kalerkantho


ধারাবাহিক গল্প
তিন গোয়েন্দা

আকাশদস্যু

৮ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



আকাশদস্যু

কাহিনি রচনা: কাজী শাহনূর হোসেন, তিন গোয়েন্দায় রূপান্তর: শামসুদ্দীন নওয়াব, আঁকা : মানব

[গত সংখ্যার পর]

তেরো

 

‘খামাখা এখানে এলাম।’ বলল কিশোর। ও আর হার্ডি উতরাই বেয়ে হিমবাহর উদ্দেশে চলেছে।

হার্ডি টুঁ শব্দটি করল না।

‘ফালতু কাজে।’ বলল কিশোর।

হার্ডি নিশ্চুপ।

‘আমি অভিযানে যোগ দিতে চাই।’ বলল কিশোর।

হার্ডির মুখে কথা নেই।

 

‘হিরু চাচা আমাকে কখনোই অ্যাকশনের বাইরে রাখে না।’

‘ওহ, ঘ্যান-ঘ্যান কোরো না তো।’ এবার বলে উঠল হার্ডি। ‘কান পচে গেল!’

‘বোকামি করেছি আমরা।’ আওড়াল কিশোর। ‘তা ছাড়া, সহজ পথ ছেড়ে কঠিন পথে যাচ্ছি কেন? এটা তো একটা খাড়া ক্যানিয়ন।’

একটা ম্যাপের ভাঁজ খুলল হার্ডি।

‘জি লিং আমাকে এই ট্রেইলটা বেছে নিতে বলেছে, জাদুকরের পুলিশদের যাতে এড়াতে পারি।’ বলল সে। ‘এই ক্যানিয়নটার নাম ওড লেহি হু কিংবা লেট ইকো ক্যানিয়ন।’

‘কী মানে এর কে জানে।’ মনে মনে বলল কিশোর।

কয় ধাপ যেতেই জেনে গেল।

‘খামাখা এখানে এলাম, খামাখা এখানে এলাম।’ ওপর-নিচ থেকে একই সঙ্গে ভেসে এলো কার যেন ঘ্যানর ঘ্যানর। ‘এলাম, এলাম, এলাম...’

‘হিরু চাচা আমাকে কখনোই, আমাকে কখনোই, কখনোই, কখনোই, কখনোই।’ সেই একই নাকি কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিটি আনাচে-কানাচে। ওরা যতই ওপরে উঠছে, ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে শব্দ।

‘কান পচে গেল, পচে গেল, পচে গেল, গেল...’

কান জোড়া গরম হয়ে উঠল কিশোরের।

চুপ হয়ে গেল ও এবং দুজনে কষ্টেসৃষ্টে উঠে যেতে লাগল হিমবাহটির উদ্দেশে।

লেট ইকো ক্যানিয়নের চূড়ায় পৌঁছে কিশোর আর হার্ডি বিশ্রাম নিতে থামল।

ওই নিচে ঘুমন্ত শারমা শহরের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আলো চোখে পড়ল ওদের—এবং যার মাঝখানটা জুড়ে রয়েছে বিশাল দুর্গের অতিকায় কালো স্তূপ।

কিশোর জানে, শহরের অপর প্রান্তের কোন পাহাড়ে বব আর্থার, সিং আর খুদে লামা তাঁদের প্যারাসেইল তৈরি করছেন। এ-ও জানে, নিচে কোথাও জি লিং ও তাঁর কমান্ডোরা গুপ্ত সুড়ঙ্গে হানা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আর আমি কিনা এখানে একটা বিমান খুঁজতে এসেছি!

কিন্তু নালিশ করার সুযোগ নেই। এবং লেট ইকো ক্যানিয়নের প্রতিধ্বনি ওকে শিখিয়ে দিয়েছে, কী রকম ছেলেমানুষী শুনিয়েছে ওর কথাগুলো।

দুরারোহ ট্রেইলের অনেকখানি ওপরে, কালের প্রবাহে জমাট বাঁধা সাদা ঢেউয়ের মতো দেখাচ্ছে গর্জনশীল হিমবাহটি এবং ওটা সত্যিই তা-ই।

ওটার ওপরে মেঘে ঢাকা কালচে ধূসর আকাশ। নক্ষত্রবিহীন রাতের কথা কল্পনাও করতে পারে না কিশোর; আর সূর্য ছাড়া দিন তো আরো খারাপ।

এক খাড়া, সংকীর্ণ ট্রেইল ক্যানিয়নের শেষ প্রান্ত থেকে বরফের ৩০০ ফুট উঁচু এক দেয়ালের নিচে গিয়ে মিশেছে।

