kalerkantho


দুই বইপোকার গল্প

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুই বইপোকার গল্প

ফেসবুক, ইউটিউবের ভার্চুয়াল যুগে কাগজের রঙিন মলাটের গল্পের বই অনেকটাই কোণঠাসা। তবে এখনো অনেক স্কুল পড়ুয়ার গল্পের বই না হলে চলেই না। পড়ে ফেলেছে হাজারের বেশি বই। এমনই দুজনের গল্প শোনাচ্ছে নাঈম সিনহা ও আফরা নাওমী

 

মাহির টয়লেটেও বই

মতিঝিল মডেল স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল্লাহ আল আনাজ মাহির বাসার টয়লেটে গেলেই বুঝবে কেমন বই পোকা সে। সারি সারি বই সাজানো সেখানে।

মাহির বই পড়ার আগ্রহের শুরু পারিবারিকভাবেই। ছেলেবেলায় নানা-নানির মুখে গল্প শোনা। এরপর মায়ের কিনে দেওয়া মোল্লা নাসিরুদ্দীনের কাহিনি দিয়ে আরম্ভ। সেটা অবশ্য অনেক দিন আগের কথা। তখন মাহি মাত্র নিজে নিজে পড়তে শিখেছে।

ইতিমধ্যে সে পড়েছে শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হকের কিশোর উপন্যাস-গল্প সমগ্র। আরো পড়েছে তিন গোয়েন্দা, দস্যু বনহুর সিরিজ, হিমু-মিসির আলী। খুদে পণ্ডিতের ভাষ্য। এর অনেক বই-ই সে পড়ে শেষ করেছে পঞ্চম শ্রেণিতে থাকতেই। আর বাসার বুক সেলফে রাখা এই বইগুলো একবার নয়, বারবার পড়েছে।

বিদেশি বইয়ের মধ্যে জুলভার্নের কল্পকাহিনিগুলো তার খুব প্রিয়। তার পড়া অনুবাদ বইগুলোর মধ্যে বেশি পছন্দ আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ, টম সয়ার, আ টেল অব টু সিটিস, ফ্রাংকেনস্টাইন। শার্লক হোমসের বইগুলোও ভালো লাগে।

মাহির প্রিয় বইগুলোর একটি মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘গ্রামের নাম কাঁকনডুবি’। তিন গোয়েন্দা সিরিজের বইগুলোও ভারি পছন্দ। কমিকসও আছে পছন্দের শর্ট লিস্টে।

মাহির বই পড়ার তালিকা প্রায়ই বয়সের ফ্রেম ডিঙিয়ে গেছে। একদিন মাহি তার পড়ার মতো বাসায় নতুন কোনো বই খুঁজে পাচ্ছিল না। তখন বড় বোনের কেনা হুমায়ূন আহমেদের দেয়াল বইটি নজরে পড়ে। কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে পড়া শুরু করে দেয়। বইটা শেষ করে তবেই স্বস্তি। এরপর জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’, আনিসুল হকের ‘প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে’ কিংবা ‘মা’র মতো বেশ কিছু চমৎকার বই পড়েছে। মাহির বিশেষ পছন্দ ‘হিমুর মধ্যদুপুর’।

মাহির নানা মাঝেমধ্যে টয়লেটে পত্রিকা পড়তে নিয়ে সেখানেই রেখে আসতেন। তাই দেখে মাহি টয়লেটে বই পড়া ও রেখে দেওয়া শুরু করে। মাহির টয়লেটের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে, সামনে সেখানেও ছোটখাটো একটা লাইব্রেরি হয়ে যাবে।

প্রতিবছর একুশে বইমেলায় দুই থেকে তিনবার যাওয়া চাই তার। ফেরা হয় ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে। মাহি জানায়, এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না।

প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা বই নিয়েই থাকে মাহি। মাহির কাছে সবচেয়ে বিরক্তির সময়, যখন সে পড়ার জন্য নতুন কোনো বই খুঁজে না পায়, কিংবা বাড়িতে রাখা সব বই পড়া শেষ হয়ে যায়। বেড়াতে গেলে বই তার সঙ্গী হয়।

বই পড়া পড়াশোনায় কোনো ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে কি না জানতে চাইলে সে জানায়, ‘এটা বরং আমার পড়াশোনায় সাহায্য করে। যখন পরীক্ষায় কোনো রচনা লিখতে দেয়, তখন আমার পড়া বইগুলো সেখানে কাজে লাগাতে পারি। এতে আমার সাধারণ জ্ঞানও বাড়ছে, এ ছাড়া বিজ্ঞানের নানা তথ্য আমি বই পড়া থেকেই সংগ্রহ করছি।’

সাইক্লিং, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি, খেলাধুলাতেও মাহির আগ্রহ। তবে ইদানীং মোটা কাচের ফ্রেমের চশমা পরা মাহি কারাতে শিখছে আর মোবাইল ক্যামেরায় ফটোগ্রাফি করছে। ঘরের কাজেও সে বেশ পটু। নিজের নাশতা নিজেই বানাতে পারে। রুটি ভাজা, ডিম ভাজা কিংবা হরলিকস নিজেই করে খায়। এ ছাড়া মাহি পাখিও পোষে। তার আছে চারটি করে কোয়েল ও বাজরিগার পাখি।

