kalerkantho

আবরারের জন্য শোক

১৯ মার্চ। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। মেধাবী এই তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু সারা দেশের শিক্ষার্থীদের একই সঙ্গে শোকবিহ্বল ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর কিছু ছবি ও প্রিয়জনদের বেদনার অনুভূতি এখানে তুলে ধরা হলো...

২৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আবরারের জন্য শোক

আমার বাবাকে কখনো একা ছাড়তে চাইতাম না। ও বলত, আম্মু তুমি যদি আমাকে একা চলাফেরা করতে না দাও, তবে আমি ইনডিপেনডেন্ট হব কিভাবে? সবাই আমার বাবাটাকে অনেক পছন্দ করত। পরিবারের মাথার মুকুট ছিলি তুই। আমাদের একা ফেলে চলে গেলি কিভাবে? আমি কিভাবে তোকে ছাড়া থাকব? তুই একবার ফিরে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে মা বলে ডাক, বাবা।’

ফরিদা ফাতেমী


মা

এক অনুষ্ঠানে মা, বাবা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে আবরার

জীবনে অনেক কষ্টের সময় পার করেছি। ছেলেকে কবরে শুইয়ে দেওয়ার মতো কষ্ট আর কিছুর সঙ্গে মিলবে না। জীবনের সব সফলতা যেন একটি ঘটনায় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। আমার বাবাটা আর আমার কাছে আসবে না, কোনো দিন আর আমি তার মুখে বাবা ডাক শুনতে পাব না।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহমেদ চৌধুরী


বাবা

 

সবাই রক্তাক্ত আইডি কার্ডের ছবি দিচ্ছে। আমি দিলাম ফাল্গুনের খুব সুন্দর হাসি-খুশি একটি ছবি। ফাল্গুনের ক্লাসে ও বলেছিল, ‘ম্যাডাম, আমরা আগে কখনো ফাল্গুন উদ্যাপন করিনি। এবার খুব ভালো লাগছে।’

ছেলেটি আমার ছাত্র। আবরার নাম। বিইউপিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিল। বাকিদের মতো ও হয়তো হাসিমুখে বলেছিল, ‘আমি ডিপ্লোম্যাট হব।’ প্রথম বেঞ্চে বসত। স্নায়ুযুদ্ধ, উপনিবেশবাদ নিয়ে লেকচারের সময় আমার আগেই অনেক কিছু পটাপট বলে দিত। এসির রিমোট নিয়ে বসে থাকত দেখে বকাও দিয়েছিলাম। ক্লাস টেস্টের খাতা পেয়ে বলেছিল, ‘ম্যাডাম, আমি তো সব পয়েন্ট লিখেছি। আর কি লিখলে আমি দশে দশ পাব!’

আমার আজকে ৮.৩০-এ ক্লাস ছিল ওদের সঙ্গে। আমার ক্লাস করার জন্যই ও বাসা থেকে বের হয়েছিল। রাস্তা পার হওয়ার সময় ও কী ভাবছিল জানি না। কয়েক সেকেন্ড আগেও হয়তো ভাবছিল, ক্লাসে গিয়ে প্রথম বেঞ্চে বসবে। বাবা একটু দূরে দাঁড়ানো। নিজের রক্ত পানি করে লালন-পালন করা ১৮-১৯ বছরের সন্তানকে বাস চাপা দিয়ে চলে গেল। ১১টায় গিয়ে দেখলাম, জেব্রাক্রসিং রক্তে ভেজা। সবাই যখন ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে স্লোগান দিচ্ছে, ও তখন অন্য জগতে। ও হয়তো জানেও না ওর বন্ধুরা হাউমাউ করে কাঁদছে ওর জন্য। ওর বন্ধুরা একদিন ব্যাচ ট্যুরে যাবে, পাস করবে, চাকরি করবে, বৃদ্ধ হবে। আবরারের কথা মনে করলে হয়তো এই সুন্দর বাচ্চা ছেলেটির কথা স্মরণ করবে। ওর বয়স বাড়বে না। ইউক্যামে ওর নাম আর রোল ৫৯ থেকে যাবে। ওর মা-বাবা, ভাই কিভাবে এই শোক নিয়ে বাঁচবে জানি না।... ছেলেটির মৃত্যুযন্ত্রণা ভাবলে চোখের পানি আটকানো যাচ্ছে না। আমি কিভাবে ওদের ক্লাস নেব জানি না। আগামীকাল আমি বেঁচে থাকব কি না সেটাও অনিশ্চিত। মৃত্যু এই দেশে খুব সহজ, অনেক বেশি সহজ।

ফাতেমা তুজ জোহরা


শিক্ষক

ক্যাম্পাসে, বন্ধুদের সঙ্গে

মন্তব্য