kalerkantho


ইংরেজি শিখতে কোনটা জরুরি?

ইংরেজিতে জিপিএ ৫ পাচ্ছে বিস্তর ছেলে-মেয়ে। কিন্তু এদের অনেকেই কয়েক লাইন ইংরেজিও বলতে পারে না। গলদটা কোথায়? এর সমাধানই বা কী! এ নিয়ে আড্ডায় মেতেছিল চট্টগ্রামের চার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চার শিক্ষার্থী। সঞ্চালনায় ছিলেন আরাফাত বিন হাসান

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইংরেজি শিখতে কোনটা জরুরি?

আড্ডায় চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী সৈয়দ জাফরুল হাসান শান্ত, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ফয়সাল মুহাম্মদ চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম কলেজের একাদশ শ্রেণির মোহাম্মদ ইজতিহাদ আবতাহী। [আড্ডায় থাকলেও ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির মিজবাহ মাহবুবা মিনহা ছবিতে নেই] ছবি. দিব্যজিৎ বড়ুয়া

শান্ত : আমাদের মাতৃভাষা না হলেও ইংরেজিতে বাড়তি দক্ষতা দরকার। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ইংরেজি শেখায় যথেষ্ট সহায়ক নয়।

আরাফাত : ক্লাসে তো অনেক কিছুই পড়তে হয়। ইংরেজি যা শেখানো হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম।

ফয়সাল : আসলেই তা-ই। দেখা যায়, স্কুল-কলেজপর্যায়ের ইংরেজিতে কয়েকটা অনুচ্ছেদ থাকে, স্যার সেগুলো ক্লাসে পড়ান। শব্দার্থগুলো বলে দেন। এভাবে আমরা ক্লাসের পড়া শিখতে পারি ঠিকই, কিন্তু ভালো ইংরেজি বলা শিখি না।

মিনহা : শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষায় বেশি নম্বর নিশ্চিত করতে চান। ফলে গ্রামারের দিকে জোর দেন। গ্রামারের খুঁটিনাটি শেখান। আমরা হয়তো ভালো ব্যাকরণ শিখি, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাই; কিন্তু ইংরেজি বলা আর হয় না।

আরাফাত : তার মানে, তুমি বলতে চাচ্ছ, ব্যাকরণ বাদ দিয়েও ইংরেজি বলা যাবে—অর্থাৎ ব্যাকরণের জন্য ভাষা নয়, ভাষার জন্য ব্যাকরণ, তা-ই তো?

মিনহা : ঠিক তা-ই।

আবতাহী : মিনহা ঠিক বলেছে। কারণ একটা শিশু যখন কথা বলতে শেখে, সে তো আর আগে ব্যাকরণ শেখে না। ভাষাই আগে শেখে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি বলতে শেখার ওপর জোর দেওয়া হয় না। অথচ বলতে জানলে পরে গ্রামারটা সহজ হয়ে যায়।

ফয়সাল : অভিভাবকরাও কিন্তু স্পিকিংয়ে জোর দেন না। তাঁরা চান জিপিএ ৫। এতে বেশির ভাগ ছাত্র-ছাত্রীর ইংরেজিতে জড়তা থেকে যায়। বলতে না পারলে শেখার কোনো মানে হয় না।

আবতাহী : অভিভাবকরা তো চাইবেনই একাডেমিক রেজাল্টটা ভালো হোক। মূল সমস্যা পড়াশোনার পদ্ধতিতে। বাংলা মিডিয়ামের ইংরেজি ক্লাসেও ইংরেজি স্পিকিং বাধ্যতামূলক করা হোক।

ফয়সাল : আমার মনে হয়, ইংরেজি বিষয়ের ১০০ নম্বরের মধ্যে ২০ বা ২৫ নম্বরের স্পিকিং পরীক্ষা থাকলে নম্বরের জন্য হলেও সবাই বলতে শিখবে।

মিনহা : আরে আমরা যখন ক্লাস সেভেনে ছিলাম, ইংরেজিতে মৌখিক পরীক্ষা ছিল ২০ নম্বরের। ছাত্র-ছাত্রী বেশি হওয়ায় টিচাররা সবার পরীক্ষা নিতে পারতেন না। এমনিতে ১৫-১৮ নম্বর দিয়ে দিতেন। সেটা আরো ক্ষতিকর।

ফয়সাল : শিক্ষক কম, তাই এ সমস্যা। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রী অনুপাতে নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষককে যদি পরীক্ষার সময় ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে মৌখিক পরীক্ষাটা হয়তো নেওয়া সম্ভব।