‘আমরা ওটার মাথায় উঠব কিভাবে?’ প্রশ্ন করল কিশোর।

‘জি লিং বলেছে হিমবাহে ফাটল আর সুড়ঙ্গ আছে।’ বলল হার্ডি। ‘সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে হুংকার শুনব আমরা। আমরা যদি সব সময়ই মহান ইয়েতির আওয়াজ থেকে দূরে থাকি, সুড়ঙ্গগুলো আমাদের চূড়ায় পৌঁছে দেবে।’

‘আমি গর্জন শুনেছি।’ বলল কিশোর। ‘মানে এখন শুনছি আর কি।’ ওদের সামনে যে বরফ রয়েছে, সেখান থেকে এক গড়গড় গর্জনের শব্দ এলো।

‘ওই যে, মহান ইয়েতি।’ বলল হার্ডি।

‘আপনি এসবে বিশ্বাস করেন নাকি?’ প্রশ্ন করল কিশোর।

‘কেন নয়?’ বলল হার্ডি। ‘৫০ বছর ধরে দিন-রাত মেঘে ঢাকা থাকছে আকাশ, এটাকে তো এক ধরনের ম্যাজিকই বলতে হবে।’

হিমবাহর তলায় যেখানে বরফ আর পাথর মিশেছে, সে জায়গাটিতে পাক খেতে শুরু করল সে।

‘আমি কী ভাবি তাতে কিছু যায় আসে না। এসো, একটা ফাটল খুঁজে বের করি। দিনের বেলায় চূড়ায় ওঠা গেলে, ওখান থেকে বিশাল দুর্গ আক্রমণের দৃশ্য দেখতে পাব।’

একগাদা অতিকায় পাথর পড়ে রয়েছে, সে জায়গাটা অতিকষ্টে পেরোল দুজন। গর্জনের শব্দ ক্রমেই জোরালো হলো, যতক্ষণ অবধি না ওরা উঁচু, সরু প্রবেশমুখ নিয়ে এক নীলচে বরফের গুহা খুঁজে পেল।

‘এসো, আল্লাহর নাম নিয়ে ভেতরে ঢুকি!’ বলল হার্ডি, মশাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাইনের এক ডালে আগুন জ্বালল।

মশালের আলোয় হিমবাহে মসৃণ, নীল এক সুড়ঙ্গ ধরা পড়ল। হার্ডি আর কিশোর শশব্যস্তে ভেতরে ঢুকে ওপর দিকে উঠতে লাগল। ওদের শ্বাস-প্রশ্বাসের মেঘ আবছা করে তুলল কাঁপা কাঁপা আলো।

১০০ গজ ভেতরে গিয়ে, শাখা বিস্তার করেছে বরফের সুড়ঙ্গটা। ডান দিকে গর্জনটা জোরদার শোনাচ্ছে, কাজেই বাঁ দিকের পথ বেছে নিল ওরা।

গুহাটার যেন কোনো শেষ নেই। এবং শুধুই ওপরে উঠে যাচ্ছে। প্রতিটি শাখায়ই অভিযাত্রীরা সেই সুড়ঙ্গপথ বেছে নিল, যেটি গর্জনের শব্দ থেকে ওদের দূরে নিয়ে যাচ্ছে—যদিও মৃদু শোনালেও আওয়াজটা কখনোই মিলিয়ে যাচ্ছে না।

চূড়ায় যখন উঠে এলো ওরা, মনে হলো যেন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবে মেঘরাশি। রুপালি রঙের মেঘপুঞ্জ হিমবাহর চূড়ায় কোমল আভা ছড়াচ্ছে।

‘আলো ফুটছে।’ বলল হার্ডি। মশালটা নিভিয়ে দিল। ‘মেঘগুলো কি রকম চকচক করতে শুরু করেছে দেখো। এসো, প্লেনটা খুঁজি। ওটা এখানেই কোথাও আছে।’

‘আপনি আগে যান।’ বলল কিশোর। ‘আমি পেছনেই আছি।’ কথাগুলো বলার পরমুহূর্তে কিশোর টের পেল, নেতা নয়, অনুসারী এখন ও। কী অবাক কাণ্ড! মাথা দেখা যাচ্ছে পুরোই গুলিয়ে গেছে আমার। ভাবল ও।

মেঘের দল মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলেছে কিশোরকে। নিরানন্দ শারমা-লা ওকে কাবু করে দিয়েছে। হিরু চাচা, মুসা আর রবিনকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও। বাঘার কথা না হয় বাদই থাকল।

বিশাল দুর্গ আক্রমণের মিশন যদি ব্যর্থ হয়? যদি না-ঝোলানো—না কী যেন—ওটা যদি পরিকল্পনামাফিক সেরে ফেলে শত্রুপক্ষ?

