kalerkantho


যেভাবে চাকরি পেলাম

দল বেঁধে পড়ার অভ্যাস স্কুলবেলা থেকেই

জুতসই একটি চাকরি বগলদাবা করা সহজ কর্ম নয়। রায়হান রহমানকে চাকরি পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন ১১তম জুডিশিয়ারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ তাজুল ইসলাম সোহাগ

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দল বেঁধে পড়ার অভ্যাস স্কুলবেলা থেকেই

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই থাকতাম হোস্টেলে। দল বেঁধে পড়ার অভ্যাস তখন থেকেই। গ্রুপ স্টাডি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেও চলত। একসঙ্গে পড়লে অনেক সুবিধা—একজন একটি বিষয় না বুঝলে অন্যজন বুঝিয়ে দিত। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছি। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছি ভালো ফল নিয়ে। আইন পড়ার ইচ্ছা ছিল। ভর্তি হয়েছিলাম নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্বপ্ন ছিল সহকারী জজ হব। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বইয়ের পাশাপাশি বাইরের বইও পড়তাম। পড়ার আগ্রহ আমাকে জুডিশিয়ারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করেছে।

আইনের ছাত্র হিসেবে মুটিংয়ের (আদালতের আদলে ইংরেজিতে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন) সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। জাতীয় হেনরি ডুনান্ট মুট কোর্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। যুক্ত ছিলাম বিতর্কের সঙ্গেও। আইনবিষয়ক বিভিন্ন ক্যাম্প ও সেমিনারে অংশ নিয়েছি। একাডেমিক ফল ভালো ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের পাট চুকিয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটিই ছিল আমার প্রথম চাকরি। তখন একটা চাকরি বেশ দরকার ছিল। তাই যোগ দেওয়ার সময় দ্বিতীয়বার ভাবিনি।

প্রতিদিন ক্লাস নেওয়া, রাতে লেকচার তৈরি করা—দম ফেলার ফুরসত ছিল না। এত কিছুর ভেতরেও জুডিশিয়ারি পরীক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছি। আইন বিভাগে শিক্ষকতা করার সুবাদে আইন নিয়ে চর্চা হতো। আইনের ব্যাখ্যা, আইনের ব্যবহার, আইনের আলোকে বিভিন্ন বিষয়ে সমস্যার সমাধান দিতে হতো ক্লাসে। ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য নিজেকে সব সময়ই প্রস্তুত রাখতে হতো। তাই প্রচুর পড়াশোনা করতাম। একাধিক দৈনিক পত্রিকা পড়তাম। নিজেকে আপডেট রাখার চেষ্টা করতাম। এসব আমার প্রস্তুতিতে কাজে দিয়েছে।

পড়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় ছিল না। যখন সময় পেয়েছি তখনই পড়েছি। এমনও হয়েছে, সকাল ৯টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত একটানা পড়াশোনা করছি। জুডিশিয়ারির সিলেবাস বেশ বড়। বিষয়গুলো চর্চার মধ্যে রাখতে হয়েছে। আইন মুখস্থের বিষয় নয়। আর জুডিশিয়ারিও শুধু পাস করার পরীক্ষা নয়। এখানে ভালো নম্বর পেতে হয়। জুডিশিয়ারিতে শুধু আইন নয়, সঙ্গে অন্য বিষয়গুলোও থাকে। যেমন—বাংলা, গণিত, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান। ডিবেট ও মুটিংয়ের কারণে ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞানে দখল আগে থেকেই ছিল। আইনের বই পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ সব ধারা পড়েছি। প্রতিটি আইন তৈরির পেছনের উদ্দেশ্য জেনেছি। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আইনবিষয়ক কলাম, মামলাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন পড়ে নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করতাম। দেওয়ানি মামলাসংক্রান্ত আইন, ফৌজদারি আইন, পারিবারিক আইন, সাংবিধানিক আইন—এ বিষয়গুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আইন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এমন বই পড়তাম। আলোচিত মামলার রায়, প্রেক্ষাপট পড়েছি। নিজের মতো করে গুছিয়ে নোট করেছি।

জুডিশিয়ারি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর মনে হয়েছিল, বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তরই আমার জানা। প্রিলিতে টিকে যাওয়ায় আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। এই আত্মবিশ্বাস আমার লিখিত পরীক্ষায় কাজে দিয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে নিজস্ব মতামত দিয়েছি। আইনের বিষয়গুলোতে নিজস্ব মতামত দেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নের নম্বর অনুসারে অল্প কথায় মূল বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। লিখিত পরীক্ষায় টিকে যাওয়ায় উত্ফুল্ল ছিলাম।

মুটিং, ডিবেটিং ও শিক্ষকতার সুবাদে ভাইভা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না। ভাইভা বোর্ডে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল দেওয়ানি আইন ও ফৌজদারি আইনের পার্থক্য কী কী? রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭-ক ধারায় কী বলা আছে? ধারা ১৭-ক কত সালে সংশোধন করা হয়েছে? এটি করার সময় আর কোন কোন আইন সংশোধন করা হয়েছে? কত তারিখে সংশোধন হয়েছে? মুসলিম আইনের প্রিয়েমশন নিয়েও জানতে চেয়েছিলেন ভাইভা বোর্ডের সদস্যরা। এভাবে একটির পর একটি প্রশ্ন করেই যাচ্ছিলেন। বিনয়ের সঙ্গে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি।

কথা বলার সময় আমার হাত নড়ছিল। তাই একজন জিজ্ঞেস করলেন, এভাবে হাত নড়ে কেন, রাজনীতি করেন নাকি? আমি বলেছি, স্যার, আমি শিক্ষকতা করি। ক্লাস নেওয়ার সময় বিভিন্নভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের বোঝাতে হয়। তাই হাত নড়ানোটা অভ্যাস হয়েছে। ভয় পেয়েছিলাম। তবে তাঁরা আমার উত্তর শুনে খুশি হয়েছিলেন। জুডিশিয়ারিতে সহকারী জজ হিসেবে টেকার পর মনে হয়েছিল, আমার জীবনে আর কোনো চাওয়া নেই।


মন্তব্য