kalerkantho


গল্প

আকাশদস্যু

কাহিনি রচনা: কাজী শাহনূর হোসেন
তিন গোয়েন্দায় রূপান্তর: শামসুদ্দীন নওয়াব

৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আকাশদস্যু

আঁকা : মানব

এক

উত্তর বার্মার পাহাড়সারির ওপরে শীতল, স্বচ্ছ একদিন। বহু নিচে, ঘন, ধোঁয়াটে বনভূমিতে ঢাকা ভূখণ্ড, কিন্তু এখানে প্রায় ২০ হাজার ফুট ওপরে, সব সময়ই রীতিমতো ঠাণ্ডা থাকে।

দুটি টার্বোপ্রপ গুঞ্জন তুলছে, টুইন-ইঞ্জিন শর্ট উড়োজাহাজটি একঘেয়ে শব্দ করে উড়ে চলেছে ককপিটের দুজন লোকই যুবক। কন্ট্রোলে বসা পাইলটের মাথায় বেসবল ক্যাপ; তার সঙ্গীর মাথায় পাগড়ি।

‘ওই যে হিমালয়, সিং।’ বলল পাইলট। উত্তর দিগন্তের তুষারাবৃত চূড়াগুলো আঙুল তুলে দেখাল। ‘ক্লাউড অ্যালি নামে এক নির্জন গিরিপথে ভূতুড়ে বিমানটাকে দেখেছিলাম  আমি।’

হেসে উঠল তার কোপাইলট।

‘তুমি একটা কুসংস্কারের ডিপো, হার্ডি।’ বলল সে। ‘প্লেনটা আকাশ ফুঁড়ে হাজির হওয়া মানেই ওটা ভূতুড়ে নয়।’

মতভেদ সত্ত্বেও ওরা বন্ধু। সিং বড় হয়েছে এক ধর্মভীরু পরিবারে, মা-বাবার আশা ছিল ভবিষ্যতে সে ধর্মগুরু হবে। কিন্তু তার বদলে সে স্কটল্যান্ডে গিয়ে সায়েন্স আর ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেছে। ওদিকে হার্ডি জাতিতে স্কট, গ্লাসগোর ছেলে, বেশ কয় বছর পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর পুবের নানা গুপ্তরহস্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

ফেলিক্স এয়ারের পক্ষে বিমান চালনার সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছে তারা। দুজনই যেহেতু দক্ষ পাইলট, তাই একসঙ্গে ওড়ার সুযোগ খুব কমই মেলে। এই ফ্লাইটটি যদিও ওদের জন্য এক বিশেষ উপলক্ষ। সিং সাধারণত ভিন্ন রুটে ফ্লাই করে, কিন্তু আজ ছুটির দিনে বন্ধু তাকে এক রহস্যের সমাধান করতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

“ ‘ভূতুড়ে বিমান’ বলতে আমি কী বুঝিয়েছি নিজের চোখেই দেখবে।” বলল হার্ডি। পোড়খাওয়া যুবকটি অবিচল, অভ্যস্ত হাতে কন্ট্রোলগুলো সামলাচ্ছে। ২৮ বছর বয়সেই এই রুটে একজন অভিজ্ঞ বৈমানিক সে।

‘আগে দেখি, তারপর বিশ্বাস করব।’ বলল সিং।

‘ঠিক হ্যায়!’ হেসে সামনে থ্রটল ঠেলে দিল হার্ডি এবং বিমানটি শাঁ করে উঠতে দিল, পর্বতমালার বরফ ঢাকা দেয়ালটির উদ্দেশে ঘুরে গেল ওরা। বিমানে কোনো যাত্রী নেই যে অভিযোগ করবে। ফেলিক্স এয়ার কার্গো এয়ারলাইনস। আজ ওরা ড্রামকে ড্রাম তেল আর ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ বহন করছে।

‘আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে অযথা সময় নষ্ট করছ।’ বলল সিং। ‘ভুলে যেয়ো না, আমিও কিন্তু তোমার চেয়ে কম সময় ধরে ফ্লাই করছি না।’

তখনো হাসছে, হার্ডি ছোট্ট জোড়া ইঞ্জিন বিমানটি সোজা করল। শর্ট ওদের দুজনের কাছেই প্রিয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডে তৈরি, ওটা এক প্র্যাকটিক্যাল ডিজাইন : বক্সি, হাই-উইং মনোপ্লেন, সুপ্রশস্ত, নির্ভরযোগ্য এবং প্রায় যেকোনোখানে ল্যান্ড করার উপযোগী।

