kalerkantho


নার্গিসাস

জয়া ফারহানা

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



নার্গিসাস

হ্যালো, সি বি জামানের সঙ্গে কথা বলছি?

ইয়েস, ইউ আর।

দোস্ত, এ আর মল্লিক বলছি।

নাম শুনেই মুডটা খচে গেল। কিন্তু সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। অবচেতন থেকে অদৃশ্য সিগন্যাল জানান দিল, সতর্ক হও, জামান। এ আর মল্লিক দেশের মেইনটেন্যান্স ডিভিশনের একজন। চাল দিতে ভুল করলে কিংবা ডিসিশনে একচুল এদিক-সেদিক হলে তোমার পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারে ব্যাড প্যাঁচ পড়বে। বিহেভ লাইক এ স্পঞ্জ। স্পঞ্জ যেমন সব কিছু ইমবাইব করে নেয়, তেমনি। সিবি জামান তখনই গলায় মাখন ঢেলে বলল, কী ব্যাপার দোস্ত, তোমার কণ্ঠস্বরটা এমন শোনাচ্ছে কেন?

ও কিছু না, বুকে কফ জমে আওয়াজ হচ্ছে ঘড়ঘড়। কাল রাতেও প্রচুর বরফ দেওয়া হুইস্কি খেয়েছি।

নাকি, নতুন করে আইসক্রিমের মতো ভালোবাসতে শুরু করেছ কাউকে?

আরে না, এখন কাউকে আইসক্রিমের মতো ভালোবাসতে গেলে তো নিজেই গলে হাওয়া হয়ে যাব। আমার জীবন তোমার ভাবির জিম্মায়। তাতেই আরামের নিঃশ্বাস ফেলছি। মহিলা, ব্লটিং পেপারের মতো সব দুঃখ-কষ্ট শুষে নিয়েছে। বুকের পাঁজরগুলো হয়েছে বহুদিনের ডুবন্ত জাহাজের ক্ষয়ে যাওয়া লোহালক্কড়ের মতো।

সি বি জামান ভাবলেন, বয়সের সঙ্গে মল্লিকের অভিমানের চালচিত্র বদলেছে। মুখে বললেন, তোমার কাব্যরোগ আর গেল না।

হ্যাঁ, মানুষ তো যন্ত্র নয়। রাষ্ট্র হৃদয়হীন এবং বুদ্ধিহীন বলে তার প্রতিভাবান নাগরিকবৃন্দ বুদ্ধি ও হৃদয়বৃত্তির চর্চা করবে না, তা তো হয় না।

আবার রাষ্ট্র নিয়ে টানাটানি কেন?নিশ্চয়ই কোনো কিন্তু আছে। হঠাৎ রাষ্ট্রের ওপর এত রাগ?

না, রাষ্ট্রের ওপর কোনো রাগ নেই। আমি তো রাজনীতি থেকে কবেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। এখন ব্যবসাই সব। ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রাক্ট, আর্জেন্টলি ব্যবসা বাড়ানো, কত ধরনের চাপ।

তাহলে?

না, দেখছি রাজনীতির মাঠে কত আনকোরা লেবেল, লঞ্চ করতে চাইছে নিজেকে। আগাছারা বৃক্ষ প্রমাণ করতে চাইছে নিজেদের, তোমাদের মতো মানুষের অ্যাটেনশনও পেয়ে যাচ্ছে।

বুঝেছি, তোমার মনে ক্ষোভ জমেছে কোনো কারণে। আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারো। শেয়ারিংয়ে ক্যাথারসিস হয়। হালকা হওয়া যায়।  

ডোন্ট থিংক সো। তোমার কাছে কাঁদুনি গাইবার জন্য ফোন দিই নাই। বাই দ্য ওয়ে, তোমার এলাকায় নমিনেশন নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়েছে?

না তো। কিছুদিন আগেও তো পার্টির হাইকমান্ড হেভিওয়েট নেতাদের মধ্যে ডেকে বললেন, আপনিই নির্বাচনের চিফ অর্ডিনেটর হোন না জামান সাহেব। তার পর থেকে তো দলের পাতি, নোয়া পাতি নেতারা কিভাবে তোল্লাই দিচ্ছে! অনেক দিন পরে মার কাটারি ফর্মে ফিরে এসেছি, বুঝলে মল্লিক।

সামনে টিভি থাকলে খুলে দেখো। আমি ফোন রাখছি।

না, রেখো না। কী দেখাচ্ছে টেলিভিশনে, বলো তো?

