kalerkantho

বড় গল্প

উত্তরাধিকার

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



উত্তরাধিকার

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

ভাদ্রের নদী ভরা থাকে, সবাই জানে, নদী না দেখা শহরের কিছু খাস মানুষ ছাড়া। সে রকম এক খাস মানুষ এক ভাদ্র দিনে জানালেন, অবাক, তাঁর শ্বশুরের গ্রাম ডুবে আছে। মানুষ কষ্টে আছে। তাদের কষ্ট লাঘব করতে হয়।

ভুল বলছি না, ‘লাঘব’ কথাটাই তিনি বলেছিলেন। দুই পুরুষ ধরে শহরে বসবাস করে ভাষাটাকেও তিনি গ্রাম থেকে যতটা সম্ভব দূরে নিয়ে গিয়েছিলেন। ডুবে যেতে থাকা মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য ত্রাণ দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়টা নিয়ে কথা বলার জন্য তিনি আমার বাসায় এসেছিলেন। তাঁকে আমি বাচ্চু ভাই বলে ডাকতাম। তাঁর একটা পোশাকি নাম ছিল, কিন্তু সেই নামটার ব্যবহার ছিল কম, ফলে এত দিন পরে এসে তা ভুলে গেছি।

তাতে বাচ্চু ভাই এখন মন খারাপ করবেন না। কারণ বছর তিনেক আগে তিনি মন খারাপ করা না করার দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন।

বাচ্চু ভাইকে কেন তাহলে মনে রেখেছি, আমার এই গল্পে নিয়ে এসেছি? কারণ দুইটা—একটা বড়, আরেকটা ছোট। ছোট কারণটা তাঁর ভালোমানুষি, যা দুই নম্বর কারণটা তৈরি না হলে হয়তো বড় কারণ হয়েই থাকত। আর বড় কারণটা তাঁর এক অসাধারণ জীবনকাহিনির একেবারে ভেতরে আমাকে নিয়ে যাওয়া। বাচ্চু ভাই তাঁর বানে ডোবা শ্বশুরগ্রামে আমাকে নিয়ে না গেলে এই জীবনকাহিনিটা আমার অলক্ষ্যেই থাকত, আমার খাতায় অলেখাও থাকত। তাতে ক্ষতিটা কার হতো জানি না; আমার অন্তত হতো। আমার ভেতরে একটা যে অতৃপ্ত মানুষ আছে—অতৃপ্তিটা দেশের খুব প্রয়োজনে হাতে বাঁশ-বন্দুক তুলে যুদ্ধ করতে না পারার; ক্ষতিটা সেই মানুষটার হতো। গ্রাম ডোবানো বানের ভাদ্রটা ছিল ১৩৯৫ সনের। এই বাংলা সনটা, অবাক, শহরের খাস মানুষ বাচ্চু   ভাই-ই শুধু ব্যবহার করতেন। আমার আর শহরের যত আমমানুষের জিবে ইংরেজি সালটাই আসে সবার আগে। শহরের পত্রপত্রিকার মতো আমরা বলি আটাশির বন্যা। ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল সেই বছর এবং তা শুরু হয়েছিল ভাদ্রেরও অনেক আগে। এখনো আমার পাড়ার ‘ফিটফাট লন্ড্রি’র আয়রনম্যান মাশুক আটাশির বন্যার কথা বলতে গিয়ে ‘পানি’র কথা বলে। তার বড় ভাই আবির মিয়া আটাশির পানিতে ডুবে মরেছিল।

সে আরেক গল্প। চারদিকে এত জীবনগল্প ছড়ানো-ছিটানো, কোনটা রেখে কোনটা যে বলি!

বাচ্চু ভাইয়ের কোনো গ্রাম ছিল না। তাঁরা ছিলেন ঢাকার আরমানিটোলার আদি বাসিন্দা। স্বাধীনতার পর যখন হঠাৎ পুরান ঢাকার মানুষ গুলশান-বনানীর দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাতে শুরু করেছে—যখন ওই দুই নতুন পাড়া তাদের বনেদিপনা ঘোষণা করেছে এবং শহর তাত্ত্বিকদের ভাষায় জেন্ট্রিফিকেশনের পতাকা তুলে ধরছে, তখন বাচ্চু ভাইয়ের বাবা আর দুই চাচা গুলশানে বাড়ি কিনে পাড়ান্তরি হয়েছেন। আরমানিটোলার চিপাগলির বাড়িটা আঁকড়ে পড়ে থাকলেন শুধু তাঁর দাদি আর বড় চাচা। গুলশানবাসী হওয়ার পর তাঁদের ভাষাটাও বদলে গেল; ‘যন্ত্রণা লাঘব’, ‘ত্রাণ বিতরণ’—এসব শব্দে সেই ভাষা প্রমিতর কাছাকাছি পৌঁছে গেল।

পুরানা পল্টনে ‘লাইট হাউস’ নামে এক দোকান ছিল বাচ্চু ভাইদের, তাঁদের অনেক ব্যবসার একটা। সেই দোকানে নিয়নবাতি থেকে নিয়ে ইলেকট্রিক ঝাড়বাতি, সবই পাওয়া যেত। পুরো ঢাকা শহরের ইলেকট্রিক ঝাড়বাতির জোগান দিত একা লাইট হাউস। বাচ্চু ভাই বলতেন, এ হচ্ছে তাঁর আলোর দোকান। সেই দোকানের জানালায়, ১৯৭৪ সালের শীতের এক বিকেলে, এক টেবিল ল্যাম্প দেখে আমি অস্থির হয়ে পড়লাম তা কেনার জন্য, এ বিষয়টা ঠাহর করেও যে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকের বেতনে এটি কুলাবে না। তার পরও দোকানে ঢুকে এটি নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। বাচ্চু ভাই—ওই মুহূর্তে আমার কাছে শুধুই লাইট হাউসের একজন কর্তাব্যক্তি— এগিয়ে এসে বলেছিলেন, ‘এ হচ্ছে সবুজ ঘেরাটোপ পরা আদি ব্যাংকার্স ল্যাম্প। আছে মাত্র দুটি।’

‘কত দাম?’ হতাশা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

দাম শুনে অস্বস্তিতে পড়ে তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরোনোর জন্য দরজার দিকে এগিয়েছি, বাচ্চু ভাই পেছন থেকে ডাক দিলেন। দোকানের ভেতরের দিকে একটা টেবিল পাতা ছিল, আমাকে একেবারে হাতে ধরে নিয়ে সেই টেবিলের সামনের একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজে বসলেন টেবিলের পেছনের শাহি চেয়ারে। ‘চা চলবে?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন। আমি কেন জানি ‘হ্যাঁ’ বললাম, যদিও ইচ্ছা হচ্ছিল, না বসে চলে যাই। চা খেতে খেতে তিনি আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন, নিজের একটা কার্ড দিলেন। তারপর হেসে বললেন, ‘লোকে আমাকে বাচ্চু ভাই বলেই ডাকে।’

ল্যাম্পটা আধাদামে আমাকে দিলেন বাচ্চু ভাই। বলা যায় গছিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আপনি আলোর পথের মানুষ, আলোর দোকান থেকে খালি হাতে কী করে ফিরে যান।’

কিছুদিন পর তিনি আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করতে থাকলেন। সম্বোধন কথাটা আমার না, এটি বাচ্চু ভাই-ই ব্যবহার করেছিলেন। ‘আপনাকে তুমি বলেই সম্বোধন করব,’ তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি কথাটায় অনেক দূরুত্ব।’

তত দিনে তাঁর দোকানে মাঝেমধ্যে যাই, ভালো মানুষটির সঙ্গে সময় কাটাতে ভালো লাগত বলে। তিনি গুলশানবাসী হলেও আরমানিটোলার খাবারদাবার কখনো ছাড়েননি। আমাকে পনির দেওয়া বাখরখানি আর মাটন কাটলেট খাওয়াতেন। বাচ্চু ভাই একদিন তাঁর বিয়ের গল্প বললেন। জানালেন, তাঁর স্ত্রী গ্রামের মেয়ে। তিনি পড়াতেন গুলশানের এক বাচ্চাদের স্কুলে। স্কুলটা বাচ্চু ভাইয়ের বাড়ির পাশে। ‘প্রতিদিনের প্রাতর্ভ্রমণ শেষে ফেরার পথে তোমার ভাবির সঙ্গে দেখা হতো। দেখা থেকে প্রেম,’ তিনি জানালেন।

অতঃপর বিয়ে।

প্রাতর্ভ্রমণ শেষে সিনেমার নায়করাও যখন বাসায় ফেরে, তাদের ঘাম চকচকে, ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত চেহারা দেখে কোনো মেয়ের মনে সহজে প্রেমভাব আসার কথা নয়, অথচ বাচ্চু ভাইয়ের ঘামে ভেজা ক্লান্তিলেপা মুখ দেখেই কিনা তাঁর স্ত্রী তাঁকে ভালোবেসেছেন। সেই মহীয়সী নারীকে আমি অবশ্য কখনো দেখিনি।