আবতাহী : কিন্তু যে শিক্ষকরা ইংরেজি মৌখিক পরীক্ষাটা নেবেন, তাঁদের অবশ্যই ইংরেজির শিক্ষক হতে হবে। কিন্তু গ্রামে, এমনকি শহরেও অনেক স্কুলে ইংরেজির ভালো শিক্ষক নেই। অন্য বিষয়ের শিক্ষকরাই ইংরেজি পড়ান। দুই-তিনজন ইংরেজির শিক্ষক থাকলেও এত শিক্ষার্থীর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া কঠিন।

শান্ত : সাধ্যের মধ্যে চিন্তা করি, তা হলেও ভালো ইংরেজি বলা শেখা যায়। যেমন—একজন ছাত্র স্কুলে মোটামুটি গ্রামার শিখছে। সে কিন্তু একটু-আধটু হলেও ইংরেজি বলতে পারবে। সে যদি ইংরেজি মুভি দেখে নিয়মিত, অনেক শব্দ শিখবে, বাক্য শিখবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুশীলন প্রয়োজন।

ফয়সাল : ইংরেজিতে বিভিন্ন গল্পের বই পড়লেও বলাটা সহজ হবে। বই পড়ে নতুন শব্দ শেখা যায়।

আরাফাত : কিন্তু শব্দগুলোর অর্থ আগে থেকে না জানলে বই পড়ার ইচ্ছাটা থাকবে না।

ফয়সাল : তা ঠিক নয়। আপনি যখন একটা ইংরেজি উপন্যাস কিংবা কোনো বই পড়তে থাকবেন, কয়েকটা শব্দের অর্থ জানা না থাকলেও ভাবটা বুঝে যাবেন। এভাবে পড়তে পড়তে একসময় অভ্যস্ত হয়ে গেলে আর অভিধান দেখতে হবে না।

আবতাহী : আমাদের যেসব ইংরেজি রচনা শিখতে হয়, এর বেশির ভাগই গতানুগতিক। যেমন—ইওর হবি, জার্নি বাই বোট। এগুলোর পরিবর্তে যদি প্রিয় সাইকেল কিংবা তোমার হেডফোন নিয়ে একটা রচনা লিখতে বলা হতো, তাহলে সৃজনশীল হতো সবাই। নিজের থেকে লেখায় তার ভাষার দক্ষতাও বাড়ত।

ফয়সাল : আমার এক বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রে থাকে। শিক্ষকরা তাদের কয়েকটি গল্পের বই দিয়ে দেন। সেগুলো পড়ে প্রেজেন্টেশন দেয় তারা। এটা তাদের একাডেমিক শিক্ষারই অংশ। দেখুন, সিস্টেমটা কত সুন্দর। বই পড়া হলো, শেখাও হলো, দক্ষতাও বাড়ল।

মিনহা : মজার তো! আমরা যদি ক্লাসের সবাই মিলে সপ্তাহে এক দিন করে কোথাও ঘুরতে গিয়ে ওটা সম্পর্কে লিখি, তা হলেও কিন্তু বেশ ভালো হয়। আর ইংরেজি ক্লাস চলাকালীন পুরো সময়টায় যদি ক্লাসের সবাই ইংরেজি বলার চেষ্টা করে, তাহলেও আস্তে আস্তে ইংরেজি বলায় দক্ষতা বাড়বে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষককে অবশ্য আন্তরিক হতে হবে। ছাত্র যদি বলতে ভুল করে, শিক্ষককে সেটা ঠিক করে দিতে হবে।

আরাফাত : টেন মিনিট স্কুলের আয়মান সাদিক ভাইয়াও কিন্তু ইংরেজি শেখার কয়েকটা উপায় বলে দিয়েছেন, তার মধ্যে ক্রিকেটের কমেন্ট্রি শোনা একটা।

শান্ত : উনি তার আরেকটা ভিডিওতে ইংরেজি শেখার জন্য মেসেঞ্জার অথবা হোয়াটসআপে চ্যাট গ্রুপ খুলে ইংরেজিতে কথা বলতে বলেছেন। এটিও চমৎকার কাজ দেবে।

ফয়সাল : প্রতিটি স্কুলে ইংলিশ ক্লাব খোলা এবং সপ্তাহে অন্তত একটি দিন এ ক্লাবের মাধ্যমে ইংরেজির ওপর একটি প্রগ্রাম করা হলেও ভালো হয়। সেখানে ইংরেজিতে বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা—এসব থাকবে।

আরাফাত : দল বেঁধে ইংরেজি দৈনিক পড়তে পারি।

শান্ত : তবে মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। বন্ধুদের সামনে কেউ যদি ইংরেজি বলতে যায়, তাহলে অন্য অনেকের টিটকারি শুনতে হয় তাকে। এখানে উপহাসের পরিবর্তে উৎসাহ দেওয়া দরকার। তাহলেই সে বলার উৎসাহ পাবে। আর কাউকে টিটকারি করা হলেও, সে যেন থেমে না যায়। ইংরেজি বলায় যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তবে হাসাহাসি গায়ে মাখা যাবে না।



মন্তব্য