আচ্ছা, তোমাদের নমিনেশন বোর্ডে কী কী প্যারামিটারের বেসিসে নাম্বারিং করা হয়েছে, বলা যায়?

পলিটিক্যাল অ্যাপিল, গ্রাস রুটের সঙ্গে কানেকটিভিটি, অনেস্টি, দলের সঙ্গে টেক্সচার, প্রিভিয়াস রেকর্ড, ডেডিকেশন—এ সবই। ওই সব সময় যা হয় আর কি।

তাহলে শাহানা নাজনিন মেয়েটা নমিনেশন পেল না কেন? একটু ভাবো। আমি রাখছি।

চ্যানেল অন করলেন সি বি জামান। ‘সিটি মেয়র নির্বাচনে শাহানা নাজনিনকে দল থেকে মনোনয়ন না দেওয়ায় দলের পাঁচ তৃণমূল কর্মীর ট্রেনের নিচে ঝাঁপ। ’ খবরটি ব্রেকিং নিউজ হিসেবে যাচ্ছে। এ তো রীতিমতো হাড়ে হিম ধরার মতো খবর। এবার সত্যিই মুড পাংচার হলো সি বির। এই চ্যানেলটির সিইও তাঁর ঘনিষ্ঠজন। সি বি জামান ফোন করতেই পেয়ে গেলেন।

কী ব্যাপার, সূর্য আজ দুদিকে উঠেছে মনে হয়। সকাল বেলায়ই তারা নয়, নক্ষত্র নয়, রীতিমতো সূর্যের ফোন।

রাখো তোমার প্যাম্পারিং। বলো তো তোমাদের চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ হওয়ার শর্ত কী? একজনকে ন্যায্যত নমিনেশন দেওয়ায় যদি হেজিপেজি কয়েকজন ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেয়, তো সেটাই ব্রেকিং নিউজ হবে?

কী করব বস, আমরা তো খবরের গোলাম। প্রেসের কাছে ‘নো নিউজই মোর নিউজ’।

ঠিক আছে, তোমরা কী যেন বলো, স্ক্রল নিউজ, সেটি দিলেও তো হতো। আগুন লাগা, মারামারি, বাস ওল্টানো, লঞ্চডুবি, সব ভয়ংকর নিউজই তো ওই স্ক্রলেই যায়।

আগুন লাগা, মারামারি, লঞ্চডুবি—সবই ব্রেকিং নিউজ হিসেবে যায় বস, আপনি বোধ হয় খেয়াল করেন না।

স্ক্রল নিউজ ব্যাপারটা কী বলো তো?

নিতান্ত নিরীহ শিশুর মতো হামাগুড়ি দেয় যে সংবাদ, টিভির পরিভাষায় সেটাই স্ক্রল নিউজ। এখন আপনি বলেন, এতগুলো মানুষ সুইসাইড করল, সেটা কি স্ক্রল হতে পারে? স্ক্রল আর ব্রেকিংয়ের সঙ্গে আপনার প্রবলেমের কানেকশন কী বস?অ্যানি প্রবলেম?বলেন, কী করতে পারি আপনার জন্য। আই উইল ট্রাই মাই লেভেল বেস্ট টু হেল্প ইউ।

বেস্ট টা কোনো দিনই তুমি দিতে পারবে না জানি। তবে বেটার হয়, ব্রেকিং নামিয়ে ওটাকে যদি স্ক্রল নিউজ করো।

ওকে, বস। ১০ মিনিটের মধ্যে নেমে যাবে। তো বস, আমার সঙ্গে কি খালি ইলেকট্রনিক ঝগড়াই করবেন, নাকি আপনার একটু-আধটু ব্লেসিংও দেবেন?

ব্লেসিং পাবে। তবে আমার এখন মিডিয়া হাইপ দরকার। তোমাদের টক শো...