বাচ্চু ভাইয়ের কপালটা বরাবরই ভালো ছিল, অন্তত আমার চোখে তার কোনো ব্যতিক্রম কখনো ধরা পড়েনি।

 

দুই

 

ভালো মানুষ বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে বেলঘর যেতে হলো। তাঁর চরিত্রের একটা বড় গুণ ছিল এই, তিনি যা করতে মনস্থ করতেন, করেই ছাড়তেন। দোনামনা কী জিনিস, তা তিনি জানতেন না।

আমার তিন-চার ভালোমানুষ বন্ধু ছিল, যারা চাল-ডাল, লুঙ্গি-শাড়ি—এসবের একটা সংগ্রহ তৈরি করে দিল। বাচ্চু ভাইয়ের পরিবার দিল কেরোসিন তেল, তেলের স্টোভ, বিস্কুটের টিনসহ হরেক সামগ্রী। বাচ্চু ভাইয়ের স্ত্রী কী দিয়েছিলেন, জানা হয়নি; কিন্তু তিনি যে আমাদের জন্য আটার রুটিভর্তি তিনটি টিফিন ক্যারিয়ার দিয়েছিলেন, সেগুলোই ত্রাণকাজের চার-পাঁচ দিন আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল।

ঢাকা থেকে আমরা রওনা হয়েছিলাম একটা ট্রাকে চড়ে। আমরা মানে বাচ্চু ভাই, আমি আর আমার হলজীবনের এক বন্ধু মোশাররফ। তাকে সঙ্গে নেওয়ার কারণ, সে কয়েক দিন আগে কমিউনিস্ট পার্টির এক ত্রাণদলের সঙ্গে উত্তরবঙ্গ ঘুরে এসেছে। নৌপথটা তার ভালো জানা। ত্রাণকাজেও তার আগ্রহ। নিজেও সে কিছু কাপড়চোপড় আর ওষুধপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছে।

গঙ্গাছড়া হয়ে ঘাঘটে এসে আমরা একটা বড় নৌকা নিলাম। নৌকাটা খুবই পোক্ত, ভেতরটাও বেশ বড়সড়। মালসামান তুলে নৌকা ছেড়ে দিল।

গল্পটা যেহেতু আমাদের নৌকাভ্রমণ নিয়ে নয়, আমাদের যাত্রার বর্ণনাটা এই গল্পে তাই অপ্রয়োজনীয়। আমরা আকাশে উড়াল দিয়ে বেলঘর পৌঁছলেও এই গল্পের কোনো উনিশ-বিশ হতো না।

গল্পটা রোশনারার। তার কাছেই যাওয়া যাক।

 

তিন

 

বেলঘর আসলেই ডুবেছে। সারা গ্রামে পানি, বাড়িঘর তলিয়ে গেছে—কোনোটায় চাল ভাসছে, ভাগ্যবানের বাড়ি ডুবেছে দাওয়া পর্যন্ত। মানুষজন কলাগাছের ভেলায় থাকছে; কেউ কেউ মাচান বেঁধেছে। সারা গ্রামে পাকা বাড়ি মাত্র চার কি পাঁচটি, তার মধ্যে ঢালাই ছাদ আছে একটি বাড়ির। সেই ছাদে সামান্য অবস্থাপন্ন যারা, তারা আশ্রয় নিয়েছে। বাকিরা ভিড় জমিয়েছে বেলঘর রাজা মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাদে। আর বাকি যারা, রোশনারার মতো যাদের জমিজমার জোর নেই, তারা ঠাঁই নিয়েছে বেলঘর-কালুতারা রাস্তায়। আমরা যদি উড়ে উড়ে বেলঘর পৌঁছতাম—যেমন উড়ছিল কিছু চিল, এমন নির্লিপ্ততায় যেন নিচের পৃথিবীটা আছে আগের মতোই, কোনো বিপদ-বিপর্যয় এই পৃথিবীতে ঘটেনি—তাহলে এই রাস্তাটাকেই প্রথম চোখে পড়ত আমাদের, দু-তিন গ্রামের মধ্যে জেগে থাকা লম্বা-আঁকাবাঁকা এই সরীসৃপ জমিন। এই রাস্তাটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সবার জন্য। আমাদের পৌঁছতে রাত হয়ে গিয়েছিল। দুই মাঝি তাই রাতযাপনের জন্য একটা গাছের সঙ্গে নৌকা বাঁধলেন, তারপর ছলাত করে পানিতে নেমে পড়লেন। মোশাররফ বলল, তাঁরা তামাক টানতে গেছেন। তামাকের নেশা বলে কথা।

পরদিন ভোরে মাঝিদের একজন জানালেন, যত মানুষ আছে ওই সরীসৃপ রাস্তায়, তাদের সবাইকে ত্রাণ দিয়ে কুলাবে না। তিনি বুদ্ধি দিলেন, বেছে বেছে বুড়ো মানুষদের আর ছোট বাচ্চা আছে—এ রকম মেয়েদের তা দেওয়া যেতে পারে। বুদ্ধিটা মোশাররফের সায় পেল। সে ওই মাঝিকে নিয়ে সরীসৃপ রাস্তার দিকে চলে গেল। বুকপানি ঠেলে।

ঘণ্টাখানেক পর কুড়ি-পঁচিশজনের একটা দলকে সরীসৃপ রাস্তার এক বাঁকে জড়ো করা হলো। মোশাররফ বলল, মাঝি লোকজনকে এ রকম বলেছেন যে এই মানুষগুলোর একটা বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আমরা যত তাড়াতাড়ি পারলাম শাড়ি-লুঙ্গি, মুড়ি-বিস্কুট, চাল-কেরোসিন—যা দেওয়ার দিলাম। বাচ্চু ভাই বললেন, ত্রাণসামগ্রী যখন আরো আছে, সব বিতরণ করে দিলে কেমন হয়? বিচক্ষণ মাঝি বললেন, আর ১৫ মিনিট এ জায়গায় থাকলে বাকিরা এসে ভিড় জমাবে। সেই ভিড় সামাল দেওয়া যাবে না। ক্ষুধার্ত মানুষ অনেকে একসঙ্গে হলে তাদের সামাল দেওয়া যায় না। যারা দিতে জানে, হাতে লাঠি-বেত নিয়ে, তারা কিছুটা কম-মানুষ হয়।

তা ছাড়া অন্য মাঝি জানালেন, ক্ষুধার্ত মানুষ গ্রামের অন্যত্র আরো আছে। তাদেরও কিছু দেওয়া যায়।

বাচ্চু ভাই তাতে সায় দিলেন, ‘ঠিক আছে,’ তিনি বললেন, ‘নৌকা ঘোরান।’

 নৌকা ঘোরানোর মুহূর্তে রোশনারা আমাদের ডাকলেন। ‘বাবারা,’ আর্তকণ্ঠে তিনি বললেন, ‘বাচ্চাটারে বাঁচান।’

তিনি যে রোশনারা, তা তখনো জানি না। ছোটখাটো একটা মানুষ, চোখে পড়ার মতো মোটেও নয়, শুধু দুটি চোখ ছাড়া। শ্যামলা রং, একটা একপেড়ে সাদা শাড়ি পরেছেন, কাদা-কালিতে সেই শাড়ির সাদা আর অবশিষ্ট নেই। মাথায় হালকা একটা ঘোমটা, ঘোমটার নিচে চুল কালো-বাদামি, জট পাকানো। কপালে ভাঁজ।

আমরা তাঁর হাতে ধরা বাচ্চাটার দিকে তাকালাম। অভিজ্ঞ মোশাররফ বলল, ডায়রিয়া।

বাচ্চু ভাই এক মাঝিকে বললেন, ‘বাচ্চাকে আর মহিলাকে নৌকায় তোলেন।’

মাঝি দ্বিধায় পড়লে বাচ্চু ভাই হাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে নিলেন। বাচ্চাটা নেতিয়ে পড়েছে, গায়ে দুর্গন্ধ, দাস্ত হচ্ছে—বোঝা গেল। তার পরও কাঁইকুঁই করে সে কাঁদল। নতুন মানুষের কোল তার পছন্দ না। ‘আপনিও উঠুন’, রোশনারাকে বললেন বাচ্চু ভাই।

মোশাররফ আমাকে আগেই জানিয়েছে, ডায়রিয়ার মহৌষধ কিছু স্যালাইন এনেছে সে। বাচ্চু ভাইও এনেছেন। ১৯৮০ সাল থেকে ব্র্যাক এই মহৌষধ বাজারে ছেড়েছে। ওরাল স্যালাইন নিয়ে আসার চিন্তাটা এই দুজনের মাথায় এসেছে, আমার আসেনি। অবাক। অথচ আমি কিনা প্রাচ্যের অক্সফোর্ডে অধ্যাপনা করি!

