kalerkantho


চৌকস

জ্বলজ্বলে এক নক্ষত্র!

নাহরিন আহমেদ নক্ষত্র। গার্লগাইড থেকে শুরু করে গান, নাচ ও উপস্থাপনা— নামের মতোই ছড়াচ্ছে দ্যুতি। নক্ষত্রের গল্প শোনাচ্ছেন আফরা নাওমী

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



জ্বলজ্বলে এক নক্ষত্র!

নক্ষত্র পড়ছে ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। দশম শ্রেণিতে।

পড়াশোনায় মনোযোগী। তবে শুধু পাঠ্য বইয়ে ক্ষান্ত দেয়নি। দুনিয়া জয় করতে নেমেছে ও।

চতুর্থ শ্রেণিতে থাকতেই যোগ দেয় ‘হলদে পাখি’ দলে। তখন থেকেই পরিচয় গার্লগাইডের সঙ্গে। নক্ষত্র বলে, ‘তখন গার্লগাইড নিয়ে ভুল জানতাম। সুরাইয়া ম্যাডাম আমার ভুল ভাঙান ও উত্সাহ দেন। ক্লাস সিক্সে উঠে যোগ দিই গার্লগাইডে। একসঙ্গে তালে তালে পা ফেলতে দারুণ লাগত।

বড় আপুদের নেতৃত্ব দেখে অনুপ্রেরণা পেতাম। তখন থেকেই ঠিক করি, আমাকেও এমন নেতা হতে হবে। ’

নক্ষত্রের বাবা ছাত্রজীবনে রোভার স্কাউট ছিলেন। তিনি নক্ষত্রকে শিখিয়ে দেন গেরোসহ স্কাউটিংয়ের আরো টুকিটাকি। নক্ষত্রের নানাও ছিলেন রোভার স্কাউট লিডার। তিনিও তালিম দিয়েছেন মাঝেমধ্যে।

এক বছরেই গাইডদের বন্ধু হয়ে যায় নক্ষত্র। স্পোর্টস ডে বা জাতীয় দিবস উপলক্ষে যত কিছুই হোক, ডাক পড়ে নক্ষত্রের। ক্যাম্পেইনিং করত তারা। ময়মনসিংহের কাঞ্চনপুর কিংবা ব্রহ্মপুত্রের চরসহ আরো অনেক জায়গায় ঘুরেছে নক্ষত্র ও তার দল। স্থানীয় নানা বিষয়ে সচেতন করে আসছে।

নক্ষত্র জানাল, ‘আমার দেখাদেখি আমার অনেক বন্ধু ও জুনিয়ররাও যোগ দিয়েছে গাইড দলে। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে আমি সহায়তা করতে তৈরি। ’

কাঞ্চনপুর গ্রামে যখন ক্যাম্পেইনিং করতে যায়, সেখানে সবাইকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হয়। যাকে বলা হয় পেট্রোল। চারটি পেট্রোল ছিল। একটি গ্রুপের লিডার ছিল নক্ষত্র। প্রতিটি দলকে একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হয়। সাংস্কৃতিক ও নানা টুকিটাকি জিনিসপত্র তৈরির ওই প্রতিযোগিতায় নক্ষত্রের পেট্রোলটিই প্রথম হয়।

নক্ষত্রের ছোট্ট জীবনে সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতাটি হলো দেশের বাইরে যাওয়া। ২০১৬ সালে হংকং গার্লগাইড অ্যাসোসিয়েশন তাদের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘পেইচিং ইনার মঙ্গোলিয়া ট্যুর ২০১৬’-এর আয়োজন করে। বাংলাদেশ গার্লগাইড অ্যাসোসিয়েশনকে আমন্ত্রণ জানায় তারা। ময়মনসিংহ জেলার জেলা গাইড কমিশনার, স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাছিমা আক্তার এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করে অনানুষ্ঠানিকভাবে জেলার সেরা গাইড হিসেবে নির্বাচন করেন নক্ষত্রকে। রাজশাহীর দুজন রেঞ্জারও ছিলেন ওর সঙ্গে। ‘বাংলাদেশ গার্লগাইড অ্যাসোসিয়েশনের লাকি আপা সর্বোচ্চ আন্তরিকতায় আমার ভিসার ব্যবস্থা করেন। এ ছাড়া অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেক সদস্য শুভকামনা জানিয়েছেন। তাঁরা তথ্য দিয়েছেন, উপদেশও দিয়েছেন। ’ জানাল নক্ষত্র।

