kalerkantho


পথশিশুদের বন্ধু

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পথশিশুদের বন্ধু

আলোচিত এই তরুণকে অনেকেই চেনেন। তিনি জেলে গিয়েছেন, সংবাদ শিরোনামও হয়েছেন। আবার খালাসও পেয়েছেন সসম্মানে। এর সবই ঘটেছে তাঁর ‘মজার ইশকুল’ ও পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে। কিভাবে মজার ইশকুল, পথের ছেলে-মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো শুরু হয়েছিল—এ প্রশ্নের জবাবে আরিয়ান আরিফ বললেন, ‘আমার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এই ইশকুলের শুরু। আজও মনে আছে—২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি ফেসবুকে পথশিশুদের জন্য একটি ইশকুলের কথা বলেছিলাম। স্ট্যাটাসে লিখেছিলাম, “শাহবাগে শিক্ষাবঞ্চিত অনেক পথশিশু ভিক্ষা কিংবা ফুল বিক্রি করে। আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ বিকেলেই অবসর থাকি, পথশিশুদের বিকেলে পড়াতে পারি? স্কুলের নাম ‘মজার ইশকুল’ হতে পারে। ৪৯ জন পোস্টটি লাইক দিল। অনেকে কমেন্ট করল।”

দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী তাদের পড়াতে আগ্রহী হলেন। ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি কনকনে শীতের এক সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টো দিকে রমনা কালী মন্দিরের পাশে ১৩টি শিশু নিয়ে মজার ইশকুল যাত্রা করল। প্রথম দিন সেই দুই শিক্ষক পড়াতে এসেছিলেন। তবে এর পর থেকে ব্যস্ততার জন্য আর সময় দিতে পারেননি। ফেসবুক প্রচারণা, বন্ধু-পরিচিতদের সহযোগিতায় স্কুলটি চালিয়ে নিয়েছেন আরিয়ান। আস্তে আস্তে অনেকে যুক্ত হয়েছেন।

শুরুর দিকে একদিন পর একদিন এক ঘণ্টার ক্লাস হতো। শুক্রবার ছিল ছুটি। খোলা আকাশের নিচে টানা আট মাস এভাবেই চলেছে ‘মজার ইশকুল’। বর্ষায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লালন মঞ্চে স্কুল গিয়েছে। সেখানেই সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধরে এখনো তাঁদের ক্লাস চলছে। ধীরে ধীরে ছাত্র-ছাত্রী বেড়েছে।

২০১৪ সালের ২৮ জানুয়ারি তাঁরা ‘অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছেন, নিবন্ধন করেছেন। সেই থেকে আজতক দুটি স্থায়ী ও তিনটি অস্থায়ী ‘মজার ইশকুলে’ অন্তত ৫০ হাজারের বেশি পথশিশুকে শিক্ষার আলো দেওয়া হয়েছে, হাজারো পথশিশুকে মাদকাসক্তি ও ভিক্ষা করা থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

বাবু আহমেদ মজার ইশকুলের অন্যতম শিক্ষক। ঢাকা কলেজে বাংলায় পড়েন। তৃতীয় বর্ষের এই ছাত্র দেড় বছর ধরে স্কুলের শিক্ষক। তিনি বললেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি করি, খেলাধুলা করি। যারা নিজের নামটিও লিখতে পারে না, তাদের অক্ষর শেখাই। যে যে বিষয় পড়তে ভালোবাসে, সেটি পড়াই। যে ছবি আঁকতে চায়, সেটি করতে তাকে সাহায্য করি।’

ঢাকার আগারগাঁও ও মানিকনগরে দুটি স্থায়ী ‘মজার ইশকুল’ আছে। সেগুলোর মাধ্যমে ৬০ জন করে মোট ১২০ জন সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু নিয়মিত ইশকুলমুখী হয়েছে। স্থায়ী মজার ইশকুলের সব শিক্ষার্থীর  ইউনিফর্ম আছে। ছাত্ররা লাল টি-শার্ট, সবুজ প্যান্ট, ছাত্রীরা লাল ফ্রক ও সবুজ স্কার্ট পরে। তারা অন্য সাধারণ স্কুলের মতো লেখাপড়া করে। স্কুলে এসে প্রথমেই জাতীয় সংগীত গায়। এরপর ক্লাসে গিয়ে বর্ণপরিচয় শেখে, ছবি আঁকে। তাদের বিনা মূল্যে টিফিন দেওয়া হয়। আগারগাঁওয়ের ইশকুলে ‘বাটা চিল্ড্রেন প্রগ্রাম’ সাহায্য করে। অদম্য বাংলাদেশের ‘স্পন্সর অ্যা চাইল্ড’ কার্যক্রমে অংশ নিয়েও অনেকে শিশুদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করে দেন। তবে এখনো তাঁরা ইশকুলগুলোতে ভাড়া দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম চালান। ঢাকার সদরঘাট, কমলাপুর ও শাহবাগের অস্থায়ী স্কুলে সপ্তাহে একদিন বিকেলে ক্লাস হয়। সেগুলো স্বেচ্ছাসেবকদের চাঁদায় চলে। নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবক মাসে ২৫০ টাকা করে চাঁদা দেন। সব স্কুলেই জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসারে প্রাথমিক জ্ঞান দেওয়া থেকে শুরু করে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। পর্যায়ক্রমে এটি এসএসসি পর্যন্ত উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। এখন তাঁদের শ পাঁচেক নিয়মিত ছাত্র-ছাত্রী ও ৫০ জন নিয়মিত স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষক আছেন। তবে আরিয়ান বললেন, “আমাদের তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক ১ হাজার ৫৭ জন। তাঁরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রী। তাঁরাও পড়াতে আসেন। আর ২৯ জন কর্মকর্তা আছেন। এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তিনি বললেন, ‘আমরা বছর বছর ছয়টি মজার উৎসব করি। জানুয়ারিতে ‘পিঠা’, ফেব্রুয়ারিতে ‘ক্রীড়া’, মে মাসে ‘ফল’, রোজার ঈদে ‘ঈদ’, অক্টোবরে ‘আনন্দ (পিকনিক)’ ও ডিসেম্বরে ‘শীত’ উৎসব করি।” তিনি খুশির খবর দিলেন, “মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় ‘অদম্য বাংলাদেশ চিল্ড্রেন ভিলেজ’ নামে পথশিশুদের জন্য ৩৭ শতাংশ জমির ওপর স্থায়ী শেল্টার হোম তৈরির প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষ করেছি। পাঁচ একর জমিতে এই হোম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আছে। তাতে অন্তত এক হাজার সুবিধাবঞ্চিত পথশিশু থাকতে পারবে।” কেন পথশিশুদের জন্য এত কাজ করছেন—পথশিশুদের বন্ধু আরিয়ান আরিফ বললেন, “আমরা স্বেচ্ছাসেবীরা পথশিশুদের পাশে দাঁড়ানোর সময় একটিই শপথ নিই—‘জন্মের পর আমি যে বাংলাদেশ দেখিয়াছি, মৃত্যুর সময় তাহার চাইতে উন্নত দেশ রাখিয়া মরিতে চাই’।”



মন্তব্য