 

চার

 

আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম, বাচ্চাটা রোশনারার। কিন্তু তিনি জানালেন, এটি তাঁর নাতি। তাঁর ছেলে ফয়জুলের। ফয়জুল কুয়েত গিয়েছিল দালানে কাজ করতে। উঁচু দালান থেকে পা পিছলে পড়ে মরেছে।

 রোশনারার যে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাওয়া বয়সী একটা ছেলে থাকতে পারে, যার আবার দু-তিন বছরের এক ছেলেও আছে—এই চিন্তাটা একটা খটকার মতো আমাদের ভাবাতে শুরু করতে না করতেই সেই ছেলের মৃত্যুসংবাদ আমাদের বুকে শেলের মতো হানল। ‘শেলের মতো হানল’ কথাটা বাচ্চু ভাইয়ের। নেতিয়ে পড়া বাচ্চাটা দেখেই তাঁর চোখে চিকচিক করা বাষ্প জমেছিল, বাচ্চাটার বাবার এ রকম অপঘাতে মারা যাওয়ার কথা শুনে সেই বাষ্প তরল হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরেছিল।

ফয়জুলের মৃত্যুর এক বছরও হয়নি। কিন্তু রোশনারা যখন তার ওই উঁচু দালান থেকে পড়ে মারা যাওয়ার কথা বলছিলেন, তাঁর মুখের ভাবে কোনো পরিবর্তন ছিল না। যেন এমন মৃত্যুতে কষ্টের কিছু নেই, অথবা যেন এমন মৃত্যু হরহামেশেই হয়, যেন তাঁর নিজের আরো সাত-আট ছেলে এভাবেই মরেছে।

রোশনারার মুখে আমি একটা ধাঁধা দেখলাম। বাচ্চু ভাই ভেজা গলায় কথা বলছিলেন। তাঁর ভেজা গলার ছোঁয়ায় আর মোশাররফের খাবার স্যালাইন হাতে নার্সের ভূমিকায় নামায় রোশনারা আশ্বস্ত হয়েছেন এবং নিজের নামটি বলেছেন। আমি বুঝলাম, তাঁর বলার অনেক কিছুই আছে, কিন্তু তাঁর সব গল্পে হয় তাঁর ছেলের মৃত্যু অথবা বন্যা অথবা নাতির অসুস্থতা অথবা সব কিছুর যোগফল অথবা অন্য কিছু—একটা ছিপি লাগিয়ে দিয়েছে।    রোশনারা মাথা নিচু করে বসে ছিলেন, আমি তাঁকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, এ কোনো সহজ অথবা অসহায় মানুষের মাথা নিচু করে বসা নয়—এই বসা সময়ের বিপরীতে, ভাগ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়ে যাওয়া কারো সাময়িক বিরতির এবং এই বসাটা তাঁর অভ্যাসে নেই—হয়তো সে জন্য কিছুটা অস্বস্তি। বাচ্চু ভাইয়ের গলার আর্দ্রতা আটাশির প্লাবনকে ছাপিয়ে গেল। তাঁর কথা রোশনারার গল্প আটকে দেওয়া ছিপিটা আলগা করল। রোশনারা শুরুতে এককথা-দুইকথায়, পরে আস্ত এক একটা বাক্যে উত্তর দিতে থাকলেন। আমার জানা হলো—এবং জেনে তাঁর জন্য এক গভীর মমতা আমাকে পেয়ে বসল—যে আমি আর রোশনারা সমান বয়সী। পনেরো বছরে বিয়ে হয়েছিল তাঁর, ষোলো বছর বয়সে ফয়জুল জন্মেছিল, উনিশ বছর বয়সে মেয়ে পারুল। রোশনারার বয়স যখন একুশ এবং দেশের অনেক মানুষ যে সময় যুদ্ধে গেল, সেই সময় তিনি হারালেন তাঁর স্বামীকে। তারপর নতুন দেশ হলো, আর রোশনারার নতুন কিন্তু ভয়ানক এক অরক্ষিত জীবন শুরু হলো। এই জীবনের গল্পে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই; যেহেতু এই জীবনটা তিনি চাননি, না এলেই ভালো হতো; কিন্তু এই জীবন নিয়ে তাঁকে চিরতরে হারিয়ে দিতে দেয়নি তাঁর দুটি সন্তান। এই জীবনটার কথা বলতে গিয়ে রোশনারা সময়কে একদৌড়ে পার করিয়ে দিয়েছেন একটা ক্লান্ত রেসের ঘোড়া যেমন দৌড়ায়, না দৌড়িয়ে তাঁর উপায় নেই জেনে, সে রকম। তিনি তাঁর গল্পের ক্লান্ত ঘোড়াকে থামিয়েছেন ফয়জুলের আঠারো বছর বয়সে বাবা হওয়ার দিনে এবং সেখান থেকে আবার শুরু করেছেন, তবে এবার ঘোড়াটাকে হাতে ধরে তিনি হাঁটালেন, মাঝে মাঝে জিরিয়ে নিতে দিলেন। তাঁর গল্পে ছেলের বিয়ের কোনো উল্লেখ না থাকায় আমি অবাক হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, হয়তো ছেলের বিয়ে নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল অথবা ছেলের বউকে নিয়ে—অথবা দুটোই। আমি শহরের মধ্যবিত্ত মানুষ, এ রকম ভাবাটাই আমার কাজ। কিন্তু আমাকে অবাক করে রোশনারা জানালেন, প্রস্তাবটা ছেলেই এনেছিল বটে; কিন্তু মেয়েকে দেখে তাঁর পছন্দ হয়েছিল। মেয়ের মা-বাবা গরিব। বাবা বেগার খাটেন। মা গ্রামের গৃহস্থবাড়িতে কাজ করেন। কিন্তু মেয়েটি খুবই লক্ষ্মী। এখন এই বানের দিনে ছেলেকে রোশনারার হাতে দিয়ে মেয়েটি মা-বাবার দেখাশোনা করছে। তবে বান নামা পর্যন্ত তাঁরা বাঁচেন কি না সন্দেহ। রোশনারা নাতিকে কোলে নিয়ে এই সরীসৃপ রাস্তায় এসে উঠেছিলেন একটা আশা নিয়ে—আকাশ থেকে নামা কোনো একজন, তিনি ডাক্তার হতে পারেন অথবা না-ও হতে পারেন—তাঁর নাতিকে ভালো করে দেবেন। দুই দিন ধরে ভুগছে ছেলেটি, আর দুই দিন পার হলে সে মরে যাবে, তখন তিনি কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াবেন লক্ষ্মী বউটার সামনে? নাতিটা মরে গেলে দাফনের মাটিটাও মিলবে না। বেলঘরে অনেক মৃতকে বানের হাতেই সঁপে দিয়েছে মানুষ।

 মোশাররফ তাহলে আকাশ থেকে নামা সেই মানুষ। কারণ সে বাচ্চাটার জন্য চিঁড়া, দুধ আর কলারও ব্যবস্থা করেছে। এসব খেয়ে আধাঘণ্টায়ই বাচ্চাটা শান্তি পেয়ে ঘুমাতে গেছে।

বাচ্চা কোলে মোশাররফকে দেখে মনে হচ্ছে, প্যান্ট-শার্ট পরা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল।

বাচ্চু ভাইয়ের আর্দ্র গলা আরো আর্দ্র হচ্ছে। নৌকার বাইরে ঝুপঝুপ বৃষ্টি পড়ছে। আমরা এখন যাচ্ছি     রোশনারার বেয়াইদের বাড়ির দিকে। লক্ষ্মী বউটা না খেয়ে আছে, ওর গায়ের পুরনো শাড়িটা ন্যাকড়া হয়ে গেছে, তার ওপর ভিজে পচে গেছে। বৈঠায় নরম শব্দ উঠছে। সেই শব্দের সঙ্গে তাল রেখে রোশনারার নরম গলা ওঠানামা করছে। একসময় সেই গলায় একটা অবাক তেজ এলো। তেজটা শ্রোতাদের জাগিয়ে দেয়, তাদের রক্তে একটা টান দেয়। আমি জানি, তেজটার উৎস কোথায়।

আমি তাঁর আড়াআড়ি বসেছি, বাচ্চু ভাই বসেছেন সামনে। আমি তাঁর মুখের একটা দিক দেখছি, গর্তে বসা একটা চোখের আলো জ্বলা-নেভা দেখছি, দু-এক গোছা কালো বাদামি চুলের অবাধ্য ওড়াউড়ি দেখছি এবং ভাবছি, তিনি আমার থেকে যেন কত বছরের বড়, যেন আমি তাঁর ধারেকাছে কোনো দিন পৌঁছতে পারব না, যেন এক শূন্য জীবন নিয়ে আমি এখনো তাঁর থেকে বেঁচে থাকার মতো দূরত্বেও পা রাখতে পারিনি।

 

 

পাঁচ

 

