ ছুঁয়ে যেন সমুদ্র আলোড়ন-বিলোড়ন তুলছে। কী ছন্দোময় গর্জন, শুনছেন!

হিরণ্ময় বলল, আপনাকে তো শুধুু কম্পিউটার বোঝেন বুঝতাম। কিন্তু একি দেখছি!

সাজনা বলল—দাদা, ও কিন্তু কবিতা লেখে, গানও গায়।

হিরণ্ময় বলল—ও হ্যাঁ, গানের কথা জানি, কিন্তু কবিতার কথা জানতাম না।

সাজনা এবার চারদিকে তাকিয়ে বলল—ও মা, এটা তো বিরাট সুন্দর জিনিস। আমি আর মালেক কখনো আগে কক্সবাজারে আসিনি। সমুদ্র দেখিনি। দারুণ, দারুণ!

অন্যরা সবাই আসলে আগেও কক্সবাজার এসেছে। সাজনা বলতে থাকে, এত সুন্দর সমুদ্র!

লীনা বলল—ভাবি, চাঁদটা যদি উঠতে পারত, তাহলে দেখতেন কী জিনিস হতো।

সাজনা বলল, আমি চাঁদ দেখা যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব।

কিন্তু ভাবিরা যে চলে যেতে চাইছেন, হিরণ্ময় বলল।

কলাবতী বলল, ভাবিরা চলে যেতে চাইছেন না, তোমরাই পাঠিয়ে দিতে চাইছ। তোমাদের মাতাল হওয়ার জন্য।

অরিতা বলল—বাবা রে, আমি চলে যাই, আমার শীত শীত লাগছে।

অরিতার সঙ্গে কলাবতীও যোগ দিল, আমিও চলে যাব। যাদের ইচ্ছা হয় তারা থাক।

বাচ্চাগুলো নিয়ে অরিতা আর কলাবতী অরিতার রুমেই ফিরে যাওয়া ঠিক করল। কিন্তু হামিদ আর লীনার বাচ্চা দুটো মা-বাবা ছাড়া যাবে না। তখন লীনাও ইচ্ছা না থাকলেও তাদের সঙ্গে যোগ দিল বাচ্চা দুটো নিয়ে।

এরপর চারজন পুরুষ আর একজন মহিলা মিলে আসর জমে উঠল। হিরণ্ময় বলল—ভাবি, অন্তত বিয়ারটা খান। এটা মাতাল করবে না আপনাকে।

না ভাই, না। এগুলো আমি ছুঁই না।

মালেক দুষ্টামি করে বলল, একটু ছোঁও না আজকে, যে পূর্ণিমা ওঠার কথা ছিল ওঠেনি, তার স্মরণে।

হোটেলের লোকটা এলো। বলল—স্যার, আবহাওয়া খারাপ, গ্রিল বন্ধ করে দেব। আর কি কিছু আনব?

মালেক উদার গলায় বলল—কী বলো হে, সন্ধ্যা তো এখনো শুরু হয়নি।

বয়টার পেছনে আরো একজন লোক দাঁড়ানো। একটু বয়স্ক। অন্ধকারে চেহারা দেখা যাচ্ছিল না। সাদা ইউনিফর্ম পরা। বলল—স্যাররা, একটা কথা বলতে এসেছি। বেয়াদবি নিয়েন না। ওয়েদার খারাপ। বিচ চেয়ারগুলো ঢুকিয়ে ফেলতে হবে। আপনারা আধাঘণ্টার মধ্যে সব সেরে ফেলুন।

হিরণ্ময়ের ব্যাগ থেকে বোতল বের হয়েছে, গলায় গেছে সবার।

মালেক ঝাঁজ নিয়ে বলল—হোয়াট! আধঘণ্টার মধ্যে নিয়ে যাবেন মানে? আমরা কি ফকিন্নির ছেলে আসছি নাকি, নিয়ে গেলে নিয়ে যান। আমরা এই বালিতেই শুয়ে শুয়ে ঝড় দেখব।

লোকটা খুব নম্রভাবে বলল—না, স্যার, তারপর পরিবেশ হালকা করার জন্য বলল—বলছিলাম স্যার, ওয়েদার খারাপের দিকে তো। বোর্ডারদের সতর্ক করে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। এখন তো কোস্ট গার্ডরাও চলে গেছে। যা হোক, স্যার, আপনারা থাইকেন, কিন্তু বেশিক্ষণ থাইকেন না। আর পানিতে নাইমেনটাইমেন না, স্যার।