‘উঁচু চূড়াগুলোর দিকে যাচ্ছি আমি, ক্লাউড অ্যালিতে ঢুকছি।’ জানাল হার্ডি। ‘শেষ যেবার এখানে আসি, ভূতুড়ে প্লেনটি ওই মেঘগুলো ফুঁড়ে উদয় হয়েছিল।’

‘তুমি বারবার খালি ভূতুড়ে ভূতুড়ে করছ কেন? কেন ভাবছ, ওটা ভূতুড়ে ছিল?’

‘একটাই কারণ। ওটা একটা পুরনো প্লেন। ডাকোটা।’

টুইন-ইঞ্জিন ডিসি ৩-এর ব্রিটিশ নাম ছিল ডাকোটা, প্রথম দিককার অন্যতম অল-মেটাল কার্গো প্লেন ওটা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রবাহিনীর এয়ার সার্ভিসের মেরুদণ্ড ছিল এই বিমান।

পঞ্চাশ বছর আগের কথা!

‘তাতেই ওটা ভূতুড়ে বিমান হয়ে যায় না।’ বলল সিং। ‘এখনো অনেক ডিসি-৩ উড়ে বেড়াচ্ছে। খুব শক্তপোক্ত বিমান ছিল ওটা। প্রায় শর্টের কাছাকাছি মানের। আমি নিজেই কয়েকবার চালিয়েছি। কেন যে তুমি—’

‘ওই যে!’

হার্ডির কথায় বাধা পেল সিং। হার্ডি বিমানটাকে সামান্য উঁচু করে তর্জনী দেখাল জানালা দিয়ে।

মেঘরাশির মাথার ওপর রুপালি এক টুইন-ইঞ্জিন বিমানকে ভেসে থাকতে দেখল সিং, হাজারখানেক ফুট নিচে।

‘তাই তো, ওই যে। পুরনো ডিসি-৩ ডাকোটা—ঠিক তুমি যেমনটা বলেছিলে!’

‘ফেলিক্স এয়ার কয়েক বছর আগে ঠিক যে রকম একটা হারিয়েছিল। আর দেখো, সিং, ওটা মনে হয় বিপদে পড়েছে। ডানা দুটি কিভাবে নাড়াচ্ছে।’

এটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিপত্সংকেত।

‘তুমি নিচে নেমে চেক করে দেখো।’ বলল সিং। ‘আমি দেখি, রেডিওতে ধরতে পারি কি না।’

হার্ডি একটু পরে, মেঘরাশির কাছে নামিয়ে আনল নিজেদের বিমান। পুরনো বিমানটি মেঘমালার চূড়ায় ওটার টেইল হুইল প্রায় ছুঁইয়ে রেখে ভাসছে।

‘হ্যালো, ডাকোটা!’ বলল সিং, ঠোঁটের কাছে মাইক্রোফোন ধরে। ‘হ্যালো, ডাকোটা। দিস ইজ দ্য ফেলিক্স এয়ার শর্ট এ সেভেন এইট সিক্স, কলিং ডিসি-থ্রি ইন ডিসট্রেস! কাম ইন! কাম ইন...’

হার্ডি লেভেল অফ এবং থ্রটল ব্যাক করে নিজেদের বিমানটিকে ডাকোটার সামান্য পেছনে আর ওপরে নিয়ে এসেছে।

‘ক্যানিয়নগুলোর একটির দিকে যাচ্ছে ও, উঁচু চূড়াগুলোর উদ্দেশ্যে।’ বলল হার্ডি। ‘কিন্তু ওখানে তো বেরোনোর কোনো পথ নেই!’ সামনে, উই-স্ক্রিন ভেদ করে, বরফ আর তুষারের এক খাড়া প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে হিমালয়।

তখনো মেঘরাশির মাথার ওপরে ভেসে রয়েছে, ডিসি-৩ ঢালু এক উপত্যকা অভিমুখে ঘুরল, এবার আরেকটি। মনে হচ্ছে, গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে উড়ে চলেছে ওটা।

