kalerkantho

সোমবার । ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৮ ফাল্গুন ১৪২৩। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিম্নকক্ষে পাস হলো ব্রেক্সিট বিল

কুদরাত-ই-খুদা বাবু    

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



নিম্নকক্ষে পাস হলো ব্রেক্সিট বিল

নাৎনা আলোচনা-সমালোচনা ও অনেক তর্ক-বিতর্ক উপেক্ষা করে অবশেষে পাস হয়ে গেল ‘ব্রেক্সিট বিল’। ৮ ফেব্রুয়ারি শত শত সংশোধনী প্রস্তাব পাশ কাটিয়ে ব্রিটিশ সংসদের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমনসে ব্রেক্সিট বিলটি পাস হয়। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে যুক্তরাজ্যের সদস্য পদ পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়ার যে পরিকল্পনা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে তুলে ধরেছেন, তা বাস্তবায়নের বাধা অনেকটাই কেটে গেল। এখন শুধু ব্রিটিশ সংসদের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের অনুমোদন পেলেই বিলটি আইনে পরিণত হবে। আর এ বিলটি আইনে পরিণত হলে তা টেরেসা মেকে পরিকল্পনামতো ইইউ জোট থেকে যুক্তরাজ্যকে বের করে নেওয়ার ক্ষমতা দেবে।

 

ব্রেক্সিট ও ব্রেক্সিট বিল কী?

২০১৬ সালের ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটে যুক্তরাজ্যের জনগণ ইইউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পক্ষে রায় দেয়। গণভোটে ইইউ থেকে সরে আসার পক্ষে ভোট দেয় ৫১.৯ শতাংশ মানুষ। গণভোটের ওই ফলের পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে যান ডেভিড ক্যামেরন। নতুন দায়িত্ব নেন কনজারভেটিভ পার্টির টেরেসা মে। নিয়মানুযায়ী ইইউ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হলে যুক্তরাজ্যকে ২০০৯ সালে প্রণীত লিসবন চুক্তির ‘অনুচ্ছেদ ৫০’-এর আওতায় আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। ওই আবেদনের দুই বছরের মধ্যে সম্পর্ক চুকিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইইউয়ের সদস্য পদ ছেড়ে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টিকে বলা হচ্ছে ব্রেক্সিট, যা ‘ব্রিটেন এক্সিট’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। অন্যদিকে ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের সরে আসার বিলটির নাম ‘ব্রেক্সিট বিল’ হলেও এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন (উইথড্রয়াল নোটিফিকেশন) বিল’। এই বিলে ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের সদস্য পদ প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে এর মধ্যেই এমপিদের অনুমোদন চেয়েছে ব্রিটিশ সরকার।

 

যেভাবে পাস হলো

সংশোধনী প্রস্তাব কিংবা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চলা তুমুল বিতর্ক—কোনো কিছুই যেন বাধা হলো না। ৮ ফেব্রুয়ারি হাউস অব কমনসে বিলটির ওপর অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত ভোটাভুটিতে ৬১৬ এমপির মধ্যে ৪৯৪ জনই বিলের পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষে ভোট দেন ১২২ জন। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ ও বিরোধী দল লেবার পার্টি এই বিলে সমর্থন দিতে নিজ নিজ এমপিদের প্রতি নির্দেশ জারি করে। সেই নির্দেশ অমান্য করে কনজারভেটিভ পার্টির একজন ও লেবার পার্টির ৫২ জন এমপি বিলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। দলীয় অবস্থানের সমালোচনা করে লেবার পার্টির ছায়া মন্ত্রিসভা থেকে মোট চারজন এমপি পদত্যাগ করেছেন। লিবারেল ডেমোক্রেটিক, স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি ও ওয়েলসের প্লাইড কামরি বিলটির বিরোধিতা করে। এর আগে প্রথম দফার ভোটাভুটিতে ব্রেক্সিট বিলের পক্ষে ভোট দেন মোট ৪৯৮ জন এমপি। নিজ দলের নির্দেশ অমান্য করে লেবার পার্টির ৪৭ জন এমপি ব্রেক্সিট বিলের বিপক্ষে ভোট দেন। আর ১১ জন ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। কনজারভেটিভ পার্টির ছয়জন ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির দুজন ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।