লোক দুটো চলে গেলে হামিদ মালেককে বলল, কী ব্যাপার, আপনি এত রেগে গেছেন কেন? উনি উনার দায়িত্ব পালন করছিলেন।

মালেক চুপ হয়ে রইল। সাজনা বলল—ভাই, দেন একটু, বিয়ারটাই দেন। হালকা একটু খাই। সমুদ্রটা যেন গায়ের ভেতরে ঢুকে বাজনা বাজাচ্ছে।

এক বোতল হুইস্কি পুরো খালি হলে হিরণ্ময় দ্বিতীয় বোতলটা বের করল। ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়েছে। বাতাস বেশ ঠাণ্ডা। কিন্তু ফুর্তিতে হিরণ্ময় গেয়ে উঠল—নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু, পাছে পাছে। আর বাকিরা সবাই নাচতে লাগল।

মালেকের অদ্ভুত ভালো লাগছিল। সে তার কেতাবি পোশাক শার্ট আর ট্রাউজার এবং জুতা জোড়া খুলে ফেলল। শুধু গেঞ্জি আর আন্ডারওয়্যার। সমুদ্রের ঢেউ এখন বেশ খানিকটা উত্তাল। গর্জনও বেড়েছে। তীরের দিকে ঢেউয়ের এগিয়ে আসাও তীব্রতর হচ্ছে।

মালেক বলছে, সে একটা মাত্র ডুব দেবে সমুদ্রে। তারপর উঠে আসবে।

রবিন, হামিদ আর হিরণ্ময় তাকে বাধা দিল।

রবিন তারস্বরে বলল—খবরদার, ডোন্ট ইউ থিংক লাইক দ্যাট!

মালেক বলল, হু আর ইউ টু স্টপ মি! অ্যাঁ, আর ইউ মাই গার্ডিয়ান?

হামিদ বলল, আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন সব কিছুতে। তখন থেকেই দেখছি আপনি অফ মুডে আছেন, ইজ এনিথিং রং সামহয়্যার?

লুক, মালেক বলল, আপনারা যে ধারণা করে কক্সবাজার এসেছেন, আমি আমরা—আমি বা সাজনা—সে ধারণা করে আসিনি।

মানে, এবার হিরণ্ময় চটে গিয়ে বলল।

মানে, মালেক বলতে থাকল। আপনারা এসেছেন মজা করতে—ফাইভ স্টার হোটেলে থাকবেন, হোটেলে বাথটাবে স্বামী-স্ত্রী মিলে গোসল করবেন, দিনে-রাতে বাচ্চাদের আড়ালে নানা কিছু করবেন, ছবি তুলবেন, ফেসবুকে দেবেন, কিছু শামুক খাবেন, না-ও খেতে পারেন, কিছু মাপা ড্রিংক করবেন, কিছু কড়ির মালা কিনবেন, গলার হার, বার্মিজদের দোকান থেকে শাল, চাদর, আচার কিনবেন। এই  হলো আপনাদের আনন্দ।

সাজনা বিয়ারের ক্যানটা পুরো গিলেছে। সে-ও মালেকের পাশে দাঁড়িয়ে মালেকের কাঁধে হাত রেখে বলল—এই, তোমার শীত লাগছে না?

হামিদ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলল—তো, আপনারা কী করতে এসেছেন?

হিরণ্ময় কৌতুক করে বলল, সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে। এই বলে সে মালেকের গ্লাসে আরেকটু ঢেলে বলল—কুল ডাউন, বস। উই আর নট স্টপিং ইউ। বাট, মাইন্ড ইউ, দ্য শি ইজ অ্যাংরি।

নামার সময় কিন্তু তারা সবাই নামল। ঢেউ তাদের অমোঘভাবে ডাকছে। বাতাসে হিড়হিড়ে ঠাণ্ডা। তাদের তেমন ঠাণ্ডা লাগছে না। বরং বেশ উত্তেজনা লাগছে।

মালেকের মনে হচ্ছে, তার খালি পিঠে বৃষ্টির শলাগুলো যেন ভালোবাসার আঙুল। তারা হাঁটু পর্যন্ত নেমেছে। কিন্তু ঢেউ উঠছে কোমর সমান বা তার চেয়েও ওপরে। রবিন লক্ষ করল, মাটিতে তার পায়ের আঙুল বালু শক্তভাবে খামচে ধরেছে, এবং ঢেউয়ের প্রবলশক্তিও তাকে নড়াতে পারছে না। সে মনে মনে নিজেকে বলল, আর এগোনো যাবে না। এগোলেই বিপদ। হামিদ আর হিরণ্ময় তার পেছনে পেছনে, কিন্তু অকুতোভয়ে কোরাস গাইছে—নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু, পাছে পাছে।