বুঝেছি বস, বলতে হবে না। আপনাকে কষ্ট করে স্টুডিওতে আসতে হবে না। স্টুডিওই যাবে আপনার কাছে। অফিসে অর্গ্যানোমিক্যালি ডিজাইনে সেরা অ্যাংকর যাবে এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ নিতে, আজই। জানেন তো বস, মার্কেট রিসার্চের টিআরপিতে আমরা টপ পজিশনে আছি।  

আজই? তাহলে আমার কিছু অ্যাপয়েন্টমেন্ট রিশিডিউল করতে হবে, পিএসের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

ফোন রেখে কিবোর্ডের ওপর ঝড়ের বেগে হামলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফাইল বের করলেন সি বি জামান। ২৭ মার্চের পাতা দেখাচ্ছে, ১২টি অ্যাপয়েন্টমেন্ট। এর মধ্যে একটি আছে কনস্যুলেট অফিসের ইনভিটেশন। এটা ক্যানসেল করা কি ঠিক হবে? এই দেশটির সঙ্গে বহু ধরনের কানেকটিভিটি, ব্যবসা। ভালো প্যাঁচে পড়া গেল দেখছি। ব্যবসা না রাজনীতি—কোনটা রেখে কোনটা সামলাবেন। খুবই পাজল লাগছে সি বি জামানের। আইরিন খানকে নমিনেশন দিয়ে ক্যান্ডি ফ্লসের মতো হালকা হলেন, এখন তো দেখা যাচ্ছে উল্টো ঘাড়ের ওপর পাহাড় চেপে বসেছে। কোন কাজটা আগে করা দরকার। ভেন্ডিং মেশিন থেকে কফি নিয়ে সকালের কাগজটা পড়াই বোধ হয় সবচেয়ে জরুরি। দেখা যাক, নমিনেশন নিয়ে কী লিখেছে কাগজওয়ালারা। হুম, প্রভাবশালী সব পত্রিকায়ই আজ শাহানা নাজনিনের ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে। দৈনিক কালান্তর জিজ্ঞেস করেছে, আপা, নেতা হওয়ার স্বপ্ন তো এক ধাক্কায় চুরমার হয়ে গেল আপনার। উত্তরে শাহানা নাজনিন বলেছেন, আমার গুরু, আমার নেতা বলেন, হিরো কে জানো তো? যাকে প্ল্যান করে জিতিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে, সে হিরো নয়। সারাক্ষণ মার খেতে খেতে, ক্রমাগত লাথি খেতে খেতে, জীবনভর অপবাদ নিতে নিতে, শেষ পর্যন্ত যে ঘুরে দাঁড়ায় হেরো থেকে হিরো হয়ে যায়, সে-ই হিরো।

আপনি তবে নিজেকে হেরো ভাবছেন?

না, মোটেই না।

দলের নমিনেশন ছাড়াই নির্বাচন করবেন তবে?

সবাই যখন আমাকে হেরো প্রমাণ করতে চায়, তখন আমার ভেতর থেকে কেউ একজন অসীম শক্তি জোগায়। কেউ আমাকে ডিক্টেট করে কোনো কাজ করতে নিষেধ করলে সেটাই আমার বারবার করতে ইচ্ছা করে। আর এই মুহূর্তে কেউ কেউ সেটাই করছেন। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে নির্বাচন থেকে সরে যেতে বলছেন। অ্যান্ড সামবডি বিহেভ লাইক ফিল্মি ভিলেন। যখন আমাকে কেউ অপমান করার চেষ্টা করে, আমি তখন আমার কাজের মধ্যে সেই অপমানটুকু মিশিয়ে নিই। কিছুক্ষণ বাদে ভুলেও যাই। এখন আপনি যা বোঝার বুঝে নিন।

কিন্তু আপনার কম্পিটিটর আইরিন খান, তিনি তো সেলিব্রিটিদের সেলিব্রিটি। সি হ্যাজ টু বি ক্যামেরা ফ্রেন্ডলি। সি হ্যাজ টু মাচ এক্স ফ্যাক্টর। অ্যান্ড সি ইজ ভেরি কিন। দলের জন্য প্রয়োজন কত রকম কানেকটিভিটি যে ওনার আছে, ওয়ার্ল্ডওয়াইড। দল ওনাকেই যোগ্য মনে করেছে।