বছরটা ছিল গণ্ডগোলের, বললেন রোশনারা। ‘গণ্ডগোলের’ কথাটা শুনে আমার খারাপ লেগেছে। একটা আপত্তি জানানোর কথা মনে এসেছিল। কারণ আমি দেখেছিলাম দেশের দুই সামরিক শাসক ও তাঁদের জিন্দাবাদ-মারহাবা আওয়াজ তোলা সাগরেদরাও সে রকমটা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন, কিন্তু বাচ্চু ভাই ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিলেন। বুঝলাম রোশনারার গল্পটাকে তিনি বাধাহীন চলতে দিতে চান। কিছুদিন থেকেই রোশনারা শুনছিলেন দেশে কিছু একটা হতে যাচ্ছে; টেরও পাচ্ছিলেন। ফয়জুলের বাবা হাট থেকে ফিরে তাঁকে সে রকমটাই বলতেন। একদিন তিনি জানালেন যুদ্ধ লেগেছে। কিন্তু কোথায় লেগেছে, কারা যুদ্ধ করছে, কিভাবে করছে—রোশনারা ঠাহর করতে পারলেন না। যুদ্ধ করছে যে বন্দুক কই? ঘোড়া কই? তিনি তো শুনেছেন রাজা-বাদশাহরা যুদ্ধ করতেন ঘোড়ায় চড়ে। সে বছর বৈশাখে, রোশনারার সেই অদৃশ্য যুদ্ধের শুরুতে তাঁর লালরঙা গাভিটা একটা বাছুরের জন্ম দিল, কিন্তু বাছুরটার লেজের মুখ দুটো। দুই লেজের বাছুর দেখে ফয়জুলের বাবা ভয় পেলেন অথচ লোকটার বুকের ছাতি ছিল কত চওড়া, গুর্দা-কলিজা ছিল হামিদ পালোয়ান থেকেও তাজা।

গণ্ডগোলের শুরু হলো হঠাৎ একদিন প্রীতিলতাদের বাড়িতে যখন আগুন লাগল। লাগল না, লাগাল কিছু মানুষ। সেই কিছু মানুষ আবার বেলঘরেরই, যাদের ফয়জুলের বাবা নাম ধরে ডাকতেন। তিনি দৌড়ে এসে বললেন, এবার রক্ষা নেই। আর্মি এসেছে।

আর্মি কী জিনিস রোশনারা জানতেন না; কিন্তু তারা যে ভয়ানক, তা বুঝতে পেরেছিলেন। তারা অবশ্য ওই দিন আসেনি অথবা তার পরদিন অথবা আরো এক মাসও আসেনি। যেদিন তারা এসেছিল, রোশনারা জানালেন, বেলঘরের শ্রাবণের আকাশটা, মাটি আর পুকুরটা—আটাশির পানিতে যে পুকুরটা তলিয়ে গেছে, যাকে আর দেখা বা চেনার উপায় নেই—তারা তৈরি ছিল। তবে সে গল্প পরে।

প্রীতিলতাদের বাড়িতে যারা আগুন দিল তাদের একজন ছিল প্রতিবেশী। ছোটবেলা সে প্রীতিলতার সঙ্গে স্কুলে পড়েছে, পুকুরে—ওই পুকুরটাতে—সাঁতার কেটেছে। একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে ওর পায়ের হাড় মচকে গেলে প্রীতিলতা সেই হাড়ের ওপর চুন আর বাটা হলুুদের পট্টি বেঁধে দিয়েছে। অথচ আগুন দেওয়ার দিন প্রীতিলতার চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলেছে, ‘তোকেও পুড়াতে পারতাম, পুড়ালাম না। এখন তোরা ভারত যা।’ প্রীতিলতা বাপের বাড়ি এসেছিল। কারণ তার দুই নম্বর বাচ্চা হতে যাচ্ছিল। আগুনের ঘটনায় আর ভয়ে-শঙ্কায় প্রীতিলতার ভেতরটাতে একটা ওলটপালট হলো। একটু আগেভাগেই বাচ্চাটা বেরিয়ে এলো। মরা।

প্রীতিলতা তার বাপ-মায়ের হাত ধরে দুই বছরের ছেলেটাকে কাঁধে ফেলে গ্রাম ছেড়ে পালাল। পালানোর সময় রোশনারাকে বলল, ‘নফর নিজে বা তার লোকজন দিয়ে আমাকে অনেক কিছু করতে পারত। না করে সে যে দয়া দেখিয়েছে, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এ কথাটা তুমি তাকে জানিয়ে দিয়ো।’

নফর প্রীতিলতার সেই ছোটবেলার বন্ধু।

নফরকে অবশ্য প্রীতিলতার কথাটা চাইলেও রোশনারা পৌঁছে দিতে পারতেন না। নফর মারা পড়েছিল। ফয়জুলের বাবা জানিয়েছিলেন, সে এক সন্ধ্যার পর গঙ্গাছড়াতে আর্মিদের ক্যাম্পে ঢুকতে গিয়ে গুলি খেয়েছিল। ঠিক কী কারণে, তিনি তা বলতে পারেননি।

গ্রামটাতে দশ-বারো ঘর হিন্দু ছিল, সেসব ঘরের    দু-তিনটি পুড়েছে, সুদেব মাস্টারের বাড়ি লুটপাট হয়েছে। আগুনে পুড়েছে সাজু চেয়ারম্যানের বাড়ি। ধনু মিয়া আর আবদুর রহিমের বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে, লুটপাট হয়েছে আরো দু-এক বাড়ি। এসব ঘটনায় চার-পাঁচজন মানুষ মরেছে, জখম হয়েছে কেউ কেউ। গ্রামের মানুষ আহাজারি করেছে, কান্নার রোল উঠেছে অনেক বাড়িতে। কিন্তু কয়েক বাড়িতে ঈদের আনন্দ দেখা গেছে আষাঢ়ের কালো মেঘ ছাওয়া দিনেও। সেসব বাড়ির একটি আসগর আলীর। সেই বাড়িতে টঙ্গিঘরের মাথায় চান-তারা পতাকা উড়েছে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা দিনেও। আসগর আলী ডেকেছেন ফয়জুলের বাবাকে, বলেছেন তাঁর সঙ্গে কাজ করতে। কাজ, অর্থাৎ নফর যা করত। নফর মারা পড়েছিল। নফরের সঙ্গে যাওয়া নূর মিয়াকে আর্মিরা ক্যাম্পে রেখে দিয়েছিল। আসগর আলীর মানুষজনে টান পড়েছিল। ফয়জুলের বাবা বলেছিলেন, তিনি নিজেকে মানুষ বলেই মনে করেন, নফর বলে নয়। আসগর আলী প্রথমে তাঁকে ধমক দিয়েছিলেন, তারপর সতর্ক করেছিলেন, তারপর জানিয়ে দিয়েছিলেন আজরাঈল ফেরেশতার জন্য তৈরি থাকতে। ফয়জুলের বাবা বেরিয়ে আসতে আসতে বলেছিলেন, তাঁর ঈমান মজবুত, তাঁর যেদিন যাওয়ার সময় হবে, আজরাঈল ফেরেশতার সঙ্গে তিনি ঈমানের সঙ্গেই যাবেন।

ফয়জুলের বাবা এসব কথা কেন স্ত্রীকে বলতেন, বাচ্চু ভাইয়ের এই প্রশ্নে রোশনারা একটুখানি হেসেছিলেন। এই প্রথম তিনি হেসেছিলেন। তাঁর হাসি দেখে মনে হলো, শ্রাবণ দিনের মেঘ ছাওয়া বিকেলের সূর্যটা যেন একটুখানি ঝিলমিলি দিল।

 

ছয়

 

আমরা রোশনারার বেয়াইদের বাড়িতে পৌঁছলাম। বাড়িটা অনেকটাই তলিয়ে পানিতে—বাড়ি বলতে একটুখানি ছনছাওয়া চাল, বাঁশের বেড়া একটা দরজার আধখানা, একটা অদৃশ্য দাওয়ায় দুটো কাঠের চৌকি বাঁধা একটা বাঁশের সঙ্গে। চৌকির পাটাতনের কয়েক আঙুল নিচেই পানি। এক লোক চৌকিতে শুয়ে, দেখে মনে হতে পারে মারাই গেছেন। তাঁর পাশে হাঁটুতে মাথা ঢুকিয়ে বসে থাকা এক মহিলা; অন্য চৌকিতে ঘর-সংসারের টুকটাক জিনিসের সঙ্গে চুপচাপ বসে থাকা একটি বছর কুড়ি বয়সের মেয়ে। লক্ষ্মী বউ। প্রথম চৌকিটি কিছুটা ঢেকে রেখেছে ঘরটার চাল, দ্বিতীয় চৌকিটার ওপর বৃষ্টি পড়ছে। আমাদের নৌকা দেখে লক্ষ্মী বউ ভয় পেল। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারল না, আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। নৌকা থেকে গলা বের করে রোশনারা তাকে ডাকলেন, কথা বললেন।