মালেক তখন থেকে সাজনাকে হাতে ধরে ঢেউয়ের মধ্যে ঝাপটাচ্ছে। কখনো রবিনের আগে, কখনো পেছনে। ওরা দাঁড়িয়ে নেয়, বারবার বসে বসে সমুদ্রের পানিতে আবাহন করতে চাইছে। ঢেউ এসে একেকবার তাদের ডুবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আর তারা বেশ খানিকটা নোনা পানি গিলে ফেলছে। এবার তারা উঠে দাঁড়াল। দুজনেই একজনের সঙ্গে আরেকজন ধরা। তারা রবিনের হাত দুয়েক দূরে। পুরো আকাশ নিকষ কালো। সমুদ্রের পানির রং মিশমিশে কালো। শুধু ঢেউয়ের উত্থান দেখা যায় আকাশের বুকে, তা-ও একটা বিভাজনরেখা তৈরি করতে। রবিন দেখতে পাচ্ছে, স্পষ্ট একটা বিরাট ঢেউয়ের মালা আড়াআড়িভাবে উঠে আসছে সমুদ্রের বুক থেকে। রবিন দেখতে পাচ্ছে, সেটা যত কাছে আসছে ততই উঁচু হচ্ছে। একেবারে মাথার ওপরে এলে রবিন ঘুরে পিঠ দিয়ে দিল। রবিনদের ওপর ঢেউটা যখন ঝাঁপিয়ে পড়ল, সেটা ছিটকে গিয়ে যেখানে বিচ চেয়ার রাখা ছিল সেখানে পড়ল। মুহূর্তের জন্য যেন একপুকুর পানির তলায় হাবুডুবু খেল সে। যখন ঢেউটা সরে গেল, সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে যেন হামিদের চিত্কার শুনতে পেল।

ও আল্লাহ্, মালেক আর সাজনা ভাবি তো ভেসে যাচ্ছে মনে হয়। হিরণ্ময়ও চিত্কার দিয়ে উঠল—মালেক সাহেব...,সাজনা ভাবি...।

প্রচণ্ড ঢেউটা যেমন জোরে এসেছিল, তার চেয়েও বেগে ফেরার টানে মওকা পেল মালেক আর সাজনাকে মুঠোয় নিতে। বাকিরা অন্ধকার রাত্রির মধ্যে ঢেউয়ের আগায় দুটো মানবমূর্তি ঠাহর করে দেখল কি দেখল না, তাদের হাত উঁচানো দেখল কি দেখল না, তাদের ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিত্কার শুনল কি শুনল না, কিন্তু রবিনের মনে হলো মালেক ও সাজনা দুজনেই যেন ঢেউয়ের ওপর অনেকক্ষণ খাড়াভাবে দণ্ডায়মান ছিল, তারপর হঠাৎ ঢেউয়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

কী করবে না করবে, তারা কেউ বুঝতেই পারছিল না। কতক্ষণ কাটল সময়, কেউ বলতে পারল না। হঠাৎ রবিন দেখে একটা জায়গায় ঢেউ একটু সরেছে, আর কী যেন দেখা যাচ্ছে বালুর ওপর। তারা ছুটে গেল। হ্যাঁ, ঠিকই, মালেক উপুড় হয়ে আছে, পাশে সাজনা চিত হয়ে। দু-একজন জেলে তাদের গ্রামের পথে ফিরছিল কাঁধে মাছ ধরার জাল গুটিয়ে নিয়ে। তাদের একজনের হাতে একটা টর্চলাইট। হিরণ্ময় ছুটে গেছে হোটেলের ভেতরে সাহায্যের জন্য। হামিদ মোবাইলের আলো ফেলল সাজনার মুখের ওপর। কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। জেলেদের একজন টর্চের কড়া আলো ফেলল। আরেকজন পেটের ওপর চাপ দিল। গলগল করে পানি বেরিয়ে এলো। লোকটা খুব ক্ষীণকণ্ঠে বলল, জান নেই মনে হয়। অন্য লোকটা মালেকের উপুড় হওয়া শরীর চিত করে আলো ফেলল মুখে। মালেকের গাল হাঁ করা। তার পেটে চাপ দিতে হলো না। উপুড় থেকে চিত করার সময় পানি গড়িয়ে বের হয়ে গেছিল।