গোয়েন্দা কাহিনির ভক্ত আনুশকা

দিন নেই রাত নেই, শুধু বই আর বই। গোটা জগৎ একদিকে, বই একদিকে। বই পড়ার এত শখ কিভাবে হলো জানতে চাইলাম হলিক্রস স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী আনুশকা আরিয়ানার কাছে। জানাল, আগে প্রচুর টিভি দেখা হতো। যে-ই বড় ভাইয়ের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হলো, অমনি মা-বাবা ডিশের লাইন দিলেন কেটে। এখন কী করবে  ছোট্ট আনুশকা? বই পড়েই অবসর কাটানোর ব্যবস্থা করল। অবশ্য ছোট থেকেই হাতের কাছে যা থাকে তা-ই পড়া হয়।

মোটা মোটা বই নিমেষেই শেষ করে ফেলে এখন। বিভিন্ন লেখকের বই সংগ্রহ করতেও ভালোবাসে। এর মধ্যে আছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের রোমাঞ্চকর সব বই, রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু সমগ্র, সমরেশ মজুমদারের অর্জুন সমগ্র।  সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার সব কটা কাহিনি পড়ে ফেলেছে। তালিকায় রয়েছে শার্লক হোমসও। গোয়েন্দা কাহিনি আর অ্যাডভেঞ্চারের বই তার ভীষণ প্রিয়। তাই গোয়েন্দা কাহিনির গন্ধ পেলেই হলো, সেটাই তার চাই!

তাই বলে কবিতায় অরুচি নেই। পড়া হয় জীবনানন্দ দাশ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, শামসুর রাহমানের কবিতা। জহির রায়হান, হুমায়ূন আহমেদ, আলী ইমাম, আনিসুল হক, সুমন্ত আসলাম—কার বই পড়েনি। রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প, শরৎ চন্দ্রের উপন্যাসও ভালো লাগে তার। পুরনো বা আগের লেখকদের বই পড়তেই বেশি পছন্দ করে। ‘তাঁদের লেখায় এক ধরনের জাদু আছে। সহজেই আকৃষ্ট করে ও টানতে থাকে।’ বলল আনুশকা। 

প্রত্যেক বছর চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করে বইমেলার। তিন-চারবার যাওয়া হয় বইমেলায় আর অনেক অনেক বই কেনে। একটা বই পড়া শুরু করলে সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই। সময়জ্ঞান থাকে না, নাওয়া-খাওয়া ভুলে শুধু বই-ই পড়ে। আনুশকার প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গয়নার বাক্স আর জাফর ইকবালের অবনী তার সবচেয়ে প্রিয় গল্পের বই।  ইংরেজি গল্পের বইও পড়ে আনুশকা।

বই পড়ার শখ থেকেই সদস্য হয় ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’-এর। সারা বছর টাকা জমায় বই কেনার জন্য। আনুশকার মা বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজনরা যে ঈদি দেয়, সে টাকাও জমিয়ে রাখে আমার কাছে, বই কেনার জন্য।’

আনুশকা মা-বাবার সঙ্গে ঘুরেছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মিসর, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায়। এ ছাড়া রাঙামাটি, কক্সবাজার, কুয়াকাটায় বেড়িয়েছে। সবখানেই তার সঙ্গী বই। বই নিতে না পারলেও থাকে ট্যাব আর তাতে জমা করে রেখেছে অসংখ্য পিডিএফ। বেড়ানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশে বই পড়তে খুব আনন্দ পায়।

পিএসসিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। জেএসসিতে ছিল এ প্লাস। বিজ্ঞানের ছাত্রী হলেও প্রিয় বিষয় বাংলা। এর মধ্যে আবার বাংলার ব্যাকরণই বেশি ভালো লাগে! তিন বছর গান শিখেছে ছায়ানটে। বই পড়ার পাশাপাশি দৈনিক সংবাদপত্রও পড়ে। বই পড়ে যেমন নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে, পত্রিকা পড়েও অনেক অজানা বিষয় জানতে পারে। অবসরে বিভিন্ন টিভি সিরিজও দেখে। স্কুলের পরীক্ষা চলার সময়গুলো সে অনেক কষ্টে কাটায়। অপেক্ষায় থাকে কবে পরীক্ষা শেষ হবে আর একটা একটা করে বই পড়া শুরু করবে। আনুশকার বাবা চান, বড় হয়ে মেয়ে ডাক্তার হবে। মায়ের কথা, ও যা হতে চায় তা-ই হবে, কোনো বাধা নেই। আনুশকা নিজে এখনো ঠিক করেনি কী হবে বড় হয়ে। কিন্তু এইটুকু ঠিক করে রেখেছে জীবনে যা-ই হোক, যা-ই করুক বই সব সময় তার সঙ্গে থাকবে।


মন্তব্য