 

সাত

 

বিকেলের দিকে মোশাররফ বলল, আরো দুই দিন লাগবে ছেলেটার পুরো ভালো হতে।

লক্ষ্মী বউয়ের বাবা মারাই গেলেন। মারা গিয়েই ছিলেন নব্বই ভাগ, এমনি তীব্রতায় খিদা মানুষকে শেষ করে দেয়। আমাদের দেওয়া খাবার ছুঁয়ে দেখারও তাঁর শক্তি ছিল না, ইচ্ছা নিশ্চয়ই ছিল। বাচ্চু ভাই টাকা দিলেন, মাঝিদের একজন তাঁকে ভাসিয়ে দিয়ে এলেন ঘাঘটের ভাটিতে। লক্ষ্মী বউয়ের মা চৌকি থেকে নামতে রাজি হলেন না। স্বামী চলে গেছেন, তিনিও যাওয়ার পথে।

দশ দিনের জমে থাকা খিদা নিয়ে তিনিও যে টিকে ছিলেন, সে-ও এক আশ্চর্য বিষয়।

মাঝিরা অধৈর্য হচ্ছিলেন। বাচ্চাটাকে, বুড়িটাকে, অর্থাৎ রোশনারাকে—এবং এখন রাতে লক্ষ্মী বউটাকে—নৌকাতে রাখতে গিয়ে তাঁদের প্রচুর সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু বাচ্চু ভাই তাঁদের অধৈর্য আর আপত্তি টাকা দিয়ে কিনে নিলেন।

খিদার মতো টাকারও শক্তিটা এতই প্রবল, কিছুতেই ঠেকানো যায় না।

 

 

আট

 

গল্পটাকে ছোট করতে হয় এবং ছোট করতে গিয়ে লক্ষ্মী বউয়ের মা যে মারা গেলেন স্বামী মারা যাওয়ার ঠিক এক দিন পর এবং স্বামীর মতো তিনিও যে আমাদের ত্রাণের খাদ্যকে ছুঁয়েও দেখলেন না অথবা ছুঁয়ে দেখার শক্তি যে তাঁর ছিল না। আগ্রহটা থাকলেও এবং খিদা যে তাঁকে কিভাবে জীবন থেকে একটানে ছিনিয়ে নিল এবং প্লাবনের পানি যে তাঁর মরা শরীরটা কোন ভাটির দিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সে কথাগুলো, রোশনারার ভাষায়—আকাশেই জমা রেখে দিতে হলো। যা বরং বলা যায় এবং তা-ও ছোট দাগে, তা হলো, লক্ষ্মী বউ, যার একটা নাম ততক্ষণে/তত দিনে আমাদের জানা হয়েছে, হালিমা, সে আমাদের সঙ্গে ঢাকা গেল। ঢাকায় গার্মেন্ট ব্যবসা তখন ফুলেফেঁপে উঠছে, হালিমাদের মতো লক্ষ্মী বউদের পেলে গার্মেন্টওয়ালারা কোনো প্রশ্ন না করেই কাজে লাগিয়ে দেয়। বাচ্চু ভাইয়ের এক বন্ধুর গার্মেন্ট কারখানা ছিল, তেজগাঁওয়ে। হালিমা সেখানে চাকরি পেল। তার বাচ্চাটাকে সে সঙ্গে রাখল। চার-পাঁচ মেয়ের সঙ্গে মিলে একটা ঘর ভাড়া নিল, সেখানে আরো একজন ছিল সন্তান নিয়ে, এক নানিমা অথবা দাদিমাও ছিল তাদের সঙ্গে...। যা-ই হোক।

রোশনারাকে ততক্ষণে/তত দিনে আমার অনেকটা চেনা হয়েছে। আমি বুঝেছি তিনি মেয়ে পারুলের অথবা হালিমার সঙ্গে গিয়ে থাকার মতো মানুষ নন। নাতিকে, লক্ষ্মী বউকে হারিয়ে তিনি খুব মনঃকষ্টে থাকবেন, কিন্তু ভাঙবেন না। তাঁর দুই বছর কম চার দশকের জীবনে তিনি অনেক ভেঙেছেন; জীবনটাই তো তাঁর ভাঙা, কিন্তু মচকাননি একবারও।

কিছু মানুষ থাকেন, নিয়তিও যাঁদের বাঁকা করতে, মচকাতে পারে না। না মচকালে, শুধু ভেঙে গেলে নিয়তিও হতাশ হয়, পরাজিত বোধ করে; নিয়তি মানুষকে মচকাতে পারলেই খুশি হয়। সেটিই তার মূল কাজ।

রোশনারার সঙ্গে নিয়তি তার মূল কাজটা করতে পারেনি। সে জন্য তাঁকে শুধু ভেঙেই সে যেটুকু তৃপ্তি পেয়েছে, পরাজিতের কোনো তৃপ্তি থাকলে সেই তৃপ্তি। তাঁর নাতিটাকে, লক্ষ্মী বউটাকে তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে নিয়তি আরেকবার তাঁকে ভাঙল। কিন্তু একটা ভাঙা আয়না আরেকবার ভাঙলে কী আসে-যায়!

 

নয়

নৌকার বাইরে অন্ধকার। বৃষ্টি থেমেছে। নৌকার ভেতরে একটা হারিকেন লণ্ঠন জ্বলছে। আলো থেকে যেন অন্ধকারই বেশি ছড়াচ্ছে লণ্ঠনটা। কেরোসিনে ভেজাল, প্রচুর কালি হচ্ছে সে জন্য। লণ্ঠনের চিমনিটার ওপর দিকটা ঢেকে গেছে সেই কালিতে।

তাতে লাভ হয়েছে, রোশনারার মুখের অল্পখানি ছাড়া পুরোটাই ছায়ায় ঢাকা। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে একটা প্লাবনের ভেতর থেকে যেন অল্পখানি জেগে থাকা এক ডাঙার মানুষ। যেন এই শেষ গল্পটা বলে তিনি আবার তলিয়ে যাবেন; অথবা এই গল্পটা শেষ হলে তিনি আবার প্লাবনে গা ভাসাবেন।

সে জন্য কি না, তাঁর গলায় আলাদা একটা জাদুও ছিল। একসময় মনে হলো তাঁর কথাগুলো যেন মেঘের ভেতর থেকে ভেসে আসছে, তাতে বাদলা দিনের একটা মায়াও যেন লেগে আছে। এ রকম কথা যখন বাজে, তখন তাদের থেকে কান ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।

তিনি বলছিলেন আসগর আলীর জনবল বাড়ানোর গল্প। ফয়জুলের বাবাকে না পেলেও আরো তিন-চারজন মানুষকে পেতে তাঁর সমস্যা হয়নি। আসগর আলীর জমি ছিল, টাকা ছিল; কিন্তু ওই সময়টাতে টাকা থেকেও বোধ হয় মানুষের জীবন-মরণের ওপর তার ক্ষমতাটা বেশি ছিল—তাতে ওই কিছু মানুষেরও লোভ জেগেছিল। আসগর আলী চাইলে কেউ বেঁচে থাকবে, না চাইলে না—তার দলে যোগ দেওয়া যারা তরুণ ছিল, তাদের কাছে এ বিষয়টা ছিল নেশা জাগানোর মতো। তার ওপর বাড়তি পাওনা ছিল প্রবল শক্তিধর, ভিনদেশি, ভিনভাষী কিছু মানুষের খিদমত করার, তাদের প্রিয় খিদমতগার হওয়ার লোভ। লোভ আরো ছিল, চান-তারার পক্ষে দাঁড়িয়ে ভারতের দালালদের শেষ করে দেওয়া।

আসগর আলী একদিন আর্মি ডেকে আনতে গেল। তার ডাকটা নিশ্চয়ই সে খুব আদব-লেহাজের সঙ্গেই দিয়েছিল। আর্মি এলো। চার-পাঁচজনের একটা দল।

এরপর কী কী ঘটল, গল্পটার ডালপালা কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়ল, তার বর্ণনা দেওয়াটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রথমত গল্পটা আমার নয়, সে জন্য; কিন্তু আমার হলেই বা কী হতো, যেখানে রোশনারা ছিলেন, তাঁর শ্রাবণের মায়া ছড়ানো গলা নিয়ে। সে জন্য গল্পটা তাঁর বয়ানেই শোনা যাক, যদিও তাতেও একটা সমস্যা—তাঁর বলা সেই গল্পটা আমার লেখায় অনেকটাই হারিয়ে যাবে। তার পরও।