‘ওই যে, প্লেনটা!’

একটু সামনে থেকে উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা গেল হার্ডির।

কিশোর ওর নাগাল ধরতে পড়িমরি এগোলো, কিন্তু হার্ডি এরই মধ্যে দৌড়ে আসছে ওকে খুঁজে নিতে।

‘আমার শর্ট প্লেনটা পেয়েছি।’ বলল হার্ডি। ‘তোমাদের ডিসি-৩ও। এবং আরো অনেক।’

‘আরো অনেক কী?’

‘প্লেন! দেখবে, এসো!’

খাড়া উঠে যাওয়া এক বরফ পাহাড় ঘুরে, সমতল এক এয়ারস্ট্রিপের এক কিনারায় এসে দাঁড়াল ওরা।

‘আশ্চর্য তো!’ অস্ফুটে বলল কিশোর।

ওখানে ফেলিক্স এয়ার শর্ট এবং চায়না বিলের ডিসি-৩ দেখা যাচ্ছে। দুটিই একেবারে অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। ডিসি-৩-এর পাশে সেই স্নোমোবাইল, যেটি টেনে এনেছে বিমানটি। কিন্তু কিশোরকে অবাক করেছে ওটার পেছনের দৃশ্যটা।

আরো ডিসি-৩। মোট পাঁচটি। প্রাচীন বিমানের কবরস্থান যেন ওটা, মেঘাচ্ছন্ন দিনের আলোয় পরিত্যক্ত, অবহেলিত দেখাচ্ছে ওগুলোকে।

ডিসি-৩গুলোর মধ্যে কিছু একটা অস্বাভাবিকতা রয়েছে; কিন্তু কিশোর জানে না কী সেটা—জানল তখনই, যখন ডানাগুলোর নিচে হেঁটে গিয়ে চোখ তুলে চাইল।

সব কটা ইঞ্জিনের বহিরাবরণ ফাঁকা। শক্তিশালী র্যাডিয়াল ইঞ্জিনগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে, সে সঙ্গে থ্রি-ব্লেডেড প্রপেলারগুলোও—এই বিমানগুলোকে, যেগুলো সারা দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় উড়িয়ে নিয়ে গেছে।

আত্মাবিহীন মৃতদেহের মতো অবস্থা এখন বিমানগুলোর। ডানা আছে কিন্তু হৃদয় নেই।

‘ডিসি-৩-এর জাদুঘর মনে হচ্ছে এ জায়গাটিকে।’ বলল কিশোর। ‘সব কটির ইঞ্জিন খুলে নেওয়া হয়েছে শুধু আমাদেরটা বাদে এবং দেখে মনে হচ্ছে, এরপর ওটার পালা।’

‘ওদিকে তাকিয়ে দেখো!’ বলল হার্ডি। হিমবাহর ওপাশে, এয়ারস্ট্রিপের পাশে এক ফাটল দেখাল তর্জনী তাক করে। মনে হচ্ছে, বরফের ভেতর থেকে ধোঁয়া উঠছে বুঝি।

সাবধানে সেদিকে এগিয়ে গেল দুজনে।

‘আগুন মনে হচ্ছে।’ বলল কিশোর। ‘বরফের মধ্যে আগুন।’

‘কিন্তু এটা ধোঁয়া নয়।’ বলল হার্ডি। ‘কুয়াশা!’

কুয়াশা অনর্গল ভেসে ভেসে উঠে যাচ্ছে ওপরের রুপালি মেঘরাশির সঙ্গে যোগ দিতে, ওগুলো ভরিয়ে তুলতে।

ফাটলটার কাছে গর্জন সবচেয়ে বেশি জোরদার, নিয়মিত একঘেয়ে সুরে গর্জে চলেছে।

কিশোর হাঁটু গেড়ে বসে কান পাতল বরফে। এবার উঠে দাঁড়িয়ে বিকল উড়োজাহাজগুলোর দিকে ছুটতে লাগল।

‘যাচ্ছ কোথায়?’ হার্ডি জানতে চাইল।

‘স্নোমোবাইলটা আনতে।’ বলল কিশোর। ‘আসুন! গর্জনশীল হিমবাহ রহস্যের মনে হয় সমাধান করতে পেরেছি আমরা!’     

(চলবে)



মন্তব্য