হোটেলে এই ঝড়-জলের মধ্যেও এক দিকে লোকের ভিড়, আরেক দিকে ডাক্তার, পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট, ডিসি, র্যাব এবং সাংবাদিক। দেশের সব কটি অনলাইন মিডিয়া খবরটা ব্রেকিং নিউজে দিতে লাগল। শেষে এমন অবস্থা তৈরি হলো, রবিনরা সবাই যেন খুন করেছে এ রকম একটা চাপের মধ্যে পড়ে গেল। বাচন তখনো বুঝতে পারেনি তার কী ক্ষতি হয়ে গেছে। হোটেলের কেয়ারটেকার লোকটা পুলিশকে সব বৃত্তান্ত বলল। পুলিশের লোকটা তাদের জিজ্ঞেস করল, তাদের ড্রিংকিং লাইসেন্স আছে কি না।

তারা চুপ।

তার পরের দিন বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কক্সবাজার এসে পৌঁছলেন মালেকের মা-বাবা। সঙ্গে এক গ্রাম্য যুবক। মালেক তাঁদের বড় ছেলে, বাকিগুলো সব বোন। নিরীহ একজন ক্ষীণস্বাস্থ্যের চাষাভুষা লোক। মা আরো সাধারণ মহিলা। কালো একটা বোরকা পরা। পুরো শরীর কাঁপছে, কাঁদছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তার চেহারা কেউ দেখছে না। সাজনার মা-বাবা আগে থেকেই মধ্যেপ্রাচ্যের একটি দেশে থাকেন। কক্সবাজারে থাকেন তার খালাতো বোন আর স্বামী—তাঁরা ছুটে এসেছেন। সঙ্গে তাঁদের চার ছেলে। বোনটা কাঁদছে। ‘ওহ্, কেন যে এই ঝড়-তুফানের মধ্যে আমার বোনকে বের হতে দিলাম!’

লাশগুলোর সুরতহাল হলো। ভয়ে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মৃত্যু। রক্তে অ্যালকোহলের অতিরিক্ত পরিমাণ পাওয়া গেছে, সেটাও উঠে এলো। আর সব কিছু বাদ দিয়ে সাংবাদিকরা সেটাই ফলাও করে প্রচার করল।

অসম্ভব ভাঙাচোরা অবস্থা নিয়ে রবিনরা অবশেষে ঢাকা ফিরতে পারল।

 

 

তিন

 

সময় যত যাচ্ছে, দুর্ঘটনার কথাটি আস্তে আস্তে ফিকে হতে হতে রবিনের প্রায় আর মনেই থাকে না এ রকম হয়ে গেলে সে পুরোপুরি কাজে মন বসাতে পারল। পত্রিকায় কেউ কেউ দু-একটা সমালোচনামূলক প্রতিবেদন লিখলেও একজন যশস্বী বুদ্ধিজীবী এ রায় দিলেন যে এ ধরনের দুর্ঘটনার কোনো মা-বাপ নেই, হতেই পারে, না-ও পারে। বাংলাদেশে ড্রিংকসের জন্য লাইসেন্স নিতে হয় এটা প্রায় মদ-খাওয়া লোকেরই জানা নেই। আর মানুষ চিরকালই একটু সাহসী হয়। সাহসী হতে গিয়ে বিপদে পড়ে গেছে। ইয়াং কাপলরা কক্সবাজারে বেড়াতে গেছে আনন্দফুর্তি করতে, এটা দোষের কিছু নয়। তিনি অবশ্য বললেন, এই বিপদটা খানিকটা কন্ট্রিবিউটরি, মানে ওই কাপলরাই উপযাচক হয়ে বিপদ ডেকে এনেছিল। তবে এই বিপদ ডেকে আনার প্রবণতাটাও স্বাভাবিক। এই কলামটা ফেসবুকে কেউ আপলোড করল আর ভদ্রলোককে তাঁর মন্তব্যের জন্য প্রায় বাপের নাম ভুলিয়ে দিল সদস্যরা স্ট্যাটাসের পর স্ট্যাটাস দিয়ে।

রবিন একটা ডক্যুমেন্ট তৈরি করছিল, ডেডলাইন তার পরের দিন। এমন সময় ব্যাংক থেকে অরিতার ফোন।

কী ব্যাপার!

