kalerkantho


ফোকাস

বৈশাখে খেলো রে!

টিনএজার মানেই একটু বড় হয়ে গেছ, তাই? এখন আর ছোটদের খেলা খেলা যাবে না? ভুল! এই ছুটির মৌসুমে শৈশবের মজার কিছু দেশি খেলা খেলতে পারো দল বেঁধে। জানাচ্ছেন সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

৮ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



বৈশাখে খেলো রে!

খেলা মানেই যে সব সময় ক্রিকেট আর ফুটবল হবে তা নয়। খেলায় যত বৈচিত্র্য, তত মজা। আর বৈচিত্র্যের প্রশ্ন এলেই চলে আসবে শৈশবের খেলাগুলোর কথা। খোলা জায়গায় দাপিয়ে বেড়ানোর মজা তো আছেই, অন্যদিকে এসব খেলা তোমার শরীরকেও রাখবে ফিট।

সাতচাড়া

ছেলে-মেয়ে মিলিয়ে মোট ১০ জন। এক দলের টিম লিডার জুবায়ের, অন্য দলের হিমিকা। একটি টেনিস বলই যথেষ্ট। আর লাগবে সাতটি চাড়া বা সমতল ইটের টুকরো বা গোলাকার সাতটি পাথর। যেগুলো সহজে একটার ওপর আরেকটা রাখা যাবে। আর চাই একটা চারকোনা ইট। ওটার ওপরই সাজিয়ে রাখতে হবে চাড়াগুলো। প্রথমে বল ছুড়ল জুবায়ের। লাগল না ইটে। পরের বার হিমিকা। তারও মিস। এরপর আবার ছুড়ল মিজান। উঁহু, হলো না। হিমিকার দলের দ্বিতীয় সদস্য মিজান ছুড়তেই পড়ে গেল ইটের টুকরাটি। ছড়িয়ে গেল চাড়াগুলো। শুরু হলো হিমিকা-টিমের দিগ্বিদিক দৌড়। আর বল হাতে দৌড়াতে থাকা প্রতিপক্ষকে টার্গেট করতে লাগল জুবায়ের বাহিনী।

পরপর এক এক করে দুটি দলের সবাই বল দিয়ে চাড়ায় আঘাত করতে থাকবে। যেই দলের আঘাতে চাড়াগুলো পড়ে যাবে, সেই দলের সব সদস্য দৌড়ে পালিয়ে যাবে। কেন? কারণ, তাদের কারো গায়ে যদি প্রতিপক্ষ দলের কেউ বল ছুড়ে লাগিয়ে দেয়, তাহলে সে ‘আউট’। এভাবে সবাই যদি আউট হয়ে যায় তাহলে প্রতিপক্ষ জিতে গেল। আবার যারা চাড়া ফেলে দিল, তাদের কাজ হলো টেনিস বল থেকে পিঠ বাঁচিয়ে চাড়াগুলো আবার ইটের ওপর সাজিয়ে রাখা। সবাই ‘আউট’ হওয়ার আগে চাড়া সাজানো হয়ে গেলে জিতে যাবে দলটি।

 

দাঁড়িয়াবান্ধা

ছুটিতে গ্রাম থেকে ঘুরে এসেছে শান্ত। এখনো গ্রামের খেলাগুলো ওর মাথায় ঘুরছে, বিশেষ করে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলাটা! গ্রামে গিয়ে দেখল, দারুণ জনপ্রিয় খেলাটি। কারণটাও পরিষ্কার। টানটান উত্তেজনা আর কৌশলের খেলা এটি। কিন্তু এখানে ওর সঙ্গে এই খেলা খেলবে কে? শেষমেশ অনয়কে বলেই ফেলল খেলার কথা। সেও খুব একটা আপত্তি করল না। নতুন খেলা, নতুন নাম। একটু চেষ্টা করাই যায়! কিন্তু দল ভারী করা চাই। ডেকে আনা হলো ফারহান, নিবিড়সহ আরো গোটা দশেক বন্ধুকে। চলে গেল কাছের একটা মাঠে; কিন্তু দেখা গেল, বন্ধুদের অনেকে এ খেলার নামই শোনেনি। শেখানোর ভারটা তাই নিতে হলো শান্তকেই।