 

ব্রেক্সিট নিয়ে শ্বেতপত্র

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের সরকার ২ ফেব্রুয়ারি ব্রেক্সিট নিয়ে তাদের পরিকল্পনা ‘শ্বেতপত্র’ আকারে প্রকাশ করে। এর আগের দিন অবশ্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমনসে প্রথম দফার ভোটাভুটিতে ৩৮৪ ভোটের ব্যবধানে পাস হয় বিলটি। ব্রেক্সিটবিষয়ক ওই শ্বেতপত্রে বলা হয়, যুক্তরাজ্য ইইউ ত্যাগ এবং নতুন অভিবাসন ও শুল্ক আইন পাসের পর বাণিজ্য বিরোধ নিরসনের জন্য একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করবে। এতে গত জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণে উল্লেখ করা ১২টি লক্ষ্য লিখিতভাবে সন্নিবেশ করা হয়েছে। শ্বেতপত্রে আরো বলা হয়, যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের জন্য একক বাজার থেকে বেরিয়ে যাবে।

 

বিষয়টি গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত

ব্রেক্সিট বিষয়টি শুধু ব্রিটিশ পার্লামেন্টেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, গড়িয়েছে ব্রিটেনের হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। হাইকোর্ট ব্রেক্সিট নিয়ে সরকারের অবস্থানের বিপক্ষে রায় দিলে ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে সরকার। গত বছরের নভেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট ‘সরকার নয়, পার্লামেন্টকেই ব্রেক্সিট কার্যকরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে’ মর্মে রায় দিয়েছিলেন। আর হাইকোর্টের এমন রায়কেই শেষ পর্যন্ত বহাল রাখেন যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট। ব্রেক্সিট বিষয়টির সাংবিধানিক গুরুত্ব ও রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্ট ১১ জন শীর্ষ বিচারকের সমন্বয়ে বেঞ্চ গঠন করেন, যা দেশটিতে নজিরবিহীন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় শুনানি।

আপিল রায়ে আটজন বিচারক হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। সর্বশেষ গত ২৪ জানুয়ারি দেওয়া আপিল বিভাগের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ‘সরকার নির্বাহী ক্ষমতার দোহাই দিয়ে এককভাবে ব্রেক্সিট কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির সাড়া পেলেই শুধু সরকার অনুচ্ছেদ ৫০ সক্রিয় করতে পারবে। ’

 

টিউলিপের পদত্যাগ

ব্রেক্সিট ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের বিরোধী দল লেবার পার্টির ছায়া মন্ত্রিসভা (শ্যাডো ক্যাবিনেট) থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। পার্লামেন্টে সরকারের আনা ব্রেক্সিট বিলের পক্ষে সমর্থন দেওয়ার জন্য সম্প্রতি লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিনের নির্দেশ জারির পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন টিউলিপ। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হওয়া টিউলিপ শিক্ষাবিষয়ক ছায়া মন্ত্রণালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। উল্লেখ্য, টিউলিপই প্রথম কোনো সদস্য, যিনি ব্রেক্সিটের বিরোধিতা করে ছায়া মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন।

 

আদালতের রায়ে সরকারের জন্য যা কিছু স্বস্তির বিষয়

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় পার্লামেন্ট যে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, সেই প্রতিষ্ঠিত সত্যটি সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে আবারও শক্তিশালী হয়েছে। তবে এ রায়ে ব্রিটিশ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, ব্রেক্সিট কার্যকরের জন্য স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দান আয়ারল্যান্ডের অনুমোদন লাগবে না বলে জানিয়েছেন শীর্ষ আদালত। উল্লেখ্য, এই তিন সরকারই ইইউ ত্যাগের বিপক্ষে।


মন্তব্য