শোনো, তুমি কি বাসায় একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে? কথা আছে। আমিও ব্যাংক থেকে তাড়াতাড়ি ফিরব।

রবিন বলল, মাই গড! তুমি আর দিন পেলে না। টেলিফোনে বলে ফেলো না।

না না, টেলিফোনে বলা যাবে না। তুমি এসো।

বিকেলে রবিন ফিরে কলিংবেল চাপতেই অরিতা দ্রুত দরজা খুলে দিল।

কী ব্যাপার! অরিতা তাকে ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে ইশারা করল, চুপ।

রবিন দেখে, বাসায় বসে আছেন মালেকের মা-বাবা, আরো দুই জোড়া দম্পতি, যাদের এক দম্পতিকে রবিন চিনল—সাজনা ভাবির খালাতো বোন আর তাঁর স্বামী। যে দম্পতিকে রবিন চিনতে পারেনি, তাঁদের ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি সাজনার বাবা আর এ মা। বলতে না বলতে দুজনেই কাঁদতে শুরু করলেন। মালেকের মা-বাবাও কাঁদতে লাগলেন। সাজনার বোন একদিকে আর অরিতা আরেক দিকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করল।

অবস্থা খানিকটা শান্ত হলে রবিন তার ল্যাপটপটা সোফার পাশে রেখে বসল। সাজনার বাবাই কথা বলা শুরু করলেন।

বাবা, আমরা তো পানিতে পড়ে গেছি। আমরা হারাইছি মেয়ে, উনারা হারাইছেন ছেলে, কোনো দিন তো ভাবতে পারি নাই এই জিল্লতি হবে। সোনার টুকরার মতো আমার মেয়ে—আ হা হা!

তিনি বাক্রুদ্ধ হয়ে গেলেন। মালেকের মা-বাবা গ্রামের মানুষ, তাঁরা ঠিক অনুসরণ করছেন ঘটনা, কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না।

বাবা, উনাদের সঙ্গেও আমাদের আলাপ হয়েছে। উনাদের আপত্তি নাই। গ্রামে থাকেন তাই।

রবিন বলল, ব্যাপারটা কী বলেন তো।

অরিতা অধৈর্য হয়ে বলল, উনি তো বলছেনই, তুমি শুনছ না কেন?

হ্যাঁ, বাবা। অরিতার মায়ের সঙ্গেও আমাদের আলাপ হয়েছে, তাঁরও আপত্তি নাই। এখন তোমার মতামতটা পেতে চাই।

আমি তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। কী বলতে চাইছেন?

লোকটা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। একবার রবিনের মুখের দিকে তাকান, আবার মেঝের দিকে, আবার রবিনের মুখের দিকে। একটু ছোট করে পায়চারিও করছিলেন তিনি দুই সোফার মাঝখানে। তারপর স্থির হয়ে থেমে বললেন—বাবা, বাচনের দায়িত্বটা যদি তোমরা নাও।

কী বললেন! রবিন সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত।

হ্যাঁ, বাবা। ছেলেটা মা-বাবা হারিয়ে এতিম হয়ে গেছে। উনারা গ্রামে থাকেন, আমরা বিদেশে থাকি, ছেলেটাকে দেখবে কে? আর আমার ভাগ্নি থাকে কক্সবাজারে, তার নিজেরই চার-চারটা বাচ্চা। কী করি, বাবা। এটা আমার কাছে মনে হয় বেস্ট সলিউউশন।

এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে রবিন অরিতার দিকে চোখ মেলে তাকাল। অরিতার চোখে ‘রাজি’ শব্দটা যেন ফুটে উঠেছে।

রবিন বলল—অল রাইট, কিন্তু ব্যাপারটা লিগ্যালি হতে হবে। আপনারা কোনো পক্ষই আবার দাবি করতে পারবেন না।

সাজনার দুলাভাই এতক্ষণে মুখ খুললেন। তিনি কক্সবাজার জেলা জজকোর্টে ওকালতি করেন। বললেন, আমি সব কাগজপত্র ঠিক করে এনেছি। আপনাদের কনসেন্ট পেলেই সব ঠিক করে দেব।

অরিতা বলল, এক মিনিট।

সে বেডরুমে ঢুকে ঘুমন্ত বাচনকে কাঁধে করে বসার ঘরে নিয়ে এলো।

বাচন তার দাদা-দাদি, নানা-নানি কাউকেই তেমন কাছ থেকে চেনে না। সে বরং রবিন আর অরিতাকেই বেশি চেনে।

তার চোখ খুললে সে অরিতার কোলেই সহজভাবে বসে রইল।

অরিতা বলল—বাচন, তুমি কথা বলতে পারো?

বাচন বলল, আর যদি একটা গুলি চলে...



মন্তব্য