kalerkantho


প্রতিবন্ধীদের সঙ্গী

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিবন্ধীদের সঙ্গী

ইমরানের বয়স সাত। ঢাকার টঙ্গীর আবদুল্লাহপুরে থাকে। সে শারীরিক প্রতিবন্ধী। ‘নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅ্যাবিলিটি’ রোগে ভুগছে। মানে তার মাংসপেশী অবশ হয়ে আছে। তবে ওর দরিদ্র শ্রমিক বাবা জানতেন না, কোথায় চিকিৎসা করালে তাঁর ছেলে ভালো থাকবে। ‘আইডেনটিটি ইনক্লুশন’-এর বন্ধুরা উত্তরায় মানসিক প্রতিবন্ধীদের স্কুল বিউটিফুল মাইন্ডে ইমরানকে ভর্তি করেছেন। সে সেখানে পড়ালেখা করছে, তার চিকিৎসাও চলছে।

অনেক দিন ধরেই এসব প্রতিবন্ধী শিশু নিয়ে কাজ করছেন শামসিন আহমেদ। তিনিই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তিনি বললেন, ‘প্রতিবন্ধিতা সেই শিশু বা ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সমস্যা। কারণ প্রতিবন্ধী বলে তাদের সবাই দূরে সরিয়ে রাখে, বাঁচতে দিতে চায় না, সাহায্যও করে না।’ তিনি ও তাঁর বন্ধুরা এই মানসিক প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করেন।

কিভাবে এই কাজের শুরু? শামসিন তাঁর জীবনের গল্পই বললেন, ‘আমার বড় বোনটি মৃগীরোগে আক্রান্ত। আমার সাত বছরের বড় তিনি। তখন আমরা নাইজেরিয়ায় থাকতাম। শিক্ষক বা স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁর রোগটিকে কিন্তু গুরুত্ব দেননি। অন্য দশটি ছেলে-মেয়ের সঙ্গে আমার বোন নবম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে লেখাপড়া করেছেন। দেশে ফিরে তিনি স্কুলেও ভর্তি হলেন। একদিন হঠাৎ স্কুলে তাঁর খিঁচুনি হলো। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলেন, এমন ছাত্রী তাঁরা স্কুলে রাখবেন না।’ এরপর কেঁদে ফেললেন তিনি, ‘কোনো স্কুলই তাঁকে ভর্তি করেনি। তাঁর আর পড়ালেখাই হয়নি। সে অভিজ্ঞতা থেকে মানসিক রোগে আক্রান্তদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক আচরণ বদলানোর জন্য কাজ করছি আমি।’ 

লেখাপড়া শেষ করে তিনি প্রতিবন্ধীদের জন্য পরিচালনা করা ব্র্যাকের একটি কর্মসূচিতে কাজ করলেন। তাতে প্রতিবন্ধিতার পেছনে সমাজের নেতিবাচক ভূমিকাগুলো জানলেন। সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সবার অংশগ্রহণ বা ইনক্লুশনের উপায় শিখলেন। মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের কোর্স করলেন। ২০১৫ সালে সমমনাদের সঙ্গে আলোচনা করলেন। তাঁরা সবাই মিলে ফেসবুকে পেজ খুললেন, www.facebook.com/identityinclusion। সংগঠনের নাম দিলেন ‘আইডেনটিটি ইনক্লুশন।’ ফেসবুকে প্রচারণা চলল, স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। তার পর থেকে এসব মানুষকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসতে কাজ শুরু করছেন তাঁরা। আইডেনটিটি ইনক্লুশনে এখন ১০ জন স্বেচ্ছাসেবী আছেন। তাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী। ব্যবস্থাপক আছেন দুজন। রোগী ও তার পরিবারকে তাঁরা মনো-সামাজিক সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করেন। সারা দেশের তরুণদেরও তাঁদের কাজে যুক্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-ছাত্রী ও আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে ‘আইডেনটিটি ইনক্লুশন’ প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছে। শামসিন বললেন, ‘গত দুই বছরে ঢাকা, খুলনা, শাহজালাল, নর্থ সাউথ এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ছাত্র-ছাত্রীদের আমরা কর্মশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এ পর্যন্ত ৮০ জন শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।’ এত দিন ধরে কাজ করে কী দেখেছেন—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের মূলধারার স্কুলগুলো মানসিক প্রতিবন্ধী বলে এসব ছাত্র-ছাত্রীকে ভর্তি করে না। এভাবে তাদের শিক্ষা, বিনোদন ও কর্মসংস্থানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ফলে তারা আরো হতাশ হয়ে পড়ে, শরীর ও মন আরো ভেঙে পড়ে। আমরা তাদের উন্নত জীবনের জন্য কাজ করি।’ এই কাজের সুবাদে ২০১৬ সালে ‘আরবান ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতায় স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ‘আইডেনটিটি ইনক্লুশন’ বিশেষ পুরস্কার পেয়েছে। শামসিন আহমেদ ও তাঁর বন্ধুরা স্বপ্ন দেখেন, এমন এক দেশ হবে বাংলাদেশ, যেখানে কাউকে ‘প্রতিবন্ধী’ বলে তার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হবে না। সমাজের অন্যদের মতো তাদেরও সব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সমান অধিকার থাকবে।


মন্তব্য