প্রথমে মাটিতে দাগ কেটে ঘর তৈরি করা হয়। ঘরগুলো দেখতে অনেকটা ব্যাডমিন্টনের কোর্টের মতো। দুই দলে চার-পাঁচজন করে খেলোয়াড় থাকে। একদল আক্রমণকারী, আরেকদল প্রতিরক্ষাকারী। বর্গাকার একটি ঘরে সামনে-পেছনে সমান দূরত্বে দুটি করে দাগ কাটতে হয়। এ দুই দাগের মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণ জায়গা রাখতে হয়। এগুলোকে বলে আড়া কোর্ট। দুটি আড়া কোর্ট জোড়া দিয়ে মাঝে একটি কোর্ট তৈরি করা হয়। ওটাকে বলে খাড়া কোর্ট। খেলোয়াড় যত বেশি, কোর্টও তত বাড়বে। প্রতিটি আড়া কোর্টে একজন করে আক্রমণকারী খেলোয়াড় দাঁড়াবে। তাদের প্রতিরক্ষা দলের খেলোয়াড়রা পরবর্তী আড়া কোর্টে ঢুকতে বাধা দেবে। কোর্টের ওপর বা ঘরের ভেতর আক্রমণকারীদের কাউকে ছুঁতে পারলে সে ‘আউট’ হবে। সামনের খেলোয়াড় তার পেছনের খাড়া কোর্ট ব্যবহার করতে পারে। আক্রমণকারীদের একজন কৌশলে একজন বাধাদানকারীকে ডিঙিয়ে পরবর্তী আড়া কোর্টে গেলেই খেলা জমে ওঠে। কারণ তখন পরবর্তী কোর্টের বাধাদানকারীর পক্ষে দুজনকে একসঙ্গে বাধা দেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সুযোগে আক্রমণকারীদের একজন দাগ পেরিয়ে সব ঘর পেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এরপর আবার পেছনের ঘর থেকে তাকে একেবারে সামনে আসতে হয়। কোর্টে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিরক্ষা দলের ছোঁয়া বাঁচিয়ে সবাই ফিরে আসতে পারলেই গেম। একজন খেলোয়াড় দৌড়ে কতটুকু ঘর সামলাতে পারবে, তার ওপর ভিত্তি করে ঘর কাটা হয়।

দাঁড়িয়াবান্ধা বেশ কসরতের খেলা। এতে পেশি শক্তিশালী হয়। শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। এক কোর্ট থেকে আরেক কোর্টে কৌশলে লাফালাফি করতে হয় বলে মগজটাও থাকে দৌড়ের ওপর। বাড়ে রিফ্লেক্স ক্ষমতা। তাই যারা একটু মেদ নিয়ে টেনশনে আছ, তারা নিয়মিত এ খেলা খেলতে পারো।

 

