kalerkantho


‘জয়নাল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

লেখা : আবদুল্লাহ আল মনসুর, জিয়াউল ইসলাম ও মীর হুযাইফা আল মামদূহ   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘জয়নাল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

ছবি : কাকলী প্রধান

১৯৯৪ সাল, ডিসেম্বর মাস। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই (কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের অফিস সহকারী জয়নাল আবেদিন হঠাৎ শুনলেন, আমেরিকা থেকে পাস এক অধ্যাপক তাঁর বিভাগে যোগ দেবেন। দেড় বছর বয়সী বিভাগটির হাল ধরবেন। ভদ্রলোকের নাম মুহম্মদ জাফর ইকবাল। ৪ ডিসেম্বর তিনি যোগদান করলেন। বিভাগে এসেই তিনি ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান এ বি এম হুমায়ুন কবীরের রুমে গেলেন। কিছুক্ষণ তাঁরা নানা বিষয়ে আলাপ করলেন। বাইরে এসে তাঁকে বললেন, ‘ল্যাবটি আমি দেখব।’ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সংকটের পরও গোছানো গবেষণাগার দেখেই চওড়া গোঁফের আড়ালে তাঁর মুচকি হাসি ফুটে উঠল। জয়নাল হাঁফ ছাড়লেন, যাক পছন্দ হয়েছে! সেদিনই বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারো সঙ্গেই আমেরিকাফেরত এই বিদ্বান তাঁর জ্ঞানের গরিমা দেখাননি। অহংকার ফুটে ওঠেনি কোনো কথাতেই, মাটির মানুষটিকে ভালো লাগল সবার। এর পর থেকে অফিস সহকারী হিসেবে বিভাগীয় প্রধানের রুমে প্রতিদিনই তাঁর যাওয়া শুরু হলো। একটি কটু কথাও তিনি বলেছেন মনে করতে পারেন না তিনি।

শিক্ষক হিসেবেও মানুষটি নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর ছাত্র তানভীর আহমেদ বললেন, “পাঁচ বছর হলেও স্যারের প্রথম ক্লাসের কথা আমার মনে আছে। তিনি এসে সবাইকে বললেন, ‘তোমরা তোমাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন, জীবনের হতাশা নিজ নিজ খাতায় লেখো। আমি ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলাম বলে সবার খাতা নিয়ে স্যারের রুমে জমা দিয়েছি। মুচকি হেসে বললেন, ‘কী, সবার লেখা শেষ? তোমরা তো ভালোই সময় নিলে, ভেবেচিন্তেই লিখেছ। রেখে যাও। পরশু তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে।’ তার পর থেকে আমাদের ‘ডিসক্রিট ম্যাথমেটিকস’ কোর্সটি পড়ানো শুরু করলেন। প্রতিবছরই কোর্সটি পড়ান। এত ভালো পড়ান যে আমাদের সব ছাত্র-ছাত্রীরই মনে হয় এই কোর্স পড়ানোর জন্য তিনিই সেরা।”

তাঁর কাছে যেকোনো ছাত্র বা ছাত্রীর দ্বার অবারিত। দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা নিজের রুমে বসে বিভাগ ও ছাত্র-ছাত্রীদের নানা সমস্যার সমাধান দেন। লেখালেখির ব্যস্ততার ফাঁকে সারা দেশের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে কম্পিউটার শিক্ষা, গণিত, বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বছর দু-একের মধ্যে তাঁর প্রচেষ্টায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে কম্পিউটার সায়েন্সের একটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা হয়। সিএসইর তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আনোয়ার হোসেন বলে ফেললেন, ‘তিনি আমাদের চারটি কোর্স নিয়েছেন। এত সুন্দর করে পড়িয়েছেন যে ভুলতেই পারি না।’ তাঁর পড়ানো, কথা শুনতে অন্য বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরাও তাঁর ক্লাস করতে আসে। তিনি শুধু বিষয়ভিত্তিক পাঠদানই করেন না, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলেন, তাঁদের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করেন, গবেষণার দিকে ঝোঁক তৈরি করেন। ফলে মা-বাবাকেও বলতে পারেন না—এমন অনেক ঘটনা তাঁকে নির্ভয়ে বলতে আসে অনেক শিক্ষার্থী। তিনি সব শোনেন, পরামর্শ দেন। মানুষটির আরেকটি গুণ—ধৈর্য। কখনোই কোনো ছাত্র বা ছাত্রী বা কাউকেই নির্দেশ দিয়ে কিছু বলেন না। ফলে তারা তাঁকে আরো আপন ভাবে।