দেখুন, আমি তো সেলিব্রিটি হতে চাইছি না যে ক্যামেরা ফ্রেন্ডলি হতে হবে। আর ওয়ার্ল্ডওয়াইড কানেকটিভিটির কথা বলছেন, জনগণের সঙ্গে কানেকটিভিটি থাকলে ওয়ার্ল্ডওয়াইড কানেকটিভিটির দরকার কী।   

কিন্তু তিনি, আইরিন খান তো বলেছেন, তার পরিবারের দলের প্রতি কনট্রিবিউশনের কোনো তুলনা নেই। দলের অতীত খুঁড়লে যা বেরোবে, আপনার রেকর্ড তার কাছে কিছুই নয়। আপনার কথা বলেছেন, আই লাভ হার বাট সি ডাজ নট ওউন পার্টি।

আপনাকে তিনি আশাহত বামপন্থী বা ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা থেকে উঠে আসা কোনো চরিত্র বলেছেন।

বুঝতে পারছি না—এটা সাক্ষাৎকার নাকি ফ্যালাসি?   

সি বি জামান ভাবলেন, একসময় জেনারেশন গ্যাপ হতো ২৫ বছরের ব্যবধানে। ৪৫ বছরের বাবা ২৫ বছরের ছেলেকে বুঝতে পারত না। তারপর সেটা কমে হলো ১০ বছর। ৩০ বছরের মামা ২০ বছরের ভাগ্নিকে বুঝতে পারত না। এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে চার বছরে। ২৫ বছরের ভাই ২১ বছরের বোনকে বুঝতে পারছে না। তিনি কি এই জেনারেশনকে বুঝতে ভুল করলেন? আইরিন খানকে নমিনেশন দিয়ে কি কোনো বিপদ হলো?

শাহানা নাজনিনের সাক্ষাৎকার পড়ে ১৮০ ডিগ্রি মত না বদলালেও মেয়েটি সম্পর্কে আগের ধারণা কিছুটা বদলাল সি বি জামানের। কথার মধ্যে নাইস পার্সোনাল টাচ। মেয়েটির অব দ্য বক্স চিন্তা করার ক্ষমতা আছে। কিন্তু আজকের ‘কানে তার গোঁজা জেনারেশন’ কি এসব ডেডিকেশন পছন্দ করে?

আইরিন খানের ফোন।

সি বি খবর শুনেছ? রায়গঞ্জের পিপল নাকি তোমার বাড়ি ঘেরাও করতে আসছে?

পাঁঠা বলি দেওয়ার সময় পাঁঠার গলা দিয়ে যেমন আর্তনাদ বের হয়, সি বি জামানও গলা দিয়ে তেমন আওয়াজ বের করে বললেন, ‘আমি কি আমার একার সিদ্ধান্তে নমিনেশন দিয়েছি নাকি? ফিল্ড লেভেলে রিসার্চ টিম ছিল, তৃণমূলের মতামত ছিল, দলীয় নেতাদের কনসার্ন ছিল, সব মিলিয়েই তো। ’ 

সেসবের ডাটা কোথায় সি বি?

পাঁচ হাজার ভোটারের মতামত নিয়ে এম এস ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে বলে সরাসরি স্প্রেডশিটে ফেলা যাচ্ছে না। এক্সেল স্প্রেডশিটে ফেলে টিটেস্ট করলে দুই প্রার্থীর স্ট্যাটিসটিক্যাল সিগনিফিকেন্স বেরিয়ে যাবে। আমাকে প্যাঁচে ফেলা অত সোজা নয়। আর বাড়ি ঘেরাও করবে? ঢাকা শহরের মধ্যে এমন স্যাটেলাইট টাউন আছে নাকি? ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি মনিটরিং, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, চারদিকে সারভাইলেন্স ক্যামেরা। প্রাচীরের মাথায় ইলেকট্রিক ফেন্সিং, হাত লাগলেই অবধারিত মৃত্যু। কটেজের দরজায় ভিডিও ক্যামেরা বসানো, সঙ্গে মাইক্রোফোন...নিরাপত্তার চূড়ান্ত ব্যবস্থা। অজান্তে একটা স্বস্তির শ্বাস পড়ল সি বির। সত্যি বাড়িটা তার শান্তিনিকেতন বটে। জগার্স পার্ক, গলফ কোর্স, মাল্টিজিম, প্রতিবেশী বেশির ভাগ অ্যাপার্টমেন্টবাসীই ডুয়েল সিটিজেনশিপধারী। চারপাশে ফলের বাগান, লেক, অ্যাপার্টমেন্টের ডিজাইনাররা আমেরিকান, বাগান করেছেন নেদারল্যান্ডসের বিশেষজ্ঞরা। ফলের বাগানের তত্ত্বাবধানে মুম্বাইয়ের ফার্ম চেন। অ্যাকশন এরিয়া আগাগোড়া সমান প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সৌরশক্তিচালিত ছোট্ট তিন চাকার যান, বাংলাদেশের এই কোণে কোথাও কোনো কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে না। এমনকি পরিবেশবাদীদেরও তার বিরুদ্ধে পরিবেশদূষণের অভিযোগ করার সুযোগ নেই। এতই নিষ্কলঙ্ক আমার জীবন! ভাবলেন সি বি।

