kalerkantho


হয়ে যাক কার্টুন!

কার্টুন আঁকতে কী চাই? খাতা আর পেনসিল? উঁহু! আগে চাই আইডিয়া! তারপর? তারপর চাই তিনটি জিনিস—চর্চা, আরো চর্চা, আরেকটু বেশি চর্চা। কার্টুন আঁকা শেখার টুকিটাকি অনুসন্ধানে অভিযানে নেমেছিলেন জুবায়ের ইবনে কামাল

৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০



হয়ে যাক কার্টুন!

দেশে কার্টুন আঁকার জন্য সরাসরি কোনো কোচিং সেন্টার পাবে না। এর জন্য তোমাকে কার্টুনপাড়ায় যোগাযোগ রাখতে হবে। দৈনিক পত্রিকা ও বিভিন্ন ম্যাগাজিনে চোখ রাখতে হবে। কারা কোথায় আঁকছে, কোথাও কোনো কর্মশালা হচ্ছে কি না খোঁজ রাখতে হবে সেসবের।

যারা নতুন আঁকাআঁকি শিখতে চায়, তাদের জন্য বিখ্যাত কার্টুনিস্ট এবং উন্মাদের নির্বাহী সম্পাদক মেহেদী হক আট বছর আগে গড়ে তোলেন আকান্তিস নামের একটি দল। প্রতিবছর গ্রুপটি আয়োজন করে এক মাস সময়ের দুটি কর্মশালা। সেখানে একেবারে হাতে ধরিয়ে শেখানো হয় নাক, কান, গলা নিয়ে যেকোনো সমস্যার বিষয়ে। মানে নাক, কান, গলা আঁঁকা নিয়ে সমস্যা। সেখানে থাকে কার্টুনের ডাক্তাররা। এদিকে দলছুটের কাছে এক গোপন খবরও ফাঁস করেছেন মেহেদী হক। অচিরেই ইন্টারনেটে আঁকাআঁকির জন্য বিভিন্ন ভিডিও টিউটরিয়াল ও লাইভ ক্লাসের আয়োজন করবে আকান্তিস। লাইভ ক্লাস মিস করলেও পরে তা দেখার সুযোগ থাকবে। জানালেন, ঈদের পরই শুরু হবে সেটির কাজ। আঁকাআঁকি নিয়ে যেকোনো সমস্যায় তুমি টিপস পাবে গ্রুপটিতে। ফেসবুকে গ্রুপটি আছে ইংরেজি বানানে আকান্তিস নামে।

‘দেখা যায়, আমরা কর্মশালা বা স্কেচ বুকিংয়ের আয়োজন করলে সেটি রাজধানীকেন্দ্রিক হয়। ঢাকার বাইরের আঁকিয়েরা বরাবরই বঞ্চিত হয়। তাদের কথা ভেবেই এ উদ্যোগ।’ জানালেন মেহেদী হক।

এর মধ্যে নোট বুকে কিছু উপদেশ টুকে রাখতে বলেছেন মেহেদী হক। বললেন, পেনসিলের ক্ষেত্রে ফোরবি স্পেশাল। অন্যগুলো ব্যবহার করে তেমন আরাম পাওয়া যায় না। প্রথমেই ডিজিটাল যন্ত্রপাতিতে হাত দেওয়া উচিত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গ্রাফিকস ট্যাব একটা টুল মাত্র। তুমি যদি নিজে পেনসিল-কাগজে আঁকতে না পারো, তবে কখনোই গ্রাফিকস ট্যাবে ভালো করতে পারবে না। শচীন টেন্ডুলকারের ব্যাট নিয়ে এলেই তো আমি সেঞ্চুরি হাঁকাতে পারব না।’ এই ফাঁকে জানিয়ে রাখা যাক, কার্টুন নিয়ে মেহেদী হকের ‘কার্টুন আঁকিবার ক, খ, গ এবং ক্ষ’ নামের একটি বইও আছে।

কার্টুন আঁকা হাতে-কলমে শেখায় কার্টুন পিপল নামের আরেকটি গ্রুপ। স্কুলপড়ুয়া থেকে শুরু করে বড়দেরও আনাগোনা কার্টুন পিপলে। কার্টুন পিপল প্রতি শনিবার আয়োজন করে থাকে ‘স্কেচবুক স্যাটারডে’। মাসের যেকোনো শনিবার পূর্বনির্ধারিত জায়গায় সবাই চলে আসে খাতা-পেনসিল নিয়ে। তারপর সেখানে থাকা দৃশ্য, জিনিসপত্র, মানুষজন ইত্যাদি আঁকতে বলা হয়। ব্যস, এবার না পারলে একেবারে আক্ষরিক অর্থেই হাতে ধরে শিখিয়ে দেওয়া হয়। তুমিও সেখানে যোগ দিতে পারো একেবারে ফ্রিতে! শুধু তোমার চোখ রাখতে হবে কার্টুন পিপলের ফেসবুক গ্রুপে। ফেসবুকের সার্চ বক্সে ইংরেজিতে কার্টুন পিপল লিখে সার্চ করলেই পাবে সেটি।

