kalerkantho


ইবনুলের পথচলা

সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় হয়েছে সেরা। কুইজ, জীববিজ্ঞান ও গণিত অলিম্পিয়াড, রচনা প্রতিযোগিতায়ও রয়েছে ঝুলিভর্তি পুরস্কার। ইবনুল মুহ্তাদি শাহর গল্পটা জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

১৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০




ইবনুলের পথচলা

ইবনুল স্কুলের বাইরে প্রথম কোনো বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়। বিভাগীয় শহর সিলেটে হবে ভাষা প্রতিযোগ। যদিও সে খুব বইয়ের পোকা, তবে একরকম বেড়ানোর জন্যই সিলেটে যাওয়া। ভাষা প্রতিযোগের পরীক্ষাটা খুবই ভালো হলো তার। কিন্তু এত বড় বড় স্কুলের ভালো ভালো ছাত্রের মধ্যে পুরস্কার পাওয়ার বিন্দুমাত্র আশাও ছিল না। পুরস্কার দেওয়ার সময় নাম ডাকা হয়ে যাচ্ছে, সে নিশ্চিন্তে বসে আছে। ‘‘ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে ফেলছি, এমন সময় আব্বু হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘যাও, যাও, তোমার নাম ডেকেছে!’ স্টেজে উঠে দেখি শুধু নামই ডাকেনি, আমি হয়ে গেছি সেরাদের সেরা! ওটাই ছিল আমার প্রথম কোনো বড় পুরস্কার। এর পর থেকে জাতীয় পর্যায়ে অনেক পুরস্কারই পেয়েছি।’’ জানাল ইবনুল। মা-বাবা দুজনই শিক্ষকতা করেন। তাঁদের আগ্রহে অনেক ছোটবেলায়ই গান, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কনের ক্লাসে ভর্তি হয়েছিল সে। কিন্তু খুবই লাজুক হওয়ায় কোথাও বেশিদিন টেকেনি, কোনো কিছু ঠিকমতো শেখা হয়নি। বেশি মানুষ দেখলেই ভয় পেয়ে কান্নাজুড়ে দিত। তবে ছোটবেলায় তার সবচেয়ে বড় বিচরণক্ষেত্র ছিল স্কুলের মিলাদ অনুষ্ঠান। ‘স্কুলের মিলাদে গজল আর কেরাতে প্রতিবারই পুরস্কার পেতাম।’ বলল ইবনুল। ২০১৩ সালে দি ফ্লাওয়ার্স কেজি অ্যান্ড হাই স্কুল, মৌলভীবাজারে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় স্কুলে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ নামের একটি নতুন প্রতিযোগিতার চিঠি এলো। মাত্র ১২ জন শিক্ষার্থী পাবে জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার। প্রতিযোগিতাটির কথা শুনে অংশগ্রহণের জন্য বেশ উৎসাহী ছিল ইবনুল। স্কুল থেকে তার নামও দেওয়া হলো ‘ভাষা ও সাহিত্য’ বিভাগে। উপজেলা পর্যায়ে প্রথমেই লিখতে হয় বাংলা ও ইংরেজি রচনা। লেখালেখি তার খুবই ভালো লাগত। তাই রচনা দুটি বেশ চমত্কারভাবে উপস্থাপন করেছিল। এরপর জানতে পারে সবাইকে নাকি বাংলা আর ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতে হবে। ‘এ কথা শুনে তো আমার পেটের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। বাংলা বক্তৃতাই দিতে পারি না ঠিকমতো, আবার ইংরেজি! সুতরাং এক ছুটে চলে গেলাম বাসায়। গিয়ে ধরলাম মাথা ব্যথার ভান। এদিকে আব্বুর কাছে ক্রমাগত ফোন যাচ্ছে। আমি নাকি দুটি রচনায়ই সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছি। কিন্তু আমাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সেইবার পালিয়ে আসার জন্য মা-বাবার কাছে খুব ঝাড়ি খেয়েছিলাম।’ জানাল ইবনুল। তার পর থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা প্র্যাকটিস করত আর অন্যের বক্তৃতা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে একসময় নিজেই ভালো বক্তৃতা দিতে শুরু করল। লেখালেখির প্রতি আগ্রহটা তো ছিলই। তাই যে প্রতিযোগিতা থেকে একরকম পালিয়েই এসেছিল ইবনুল, ঠিক দুই বছর পর সে প্রতিযোগিতায়ই সারা দেশে প্রথম হয়ে যায়। সৃজনশীল মেধা অন্বেষণে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ায় সরকারিভাবে থাইল্যান্ডে সফরের সুযোগ পায়। গণিত-বিজ্ঞানের প্রতি কৌতূহল থেকেই নিয়মিত অংশ নেয় বিভিন্ন অলিম্পিয়াড ও প্রতিযোগিতায়। ‘একসময় আমি কোনো প্রতিযোগিতায়ই যেতে চাইতাম না, পরে দেখা গেল পুরো স্কুল থেকে আমি একাই অংশ নিচ্ছি, একাই পুরস্কার পাচ্ছি।’ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ফলে জুটে যায় অনেক বন্ধু। স্কুলে থাকতে স্কাউটিং করেছে নিয়মিত, ক্যাম্পে তাঁবু জলসায়, আড্ডায়, পরিচিতি পেয়ে যায় গায়ক হিসেবে। বন্ধুরা মিলে একত্র হলেই গলা খুলে গাওয়া শুরু হয়ে যেত।

