kalerkantho


স্কুলটা চালাচ্ছে কলেজপড়ুয়ারা

সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের নাম লেখানো শেখাতে গিয়েই শুরু। এরপর আর থেমে থাকেনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একাদশ শ্রেণির ছাত্র আফনান ও তার বন্ধুরা। গড়ে তুলেছে ‘পথ তারার ইশকুল’। জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



স্কুলটা চালাচ্ছে কলেজপড়ুয়ারা

শুরুর কথা

২০১৫ সালের কথা। একদিন আফনান সাকিব ও তার বন্ধুরা গল্প করতে করতে হঠাত্ ইচ্ছা জাগল পথশিশুদের নাম লেখানো শেখাবে।

প্রথমে রেলস্টেশনের গোটা কয়েক পথশিশুকে সাক্ষর শেখাতে বসল ওরা। আশপাশের অনেকে ভাবতে শুরু করল বুঝি স্কুল চালু হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে যোগ দিল আরো অনেক পথশিশু। অনুপ্রেরণার শুরু সেখান থেকেই। দিনে দিনে হয়ে গেল পথ তারার স্কুল। আনুষ্ঠানিকভাবে যার যাত্রা শুরু ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর। আফনান ও তার বন্ধুরাই ক্লাস নেয়। শুরুর দিকে নিজেদের টিফিনের টাকায় পথশিশুদের শিক্ষা উপকরণ কিনে দিতে শুরু করল তারা। এখন বেড়েছে স্বেচ্ছাসেবীর সংখ্যা। মাস শেষে স্কুল ও কলেজপড়ুয়াদের দেওয়া নির্দিষ্ট অঙ্কের চাঁদার ওপরই চলছে স্কুলটির কাজকর্ম। প্রতিষ্ঠাতা আফনান সাকিব এখন মিরপুর বাংলা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। সপ্তাহে কিংবা পনেরো দিনে একবার সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়ে স্কুলটির দেখভাল করে।

তিন শাখায় ১৭৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন স্থানে ‘পথ তারার ইশকুল’-এর তিনটি শাখা আছে। শহরের রেলস্টেশন, লোকনাথ দিঘিরপার এবং শিমরাইলকান্দি খাদ্য গুদাম এলাকায় আছে এগুলো। স্কুলের নির্দিষ্ট কোনো জমি থাকার কথা নয়। তাই ভাসমান ক্লাস। সপ্তাহে প্রতিদিনই স্কুলটি খোলা থাকে। এখন কাগজে-কলমে সেখানে পড়ছে ১৭৬ জন শিশু। ক্লাস চলে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। তবে প্রতিদিন তিনটি শাখায় ক্লাস চলে না। একটি শাখায় হয়। আবার স্কুলটি শুধু পড়ায় না, পথশিশুদের জন্য হালকা নাশতার আয়োজনও করা হয়।

বছরজুড়ে আয়োজন করে বিভিন্ন ইভেন্টের। প্রতি ঈদে ও পহেলা বৈশাখে চাঁদা তুলে জামা কিনে দেওয়া হয়। শীতে দেওয়া হয় জ্যাকেট-সোয়েটার। বিভিন্ন মৌসুমি ফল নিয়েও হয় উত্সবের আয়োজন। এর বাইরে জাতীয় দিবসগুলো পথশিশুদের সঙ্গেই উদ্যাপন করে স্কুলের পাঠদানের সঙ্গে জড়িতরা। প্রতি মাসের শেষ সপ্তাহে ঘটা করে ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সপ্তাহ’ পরিচালনা করা হয়।

পরিত্যক্ত রেললাইনেই চলছে জমজমাট ক্লাস
নিজেদের পড়াশোনার ফাঁকে কী করে পথশিশুদের ক্লাস নেওয়ার সময় বের করে—এমন প্রশ্নের উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাশিদ সাবা নুর জানাল, ‘আমরা একজন করে সপ্তাহে একটি শাখায় ক্লাস নিই। এতে পড়ার কোনো ক্ষতিই হয় না। উল্টো আমাদের সময়টা ভালোই কাটে। ’ স্কুলটির আরেক শিক্ষক অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুবেল আহমেদ বলল, ‘পরিবার থেকেও আমাদের উত্সাহ দেওয়া হয়। আমি নিজে তো পড়ছি, আমি চাই ওরাও পড়ুক। আর ক্লাস নেওয়া হয় সকাল ৮-১০টা। তাই নিজেদের পড়ার ওপর কোনো চাপ পড়ে না। ’

খরচ?

গত দুই বছর স্কুলটির পরিচালনার যাবতীয় খরচ শিক্ষার্থীরা নিজেরাই জোগাড় করেছে। সংগঠনটির মোট সদস্য আছে প্রায় এক শ। তারাই প্রতি মাসে এক শ টাকা করে চাঁদা দেয়। এতে স্কুল চালানোর যাবতীয় খরচ উঠে আসে। আফনান সাকিব জানালেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এই শিশুদের পড়াশোনার সঙ্গে স্থায়ীভাবে সম্পৃক্ত করা। অল্প একটু পড়ে তারা চলে যাক, এটা চাই না। এ জন্য আমরা তাদের প্রয়োজনে অন্য স্কুলে ভর্তি করাই। দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব খরচও দেব ঠিক করেছি। ’

স্বপ্নপূরণের দ্বিতীয় ধাপ

স্কুলটির শিক্ষার্থী দিন দিন বাড়ছে। পথশিশুদের অভিভাবকরাও তাঁদের সন্তানদের এখানে পাঠাচ্ছেন। তবে এ স্কুলই শেষ কথা নয়। এখানে পড়াশোনা কিছুদূর এগোনোর পর যারা একটু পরিশ্রমী ও ভালো ফল করে, তাদের অন্য একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করে সংগঠনটি। এ পর্যন্ত তিনজনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি করিয়েছে পথ তারার স্কুল। এমনকি ওই তিনজনের পড়ার খরচও তারা দিচ্ছে।


মন্তব্য