kalerkantho

গল্প

বসতি

হাসান আজিজুল হক

১১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বসতি

অঙ্কন : দেওয়ান আতিকুর রহমান

আঠারো শতকের শেষ দিকে কার্তিকের এক ঝিকিমিকি বিকেল। হেস্টিংস তখনো বিদায় হননি। জলোচ্ছ্বাসের পর মরা সমুদ্রতীরের মন্বন্তর-পেরোনো বাংলা মরাই শুয়ে আছে। এই এলাকাটায় শুকনো, পুরনো মাটি—জায়গায় জায়গায় মালভূমির মতো উঁচু, কোথাও গভীর নিবিড় বন-জঙ্গলে পূর্ণ, নির্জন অতি দীর্ঘ গাছপালায় ঠাসা। এককালে জনপদ ছিল, এখনো রয়ে গেছে তার চিহ্ন। সেখানে আবার নতুন জঙ্গল, উচ্ছন্ন বড় বড় ভূমি মালিকের বিশাল পরিত্যক্ত ভেঙে পড়া রাজবাড়ি, ভেঙে যাওয়া দিঘি—সমস্তটায় আবার জন্মানো জঙ্গল। আর শেষ কথা, ইতিহাসকারদের বর্ণনামাফিক, সমস্ত এলাকা ভয়াবহ শ্বাপদসংকুল। এই এলাকায়ই বর্ধমানের জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর এসেছিলেন আড়াই হাজার বছর আগে। এখানকার গুণধর মানুষ নাকি কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল তাঁর দিকে; আর গায়ে দিয়েছিল থুতু। এখানেই সতেরো শতকের গোড়ার দিকে জাহাঙ্গীরের একতরফা প্রেয়সী নূরজাহানকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিল কুতুব। শের আফগান, কুতুব—দুজনই মরেছিল তলোয়ার দিয়ে মুখোমুখি লড়াই করতে করতে। দুই পরম শত্রু মরেছিল একসঙ্গে। এখন পাশাপাশি শুয়ে আছে পরম মিত্রের মতো।

অতি প্রাচীন জনপদগুলো এই এলাকায় কতকাল থেকে আছে কে জানে! হয়তো প্রাগৈতিহাসিক, গোনার বাইরের সময় থেকেই আছে। মাঝে মাঝে ছেদ ঘটেছে কি না, মুছে গেছে কি না মনুষ্যবাসের সব চিহ্ন, লুপ্ত হয়ে গেছে কি না একেকটি জনপদ—বলা কঠিন, জানতে ইচ্ছে হয়। ঢুকে পড়তে মন চায় আঠারো শতকের শেষ বিকেলের সন্ধের মুখে ওই গ্রামটিতে। সূর্য তখনো আছে, গাঁয়ের ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে না, মাঠে গেলে দেখা যেত তখন অনেকটা পাটে বসেছে, করমচার মতো লাল, রশ্মি আর নেই। বিশাল মাঠের শেষে দিগন্তে সূর্য যেখানে অনেকখানি পুঁতে গেছে, সেখানে তার চারপাশে শরতের খানিকটা সাদা মেঘ ছিল, সেই মেঘটুকু টকটকে লাল হয়েছে, কিন্তু পুব দিক থেকে অনেক দূরে ঝাপসা আঁধার এগিয়ে আসতে শুরু করেছে। মাঠটা খুব বড়, এত বড় মাঠ পেরোতে সময় নেবে—তবে পশ্চিমে আলো আরো কিছুক্ষণ থাকবে মনে হয়। এই সুযোগে এলাকাটা ভালো করে দেখে নেওয়া যেতে পারে। এদিকটায় আবার অরণ্য-জঙ্গল কিছু নেই, লুপ্ত পুরনো জনপদের চিহ্ন নেই—বড় বড় মজা দিঘি, ভাঙা রাজবাড়ি এসব কিছুই নেই—শুধুই আদিগন্ত মাঠ, একেবারে সমতল; বিরক্ত লাগে এমন একঘেয়েমি, অতিষ্ঠ করে ফেলে; চোখের জন্য এতটুকু টইটক্কর নেই।