শাহানা নাজনিনকে দেখেছ টেলিভিশনে? মহিলার মুখ হয়েছে বোটাক্স ইনজেকশন দেওয়া বুড়িদের মতো, দেখে মনে হয়, সব পেশি প্যারালাইজড। তাপ-উত্তাপ, কৌতূহল, আনন্দ, দুঃখ—সব রকম অনুভূতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

যা-ই বলো, মহিলার মধ্যে এক ধরনের সহজ প্রসন্নতা আছে। দেখলে ভরসা করতে ইচ্ছা হয়।

তুমি বলছ প্রসন্নতা? আমার তো ওকে দেখে মনে হয়েছে, সূর্যের দিকে উড়তে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়া আইকেরাস। কী রকম ট্যান স্কিন! সানস্ক্রিনের পর যে একটু কমপ্যাক্ট লাগাতে হয়, তাও জানে না, এত রোদে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, অথচ চোখে একটা সানগ্লাস পর্যন্ত নেই, এ কারণেই ওর চোখের নিচে এ রকম ডার্ক সার্কেল।

তুমি এক কাজ করো আইরিন, তুমি শাহানা নাজনিনকে বিউটি কম্পিটিশনে কমপিট করার জন্য লিপস্টিক, আন্ডার আইক্রিম আর হেয়ার সিরাম নিয়ে কিছু টিপস দিয়ে দাও।

তোমার স্যাটায়ার বুঝতে পারছি। কিন্তু প্রোটাগনিস্ট ইয়াং না দেখালে, যেকোনো পরিস্থিতিতে স্পটলাইট দখল করবে কিভাবে?

হয়তো প্রোটাগনিস্ট ইয়াং হয়ে স্পটলাইট দখলের কোনো উন্মাদ ইচ্ছা ওর নাই।

উফ, খুবই সাফোকেটেড, এরা নাকি সব নমিনেশনের অ্যাপ্লিক্যান্ট। দেখে তো মনে হয়, টিপিক্যাল হাউস ওয়াইফ। জবরজং শাড়ি, বেঢপ ফিগার, একগাদা গয়না, অশিক্ষিত হাসি, জাস্ট ইরটেটিং। এ হলো বাংলাদেশের পপুলেস্ট পার্টির নমিনেশনের অ্যাপ্লিকেন্ট! না আছে গ্রুমিং, না আছে ওরিয়েন্টেশন, এদের সঙ্গে তাকে কমপিট করতে হবে? নো, নো, এরা আমার কমপিটিটরস নয়।

কই, কোনো গয়না তো ওর গায়ে দেখলাম না, তা ছাড়া সে এসেছে মানুষের জন্য কাজ করতে, রেড কার্পেটে হাঁটতে তো আর আসেনি যে পেনসিল স্কার্ট, টপ, পায়ে ব্ল্যাক পিপ টোজ দাউ দাউ লেলিহান শিখা হয়ে হেঁটে বেড়াবে।

প্রেমে পড়ে গেলে মনে হচ্ছে?