‘নিচে মেঘের মধ্যে ঢুকছে!’ বলে উঠল সিং, ডিসি-৩ যেই শাঁ করে নেমে গেল।

‘আমরাও ঢুকব!’ বলল হার্ডি।

শর্টের নাক নামিয়ে অনুসরণ করল সে। শিগগিরই বিমানটি ঢাকা পড়ল সাদা কুয়াশার চাদরে।

‘আমরা যদি কোনো চূড়ায় হিট করে বসি?’ সিংয়ের উদ্বিগ্ন প্রশ্ন।

‘ম্যাপ অনুযায়ী এই উপত্যকাটি যথেষ্ট গভীর।’ জানাল হার্ডি। ‘আমরা যদি আর উত্তরে, উঁচু চূড়াগুলোর দিকে না যাই, তবে ভয়ের কোনো কারণ নেই।’

‘আস্তে আস্তে।’ চেঁচিয়ে সতর্ক করল সিং। ‘আমরা ওদের ওভারটেক করছি!’

হার্ডি থ্রটল ব্যাক করল এবং শর্ট মন্থর হয়ে এলো, ভেসে রইল পাহাড়ি পাতলা বাতাসে। ডিসি-৩ এখন সামান্য সামনে আর একটু ওপরে, মেঘের বুক চিরে ভূতুড়ে ছায়ার মতো ফুটে রয়েছে।

আচমকা ছায়াটা থেকে মুক্ত হলো আরো একাধিক আবছায়া।

‘আরি—’ চেঁচিয়ে উঠল হার্ডি।

‘মনে হচ্ছে, প্লেন থেকে লোকজন লাফিয়ে পড়ছে।’ বলে উঠল সিং।

‘আমাদের দিকে স্কাই ডাইভিং করে আসছে!’ চেঁচাল হার্ডি।

‘উঠে যাও!’

‘চেষ্টা করছি!’

টার্বাইনগুলো গেয়ে উঠল এবং পাতলা বাতাস খুঁড়ল; কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শর্টের সরু ডানার সামনের প্রান্তে পরপর কয়েকটি জোরালো থপথপ শব্দে আটকে গেল গ্র্যাপলিং হুক। উইন্ডস্ক্রিনে উদয় হলো এক মুখ—দেঁতো হাসছে, দাড়িওয়ালা এক আকাশদস্যু!

দুড়ুম!

পেছনের কার্গো ডোর খসে পড়ল ছোটখাটো এক বিস্ফোরণে এবং ঠাণ্ডা বাতাসে ভরে উঠল বিমানের ভেতরটা। শীতল বাতাস এবং চিৎকার-চেঁচামেচি আর পদশব্দ!

‘হামলা হয়েছে!’ চেঁচিয়ে উঠল হার্ডি। ‘রেডিও! কল...’

সিং ঠোঁটে মাইক্রোফোন ঠেকাতেই ঘাড়ের পেছনে স্পর্শ পেল পিস্তলের ঠাণ্ডা নলের।

‘রেডিওটা অফ করুন!’ নিখুঁত ইংরেজিতে বলল এক ভারিক্কি কণ্ঠস্বর। ‘এবং কন্ট্রোলগুলো আমাকে দিন। আমরা এই এয়ারক্রাফটের কমান্ড নিচ্ছি।’

 

দুই.

‘খাইছে!’ বলে উঠল মুসা। এ তো দেখি ‘টেরি অ্যান্ড দ্য পাইরেটস!’

‘কে?’ একসঙ্গে প্রশ্ন করল রবিন আর কিশোর। তিনজনে কঠোর পরিশ্রম করে পাশা টিমের হামভি ধুচ্ছে। ওদের অনেক কাজের একটা হচ্ছে যন্ত্রটাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং তৈরি রাখা।

‘গেটে।’ বলল মুসা। ‘দেখো!’

ছেলেরা ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পেল, হিরু চাচার বন্ধু বব আর্থার এক অতিথিকে স্বাগত জানাচ্ছেন। আগন্তুকের ঠোঁটের ওপর পুরু, ঝোলা গোঁফ এবং পরনে চামড়ার বম্বার জ্যাকেট আর ধোপদুরস্ত ফ্লাইং ক্যাপ। মানুষটি বুড়ো হলেও যথেষ্ট শক্তপোক্ত আর কর্মঠ দেখাচ্ছে তাঁকে।

“পুরনো কমিক স্ট্রিপ ‘টেরি অ্যান্ড দ্য পাইরেটস’ পড়নি তোমরা?” জিজ্ঞেস করল মুসা। ‘দূরপ্রাচ্যে ফ্লায়ার আর অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে লেখা। ছোটবেলায় খুব পড়তাম।’