কোথাও কোথাও আছে একটি-দুটি মহীরুহ—বট-অশ্বত্থ-পাকুড়-শ্যাওড়া—এক শ দুই শ তিন শ বছরের পুরনো। কেউ মাঠের মাঝখানে একা, কেউ কেউ জোড়ায়, ভাই বা দম্পতির মতো; কেউ আছে একটা নির্জনপ্রায় শুকনো মেঠো পুকুরের পারে আর আছে এখানে-সেখানে বড় বড় লতাগুল্মের ঝোপঝাড়। আঁধারের মধ্যে আরেকটু আঁধার, বড় বড় ঘুমন্ত জানোয়ারের মতো। এসব মাঠ যেন সৃষ্টির পরে ফেলে যাওয়া। মরা পৃথিবীর অংশ, বিভাজন বলতে কিলবিলে আলের দাগ মারা ধানের জমি। এর মধ্যে পথ বলতে দু-চারটি চওড়া আলপথ। সেসব পথের কোনোটিরই শুরু বা শেষ দেখতে পাওয়া যায় না।

এসব কথা বলতে যতটুকু সময় গেল, তার খানিকটা আগে, শেষ বিকেলের আলো তখনো ছিল, গাঁয়ের ভেতরের বড় একটা ছাতিমের পাতায় রোদ চিকমিক করছিল, তখন গাঁয়ে ঢুকে একটি খুব পুরনো মিনার বা মন্দিরের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন একজন মানুষ। মানুষটির গায়ের রং কেমন অস্পষ্ট, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। চোখ দুটিও ভালো দেখা যাচ্ছে না। তবে তাঁর পরনে আধময়লা সাদা আলখাল্লা, একেবারে পা পর্যন্ত। আর মাথায় ওই সাদা কাপড়েরই বিরাট একটি পাগড়ি। পা জোড়া খালি, ধুলোমাখা। তিনি মিনারটির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছেন।  অবশ্য এটা মিনার, না মন্দির—বলা খুব কঠিন; বেশি বড় নয়, পাতলা ইটের তৈরি। খুবই আশ্চর্য, কারণ এদিকের বাড়িঘর, পথঘাট অবশ্য অবশ্য মাটির, ধোঁয়াটে এঁটেল মাটির তৈরি ঘরবাড়িগুলো যেন মাটিরই স্বাভাবিক খোঁদল, পথঘাট সবই এমন চূড়ান্ত চূড়ান্ত মাটির যে ইটের তৈরি মিনার বা মসজিদ আসে কোথা থেকে কিছুতেই বোঝা যায় না। তবু এটি ইটেরই তৈরি বটে। মনে হয় মন্দির নয়। প্রতিমার তো কোনো প্রশ্নই নেই, কোনো গর্ভগৃহ নেই—ভেতরটা একেবারে নিরেট। তবে চারপাশে চারটি প্রদীপ রাখার কুলঙ্গি আছে। মাথাটা অবশ্য মসজিদের গম্বুজের মতো লাগে। কিন্তু নামাজ পড়ার জায়গাই যদি না থাকে, তবে আর মসজিদ কিসের, আর মুসলমানদের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখারই বা কী দরকার?