সহকর্মীদের সঙ্গেও খুব আন্তরিক তিনি। সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের মনে আছে, ২০১৩ সালে অধ্যাপনায় যোগদানের দিনই তিনি সকালে তাঁর কক্ষে এসে হাজির হলেন। বললেন, ‘আজ থেকে তুমি আমার ছাত্র নও, সহকর্মী। যেকোনো সাহায্যে ডাকবে, আসব।’ নবীন শিক্ষকটির জন্য সেদিন তাঁর একটিই উপদেশ ছিল—‘ক্লাসে এমনভাবে পড়াবে যাতে ছাত্রছাত্রীরা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে পারে। পড়ানোর পাশাপাশি তাদের ভালো মানুষ হওয়ার পাঠ দেবে, যাতে জীবনের প্রয়োজনীয় সব শিক্ষাই লাভ করতে পারে।’ এই বিভাগের প্রতিটি শিক্ষকই তাঁর ছাত্র কী ছাত্রী হলেও তিনি সবাইকে শিক্ষকের মর্যাদাই দিয়েছেন। কখনোই আদেশ করেননি, অনুরোধ করে বিভাগের উন্নয়নে কাজ করিয়েছেন। অন্যতম সিনিয়র শিক্ষক হয়েও সপ্তাহে অন্তত ৩০ ঘণ্টা ক্লাস নেন। প্রয়োজনে দুপুরের খাবারের বিরতিতেও তাঁকে ছাত্র পড়াতে দেখা যায়। প্রতিদিন সকাল ৯টায় এক কাপ কফি হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চিরচেনা ভঙ্গিতে ক্যাম্পাসে আসেন। দেরি করে ক্লাসে আসার রেকর্ড তাঁর নেই। ঠিক সময়ে তাঁকে ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অন্য সহকর্মীরা বোঝেন, তাঁদের প্রিয় শিক্ষক জানিয়ে দিচ্ছেন, আপনার সময় শেষ। ঘড়ির কাঁটা ধরে তিনি ক্লাস থেকে বেরিয়ে যান। সিএসই, ইইই (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং), সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, অনুরোধে পদার্থবিদ্যার ক্লাস নিয়েও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানকে উন্নত করেন। কোনো কারণে ক্লাস নিতে না পারলে হাতে লিখে নোটিশ বোর্ডে ক্লাস না হওয়ার নোটিশ টাঙিয়ে দেন। উৎসাহদাতা হিসেবে তাঁর তুলনা নেই। যেকোনো ছাত্রছাত্রী প্রকল্পের আইডিয়া নিয়ে গেলেই হলো, সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ‘ভালো পরিকল্পনা।’ দেখা হলে জানতে চান, কাজ কত দূর? পড়ালেখা, গবেষণার বিষয়ে তিনি অজুহাত শুনতে নারাজ—‘কতটুকু পেরেছ, কতটুকু পারনি বল। পড়া বা গবেষণা শেষ করতে আমাকে কী করতে হবে বল।’ প্রয়োজনে নিজের পকেট থেকেও গবেষণার জন্য টাকা দিতে দ্বিধা করেন না। তাঁর টাকায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের অনেক প্রকল্প তৈরি হয়েছে। বিখ্যাত মানুষটির সঙ্গে পথশিশুরাও গিয়ে কথা বলে। তিনি কাউকেই জানান না, তাদের সাহায্য করেন। জয়নাল আবেদিন প্রতি জানুয়ারিতে তাঁর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের ২০ জন দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীকে স্কুল-কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন।

ঢাকা কিংবা সিলেটের বাসা নয়, মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রিয় স্থান তাঁর গবেষণাগার ও বিভাগ। নিয়মিতই দেশ-বিদেশের নানা জায়গা থেকে অনেকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসে। তিনি তাদের সঙ্গে আলাপের পর অনুরোধ করেন, ‘আমাদের শহীদ মিনার ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার ঘুরে দেখুন।’ জীবনটি তো মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তরুণদের মমত্ব ও সচেতনতা বাড়ানো, ছাত্র-ছাত্রীদের মানুষের মতো মানুষ হওয়ার শিক্ষাদান, গবেষণা ও লেখায় কাটিয়ে দিচ্ছেন তিনি। কোনো মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে দেখা হলেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। এ দেশের যে তাঁদের প্রতি অনেক ঋণ। ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণদের মধ্যে মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে স্ত্রী ও এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই অধ্যাপক ইয়াসমিন হকের সাহায্যে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দুই হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ ‘মুক্তিযুদ্ধ কর্নার’ তৈরি করেছেন। সে কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়েছে। মুুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের মুখ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তিনি তরুণদের জানান। প্রায়ই তাঁর উদ্যোগে এই কার্যক্রম হয়। সব সেরে রাতে লিখতে বসেন। লেখালেখি শেষে ২টায় ঘুমাতে যান। সকাল থেকে ব্যস্ততা তাঁকে ঘিরে ধরে। বিজ্ঞানকে ছড়িয়ে দেওয়ার আন্দোলন, মুক্তবুদ্ধির চর্চার কারণেই বারবার হুমকির মুখে পড়েছেন। তবে কখনো এসব হুমকিকে গুরুত্ব দেননি। তিনি মনে করেন, কেউ তাঁকে মারবে না। কারণ তিনি তো সবাইকে ভালোবেসেছেন। বছরখানেক আগে সর্বশেষ হুমকিতেও থানায় জিডি (জেনারেল ডায়েরি) করাতে তাঁকে রাজি করানো যাচ্ছিল না। পরে নানাজনের অনুরোধ, পরিস্থিতি দেখে বাধ্য হয়ে জিডি করেছেন। তখন থেকে দুজন গানম্যান তাঁর সঙ্গে থাকেন। তবে তিনি তাঁদের মেনে নিতে পারেননি।

এক বন্ধের দিনে, সবাই যখন ঘুরে বেড়াচ্ছে, পরিবারকে সময় দিচ্ছেন, তিনি তাঁর বিভাগের অনুষ্ঠানে চলে এলেন। সেখানেই তাঁকে আঘাত করা হলো! জ্ঞান ফেরার পর এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে তিনি দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জয়নাল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ জয়নাল আবেদিনের চোখে জল, ‘স্যার, ঢাকার সিএমএইচে যাচ্ছি।’



মন্তব্য