‘চীন-হংকংয়ে যেমন আনন্দ হয়েছে, তেমনি বিপদেও পড়েছিলাম। খারাপ আবহাওয়ার কারণে উড়োজাহাজ ২৩ ঘণ্টা দেরি করে। তাই প্রথম তিন দিন হংকং গার্লগাইড অ্যাসোসিয়েশনের (এইচকেজিজিএ) সঙ্গে থাকতে পারিনি। ’ নক্ষত্র আরো জানাল, ওই সময়টুকুতেই তারা শিখেছে কিভাবে আত্মবিশ্বাসী হতে হয়, কিভাবে প্রতিকূল অবস্থায় মানিয়ে নিতে হয়।

এইচকেজিজিএর সঙ্গে পরে চার দিন কাটানোর সুযোগ হয়েছিল তাদের। মরুভূমি, মালভূমি, বিশ্বখ্যাত কারখানা ও জাদুঘর ঘুরে দেখা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, এ বছর জাতীয় শিক্ষা সফরে গাইড ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ গাইডের সম্মাননা পায় নক্ষত্র।

নক্ষত্র ছবি আঁকে, গান করে। নাচ ও উপস্থাপনায়ও পারদর্শী। ময়মনসিংহের উদীচীতে উচ্চাঙ্গসংগীত শিখেছে চার বছর। এখন গান শিখছে বাসায়। নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক, লোকগীতি—সবই শেখা হচ্ছে। ‘সত্যেন সেন গণসংগীত পুরস্কার ২০১৫’-এ অংশ নিয়ে জেলাপর্যায়ে গণসংগীতে সেরা হয়েছিল নক্ষত্র। এখন উত্সব এলেই গান গাওয়ার জন্য ডাক পড়ে তার। উদীচীতেই শিখছে নাচ। কত্থক তার সবচেয়ে প্রিয়।

স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো সরস করে রাখে তার উপস্থাপনা। অনুষ্ঠানের আয়োজনের ভারও পড়ে তার কাঁধে। এত কিছু করেও সময় বের করে বসে যায় ছবি আঁকতে। ‘খেলাঘর জাতীয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ২০১১’-তে শরতের দৃশ্য এঁকে জেলাপর্যায়ে প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল ও। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা আয়োজিত ‘শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ২০১০’-এ দ্বিতীয় হয়।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচির স্কুল ভলান্টিয়ার ও। ‘সৃজনশীল শিল্প সাহিত্য উত্সবে’ সে দুই বছরই অংশ নিয়েছে। গত বছর সব মিলিয়ে ১১টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছিল। ময়মনসিংহের মধ্যে তার স্কুলই প্রথম স্থান অর্জন করে। স্বভাবতই নেতৃত্বে ছিল নক্ষত্রই।

প্রতিবছর বইমেলা উপলক্ষে ঢাকায় আসা হয়। প্রিয় লেখকের তালিকায় আছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কাজী নজরুল ইসলাম, আহমেদ ছফা, শরত্চন্দ্র ও বিভূতিভূষণ। প্রিয় বই জাহানারা ইমামের ’৭১-এর দিনগুলি’। এটা নাকি এরই মধ্যে ১২ বার পড়া হয়ে গেছে।

এদিকে নক্ষত্র আবার একটি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত। নাম ‘ময়মনসিংহ ক্লিন’। শহরের পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রম দেয় ও।

এত কিছু কিভাবে সামলায় জানতে চাইলে বলল, ‘নিজেকে কড়া একটি রুটিনে রেখেছি। সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এই রুটিন। স্কুল ডে শিফট হওয়ায় ঝুটঝামেলাও কম। ’

বড় হয়ে স্থপতি হতে চায় নাহরিন আহমেদ নক্ষত্র। তাই আজকাল স্বপ্নের বাড়িঘরের ছবি স্কেচ করা শুরু করেছে।


মন্তব্য