কার্টুন আঁকা নিয়ে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পাওয়া কার্টুনিস্ট বিপ্লব চক্রবর্তী বললেন—‘সব আঁকাআঁকিই এক সুতায় গাঁথা। তবে সাধারণ স্কেচ বা জলরং-তেলরঙের ছবি আঁকার সঙ্গে কার্টুনের মৌলিক একটা পার্থক্য আছে। কার্টুনের মধ্যে চাই বেশ কড়া ডোজের হিউমার। তাই আইডিয়াটাই আসল। হিউমার থাকলে আঁকার মান খারাপ হলেও অনেক সময় ভালো কার্টুন হয়ে যায়। আর এর জন্য চাই পড়াশোনা। যেমন—কোনো রাজনৈতিক নেতার ক্যারিকেচার করতে হলে তার চেহারা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ভালো করে জেনে নিতে হবে। এরপর সেগুলো একটু বাড়াবাড়ি রকমের শেপ দিলেই হয়ে গেল। এ ক্ষেত্রে ড্রয়িংয়ের দক্ষতার পাশাপাশি ওই ব্যক্তি সম্পর্কে ভালো ধারণাও থাকতে হবে।’

 

আঁকাআঁকির জিনিসপাতি

পেনসিল : আধাভাঙা পেনসিল দিয়েও কার্টুন আঁকা যায়। তবে এইচবি, টুবির তুলনায় ফোরবি পেনসিলটাই কার্টুনিস্টদের বেশি প্রিয়। পেনসিলের এসব শ্রেণিবিন্যাশ নির্ধারণ হয় এর নমনীয়তা ও গাঢ়ত্ব দিয়ে। এইচবির চেয়ে টুবি একটু বেশি নরম। আবার সিক্সবি পেনসিল একেবারেই নরম। অন্যদিকে টুয়েলভবি পেনসিল এত মোটা আর নরম যে এটা ধার করতে বিশেষ ধরনের শার্পনার প্রয়োজন হয়।

স্কেচ বুক : কেমন স্কেচ বুক কিনবে, তা নির্ভর করবে তুমি স্কেচ বুক নিয়ে কোথায় কোথায় চলাফেরা করবে বা কিসের কার্টুন আঁকবে। সাইজের দিক দিয়ে এ ফোর সাইজের স্কেচ বুক বেশি চলছে এখন। বাজারে কিন্তু পকেট সাইজও পাওয়া যায়। হুটহাট একটা আইডিয়া পেলে সেটির একটি ড্রাফট আউটলাইন টুকে নিতে এর জুড়ি নেই।

ইরেজার : পেশাদার কার্টুনিস্টরা সচরাচর ইরেজার ব্যবহারের পক্ষে নয়। তবে শুরুতে যদি তোমার কাগজের সংকট থাকে, তবে ইরেজার রাখতে পারো। টুকটাক ভুল করে আঁকা লাইন মুছতে সাদা রাবারের চেয়ে কালো ইরেজার ব্যবহার করা ভালো। কারণ সাদা ইরেজারে মুছতে মুছতে কালশিটে দাগ পড়ে যায়। কালো ইরেজারে এই ভয় থাকে না।

 

কোথায় পাবে, দাম কত

সাধারণ পেনসিলগুলোর দাম দশ থেকে শুরু করে সত্তর থেকে পঁচাত্তর টাকা হয়ে থাকে। ফেভার ক্যাসলসহ ভালো মানের ফোরবি পেনসিলের দাম পঁচিশ থেকে পঁয়ত্রিশ টাকা। স্কেচ বুকের দাম নির্ভর করে আকারের ওপর। ত্রিশ থেকে শুরু করে দেড় হাজার টাকায়ও পাবে এটা।

কার্টুন আঁকতে পারো কলম দিয়েও। সদ্য এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কার্টুন আঁকিয়ে আনিসুল ইসলাম সামির জানাল, আঁকাআঁকি শেখার ক্ষেত্রে সে দেশি কার্টুনিস্টদেরই অনুসরণ করে। এতে কার্টুন চরিত্রে দেশি ভাবটা থাকে। প্রথম দিকে পেনসিল ব্যবহার করলেও এখন মাঝেমধ্যে কলম ব্যবহার করে। কার্টুনের জন্য বিশেষ ধরনের কলম বাজারে পাওয়া যায়। সামিরের পছন্দ সিলো নামের একটি কলম। তার মতে, আঁকার জন্য মেটাডোর হাই স্কুল এবং মেটাডোর আই টেন বেশ উপকারী।