আরে না। রূপ সপ্রতিভতা আর শিক্ষা তো সাধারণত একসঙ্গে মেলে না। সে শুধু তোমারই মিলেছে। তোমার প্রেমে পড়ার পর কি আর কারো প্রেমে পড়া যায়?ভেতরের চাপা খুশি চেপে রাখার রপ্ত কৌশল আরো একবার প্রয়োগ করলেন তিনি। বললেন—বেয়াদবটা টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে আরো কী বলেছে জানো?

কোন বেয়াদব?

আরে, ওই যে শাহানা নাজনিন, সে নাকি এখন বুঝতে পারছে, নমিনেশন বোর্ড আসলে প্রিপ্ল্যানড বদমাইশি ছিল, নিজের অজান্তেই সেই ফাঁদে সে পা দিয়েছে।

মেয়েটিকে নির্বাচন না করার জন্য থ্রেট দেব, বলছ?

আমি এসব মেয়েকে পাত্তা দেওয়ার যোগ্য মনে করি না। কখনো প্যারাগ্লাইডিং করেছ? প্যারাশুটে চেপে শূন্যে উঠে যাওয়ার পর নিচের দিকে তাকালে দেখবে, নিচের সব কিছুকে কেমন বিন্দুর মতো মনে হয়। আমি ঠিক অতটা ওপরে উঠে গেছি। যতটা ওপরে উঠলে সব কিছুকে ওই রকম বিন্দুর মতো মনে হয়। মৃত্যুভয় দেখানো আর টেন্ডারের কাগজ নিয়ে দুনম্বরি করা একই রকম। ওসব ফিচেল অপরাধ আইরিন খানকে মানায় না। যে লাইফে কোনো ফ্রিকশন, টেনশন নেই, গণ্ডগোল নেই, নিউটাউনের রাস্তার মতো মসৃণ জীবন, সেই জীবন নিয়ে আইরিন খান কী করবে? থাকুক না কিছু গণ্ডগোল।

এই মুহূর্তে সি বি জামানের মন আবর্জনার স্তূপে পড়ে থাকা পেটমোটা বিড়ালের মতো। নিজেকে রাডারলেস জাহাজের মতো লাগছে। আইরিন খান, ক্ষমতা, হাইকমান্ড—সব কিছু কি দূরে সরে যাচ্ছে তার কাছ থেকে? পাত্তাই দিচ্ছে না আইরিন।

ব্লগ, ওয়েবসাইট, ফ্যানক্লাব—সব মিলিয়ে আমার ব্র্যান্ড ভ্যালু বাকি সেলিব্রিটিদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে, বুঝলে? সি বি জামান স্বাভাবিক স্বরে বলল, ও, আচ্ছা। মনে মনে বলল, তা তুমি যখন এমন হোমরা-চোমরা, তো তোমার নমিনেশন নিতে আসার দরকার কী।

মুখে বলল, তা ঠিক। আমিই কেবল পড়ে আছি সেই পাল আমলে। হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রি এখন চরিত্র বদলাচ্ছে। ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়লে অ্যাজ ওয়েল বিজনেস ভ্যালুও বেড়ে যায়। জিং চাই, পিপলস অ্যাকসেপ্টেশন চাই, পলিটিকসে পিপলসের সঙ্গে ইমোশনের কানেকটিভিটিটা বাড়ে। আইরিন খান হয়তো তা-ই চাইছে। খান গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রিজের বাংলাদেশের অপারেশনগুলো ওর হাতে। ন্যাশনাল লেভেলের একাধিক প্রডাকশন হাউস আছে। গত এক বছরে সিনেমা বা ডকুমেন্টেশনে ইন্টারন্যাশনাল যতগুলো পুরস্কার এসেছে, সবগুলোর প্রডিউসার তাদের প্রডাকশন হাউস। ন্যাশনাল পুরস্কার পাওয়া অভিনয়শিল্পীরা তাঁর সঙ্গে সামান্য সময় কাটাতে পারলে বর্তে যায়। এখন চাইছে পলিটিকসটাকে কবজা করতে।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, সেক্রিফাইস করতে হয় বোড়োদের। সি বি জামান আপাতত সেই বোড়ো। বলল আইরিন।

এখন আর আইরিন খানের তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার প্রয়োজন নেই। দ্য জার্নি ইজ ওভার।


মন্তব্য