মানুষটার দুখানি পা দেখেই বোঝা যায় অনেক পথ পেরিয়ে এসেছেন তিনি। এত বড় মাঠ যে পার হয়েছেন সেটা কোনো কথাই নয়। পোড়ো জমি, চাষের জমির এই বড় বড় ফাঁকা বৃক্ষহীন মাঠের এলাকার বাইরে রাঢ়জোড়া যে দুর্গম বন-জঙ্গল আছে, তার ভেতর দিয়েও তাঁকে আসতে হয়েছে। হাতে একটি পাকা বাঁশের লাঠি আছে, লম্বা মানুষটির মাথা সমান। আর কাঁধে আছে একটি বড় কাপড়ের ঝোলা। কেন এসেছেন এই মানুষটি? ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ছায়া দেখা যায় এখনো, বাতাসে কটু গন্ধ এখনো আছে। কত মানুষেরই বা কবর হয়েছিল, আগুনে পুড়তে পেরেছিলই বা কতজন? মানুষের পচাগলা শব তো মিশেছিল মাটিতে। তাতে উর্বর হয়েছিল মাটি। কিন্তু যা কিছু ফলাচ্ছিল ক্ষেতজমি, তাতেই মা-বাবা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যার পচা হাড়-মাংসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। কী খেয়ে কেমন করে বাঁচবে মানুষ? সূর্যের এত আলো এ দেশে, তবু মন্বন্তরের ছায়া নিভিয়ে দিয়েছিল দিনের আলো। এই মানুষটি পরিত্যক্ত গ্রাম-জনপদের ভেতর দিয়ে আসতে আসতে দুর্ভেদ্য জঙ্গল ঠেলে হাঁটতে হাঁটতে হিংস্র জন্তু-জানোয়ার তত দেখেননি, যত দেখেছিলেন ছায়ার মধ্যে ছায়ার মতো প্রেতশরীর মানুষদের চলাফেরা করতে। তাঁর বয়স তো বেশি নয়, তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর হতে পারে। দশ বছর ধরে এ অঞ্চল তছনছ করে দিয়েছিল যে বর্গিরা, তিনি তা নিজের চোখে দেখেননি বটে, কিন্তু তাঁর বাপের কাছ থেকে যা যা শুনেছিলেন তাঁর মনে আছে। বাপ তাঁর আলীবর্দী খাঁর সেপাই ছিল, একেবারে নিচের তলার সেপাই, কোনো অস্ত্রপাতি পায়নি। পেয়েছিল একটা ভোঁতা তলোয়ার। তা-ও সেপাইগিরি ফুরিয়ে যাওয়ার সময়। মানুষটি আর ফিরে আসেনি। তাঁদের তিনটি ভাইকে মা-ই কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখেন। তিনি নিজেদের মির্জা বলেই জানেন—কিন্তু কী করে যে মির্জা তা জানা নেই। মুর্শিদাবাদের নবাব বংশ মির্জা, তাঁরাও কি সেই মির্জা। নাকি মির্জাদের সাতপুরুষ ধরে দাসী-বাঁদিদের পেটে জন্মেছে বলে মির্জা, তা-ও তিনি জানেন না। না জানুন, এখন আর তিনি ছাড়বেন না এই উপাধি। আরবি-ফারসির একটু এলেম যখন ঢুকেছে পেটে, এত বড় কাপড়ের পাগড়ি যখন বেঁধেছেন মাথায়, এখন আর মির্জা হতে বাধা কী?

আলো খুব তাড়াতাড়ি চলে যাবে, কোনো মানুষই এদিকে আসছে না কেন? কেউ কি নেই এ গাঁয়ে? গাঁয়ের রাস্তার দুপাশে মাটির ঘরগুলোতে কি কোনো মানুষ নেই? সন্ধের মুখে আর কেউ থাকুক আর না থাকুক, গাঁয়ের অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে তো থাকেই রাস্তায়। পুরো গাঁ তাহলে ফাঁকা? পথে আসতে আসতে এ রকম শূন্য গাঁ দু-একটি দেখেছেন মানুষটি। এখন মাঝে মাঝেই নানা কারণে ছোট ছোট গাঁয়ের মানুষজন ছেড়ে যায় গাঁ। বড় গাঁগুলো অবশ্য তেমন নড়াচড়া করে না। জঙ্গলের ভেতরে যেসব গাঁয়ে চাষাবাদের জমি কম, খাবার পানির ছোট-বড় পুকুরের অভাব, বর্গিদের অত্যাচার, মামা-ভাগনে, ফাঁসুরে এসব ডাকাতকে মানুষ মেরে মেরে যেখানে-সেখানে লাশ ফেলে যাওয়া বা মজা দিঘির শ্যাওলা-দামের মধ্যে গুঁজে রাখা—এসব নানা উত্পাতে একদিন হঠাৎ কোনো কোনো গাঁ জনশূন্য হয়ে যায় বটে, তবে যাওয়ার সময় লোকেরা ঘরবাড়ি ভেঙে খড়কুটো, বাঁশ-কাঠ যা পায় সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এই গাঁটিকে তো তেমন মনে হচ্ছে না।

মানুষটি এসব ভাবছেন আর ঈষৎ কটা চোখের তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে আশপাশ খুঁটিয়ে দেখছেন, তখন দেখা গেল একজন-দুজন গাঁয়ের মানুষ তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। মোটা খাটো ধুতি পরা গা-খালি একটি দুটি মানুষ। ঘন তামাটে বা পোড়া কালো রং তাদের। দেখতে দেখতে বেশ কিছু মানুষ এসে তাঁকে ঘিরে ধরল। প্রথম কথা আগন্তুকই বললেন, তোমরা কেমন মানুষ—কত দূর থেকে আমি মুসাফির তোমাদের গাঁয়ে এলাম, তোমরা কি আমাকে একটু বসতেও বলবে না, একটা রাতের জন্য একটু আশ্রয়ও দেবে না?



মন্তব্য