‘দিনটা ছিল শ্রাবণের,’ রোশনারা বললেন, ‘আকাশে মেঘের পাহাড় জমে ছিল। বৃষ্টি হয়েছিল সারা রাত, তাতে বেলঘরের পুকুরগুলো ভরে ছিল। তবে পানি অনেক হলেও এখন যে পানি দেখছেন এই ভাদ্রেও, তেমন না। এখন তো নৌকা ছাড়া চলাই দায়। যেদিন আর্মি এসেছিল, আসগর আলীর দল তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল। পথঘাট ভেজা ছিল, কাদায় লেপা ছিল, কিন্তু তারা হেঁটেই এসেছিল। ফয়জুলের বাবার এক বন্ধু ছিল, তারা মিয়া, তাঁর ছোট দুটো ভাই পাহারায় ছিল। তারাই দৌড়ে এসে খবর দিয়েছিল আর্মি আসছে। আমাকে নিয়ে ফয়জুলের বাবার খুব ভয় ছিল, আমাকে লুকিয়ে রাখতেন এবাড়ি-সেবাড়ি; দু-এক রাতে বেলঘরের বাইরে যে জঙ্গলটা ছিল—এখন নেই, এখন সেই জঙ্গল কেটে এরশাদের মানুষেরা গাছ বিক্রি করেছে, জমিতে তামাক ফলিয়েছে, অল্প কিছু গাছ আর বাঁশঝাড় যদিও এখনো আছে—সেই জঙ্গলেও থেকেছি। সেদিন দুপুরের আগে যখন খবরটা এলো, গ্রামের অনেক মানুষ এদিক-সেদিক পালাল। কিন্তু আমার মনে হলো, শ্রাবণের আকাশটা অনেক নিচে নেমে এসেছে। এ জন্য কি না, মেঘ আরো কালো হলো, বাতাসটা ভারী হয়ে এলো। এই গ্রামটার আকাশে অনেক কান্না জমে ছিল, জমিতে অনেক চোখের পানি ছিল, রক্তও পড়েছিল। সে জন্য জমিও যেন কালচে সবুজ হয়ে গেল। পা পড়ে জমিতে; কিন্তু জমিতে যেন না, যেন ফুলে ওঠা খড়বিচালির ওপর—পা-টা কেমন টেনে ধরে। ফয়জুলের বাবা কয়েক দিন ধরেই বাইরে বাইরে ঘোরেন; তাঁর সঙ্গে দু-তিনটি ছেলে, তারা গঙ্গাছড়ায় কলেজে পড়ে। তারা কোথা থেকে বন্দুক জোগাড় করেছে, জানি না। ফয়জুলের বাবা জানালেন, তিনি বন্দুক চালাতে জানেন। শুনেই আমার ভয় লেগেছে। বন্দুক তো মানুষ মারার জন্য। একসময়, আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, মিয়াবাড়ির বড় ছেলে বন্দুক নিয়ে পাখি শিকার করত...’

এইখানে বলে নিই, এই মিয়াবাড়ি বাচ্চু ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি। মিয়াবাড়ির সেই ছেলে তাঁর সম্বন্ধী। তিনি বন্দুক না, এয়ারগান দিয়ে পাখি শিকার অথবা শিকারের চেষ্টা করতেন। কিন্তু রোশনারার তো বন্দুক আর এয়ারগানের পার্থক্য জানার কথা না...

‘দিনটা কান্নায় ভিজে আরো ভারী হয়ে গিয়েছিল’, রোশনারা জানালেন, ‘আরো ভারী। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সেসব ঠেলেও আর্মি এলো। চার-পাঁচজন আর্মি। তাদের সঙ্গে ছিল আসগর আলীর নফররা। না, নফর তো তত দিনে মরে গেছে। যা-ই হোক তারা সাত-আটজন। গ্রামের কারো রেহাই পাওয়ার কথা না।

কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটা ঘটে গেল।’ দিনটা কান্নায় মোড়া ছিল, জানতাম; আরো কিছু কান্না এতে যোগ হবে, তা-ও জানতাম। কিন্তু তাতে দিনটার কোনো ইতর-বিশেষ তো হবে না। হঠাৎ কোথা থেকে সেই কলেজের ছেলেরা, আরো কিছু ছেলে মিলে, ফয়জুলের বাবা আর তাঁর দু-এক বন্ধু মিলে আর্মিদের ওপর চড়াও হলো। কোন গাছের পেছনে, ঝোপের আড়ালে, বাঁশঝাড়ের গহিনে তারা লুকিয়ে ছিল, কে জানে! আসগর আলীর নফররাও কেউ টের পায়নি, যে ছেলেগুলোকে আসগর আলী ‘মুক্তি’ বলে মসকরা করত, ডাক দিয়ে শব্দ করে থুতু ফেলত তাদের উদ্দেশ করে, সেই মুক্তিরা এতটা অবাক করা একটা হঠাৎ হামলা করে বসবে। আসগর আলীর ছোট ভাই আফসার পড়ল প্রথমে, গাছিরা যে দা দিয়ে কাজ করে, তার একটা কোপে।

‘তারপর তো দোজখের দরজা খুলে গেল।’ রোশনারা হঠাৎ চুপ করে গেলেন। তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে গেল। বাচ্চু ভাই আমার সঙ্গে চোখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। একটু পর তিনিই তাঁর পাকাপাকি হয়ে যাওয়া ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘সব দরজা খুলে গেল?’

রোশনারা চোখ খুললেন, ছোট্ট করে বললেন, ‘আর্মিরা গুলি ছুড়তে শুরু করল। আমার দুই লেজওলা বাছুরটার গায়ে একটা গুলি এসে লাগল। সেটা লুটিয়ে পড়ল। পড়ার সময় বাছুরটা মাকে ডেকেছিল।’

‘বাছুরটা তার মাকে ডেকেছিল?’ বাচ্চু ভাইয়ের অবাক প্রশ্ন। ‘জি। সব প্রাণীর বাচ্চারা এভাবে মারা যাওয়ার সময় তাদের মাদের ডাকে। মানুষের বাচ্চাদের মতো। আর তাতে মাদের বুক ভেঙে যায়। তারা কাঁদে। অভিশাপ দেয়।’

‘অভিশাপ দেয়?’

‘জি, অভিশাপ দেয়। অভিশাপ না দিলে আর্মিগুলো এদিকে আসবে কেন? পুকুরের এই পারে আমাদের ঘরটার দিকে, যার উঠানের এক কোনায় বাছুরটা দাঁড়িয়ে খড় খাচ্ছিল—বৃষ্টি থেকে খড়গুলো ভালোই বাঁচিয়েছিলাম সেবার। ওই বাছুরটাকে অনেকে ভয় পেতেন, খুব ভয় পেতেন, তার দুই মুখো লেজের জন্য। দু-একজন জবাইও দিতে চেয়েছিলেন। তাঁরা বলতেন, বাছুরটা অনিষ্ট আনবে। আমি এসবে কান দিতাম না, আমার মনে হতো বাছুরটা একটা ভালো কিছুর ইশারা নিয়ে এসেছিল। সে জন্য ওকে আমি খুব যত্ন করতাম, খড় খাওয়াতাম ঘাসের সঙ্গে মিশিয়ে। এই খাবারটা বাছুরটার খুব পছন্দের ছিল। মানুষের ভয়ে বাছুরটাকে আমি উঠানেই রাখতাম। সেদিনও বাছুরটা খড়-ঘাস খাচ্ছিল আর নাচানাচি করছিল।’

রোশনারা থামলেন। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকলেন। তারপর চোখ বন্ধ করে হয় ঘুমিয়ে গেলেন, অথবা ধ্যানে। বাচ্চু ভাই দু-একবার তাঁকে এটা-সেটা প্রশ্ন করলেন; কিন্তু রোশনারা কোনো কথা বললেন না। আমি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম, রোশনারার গল্পটা না হারিয়ে যায়।

অবাক, সারা বিকেল আর তিনি মুখ খুললেন না। শুধু নাতিটা যখন তাঁকে দাদি বলে ডাকল, তিনি হাসলেন, হাত বাড়িয়ে তাকে কোলে নিলেন। কিন্তু ছেলেটা যত সুস্থ হচ্ছে, তত তার পায়ের ওপর ফেরত যেতে চাচ্ছে। সে বলল, ‘দাদি আমি বিস্কুট খাব।’

বিস্কুট বাচ্চু ভাইয়ের হাতে, তিনি বিস্কুট দেখিয়ে নাতিটাকে ডাকলেন।

 

