kalerkantho

তরুণ নেতা

বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু করেছিলেন স্বপ্ন পূরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে তাঁরা পথশিশুদের ভাগ্য বদলে দেন, মানসিক সমস্যার সমাধান দেন, রক্তের বাঁধনে জড়ান, উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ সফল করেন, জলবায়ুর পরিবর্তনে সচেতন করেন। বাংলাদেশের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য কাজ করা ওই তরুণরা সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁদের নিয়ে বছর শুরুর বিশেষ আয়োজনে লিখেছেন ছাইফুল ইসলাম মাছুম

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তরুণ নেতা

‘আমাদের এই সংগঠন চালু হয়েছে ২০১৫ সালে। তখন মাত্র কয়েকজন ছিলাম। এখন ক্লাইমেট ট্র্যাকারের সঙ্গে যুক্ত আছেন দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশের এক হাজার ৩০০ তরুণ প্রতিনিধি।’ বলছিলেন সোহারা মেহরোজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ক্লাইমেট ট্র্যাকার সাউথ এশিয়া’র তিনি প্রধান। কী ধরনের কাজ করেন? জবাবে বললেন, ‘বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনে বাংলাদেশ অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। এই ক্ষতি সম্পর্কে এ দেশের তরুণ-তরুণীদের সচেতন করতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কর্মশালা ও সেমিনার করি। রেডিও-টিভিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নানা দিক নিয়ে আলোচনায় অংশ নিই। পত্রপত্রিকায় তরুণদের এ নিয়ে লেখালেখিতে সাহায্য করি। এসব কাজের একটিই উদ্দেশ্য—আমরা চাই তাঁরা পরিবেশগত সমস্যার দিকে মনোযোগ দিক, এসব বিষয়ে সচেতন হোক।’

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সাংবাদিকতাও করেন তিনি। লেখালেখির শুরু তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইয়েল ডেইলি নিউজে’ লিখতেন। হাফিংটন পোস্ট, আইপিএস, এশিয়া সেন্টিনেল, ডয়েচে ভেলে ছাড়াও দেশের ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউনসহ অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাঁচার জন্য অভিযোজনের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। এই কাজের জন্য সরেজমিনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখতে উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যান তিনি। সেসব জায়গায় জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে জীবনযাপনে কী প্রভাব পড়ছে এবং মানুষের কী ধরনের সাহায্য দরকার, জানার চেষ্টা করেন। এ বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। যেমন—গত মাসেই তিনি রাঙামাটি জেলার সর্ব-উত্তরের সাজেক গিয়েছিলেন। সেখানে দেখেছেন, অতিবৃষ্টির কারণে জুমের ফলন একেবারেই হয়নি। ফলে আদিবাসীরা প্রচণ্ড খাদ্যসংকটে ভুগছেন। ‘এই অতিবৃষ্টির কারণ—জলবায়ুর পরিবর্তন’, বললেন তিনি। পরিবেশ নিয়ে লেখালেখির সুবাদে ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরের ‘এনভায়রনমেন্ট কাউন্সিল’ তাঁকে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘এশিয়ান ইয়ং এনভায়রনমেন্ট জার্নালিস্ট অব দ্য ইয়ার’ অ্যাওয়ার্ড দিয়েছে।

সোহারার আরো অনেক সাফল্য আছে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ [কপ] ২১’-এ অংশ নেওয়ার জন্য সারা বিশ্বের দুই হাজার তরুণ-তরুণীর মধ্যে সেরা ১১ জনের একজন ছিলেন। ২০১৬ সালে একমাত্র বাংলাদেশি তরুণ সাংবাদিক হিসেবে ‘আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্ক’ ফেলোশিপ নিয়ে মরক্কোর ‘কপ-২২’-এ অংশ নিয়েছেন। গত বছর সেরা ১০ জনের একজন হিসেবে ‘থমসন রয়টার্স জার্নালিজম ট্রেনিং ফেলোশিপ’ করেছেন। সে বছরই এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্কের সার্ক মিডিয়া ভিজিট ফেলোশিপের আওতায় নির্বাচিত সাত দক্ষিণ এশীয় তরুণের একজন হিসেবে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে তিনি খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তবে সোহারার কাজ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নেই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘গ্লোবাল শেপার্স কমিউনিটি’ নামের স্বেচ্ছাসেবী যুব সংগঠনের ঢাকা হাবের তিনি কিউরেটর। তাঁর নেতৃত্বে ঢাকায় এই সংগঠন সমাজসেবা ও উন্নয়নমূলক অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তাদের ‘তালগোল’ প্রকল্পের মাধ্যমে বছরভর দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা খেলার ছলে সামাজিক পরিবর্তন শেখে। বছর শেষে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ক্রীড়া ও সামাজিক দক্ষতাগুলো প্রদর্শন করে। ‘এই প্রকল্পের আরো উদ্দেশ্য হলো, তাদের মধ্যে হতাশা বা মাদকাসক্তির মতো সমস্যা তৈরি হতে না দেওয়া এবং সামাজিক কাজে নিয়ে আসা।’ জানালেন সোহারা। তাঁদের ‘অদম্য’ প্রকল্পের মাধ্যমে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের সাধারণের চলাফেরার স্থানগুলোতে চলাফেরা বাড়ানোর জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে আছে বলে জানালেন তিনি।

সমাজসেবা, জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে এত কাজের সুবাদে এ বছরের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সভায় তিনি তরুণ প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। মার্চে বিশ্বের উদ্যোগী আট হাজার তরুণের মধ্যে নির্বাচিত ৮০ প্রতিনিধির একজন হিসেবে ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লসের কাছ থেকে ‘তরুণ নেতা’র সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।      

 

ছবি : হাবিবুর রহমান


মন্তব্য