‘তুমি এখনো ছোটই আছ।’ বলল কিশোর। ‘মনে  হয় শনিবার সকালের কার্টুন শোগুলো নিয়েই তখন মজে ছিলাম আমি। সে জন্যই মিস করেছি।’

‘ভদ্রলোক কে?’ প্রশ্ন করল মুসা।

‘কে জানে।’ বলল রবিন। ‘দেখে তো ইন্টারেস্টিং চরিত্র মনে হচ্ছে। চলো, আমরা নাক গলাই!’

কয় মুহূর্তের মধ্যেই হামভি ধুয়ে-মুছে সাফ-সুতরো করে, হোসগুলো বন্ধ করে সরিয়ে রাখল ওরা। পাশা কম্পাউন্ডের মাঝখানে, মূল বাড়িটির সিঁড়ির ধাপ ভেঙে মেহমানকে নিয়ে উঠে যাচ্ছেন বব আর্থার, এ সময় তাঁদের অনুসরণ করল তিন গোয়েন্দা।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও অভিযাত্রী হিরন পাশা, কিশোরের হিরু চাচা, তার অফিসে বসে কয়টা ম্যাপ নিরিখ করছিল। দরজাটা খোলা, তিন গোয়েন্দা যদিও জানে, পাশা টিমের সব বৈঠকেই তারা আমন্ত্রিত, তবুও ওরা দরজার পেছনে লুকাল।

মাঝেমধ্যে আড়ি পেতে শোনার মজাই আলাদা।

‘পাশা।’ বললেন বব, ‘ইনি আমার পুরনো বন্ধু কর্নেল উইলিয়াম স্কট। তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’

‘তাই নাকি?’ সাগ্রহে বলল হিরু চাচা। উঠে দাঁড়িয়ে ম্যাপগুলো ভাঁজ করল, এবার উষ্ণ করমর্দন করল বয়স্ক মানুষটির সঙ্গে। ‘চায়না বিল স্কট, তাই না?’

‘আপনি আমার কথা জানেন!’ অতিথি রীতিমতো চমকিত।

‘জানি বৈকি।’ বলল হিরু চাচা। ‘দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বিপুল খ্যাতি পান আপনি, ভারত আর বার্মার পর্বতমালার মধ্যে এয়াররুট চালু করার জন্য। ‘ফ্লাইং দ্য হাম্প’ বলা হতো ওটাকে। আপনার দুঃসাহসী প্রচেষ্টার কারণেই মিত্র বাহিনীর কাছে জরুরি সরবরাহ পৌঁছানো এবং জাপানিদের পরাজিত করা সম্ভব হয়।’

‘ওঁরা ভারতের কথা বলছেন!’ ফিসফিস করে বলল মুসা। দরজার আরেকটু কাছে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল ও। ইদানীং ভারত বিষয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে ও।

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ৫০ বছর আগের কথা!’ পাল্টা ফিসফিসাল কিশোর। ‘ইনি প্রাচীন লোক!’

‘কাজটা আমি একা করিনি।’ বললেন স্কট। ‘আমার পার্টনার ফেলিক্স রুটটা খোলার ব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করে আমাকে। ও ছিল মেকানিক আর আমি পাইলট। একটি টিম হিসেবে কাজ করেছি আমরা। ও না থাকলে আমি কখনোই ওই উঁচু উঁচু পাহাড়সারির ওপর দিয়ে ডিসি-৩গুলো নিয়ে যেতে পারতাম না।’

‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে খুব খুশি হলাম।’ বলল হিরু চাচা। ‘বসুন, প্লিজ!’