দশ

রাত ১০টার মতো বাজে। বৃষ্টি নেই। পরদিন সকালে আমরা ফিরব। মাঝিরা সেই আনন্দে একটা গাছের সঙ্গে নৌকা বেঁধে ছইয়ের ওপর ঘুমাচ্ছে। কিভাবে যে ঢালু ছইয়ের ঠিক মাঝখানে দুই দিকে দুই হাত মেলে মানুষ এত নিরাপদ নিদ্রা দেয়, দুই মাঝিকে না দেখলে আমার বিশ্বাস হতো না। রাতের খাবার খাওয়া হয়ে গেছে। ছেলেকে নিয়ে হালিমা একটা কোনায় জড়সড় হয়ে ঘুমাচ্ছে। শুধু রোশনারা জেগে আছেন। মোশাররফ অনেকক্ষণ ধরে বন্যায় উত্তরের জনপদে গরিব মানুষদের জীবনে কত নতুন যন্ত্রণা জুটবে, সে বিষয়ে একটা বক্তৃতা দিয়ে ছইয়ে পিঠ ঠেকিয়ে ঘুমাচ্ছে। বাচ্চু ভাই চোখ বুজে আছেন, হয়তো মিইয়ে বোঝা যাচ্ছে না। আমি জেগে আছি। বানের পানি কিছুটা কমেছে। ছয় আঙুল আট আঙুলের মতো। তাতে কিছু কিছু বাড়ি বেশ জেগেছে। একটা গৃহস্থবাড়ির টিনের চালে মেঘে মোড়া চাঁদটার ঘোলাটে কিছু আলো পড়েছে। একটা কোমল করুণ ভাব চারদিকে। আমি ভাবছি, আমার সমবয়সী রোশনারার কথা। কাল থেকে তাঁর জীবনটা কেমন হবে, কে জানে! আমি হঠাৎ তাঁকে সেই প্রশ্ন করে বসলাম। আমার প্রশ্ন শুনে আমার দিকে একটুখানি তাকালেন রোশনারা; কিন্তু অবাক হলেন বলে মনে হলো না। ‘আমার আর আপনার একই বয়স, আমরা একই বছর জন্মেছিলাম,’ আমি হঠাৎ করেই তাঁকে বললাম—কেন, তার ব্যাখ্যা দিতে পারব না। তিনি একটু হাসলেন। নিচু কিন্তু গাঢ় গলায় বললেন, ‘আপনি ভয় পাচ্ছেন, আমার গল্পটা হারিয়ে যাবে। আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কোনো গল্পই হারায় না আসলে, ওই যে আকাশ দেখছেন, ওই আকাশে সব জমা থাকে। একটু কান পাতলে শোনা যায়।’

আমি এমনই অবাক হলাম রোশনারার কথায়, আমার মুখে কোনো কথা জোগাল না। আমার অজান্তেই চোখ দুটি আকাশের দিকে গেল। ভারী আকাশ। শ্রাবণ কবেই শেষ হয়ে ভাদ্র এসেছে, আকাশটা নিয়ে একটা বিপদে পড়েই যেন মাসটা এসেছে। আকাশজুড়ে এখন কালো মেঘ থাকুক, ভাদ্র যেন তা চাইছে না; কিন্তু শ্রাবণের জমানো সঞ্চয়কে সে ফেলেও দিতে পারছে না। ফেলে দিতে কিছুদিন হয়তো সময় লাগবে। আকাশে রাতের   দু-একটি পাখি উড়ছে, মেঘবন্দি চাঁদের মুক্তির সংগ্রাম চলছে, কিন্তু তাতে সাফল্য বলতে গেলে নেই। একটা ভেজা বাতাস জবুথবু গাছগুলোকে হালকা দোলাচ্ছে।

‘সেদিনের গল্পটা আমি বলতে চাই না। তাতে আমার কষ্টটা শুধু শুধু বাড়ে।’ রোশনারা হঠাৎ শুরু করলেন। ‘কিন্তু আপনাকে বলতে পারি। আমার বাছুরটাকে যে আর্মিরা গুলি করে মারল সে কথাটা মনে পড়লে এখনো আমার বাছুরটার দুটি চোখ মনে পড়ে। তার চোখ দুটি খোলা ছিল, এত বড় বড় চোখ, চোখের কোল গড়িয়ে পড়েছিল পানি। হয়তো অশ্রু, হয়তো বৃষ্টির পানি; কিন্তু বাছুরটার চোখে যে আকাশের ছায়া পড়েছিল, তাকেও আমি ভুলি নাই। এক কালো রাগী আকাশের ছায়া। আমি ভয় পেয়েছিলাম।

আমি বাছুরটাকে দুই হাতে ধরে কাঁদছিলাম; কিন্তু ফয়জুলের বাবা এসে আমাকে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। বললেন, আর্মি আসছে। আমি তাঁর সঙ্গে ঘরের পেছন দিকে পালিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, গাভিটা ছুটে আসছে। সে একটু দূরে, মাঠে ছিল; কিন্তু বাছুরটার ডাক শুনেছিল। ওকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, একটা ভয়ানক কিছু ঘটবে। গাভিটার চোখে আগুন ছিল। আপনাকে একটুখানি বাড়িয়ে বলছি না। বাড়িয়ে বলার আমার কোনো কারণ নেই।

ফয়জুলের বাবা আমাকে একটা বাদার পেছনে ঠেলে চলে গেলেন। শুধু বললেন, নিজেকে দেখে রেখো। বাচ্চাদের দেখে রেখো। এদের হাতে পড়া চলবে না। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। বললাম, সে ভয় নাই। আপনি যান। তাঁর চোখেও আগুন ছিল। পারুলটাকে কোলে আর ফয়জুলকে হাতে ধরে আমি বাদার পেছন থেকে তাঁর যাওয়া দেখছিলাম। হঠাৎ তিনি একটা গাছের আড়ালে চলে গেলেন। দুটো গুলির শব্দ শুনলাম। বাচ্চাগুলো একটু কাঁদল, তারপর একদম চুপ মেরে গেল। আমার চোখ পড়ল পুকুরটার দিকে। অনেক কচুরিপানা জমেছিল পুকুরটাতে। ওই বছর কচুরিপানা পরিষ্কার করা, পুকুরের যত্ন করা—এসব নিয়ে কেউ ভাবেনি। কচুরিপানা প্রচুর ছিল। কিন্তু এত? আমার মনে হলো, সারা পুকুর যেন ছেয়ে গেছে কচুরিপানায়। সবুজ, সমান হয়ে বিছানো। কোনো ফুল নেই অথচ বেগুনি রঙের অনেক ফুল সকালেই দেখেছি। সেগুলো কোথায় গেল? পুকুরটা হঠাৎ দুই হাত উঁচু হয়ে জমিনের সঙ্গে মিশে গেল। কিভাবে? কে তা সম্ভব করল? বেলঘরের আকাশ? মেঘ? আমার আদরের বাছুরটা? তার রাগী   মা-টা? আমি ভেবে পেলাম না, একটা আস্ত পুকুর কী করে একটা সবুজ মাঠ হয়ে যায় এবং চার-পাঁচজন আর্মি বন্দুক মারতে মারতে তার ওপর দিয়ে দৌড়াতে থাকে। একটুও বাড়িয়ে বলছি না আপনাকে। শুধু আর্মি না, আসগর আলীর তিন-চারজন লোকও নামল সেই পুকুরে। না না, নামল না শুধু, দৌড়াল তার ওপর দিয়ে। অথচ তাদের তো জানার কথা, এটা পুকুর। আজ সকালে আমি সেই পুকুরে নেমে গা ধুয়েছি। আর্মিগুলো, অবাক, পুকুরের মাঝখান পর্যন্ত দৌড়ে এলো, যেন তারা একটা মাঠে নেমেছে খেলতে। তাদের হাতের বন্দুক থেকে আওয়াজ হচ্ছিল। গুলি চলছিল। ফয়জুলের বাবা পুকুরের পশ্চিম দিকে দাঁড়িয়ে। তাঁর আশপাশে তাঁর বন্ধুরা। তাঁর হাতেও একটা বন্দুক। ওরা নামছে পুব থেকে। কিন্তু কোথা থেকে কী যে হলো, পুকুরের মাঝখানে এসে আর্মিগুলো হঠাৎ ডুবতে থাকল। তাদের পায়ের নিচের মাঠ হঠাৎ যেন ফের পুকুর হয়ে গেল। তারা প্রচণ্ড জোরে চিত্কার দিল, এ রকম ভয়ের চিত্কার আমি কোনো দিন শুনিনি। আর্মিগুলো টুপটাপ ডুবে গেল। অবাক, একেকটা আর্মি ডুবে যায়, তাদের হাত-পা ছোড়াছুড়িতে কচুরিপানাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়, কিন্তু তারা তলিয়ে গেলে কচুরিপানাগুলো ফের ঘন হয়ে পানিতে বিছিয়ে যায়। যেন কিছুই হয়নি, কেউ নেই তাদের নিচে, যেন তারা কোনো পুকুর নয়, একটা মাঠ ঢেকে রেখেছে ঘন সবুজ ঘাস হয়ে।

এমন আজব কিছু আপনি দেখেছেন এ জীবনে? আমার সমান বয়স তো আপনার, আপনিই তো বললেন?

