kalerkantho


বিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা

স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মনে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করার এক বিশেষ প্রকল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে সক্রিয়ভাবে জড়িত। এ প্রকল্পের কথা শোনাচ্ছেন মোয়াজ্জেম আরফান

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা

স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর জন্য ২০১০ সালে একটি বিশেষ উদ্যোগ হাতে নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে চাওয়া হয় কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব। সাড়া দেন তিনি। এর ফলে শিক্ষার মান উন্নয়নবিষয়ক ‘টিচিং কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রজেক্ট (টিকিউআই-সেফ)’ প্রকল্পের অধীনে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বিজ্ঞান শেখাতে একটি উপপ্রকল্প পাস করে মন্ত্রণালয়। নাম—‘মোবাইল হ্যান্ডস অন সায়েন্স এক্সিবিশন ফর স্কুল স্টুডেন্টস।’ প্রকল্পটির দায়িত্ব নেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এরপর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫টি বিভাগের নোটিশ বোর্ডে তাঁর পক্ষে টাঙানো হয় নোটিশ। আর তা দেখে তাঁরই বিভাগের শহীদুল ইসলাম সুমন, মো. রুহুল আমিন সজীব, আবু নাছের বিকাশ, আয়েশা তাসনিমসহ জনাত্রিশেক ছাত্র-ছাত্রী দেখা করেন প্রিয় এই শিক্ষকের সঙ্গে। আলাপ-আলোচনা শেষে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন ১৫ জন। একদিন ক্লাস শেষে ড. জাফর ইকবাল আসেন শিক্ষাভবন ‘এ’তে। সঙ্গে নিয়ে আসেন নানা ধরনের পরীক্ষামূলক শিক্ষা উপকরণ। এর মধ্যে ছিল মানুষের কঙ্কাল, অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান, বিজ্ঞানের কৌণিক ভরবেগ, ঘূর্ণনের গতিবেগ, মাধ্যাকর্ষণের ভরকেন্দ্র, ওজন বস্তু, মানবদেহের অস্থি সংযোজন, এসিড ক্ষারকের উপস্থিতি পরীক্ষা, চুম্বক দিয়ে দিক নির্ণয়, লাইনফলোয়ার অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে ছোট জিনিসকে বড় করে দেখা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিস্কোপ তৈরি, গোলাকার বলকে বাতাস দিয়ে শূন্যে আটকে রাখার পরীক্ষণ সামগ্রী ইত্যাদি। শিক্ষার্থীদের তিনি বলেন, ‘আমরা আরো পরীক্ষণ সামগ্রী তৈরি করব। আমাদের দেহ ও প্রতিদিনের চেনা পৃথিবীর এই উপকরণগুলো দেখে কিশোর-কিশোরীরা বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হবে বলে আমার বিশ্বাস।’ এরপর সভার মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য তাঁরা সবাই মিলে সিলেটের বিভিন্ন স্কুলে হাজির হবেন। সেখানে এই বিজ্ঞান উপকরণগুলোর প্রদর্শন করা হবে। উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের নানা প্রশ্নের জবাব দেবেন তাঁরা। থাকবে কুইজেরও ব্যবস্থা। পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে বিজ্ঞান ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই। অসাধারণ এই উদ্যোগের নাম ড. জাফর ইকবাল নিজেই দিয়েছেন ‘বিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা।’ কাজের সুবিধার জন্য ফুয়াদ বিন নাছিরকে আহ্বায়ক নির্বাচন করে একটি কমিটিও গঠন করে দিয়েছেন তিনি। উপদেষ্টা কমিটিতে রয়েছেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ড. ইয়াসমীন হক, রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুস, সিএসই বিভাগের প্রভাষক মেহেদী হাসান নাহিদ, সৃজনশীল ডাটাবেজ প্রকল্পের উদ্ভাবক মানস কান্তি বিশ্বাস এবং ট্রিপল-ই বিভাগের প্রভাষক রিতেস্বর তালুকদার। তাঁরা সংগঠনকে আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহের ব্যবস্থা করে দেন। তাঁদের সঙ্গে শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, সিলেটের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক ও নানা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিরা।