‘কর্নেল স্কটকে ২০ বছর আগে অ্যাকটিভ সার্ভিসে আবার ডেকে পাঠানো হয়, আমাদের কটা সিল টিমকে পাহাড় আর জঙ্গলে যুদ্ধ করার উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য।’ বললেন বব আর্থার। ‘তখনই তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা।’

‘বব আর ওই ছেলেগুলো দারুণ চৌকস ছিল।’ চোখের তারা নাচিয়ে বললেন স্কট। ‘ও আর আমি তার পর থেকে যোগাযোগ রেখে চলেছি। বব আমাকে আপনার এবং পাশা টিমের কাজকর্ম সম্পর্কে জানিয়েছে। তাই নতুন এই সমস্যাটি গজিয়ে উঠতেই ভাবলাম, আপনাদের কাছে সাহায্য চাই।’

‘সমস্যা?’ বলে উঠল হিরু চাচা। চোখ জোড়া জ্বলে উঠল তাঁর, নতুন চ্যালেঞ্জের কথা শুনলেই যেমনটা হয় আর কি।

‘আমার যুদ্ধকালীন পার্টনার আর আমার একটা কমন স্বপ্ন ছিল।’ বললেন স্কট। ‘যুদ্ধ থামলেই দুজন মিলে একটি এয়ারলাইনস চালু করব ভেবেছিলাম। তারপর ফেলিক্স হিমালয়ে একটি ফ্লাইট নিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়, আর আমি একাই ব্যবসাটা শুরু করি। ওর সম্মানে এয়ারলাইনসের নাম রাখি ফেলিক্স এয়ার। ব্যবসা জমে উঠতেও সময় লাগেনি। আমরা ভারত আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট ছোট বিমানবন্দর ব্যবহার করে কার্গো আমদানি-রপ্তানি করি। তো গত সপ্তাহে আমি আমার সেরা পাইলটদের দুজনকে আর এক শর্ট টার্বোপ্রপ বিমান হারাই।’

‘দুর্ঘটনা?’ হিরু চাচার প্রশ্ন।

মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ।

‘সব সময় মেঘে ঢাকা থাকে এমন এক জায়গায় হারিয়ে যায় ওরা। এলাকাটা ম্যাপে খুঁজে পাবেন না। ওটাকে বলে ক্লাউড অ্যালি, মানে মেঘের গলি। আমাদের এক প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারলাইনস কয় বছর আগে গোটা দুই ডিসি-৩ হারায় ওই এলাকাটায়। সমস্যা হচ্ছে, কেউ এমনকি এটাও জানে না, ওই মেঘরাশির নিচে কী রয়েছে। সে জন্যই আপনাদের কাছে আসা। বব আমাকে বলেছে, আপনি নাকি এমন এক ম্যাপিং ক্যামেরা বানাচ্ছেন, যেটা মেঘের চাদর ভেদ করতে পারে।’

‘হ্যাঁ, অমন এক যন্ত্র নিয়ে কাজ করছি আমি।’ বলল হিরু চাচা। ‘কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এমন এক প্লেন দরকার, যেটা স্লো আর স্টেডি।’

‘আমি তেমন প্লেনের ব্যবস্থা করতে পারব।’ বললেন স্কট। ‘এবং বলাই বাহুল্য, সব খরচ আমিই দেব।’

‘হুম...।’ চিন্তামগ্ন দেখাল হিরু চাচাকে। ‘বেশ, ব্যাপারটা যখন এতই জরুরি—’

‘সেই সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চারটাও হয়ে যাবে।’ জুগিয়ে দিলেন বব আর্থার।

দোরগোড়া থেকে উঁকি মারল তিনটি কিশোরের মুখ।

‘আমরা যাব না?’ জিজ্ঞেস করল কিশোর।

‘হুফ।’ যোগ করল বাঘা।

চায়না বিল স্কট চেয়ারে ঘুরে বসলেন, বিস্মিত।

‘আরে, আমাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করা হচ্ছিল!’ ক্রুদ্ধ স্বরে বললেন।

‘চায়না বিল, আমার ভাতিজা কিশোর আর ওর বন্ধুদের সঙ্গে পরিচিত হোন।’ বলল হিরু চাচা। ‘তোরা ভেতরে আয়। কবজার মতো দরজার সঙ্গে লেগে থাকতে হবে না। হ্যাঁ, তোরাও যাবি আমাদের সঙ্গে।’

উত্তেজনায় পড়িমরি করে তিন গোয়েন্দা কামরায় প্রবেশ করল।

‘খাইছে!’ বলে উঠল মুসা। ‘আবার ভারত!’

‘আমরা কবে যাচ্ছি?’ হিরু চাচাকে প্রশ্ন করল রবিন।

‘আজ রাতে!’ বিখ্যাত বিজ্ঞানী জানাল। ‘গোছগাছ শুরু করো। কিন্তু তার আগে তোমাদের হাতের কাজগুলো সারা চাই!’ (চলবে)



মন্তব্য