একজন একজন করে বোধ হয় চারজন আর্মি হাওয়া হয়ে গেল, তাদের বন্দুক ধরা হাতসহ, লোহার টুপি পরা মাথাসহ। লোহার টুপি বিষয়ে অবশ্য জেনেছিলাম অনেক পরে, তা দেড় বছর তো হবে—এক শীতে, তাদের একটা টুপি ওই পুকুরে পাওয়া যাওয়ার পর।

আসগর আলীর দুইজন মানুষও মরেছিল পুকুরে ডুবে। বাকিগুলো মরল কলেজছাত্রদের বন্দুকে। আমাকে আর সেদিন পালাতে হয়নি। সেদিন পালাতে পারতামও না। কারণ ফয়জুলের বাবা। তাঁর বুকে গুলি লেগেছিল। গুলিটা সামনের দিকে ঢুকে পেছনে পিঠের কুজার পাশ দিয়ে আটকে ছিল। আমি যখন তাঁর মাথা আমার কোলে নিয়ে বিলাপ করছিলাম, তিনি একবার চোখ খুলেছিলেন। নিঃশ্বাস নিতে তাঁর বুক ভেঙে যাচ্ছিল। কিন্তু জীবনের সব শক্তি একখানে করে শুধু বলেছিলেন, ভালো থেকো। বাচ্চাদের দেখে রেখো। তিনি চোখ বুজলে আমি বুঝলাম, আমার ভেতরটা ওই দিনের আকাশটার মতো অন্ধকার হয়ে গেল, আমার জীবনের সব আলো মরে গেল। এর পরও তাঁর কথামতো আমাকে ভালো থাকতে হয়েছিল—ভালো থাকা বলতে আমার বেলায় যেটুকু হয়। বাচ্চাদেরও আমি দেখে রেখেছিলাম। নাতিটাকেও। শুধু এই ভাদ্রে এসে, এই পানিতে সে যেতে বসেছিল। আপনারা তাকে ফিরিয়ে এনেছেন। আমার কাজ শেষ।’

রোশনারার গল্প শেষ হলো, নাকি শুরু হলো, বোঝা গেল না। ‘এই শহীদের কবর কোথায় হয়েছিল,’ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম এবং করেই বুঝলাম, প্রশ্নটা আমার একটা ঘোর থেকে বেরোনোর উপায় মাত্র, কোথায় ফয়জুলের বাবার কবর হয়েছিল—তা জানার জন্য নয়। রোশনারার গল্প বলার মধ্যে একটা দমবন্ধ করা ঘোর ছিল, আমার সব ইন্দ্রিয়কে তা দখল করে নিয়েছিল। আমি ওই ঘোর থেকে বেরোনোর একটা চেষ্টামাত্র করেছিলাম। রোশনারা হাসলেন। ‘উনার নাম শহীদ ছিল না, উনার নামটা আমি স্বপ্নের ঘোরে জপি, দিনের কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওই নামে তাঁকে ডাকি। উনার নামটা আপনাকে না-ই বা বললাম। কিছু মনে করবেন না।’

আমার শিক্ষিত গালে রোশনারা—না, যা ভাবছেন তা না, একটা টোকাই শুধু দিলেন। আমার শ্রদ্ধাকে বুঝতে না পারার তার কোনো কারণ ছিল না।

কারণ যে ছিল না, তা একটু পরেই তিনি বোঝালেন। তাঁর কোমরে জড়িয়ে থাকা একটা তাগা তিনি খুলে আনলেন। সেটি আমার চোখের সামনে তুলে বললেন, ‘ইচ্ছা ছিল নাতিটা একটু বড় হলে, স্কুলে যাওয়া শুরু করলে তাকে সেটা পরিয়ে দেব। এখন নাতি কোথায় থাকবে, আমি কোথায় থাকব—সেটা শুধু ওপরওয়ালা জানেন। এইটা আপনাকে দেব। আপনি, আমি যেহেতু একই সময় দিয়ে এই দুনিয়ার আলো-বাতাসে জন্ম নিয়েছি, আপনার সঙ্গে আমার একটা আত্মীয়তা সে জন্য আছে। আপনিই সময়মতো আমার নাতিটাকে এইটা দেবেন।’

তাগার মাঝখানে বাঁধা একটা বুলেট। বোঝা যায়, অনেক পরিশ্রমে এক সুতার সমান একটা খাঁজ কাটা হয়েছে বুলেটেটা ঘিরে, যাতে তাগাটা এর চারদিকে শক্ত করে পেঁচানো যায়।

সতেরো বছর ধরে বুলেটটা তিনি আগলে রেখেছেন, এই তাগায় ঝুলিয়ে, শরীর পেঁচিয়ে। এখন সেটা নাতির জন্য আমার জিম্মায় দিতে চান।

‘এই তাগাটা আমার জন্য খুব ভারী ছিল,’ তিনি বললেন, ‘এটা খুলে হালকা লাগছে। এখন আমি আমার পথে যাব, আমার নাতি যাবে তার পথে। আমার পথ শেষ, তার পথটা অনেক দূরের। সে যেন পথে থাকে, তাগাটা সে জন্য তার দরকার।’

 

এগারো

রোশনারা বলেছিলেন, কোনো গল্পই হারিয়ে যায় না। ফয়জুলের বাবার গল্পটা তো অবশ্যই না। সেই গল্প আরেকটা মোড় নিল এত দিন পর, এই বছরের শ্রাবণে। এবারে ব্যাপক বন্যা হয়েছে, ভয়াবহ। পত্রপত্রিকা আর টিভিতে বলা হচ্ছে ২০১৭ সালের বন্যা আটাশির বন্যাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। যায়নি যে, আমাদের ভাগ্য।

একদিন টিভিতে বন্যার খবর শুনে হঠাৎ বেলঘরের কথা মনে পড়ল, আটাশির পানির কথাও। এবং      রোশনারার। বাচ্চু ভাই নেই, রোশনারার লক্ষ্মী বউ হালিমা কোথায়, তা-ও জানি না। আর রোশনারা আছেন কি নেই, তা জানাটা আমার জন্য অসম্ভব।

এক সন্ধ্যায় আমার দরজার কড়া নাড়ল কেউ। বিদ্যুৎ নেই। বেল অকেজো। আমি জানালার পাশে বসে বাইরের স্বস্তির অন্ধকার দেখছিলাম। কেউ খুব সন্তর্পণে, কিন্তু নিজের আগমনটা বুক টেনে জানান দিলে যেমন কড়া নাড়ে, সে রকম কেউ নাড়ল।

দরজা খুলে আমি চমকে গেলাম। সিঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে এক যুবক, ২৫-২৬ বছর হবে বয়স; উঁচু মাথার, প্রশস্ত কাঁধের, মুখে একটা বিনয়ী কিন্তু প্রত্যয়ী হাসি মাখা। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আমাকে সালাম দিয়ে বলল, ‘রোশনারা বেগম আমার দাদি। আপনার কাছে তিনি কিছু দিয়েছিলেন, রাখার জন্য। সেটি নিতে পাঠিয়েছেন।’

আমি ছেলেটিকে ভেতরে ডাকলাম। কিছুটা ইতস্তত করে সে ঢুকল।

‘রোশনারা কেমন আছেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘দাদি মারা গেছেন। অনেক দিন হলো।’

‘তবে যে বললে তিনি তোমাকে পাঠিয়েছেন?’

‘তিনিই তো পাঠিয়েছেন। তিনি আপনার কথা না বললে আমার কিভাবে জানা হতো বুলেটের লকেটটা আপনার কাছে আছে?’

পুরো ব্যাপারটা আধিভৌতিক মনে হলো আমার কাছে। ছেলেটি আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলছে, তার চোখে ২৫ বছর আগে দেখা রোশনারার দুটি চোখ জ্বলজ্বল করছে। আমি কথা না বাড়িয়ে একটা টর্চ খুঁজে বুলেটের লকেটটা খুঁজে আনলাম। ‘তোমাকে এটা পরিয়ে দিই?’ আমি বললাম, ‘তোমার দাদি খুশি হবেন।’

‘দিন,’ ছেলেটি বলল।

লকেটটা তার গলায় ঝোলাতে ঝোলাতে ছেলেটি বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি যত্ন করে এটি রেখেছেন।’

‘তোমার দাদি বলেছিলেন, এই লকেটটা তোমাকে পথ দেখাবে।’

 ছেলেটি হাসল। দাঁড়ানো থেকেই হঠাৎ বলল, ‘এখন যাই।’

আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই সে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। এক ঝটকা বাতাসে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। সেটি খুলে আমি সিঁড়ির দিকে তাকালাম। সিঁড়ি অন্ধকার। কেউ নেই।

কিন্তু কেন জানি মনে হলো, ওই অন্ধকারে একটা চওড়া কাঁধের এবং অবিন্যস্ত চুলের একটা আভাস যেন লেগে আছে। সেদিকে তাকাতে তাকাতে আমার হঠাৎ খেয়াল হলো, ছেলেটির নামটা আমার জানা হলো না। তাকে জিজ্ঞেস করার ফুরসতও মিলল না।

তবে আমার এ কথা ভেবে স্বস্তি হলো, সে একটা পথ খুঁজে পাবে।



মন্তব্য