টিলো এক্সপ্রেস

নামটা শুনে অনেকেরই ভ্রু কুঁচকে গেছে। খেলাটা আসলে লুকোচুরি খেলারই একটা সংস্করণ। ভ্রু ঠিক করে নাও এবার। নব্বইয়ের দশকের দিকে গ্রামে ও মফস্বলে লোডশেডিংয়ের সময় কিশোর-কিশোরীদের প্রিয় খেলা ছিল এটি। এখন খুব একটা খেলতে দেখা না গেলেও তোমার এলাকার অলিগলিতে বন্ধুরা মিলে একদিন ঠিক করে উপভোগ করতে পারো দারুণ উত্তেজনায় ভরপুর এ খেলা। খেলার নিয়ম সহজ। লটারির মাধ্যমে প্রথমে একজন ‘চোর’ হবে। বাকিরা বিভিন্ন জায়গায় লুকোবে। চোরের কাজ হবে লুকানো ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। যাকে খুঁজে বের করবে তার নাম ধরে জোরে বলতে হবে এক্সপ্রেস (যেমন—মিন্টু এক্সপ্রেস!) কিন্তু লুকিয়ে থাকা কেউ যদি চোরের অগোচরে এসে চোরকে ছুঁয়ে ‘টিলো’ বলতে পারে, তবে সে আবার চোর হবে। চোর যদি একে একে সবাইকে খুঁজে বের করে ফেলে, তবে প্রথম যাকে বের করেছে, সে-ই হবে পরবর্তী চোর। এ খেলায় বুদ্ধির কাজটা হলো—খেলোয়াড়দের এমনভাবে লুকাতে হবে বা লুকানোর জায়গা ঠিক করতে হবে, যাতে দেখে ফেলার আগেই চোরকে ছুঁয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। অর্থাৎ চোরের কাছ থেকে অনেক অনেক দূরে গিয়ে লুকালে হবে না। অন্যদিকে চোরকেও সাবধানে থাকতে হবে সারাক্ষণ। কারণ একজনকে খুঁজে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ‘এক্সপ্রেস’ বলতে গিয়ে দেখা গেল, পেছন থেকে আরেকজন এসে ছুঁয়ে ফেলল! অর্থাৎ এই টিলো এক্সপ্রেস খেলতে গিয়ে মগজে শাণ দেওয়াটাও হবে।

 

গোল্লাছুট

গোল্লাছুট মজার খেলা। রেণু আর কবিরের দল প্রথমে নিজেদের দল গোছাল। খেলতে দরকার দুটি দল (প্রত্যেক দলে কমপক্ষে পাঁচজন) আর গোলাকার একটি স্থানে পোঁতা একটি লাঠি। গোল জায়গা থেকে ৫০ গজ দূরে একটা সীমারেখা ঠিক করতে হবে।

গোল জায়গার ভেতরে দাঁড়াল রেণু নিজে। এক হাতে ধরল লাঠি। বাকি হাতে দলের আরেকজনকে। রেণু হলো গোল্লারক্ষক। তার হাত ধরেছে মিথি, মিথির হাত ধরেছে জুঁই। এভাবে তৈরি হলো শিকল। এরপর তাদের লক্ষ্য হলো যেকোনো একদিকে ছুট লাগিয়ে সীমানা স্পর্শ করা। যথারীতি কবিরের দলের কাজ হবে তাদের বাধা দেওয়া। এদিকে তাদেরও আছে বিপদ। শিকল থাকা অবস্থায় (মানে হাত হাত ধরা অবস্থায়) রেণুর দলের কেউ যদি কবিরের দলের কাউকে ছুঁয়ে দেয়, তবে ওই খেলোয়াড় বাতিল। প্রতিপক্ষ কবিরের দল পুরো চেষ্টা করে যাচ্ছে রেণুর দলের খেলোয়াড়দের বাতিল করার। রেণুর দল যতক্ষণ একজন আরেকজনকে ছুঁয়ে আছে, ততক্ষণ তারা নিরাপদ। এর মধ্যেই চেষ্টা করতে হবে দলপতির হাত ছেড়ে বা দলের সদস্যদের হাত ছেড়ে সীমানা পার হওয়ার। এর মাঝে আবার যদি রেণুর হাত থেকে লাঠি ফসকে যায়, তবে ওই অবস্থায় তার দলের খেলোয়াড়কে যদি কবিরের দল ছুঁয়ে ফেলে, তবে রেণুরা পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাবে।

আরো জানিয়ে রাখি, রেণুর দলের তিনজন যদি সীমানারেখা অতিক্রম করতে পারে। তবে তারা নতুন করে গোল্লা তৈরি করার সুযোগ পাবে। গোল্লা থেকে একজন এক লাফে যত দূর সামনে এগোতে পারবে, তত দূরে নতুন গোল্লা তথা স্টেশন তৈরি হবে। এভাবে স্টেশনটাকে সীমানার যত কাছে নিতে পারবে, পুরো দলের বিজয় ততই ঘনিয়ে আসবে।



মন্তব্য