ফুয়াদের এখনো মনে আছে, ২০১১ সালের ১৬ এপ্রিল সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার এমসি একাডেমি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিজেদের তৈরি উপকরণগুলো নিয়ে চলে গিয়েছিলেন তাঁরা। ঢাকা থেকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর থেকে এর কার্যক্রম এখনো এগিয়ে চলেছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৫০টি স্কুলে বিভিন্ন পরীক্ষণ প্রদর্শন, সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন, ২২টি মিনি অলিম্পিয়াড আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে ‘বিজ্ঞানের জন্য ভালোবাসা’। এ ছাড়া ‘আমাদের জার্নাল’ শিরোনামে প্রকাশ করেছে দুটি দেয়ালিকা। তাতে প্রকাশ পেয়েছে ৩৪ জন শিক্ষার্থীর বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা।

শুক্র ও শনিবার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এ রকম ছুটির দিনগুলো অনেক শিক্ষার্থী আরাম-আয়েশে কাটালেও, বিজ্ঞানভিত্তিক এই ব্যতিক্রমী সংগঠনটির সদস্যরা নিজেদের ব্যস্ত রাখেন নানা কাজে। বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে তাঁরা হাজির হন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সামনে। সংগঠনটির সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী ফরিহা জারিন জানান, ‘স্কুলপর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বইয়ের বাইরে বিজ্ঞানের ব্যাবহারিক চর্চা করার সুযোগ খুব একটা পায় না। তাই সারা দেশে বিজ্ঞানচর্চা ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যেতে চাই আমরা।’ সংগঠনের বর্তমান সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র মুহম্মদ ইব্রাহিম ফাহাদ জানান, ‘শিক্ষার্থীদের মন থেকে বিজ্ঞানভীতি দূর করে দৈনন্দিন ও পাঠ্য বিজ্ঞানে তাদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সিলেটের বাইরেও এ সংগঠনকে আমরা ছড়িয়ে দিতে চাই।’ আর সে জন্য আগ্রহীরা করতে পারেন মেইল (loveforscience.sust@gmail.com) কিংবা ঢু মারতে পারেন ফেসবুক পেজে (www.facebook.com/bigganerjonnovalobasha)| আরো জানা যায়, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের নির্দেশনায় ‘আমাদের জার্নাল’ (www.amaderjournal.com) শিরোনামে একটি অনলাইন মাসিক জার্নাল প্রকাশিত হচ্ছে। তাতে শিক্ষার্থীদের প্রতি এক খোলা চিঠিতে ড. জাফর ইকবাল লিখেছেন, ‘তোমরা যারা ছোট, তোমাদের যাদের বিজ্ঞান নিয়ে অনেক আগ্রহ, অনেক কৌতূহল, তোমাদের যাদের মাথার মাঝে অনেক আইডিয়া কিলবিল করে, কিছু করার জন্য হাত নিশপিশ করছে, তাদের জন্য এই জার্নাল! ছোটরা বিজ্ঞানের গবেষণা করতে পারে না—কে বলেছে? নিশ্চয়ই পারে। তাদের গবষেণা, তাদের আবিষ্কার এই জার্নালে পাঠানো হলে যাচাই-বাছাই করে এখানে ছাপানো হবে।’

এখানে লেখা পাঠানোর নিয়ম জানা গেল জার্নালটির সম্পাদনা পর্ষদের সদস্য মেহেদী হাসান নাহিদের কাছ থেকে। সে জন্য http://amaderjournal.com/ public/papersubmit/add ওয়েবলিংকে লগ-ইন করে, শুধু doc/docx ফরমেটের ফাইল আপলোড করতে হবে। সঙ্গে লিখে দিতে হবে নিজের নাম, বিদ্যালয়ের নাম, অধ্যয়নরত শ্রেণি, জন্ম তারিখ এবং সম্ভব হলে নিজের কিংবা অভিভাবকের মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা।



মন্তব্য