পড়ালেখায়ও কিন্তু ভালো সে। মৌলভীবাজারের দি ফ্লাওয়ার্স কেজি অ্যান্ড হাই স্কুল থেকে এবার এসএসসি পাস করেছে গোল্ডেন জিপিএ ৫ সহ।

ইবনুল ভালোবাসে বই পড়তে। ইবনুল বলে, ‘সুযোগ পেলেই বই কিনে ফেলি। গল্পের বই, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, গোয়েন্দা কাহিনি দিয়ে শুরু করলেও ইদানীং বিজ্ঞানের বই ও নন-ফিকশন ভালো লাগে। বই পড়ায় আমার কোনো ক্লান্তি নেই।’ ক্লাস ফোর থেকে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সদস্য। বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন কোনো কিছুই পড়তে খারাপ লাগে না।

বড় হয়ে সবার আগে একজন আলোকিত মানুষ হতে চায় ইবনুল। তার স্বপ্ন একজন শিক্ষক ও গবেষক হওয়ার। বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতার পাশাপাশি সারা বিশ্বে বাংলা ভাষাকে ছড়িয়ে দিতে চায়। ‘যে গাড়িটা (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি) আমার মধ্যে সবার আগে জ্ঞানের পিপাসা জাগিয়ে দিয়েছিল, সেই বইভর্তি ভ্রাম্যমাণ গাড়িটা আমার অনেক বড় অনুপ্রেরণা। এমন কোনো উদ্যোগ নিয়েই পুরো সমাজটাকে বদলে দিতে চাই। আর এমন একটা সমাজ গড়তে চাই, যেখানে আছে শুধু সম্প্রীতি ও ভালোবাসা।’

 

ইবনুলের যত পুরস্কার

২০১৫ সালে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে নিম্ন মাধ্যমিক ক্যাটাগরিতে জাতীয় পর্যায়ের সেরা মেধাবী।

২০১৫ ও ২০১৬ সালে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক-প্রথম আলো গণিত উৎসবের আঞ্চলিক পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন।

২০১৬ ও ২০১৭ সালে জাতীয় হাই স্কুল প্রগ্রামিং প্রতিযোগিতার আঞ্চলিক পর্যায়ে কুইজ বিভাগের বিজয়ী।

দুদক আয়োজিত দুর্নীতি প্রতিরোধবিষয়ক বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০১৬-তে বিভাগীয় পর্যায়ে রানার-আপ।

২০১৬ সালে এইচএসবিসি প্রথম আলো ভাষা প্রতিযোগে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম।

২০১৮ সালে একই প্রতিযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয়।

২০১৬ সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক গল্প বলায় দ্বিতীয়।

২০১৭ সালে সালে জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় উপস্থিত বক্তৃতায় বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয়।

২০১৭ সালে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণে বিভাগীয় পর্যায়ে ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে প্রথম।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আয়োজিত কুইজ প্রতিযোগিতায় জেলাপর্যায়ে দ্বিতীয়।

জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৭-তে জেলাপর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী নির্বাচিত।

২০১৮ সালে জাতীয় জীববিজ্ঞান ক্যাম্পে অংশগ্রহণ।

২০১৮ সালে জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন।

এ ছাড়া উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন রচনা লেখা ও কুইজ প্রতিযোগিতায় রয়েছে অনেক পুরস্কার।



মন্তব্য