kalerkantho


সত্যিকারের সুপারহিরোর গল্প শোনায়

‘লিভিং উইথ লিজেন্ডস’ স্কুলে স্কুলে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধার গল্প শোনায়, আর সেই গল্প নিয়ে পরদিন শিশুরা ছবি আঁকে। শেষদিন গল্পের সেই মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে পরিচিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের এই সংগঠন গিয়েছে ২০০ স্কুলে। তাদের নিয়ে লিখেছেন সাইফুল ইসলাম

৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



সত্যিকারের সুপারহিরোর গল্প শোনায়

সংগঠনটির নাম ‘লিভিং উইথ লিজেন্ডস’। গড়ে তুলেছেন হাসান মুনাওয়ার মাসুক ও তাঁর বন্ধুরা।

শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। তখন তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। টিউশনিতে গিয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ইফতিকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার নাম বলতে বললেন। তবে সে কয়েকজন ভাষাসংগ্রামী ছাড়া আর কারো নামই বলতে পারল না। এরপর বন্ধু মফিজ উদ্দিন নাফিজ, আবুল কালাম, আশরাফুল আলম আদীব, শায়লা সুলতানা ও ইমতিয়াজকে নিয়ে গড়ে তুললেন ‘লিভিং উইথ লিজেন্ডস’। এটি নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাবে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁরা চলে গেলেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের এনসাইক্লোপিডিয়া স্কুলে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ২০০ স্কুলে হাজির হয়েছে ‘লিভিং উইথ লিজেন্ডস’। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের সত্যিকারের সুপারহিরোর গল্প শুনিয়েছে, তাঁদের সঙ্গে পরিচিত করেছে। কিভাবে কাজ করেন? মাসুক বললেন, ‘প্রথম দিন আমরা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের ডেকে এক মুক্তিযোদ্ধা কিভাবে যুদ্ধ করেছেন সেই গল্পটি বলি। মডেলে গাছ, নৌকা ইত্যাদির রেপ্লিকার মাধ্যমে সেই দৃশ্যগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। ফলে পুরো দৃশ্যটি তারা দেখতে পায়। শিশুরা তো সুপারহিরো খুব ভালোবাসে, পরদিন সেই সুপারহিরোর কাহিনি নিয়ে ছবি আঁকে। ছবিগুলো থেকে সেরা ছবিগুলো বাছাই করা হয়। শেষদিন গল্পের নায়ক মুক্তিযোদ্ধা এসে তাদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন এবং জীবনের গল্প বলেন। ’

মাসুক বললেন, ‘অনেক মুক্তিযোদ্ধার গল্প শুনে আমরাও শিহরিত হয়েছি। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গাববাড়ী গ্রামের গাববাড়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের সামনে তাদের এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ফখরুল আলমের বলা জীবনের গল্প কোনো দিনও ভুলব না। তিনি লালমনিরহাটে ডাক বিভাগে চাকরি করতেন। দেশ স্বাধীন করবেন বলে একাত্তরের এপ্রিলে লালমনিরহাট থেকে চলে এলেন জন্মভূমি গাববাড়ীতে। ৯ নম্বর সেক্টরে হাবিবুর রহমান বীরপ্রতীকের কাছে যুদ্ধবিদ্যা শিখে শত্রুর মুখোমুখি হতে চলে যান। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ১২ জন সহযোদ্ধা নিয়ে উজিরপুরের পাকিস্তানি হানাদারদের ফাঁড়ি আক্রমণ করেন। তুমুল যুদ্ধে তাঁরা হানাদারদের হারিয়ে অস্ত্রগুলো দখল করেন। তখন তাঁর দুই সহযোগী আহত হন। মীরেরহাট ও বানারীপাড়ায়ও যুদ্ধ করছিলেন তিনি। বানারীপাড়ায় একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও সাতজন আহত হন। হাবিবুর রহমান বীরপ্রতীকও আহত হয়েছেন। এরপর শিশুরা তাঁকে দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়ে। তিনি নিজের গ্রামের শিশুদের সামনে শেষদিন হাজির হন। ’

এভাবে সারা দেশের ৬৭ জন মুক্তিযোদ্ধার জীবনের গল্প শুনেছে শিশুরা, লিভিং উইথ লিজেন্ডসের সদস্য হয়েছে ১৮৭ তরুণ। তাঁদের জীবনের খাতায় জমা হয়েছে অনেক অনেক গল্প। ঢাকার মাণ্ডা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে মুক্তিযোদ্ধাকে তাঁরা নিয়ে গিয়েছিলেন, মুুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজ সেই স্কুলের সামনেই ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। তিনি ১৯৭১ সালে পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর গল্প শোনার পর থেকে সুপারহিরো নামেই তাঁকে ডাকে সবাই। তাঁর সঙ্গে অন্যদের মতো ছবি তোলে। গেল বছরের জুনে তাঁকে চাঁদা দিয়ে একটি রিকশা কিনে দিয়েছেন তাঁরা। কিভাবে টাকা-পয়সা জোগাড় হয়? সদস্য আয়েশা শেখ নিপা জানালেন, ‘আমাদের সদস্যদের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর। তাঁরা পড়ালেখার খরচ বাঁচিয়ে ৩০ থেকে শুরু করে ১০০ টাকা—যে যা পারেন মাসিক চাঁদা দেন। মাসুক বললেন, ‘প্রথম দিকে সমস্যা হলেও রাজনীতির বাইরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরছি বলে সব স্কুলের কর্তৃপক্ষই সাহায্য করছে। ’ ২০১৫ সালে এই সংগঠন ‘ইয়ং বাংলা’ অ্যাওয়ার্ড জয় করেছে।


মন্তব্য