ডিজিটাল আঁকাআঁকির জন্য আছে গ্রাফিকস ট্যাব। এটা কিছুটা প্রফেশনালদের জন্যই বলা যায়। কেননা গ্রাফিকস ট্যাব ব্যবহারের আগে কার্টুনে হাত পাকা না করলে ট্যাবে তেমন সুবিধা করা যায় না। গ্রাফিকস ট্যাবের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হলো ওয়াকম। ওয়াকম ছাড়া বাজারে রয়েছে হুয়াইন, জিনিয়াস ইত্যাদি ব্র্যান্ডের গ্রাফিকস ট্যাব। ওয়াকমের বেসিক ট্যাবলেট ‘ওয়াকম ওয়ান’ দিয়ে শুরু। এরপর ইনটুস, ইনটুস প্রো, সিন্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের মডেল রয়েছে। গ্রাফিকস ট্যাবের দাম কিন্তু একটু বেশিই। ওয়াকমের বেসিক ট্যাবগুলো সাড়ে ছয় বা সাত হাজার থেকে শুরু। বারো থেকে আঠারো হাজার টাকায় হুয়াইন ও ওয়াকমের ভালো ট্যাব পাওয়া যায়। চাইলে আরো কিছু টাকা যোগ করে পঁচিশ হাজার টাকায় কিনতে পারো ভালো ভালো ব্র্যান্ডের গ্রাফিকস ট্যাব।

পেনসিল, ইরেজার, শার্পনার তো সবখানেই পাবে। স্কেচ বুকও এখন সহজলভ্য। নিউ মার্কেট এসবের জন্য বেশ জনপ্রিয়। সেখানকার মডার্ন, এবিসি শপ, মেটাডোর স্টেশনারিতে আঁকাআঁকির সবই পাবে। শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় গ্রাসহোপার্সে রয়েছে বাহারি সব স্কেচ বুক। গ্রাফিকস ট্যাবের জন্য যেতে পারো রাজধানীর এলিফেন্ট রোড কিংবা আইডিবিতে। মাল্টিমিডিয়া কিংডম, টেক ল্যান্ডসহ আরো বেশ কিছু দোকানে মিলবে ট্যাব। আগারগাঁওয়ে আছে টেকনো প্লানেট। আইডিবি ভবনের মাল্টিমিডিয়া সেন্টারেও আছে ড্রয়িং ট্যাব।

 

অনলাইন টিউটরিয়াল

পৃথিবীজুড়ে হাজারো কার্টুনিস্টের নিয়মিত আনাগোনা ইউটিউবে। শুধু যেটি আঁকতে চাও, তার আগে ‘হাউ টু ড্র’ যোগ করে সার্চ করলেই পাবে ভূরি ভূরি ভিডিও। চলো তবে কিছু চ্যানেলের হদিস জানা যাক।

 

কার্টুন পিপল : এটি আমাদের দেশি চ্যানেল। গ্রুপটির কথা আগেই বলেছি। এদের একটি ইউটিউব চ্যানেলও আছে। নাক, মুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অভিব্যক্তি কী করে দিতে হয়, তা নিয়ে আছে কয়েকটি ভিডিও। ইউটিউবের সার্চ বক্সে ইংরেজিতে কার্টুন পিপল লিখে সার্চ করলেই বেরিয়ে আসবে চ্যানেলটি।

 

মার্ক ক্রিলি : এই চ্যানেলের যাত্রা শুরু ২০০৬ সালে। এখন সাবস্ক্রাইবার প্রায় ২৫ লাখ। এই চ্যানেলে পাবে কার্টুন আঁকার ৬৭৪টিরও বেশি ভিডিও।      

  

কার্টুন ব্লক : ২০০৯ সালে চ্যানেলটি চালু হয়। এতে কার্টুনের বেসিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শেপ আঁকার জন্য রয়েছে অসংখ্য টিউটরিয়াল ভিডিও।

 

কার্টুন ফর কিডস হাউ টু ড্র : এক হাজার চার শর বেশি ভিডিও নিয়ে সাজানো হয়েছে চ্যানেলটি। এখানে বেসিক কার্টুন থেকে শুরু করে থ্রিডি কার্টুন পর্যন্ত আঁকার টিউটরিয়াল পাবে।

 

এ ছাড়া ঢাকা কমিকসের ইউটিউব চ্যানেলে মাঝেমধ্যেই আপলোড করা হয় টিউটরিয়াল।

 

ড্রয়িংয়ের জন্য নাম করা এক শটি চ্যানেলের লিংক পাবে এই লিংকে- https://blog.feedspot.com/drawing^youtube^channels/



মন্তব্য