kalerkantho


কিউবার নতুন কাণ্ডারি

তামান্না মিনহাজ

২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



কিউবার নতুন কাণ্ডারি

বিশ্বের একমাত্র কমিউনিস্ট দেশ কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মিগুয়েল দিয়াস ক্যানেল। বিপ্লব-পরবর্তী কিউবায় এই প্রথম প্রেসিডেন্টের গদিতে বসতে চলেছেন একজন, যাঁর নামের পেছনে কাস্ত্রো পদবি নেই। নেতার পরিবর্তন মানেই নীতিতে পরিবর্তন—এমন রীতিতেই চলে বিশ্ব। তবে এবার কিউবার ক্ষেত্রে তেমন সম্ভাবনা নেই। ৮৬ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোর হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন দিয়াস ক্যানেল, যাঁর প্রথম পরিচয়ই রাউলের আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর শুরুতেই তিনি জানিয়েছেন, কাজ করছেন তাঁর পার্টির গুরু রাউলের পরামর্শ মেনে। কিউবার সামনে এখন সংকটের পাহাড়। যার প্রথমটিই হচ্ছে অর্থনীতি। এ সংকট কাটানোই হবে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

 

মিগুয়েল দিয়াস ক্যানেল কে?

৫৮ বছর বয়সী মিগুয়েল দিয়াস ক্যানেল ২০১৩ সাল থেকে কিউবার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাবেক এই তড়িৎ প্রকৌশলী একেবারেই নতুন মুখ। কিউবার পার্লামেন্টে তাঁর নাম চূড়ান্ত করে ১৮ এপ্রিল এবং তিনি শপথ নেন ১৯ এপ্রিল। দিয়াস ক্যানেল ১৯৬০ সালের ২০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০৩ সালে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালে তিনি কাউন্সিল অব মিনিস্টারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ২০১৩ সাল থেকে কাউন্সিল অব স্টেটের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।

 

 

নতুন নেতৃত্ব কেমন হবে?

কয়েক যুগ পর কমিউনিস্ট শাসিত কিউবায় কাস্ত্রো পরিবারের বাইরে নতুন নেতৃত্ব আসছে। যদিও দিয়াস ক্যানেলের মূল পরিচয় রাউল কাস্ত্রোর ঘনিষ্ঠ বা ডান হাত হিসেবেই। ৮৬ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রো ২০০৬ সালে তাঁর ভাই ফিদেল কাস্ত্রোর স্থলাভিষিক্ত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাউল কাস্ত্রোকে সফল বলা যেতেই পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিউবার সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ওই প্রক্রিয়া থমকে দাঁড়ায়। কাস্ত্রো দেশের ভেতরেও বেশ কিছু সংস্কার কর্যক্রম শুরু করেন। প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়লেও কিউবার ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিতে তাঁর প্রভাব আগের মতোই বহাল থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

 

কিউবার বিপ্লবী অতীত

১৯৫২ সালে ফুলগেন্সিও বাতিস্তা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট কার্লোস প্রিয়র সরকারকে উচ্ছেদ করেন। এ সময় কিউবা পরিণত হয়েছিল উচ্ছৃঙ্খল ধনীদের স্বর্গরাজ্যে। যৌন ব্যবসা, জুয়া ও মাদক চোরাচালান চরম আকার ধারণ করেছিল। বাতিস্তার সরকারের নীতি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মতোই, যা ছিল ফিদেল কাস্ত্রোর বিশ্বাসের পরিপন্থী। বাতিস্তা সরকারকে উত্খাতের জন্য কাস্ত্রো একটি গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন, যার নাম ‘দ্য মুভমেন্ট’। সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে সান্দিয়াগোর কাছে মোনাকাডা সেনা ছাউনিতে একটি আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। আক্রমণটি ব্যর্থ হয়। বহু বিপ্লবী নিহত হয়। অনেকে ধরা পড়ে। বন্দিদের মধ্যে কাস্ত্রোও ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর বিচার শুরু হয়। কাস্ত্রোকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত।

সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে ১৯৫৫ সালের মে মাসে জেল থেকে ছাড়া পান ফিদেল কাস্ত্রো। আন্দোলনে আরো ভালোভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ফের গ্রেপ্তার এড়াতে এক সময় মেক্সিকো পালিয়ে যান। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় আরেক তরুণ বিপ্লবী চে গুয়েভারার সঙ্গে। ১৯৫৬ সালের নভেম্বরে একটি ইঞ্জিন নৌকায় ৮১ জন সশস্ত্র সঙ্গী নিয়ে কিউবায় ফিরে আসেন ফিদেল কাস্ত্রো। তাঁরা হাভানার সরকারের বিরুদ্ধে দুই বছর ধরে গেরিলা আক্রমণ চালান। ১৯৫৯ সালের ২ জানুয়ারি বিদ্রোহীরা হাভানায় প্রবেশ করে। বাতিস্তা পালিয়ে যান। ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় বিপ্লব হয় ১৯৫৯ সালে। তখন পশ্চিমা দুনিয়ায় কিউবাই প্রথম কমিউনিস্ট দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবায় একদলীয় শাসন শুরু হয়, যা এখনো অব্যাহত। শারীরিক অসুস্থতার জন্য কাস্ত্রো ক্ষমতা ছাড়েন ২০০৬ সালে। ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রো ওই সময় দেশের হাল ধরেন। এখন রাউল কাস্ত্রোও অবসরে গেলেন।

 

দিয়াস ক্যানেলের সামনে চ্যালেঞ্জ

নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ। কাস্ত্রোর আমল থেকে ছোটখাটো বেসরকারি সংস্থার বিনিয়োগের দরজা খুলেছিল কিউবা। নতুন প্রেসিডেন্ট সেই পরিবর্তিত অর্থনীতি কিভাবে সামলান, দেখতে চায় দেশের নতুন প্রজন্ম। সেই সঙ্গে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দিকটিও। ওবামা জমানার শেষের দিকে দীর্ঘ শীতলতা কাটিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক শোধরাতে শুরু করেছিল একটু একটু করে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে সম্পর্ক শোধরানোর সেই প্রক্রিয়াটা বারবারই ধাক্কা খেয়েছে।

অন্যদিকে কিউবার ক্ষমতার রাশ এখনই আলগা করছেন না রাউল কাস্ত্রো। ৮৬ বছর বয়সী এই নেতা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান (ফার্স্ট সেক্রেটারি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। আর কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান থাকা মানে সংবিধান অনুযায়ী তিনিই হবেন ‘সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রধান অভিভাবক’। ফলে রাউলই কিউবার সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি হিসেবেই থেকে যাচ্ছেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দিয়াস ক্যানেল তাঁর বক্তৃতায় বলেন, রাউল কাস্ত্রো কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান থাকছেন। রাউল কাস্ত্রোর আমলে উন্নয়নের ধীরগতিতে কিউবানদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল হতাশা। অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেশটির পিছু ছাড়ছে না। বেকারত্বের কারণে তরুণ প্রজন্মও হতাশ। দিয়াস ক্যানেল দেশটির অর্থনীতিকে কতটা এগিয়ে নিতে পারেন, কিউবানদের হতাশা কতটা কাটাতে পারেন, তা সময়ই বলে দেবে।



মন্তব্য